শামস তাবরিজির স্নেহমাখা হাত

সম্ভবত অপারেশন থিয়েটারে অচেতনে কিংবা অর্ধচেতনে প্রথম ওই পাগড়িপরা মানুষটাকে দেখেছিলেন। তবে আজকাল প্রায়ই তাঁর মনে হয়, শামস তাবরিজি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনো-বা যেন মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, চুলে বিলি কাটছেন। অনুচ্চ স্বরে বলছেন, ‘জুবায়ের, আমি তো তোমাকে আগেও বলেছি, যে আগুন তোমাকে পোড়ায়, সেই আগুনই তোমার ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেয়। ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই গুপ্তধন লুকিয়ে থাকে।’ অথচ ৬৫ বছর বয়সী এই জুবায়ের হুসাইন অপারেশন থিয়েটারে নিজের মৃত্যুই কামনা করেছিলেন। মেরুদণ্ডের ওই অপারেশন তাঁর যন্ত্রণা অনেকটাই লাঘব করেছে বটে, তবে চলতে–ফিরতে এখন হুইলচেয়ার ছাড়া নিরুপায়। যে অথর্ব জীবনের কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তিনি, সেটাই তাঁর ললাটলিখন। স্ত্রী সুরাইয়া আধঘণ্টা আগে হুইলচেয়ার ঠেলে বারান্দায় বসিয়ে রেখে গেছেন। চারতলার বারান্দায় বসে পথচারী ও যানবাহনের সারি দেখতে দেখতে ভাবেন তিনি, যদি এক বছর আগে ওটিতে মারা যেতেন, তাহলে এই নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হতো না। মফস্‌সলে জন্ম হলেও জীবিকা ও প্রতিষ্ঠার তাগিদে ৪৩ বছর ধরে বসবাস এই রাজধানীতে। ভেবেছিলেন চাকরির শেষ পর্যায়ে বদলি নিয়ে এলাকায় ফিরে যাবেন, সেখানেই কাটাবেন অবশিষ্ট জীবন। স্ত্রী-সন্তানদের অনাগ্রহে তা আর সম্ভব হয়নি। রাজধানীর হাতছানিতে এখানে আসাটা যত সহজ ফিরে যাওয়া অনেক কঠিন, অন্তত তাঁর ক্ষেত্রে সে রকমই হয়েছে। তবে এই শহর তাঁকে বঞ্চিত করেনি। নিজের জেলা থেকে বিকম পাস করে রাজধানীতে আসেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়তে। সেই পড়াশোনাই এই শহরে ভালোভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করেছিল। তাঁর স্বপ্ন খুব বড় ছিল না। যেটুকু চেয়েছিলেন—নিজের একটা ফ্ল্যাট, একটা গাড়ি, ছেলেমেয়ে দুটির ভালো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা—সবই পূরণ হয়েছে। তবে এখন অনেকটা নিঃসঙ্গ একঘেয়ে জীবন। ছেলেটা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএস করতে এখন জার্মানিতে। আর মেয়ে আনিকা সরকারি কর্মকর্তা স্বামীর সঙ্গে সিলেটে। হাসপাতাল থেকে যখন হিসাব দিয়েছিল অপারেশনের জন্য অন্তত ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে, তখনই জুবায়ের হোসেন বলেছিলেন, ‘এর চেয়ে বরং আমি মরে যাই, সেই ভালো।’ স্ত্রী সুরাইয়া বললেন, ‘তুমি ভেবো না, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

আজকাল প্রায়ই তাঁর মনে হয়, শামস তাবরিজি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। কখনো-বা যেন মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, চুলে বিলি কাটছেন। অনুচ্চ স্বরে বলছেন, ‘জুবায়ের, আমি তো তোমাকে আগেও বলেছি, যে আগুন তোমাকে পোড়ায়, সেই আগুনই তোমার ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেয়।

‘এতগুলো টাকা কোত্থেকে হয়ে যাবে?’

‘দরকার হয় আমার গয়নাগুলো বেচে দেব।’

‘তোমার আবার গয়না কোথায়, সবই তো আনিকাকে দিয়েছ। চার ভরি রাখা আছে ছেলের বউয়ের জন্য। ওটুকু বেচলেও কিছু হবে না।’

‘তাই বলে তুমি এই যন্ত্রণায় কাতরে মরবে, সে আমি দেখতে পারব না। টাকার একটা ব্যবস্থা হবে। তুমি অত ভেবো না।’

অর্থোপেডিক সার্জন আগেই জানিয়েছিলেন ফুল অ্যানেসথেসিয়ায় অপারেশনে অন্তত চার ঘণ্টা লাগবে। শুক্রবার বেলা আড়াইটায় তাঁকে ওটিতে নেওয়া হয়েছিল। চারপাশে উজ্জ্বল সাদা আলো। বুকের ওপর ইসিজি স্টিকার, আঙুলে অক্সিজেন ক্লিপ। হাতে লাগানো আইভি লাইনে সাদা অ্যাপ্রোন পরা নার্স ওষুধ ঢোকালে সামান্য জ্বালা টের পান। খানিক পরই চোখের পাতাজোড়া ভারী হয়ে আসে। মধ্যবয়সী স্বাস্থ্যবান ডাক্তার কী যেন জিজ্ঞেস করছিলেন, সে–কথার উত্তর দিতে দিতে জিব আড়ষ্ট হয়ে কথা জড়িয়ে আসে। তিনি বোধ হয় গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এতটা গভীর ঘুম আগে কখনো ঘুমাননি। তারপর, হয়তো কয়েক ঘণ্টা বাদে আবার যখন চোখ মেলেন, তখন মনিটরে বিপ বিপ শব্দ। মাথার ওপর স্যালাইনের বোতল ঝুলছে। ছাদের সাদা রং কেমন প্রতিফলন ছড়াচ্ছে। সামান্য শব্দ করে ঘুরছে নীলচে ফ্যান। যা কিছু শুনছিলেন বা দেখছিলেন, সবই অস্পষ্ট। অথচ কয়েক মুহূর্ত আগেই তিনি সব স্পষ্ট দৃশ্যমালা দেখছিলেন। তবে সূচনায় ছিল অস্পষ্ট, সাদাকালো আর বিক্ষিপ্ত। সে দৃশ্য ক্রমে স্পষ্ট ও বর্ণময় হতে শুরু করে। প্রথমে ক্ষুধার্ত জীর্ণশীর্ণ মানুষের অস্পষ্ট ছবি এবং তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ইন্দ্রিয়ে ভেসে আসে। জুবায়ের ভয় পেয়ে যান। এই মানুষগুলো কারা? যুদ্ধের সময় এবং তার দু–তিন বছর পর দুর্ভিক্ষেও মানুষের এমন আর্তচিৎকার শুনতে পেতেন। সে সময় তাঁদের সংসারেও ভীষণ অভাব। মা ধারদেনা করে, চেয়েচিন্তে সন্তানদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। খাদ্য বলতে ছিল কচুসেদ্ধ, গমসেদ্ধ, ছোলা আর শাক-লতাপাতা। এই দৃশ্য তবে কি নতুন কোনো অশনিসংকেত। ওই জীবনে আর ফেরত যেতে চাই না। জুবায়েরের বুক কাঁপতে থাকে। তখন কে যেন বলে ওঠে, ‘ভয় পেয়েছিস? ভয় নেই, আয় আমার কোলে আয়।’ আরে, এ তো বড় আপার কণ্ঠ। তাকিয়ে দেখেন সত্যিই তাঁর বড় আপা—তিনি তাঁকে রূপাপা বলেই ডাকতেন। আপা তাঁর চেয়ে মাত্র ৬-৭ বছরের বড় হলেও শৈশব থেকে মায়ের চেয়ে তাঁর ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। কারণ, জুবায়েরের ১৩ মাস বয়স না হতেই তাঁর আরেকটি ভাই জুম্মান জন্ম নেয়। সেই থেকে বলতে গেলে জুবায়ের রূপাপার কোলেই বড় হয়েছেন।

তিনি আবার ভয় পেয়ে যান। কেন এমন হচ্ছে? এমন সময় তাঁর ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে, ‘তোমার ওই পাপী হাত দিয়ে তাঁকে ছুঁতে পারবে না।’ তখন তিনি ভাবেন তাই তো, এই জীবনে কত অন্যায়ই তো করেছেন। কাজেই রূপাপার কাছে ওই সবুজ উদ্যানে যেতে পারবেন না।

আপা কত সুন্দর হয়েছে। চেহারা দিয়ে যেন জ্যোৎস্না ঝরছে। তার পেছনে চোখজুড়ানো এক উদ্যান। জুবায়ের রূপাপার দিকে ছুটে যেতে চান। কিন্তু তিনি তো এক পা–ও এগোতে পারছেন না। দুই গোড়ালি থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। তিনি আবার ভয় পেয়ে যান। কেন এমন হচ্ছে? এমন সময় তাঁর ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে, ‘তোমার ওই পাপী হাত দিয়ে তাঁকে ছুঁতে পারবে না।’ তখন তিনি ভাবেন তাই তো, এই জীবনে কত অন্যায়ই তো করেছেন। কাজেই রূপাপার কাছে ওই সবুজ উদ্যানে যেতে পারবেন না। মুহূর্তেই ৫০-৫১ বছর আগের একটি দৃশ্য তাঁর সামনে ভেসে ওঠে। কী কারণে যেন যুদ্ধের দুই বছর পর নিরন্নের কালে রূপাপার মাথা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। নিজের ইচ্ছেমতো হাসত আবার খানিক পরেই হু হু করে কান্না। সেবার ফাল্গুন মাসে ভীষণ খারাপ অবস্থা হলো। দুদিন কোনো কিছু খায়নি, ঘুমোয়নি একফোঁটা। কেবল ওই পাগলামি। মা-ও ভীষণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। সহ্য করতে না পেরে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘তুই মরতে পারিস নে!’ আপার তখন হয়তো ১৯-২০ বছর বয়স। কেবল একটা কামিজ গায়ে, ওড়না ও পায়জামাহীন অবস্থায় ছুটে যায় বড় রাস্তার দিকে। যাওয়ার আগে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে, ‘মা, আমি তবে চললাম।’ কী আশ্চর্য, তখনো তার মুখে হাসি। রূপাপা ছুটছে। সে ট্রাকের নিচে মাথা দেবে কি না জানি না। তার চেয়ে জুবায়েরের ভয় রাস্তার দুপাশে পুরুষ মানুষগুলোর উপহাস আর লোভাতুর দৃষ্টিতে। যে করেই হোক রূপাপাকে ঘরে ফেরাতে হবে, এভাবে সে পাগলি হয়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়াবে নাকি! দৌড়াতে দৌড়াতে তারা রেললাইনের ওপর চলে আসে। জুবায়ের ভাবেন, আপা এত জোরে দৌড়াতে কবে শিখল। তার মধ্যে দুটো দিন জলটুকু পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। জুবায়ের শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বশ্বাসে রূপাপার উড়ন্ত কামিজের পেছনটা টেনে ধরলে আপা ভীষণ জোরে স্লিপারের ওপর পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। তাকে পাঁজাকোলা করে তুলতে গিয়ে দেখেন রক্ত আর রক্ত। এরই মধ্যে গলগল করে আধসের রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে! কিশোর জুবায়ের আশপাশের লোকেদের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মতো করে বলেছিলেন, ‘তোমরা একটু এসো—আমার আপাকে বাঁচাও।’ এরপর একদিন স্রষ্টার দয়া হয়েছিল। আপাকে তিন বছরের বেশি সময় পৃথিবীতে থাকতে হয়নি। ভরদুপুরে একাকী পুকুরে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে মরেছিল। তবে আপার কপালের সেই গভীর ক্ষতের দাগ আমৃত্যু রয়ে গিয়েছিল। আপা নিশ্চয়ই আজও তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। তারপর কত কত পাপে অন্যায়ে অপরাধে কেটেছে আমার দীর্ঘ জীবন— জুবায়ের ভাবেন। অথচ আপা তো আমৃত্যুই ছিল এক অবোধ মানুষ, যেন এক নিষ্কলঙ্ক বালিকা। সে এখন কোন অধিকারে রূপাপার হাত ধরবে। ভয়ার্ত জুবায়েরের দৃষ্টিজুড়ে আবার ঘন অন্ধকার নেমে আসে। বুকের গভীরে শ্বাসকষ্ট। দৃষ্টিতে যেন একটি আলোকরেখা। শ্বাসকষ্টটা একটু কমে আসে। ঠিক তখনই বোধ হয় আলো ভেদ করে আসা ওই সাদা দাড়ি, জোব্বা-পাগড়ি পরা মানুষটি তার সঙ্গে কথা বলেছিল। কলেজে থাকতে মাওলানা রুমির কাব্য পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম শামস তাবরিজির কথা জানতে পারেন। পরে ঢাকায় এলে আরও দুটো বই হাতে আসে। কিন্তু রুমির জীবনে যেমন এসেছিলেন সেই রহস্যময় সাধক তাবরিজি এভাবে তাঁর সামনেও হাজির হতে পারেন, জুবায়ের কখনো ভাবেননি। তিনি যা বলেছিলেন, তার কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত সংলাপ মনে আছে। তিনি সামনে দাঁড়িয়ে স্নেহমাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না জুবায়ের, কোনো ভয় নেই।’

এই হুইলচেয়ার—সময়ের ঠিক আগমুহূর্তে জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে নতুন শিক্ষালাভ ঘটবে তা কে জানত। সামনে রাস্তার চলমান দৃশ্য দেখতে দেখতে সব কেমন অস্পষ্ট লাগে। না, তিনি আর ভয় পান না। তাঁর দুচোখ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে। তবে সে কান্না বেদনার নয়, প্রাপ্তি আর আনন্দের।

জুবায়ের জবাব দেন, ‘আমি ঠিক ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু কেমন অপরিচিত সবকিছু—চারপাশ—আপনি কে, পরিচয়টা স্পষ্ট করে বলবেন?’

‘আমার নাম শামস তাবরিজি। জন্মেছিলাম পারস্যে। পৃথিবীর মানুষ অবশ্য আমার চেয়ে আমার বন্ধু মাওলানা রুমিকেই বেশি চেনে। কারণ, তিনি আমার চেয়ে বহু গুণী ছিলেন। হাজার হাজার ছিল তাঁর শিষ্য ও শাগরেদ।’

‘আমি আসলে ভীষণ ক্লান্ত—চাই এখানেই অবসান হোক সবকিছুর। এই বোঝা আমি আর বইতে পারছি নে।’

‘অধৈর্য হতে নেই। তুমি কি জানো না, কষ্টের পরেই স্বস্তি নির্ধারিত থাকে?’

‘সে আর কবে—জীবনের তো শেষ বেলা!’

‘তুমি কি ভাবছ, তোমার জীবনের এই ৬০-৭০ বছরই সবকিছু? সময়ের বিষয়টি তোমরা যেমন দেখো, আদৌ তা নয়। তুমি ধৈর্য ধরো। প্রশান্তি পাবে।’

‘আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, হয়তো এ কেবল মিথ্যা আশ্বাস।’

‘বললাম তো—স্পষ্ট আমি দেখছি তোমার আকাশে নতুন চাঁদ উঠল আজ। অতএব সদ্য উদিত বাঁকা চাঁদটি পূর্ণিমার চাঁদে পরিণত হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরো। এরপর কেবল আলো আর আলো!’

অথচ অপারেশন থিয়েটারে প্রথমে জুবায়ের মৃত্যু কামনা করেছিলেন। এই হুইলচেয়ার—সময়ের ঠিক আগমুহূর্তে জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে নতুন শিক্ষালাভ ঘটবে তা কে জানত। সামনে রাস্তার চলমান দৃশ্য দেখতে দেখতে সব কেমন অস্পষ্ট লাগে। না, তিনি আর ভয় পান না। তাঁর দুচোখ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে। বুকের গভীর থেকে উঠে আসছে ক্রন্দন। তবে সে কান্না বেদনার নয়, প্রাপ্তি আর আনন্দের। জুবায়েরের ভেতরটা কী এক অব্যক্ত অনুভূতিতে, হয়তো গভীর কৃতজ্ঞতায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। মনে মনে তিনি আওড়াতে থাকেন, ‘তুমি না থাকলে আমি আমার নামও ভুলে যাই। তুমি মানুষ নও, তুমি সূর্য—সূর্য ডুবে গেলে অন্ধকার আসে।’

হঠাৎ সুরাইয়া বারান্দার কাছে এসে বলেন, ‘অতগুলো বই অনলাইনে কেন অর্ডার দিয়েছিলে? আমি রিসিভ করে নিয়েছি।’

‘পড়ব।’

‘এই লেখকের তিনটে বই তো ছিল—সেই রুমি আবার কেন?’

‘পুরো সেটটা হাতের কাছে রাখতে চাই।’

‘এখন এই পাগলামির মানে কী? ঘরে এমনিতেই টাকাপয়সা নেই।’

‘পাগলামি! হ্যাঁ, সবাই তা–ই বলবে। এর মানে তুমি বুঝবে না।’

বিরক্ত সুরাইয়া ফিরে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে জুবায়ের ডাক দেন, ‘এই শোনো।’

‘আবার কী?’

‘আমি ভুল বলেছি।’

‘কী?’

‘ওই যে বললাম, বুঝবে না। এটা ভুল। তাই সরি। বুঝতেও পারো কখনো হয়তো। কার জীবনে কখন যে আলোর ইশারা আসে কেউ তা বলতে পারে না।’

‘তুমি না দিনে দিনে আরও মিস্টিরিয়াস হয়ে যাচ্ছ!’ বলতে বলতে সুরাইয়া সম্ভবত রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যান।

জুবায়ের বিড়বিড় করে বলেন, ‘হ্যাঁ মিস্টিরি।’ খানিক বিরতি দিয়ে আবার আওড়াতে থাকেন, ‘আমি কাঁদছিলাম, আমার সেই কান্নাই গান হয়ে গেল। তুমি কোথাও যাওনি, তুমি আমার রক্তে মিশে গেছ।’ তিনি ভাবেন, শামস তাবরিজি বাস্তবে না হলেও নিশ্চয়ই স্বপ্নে ধরা দেবেন, হয়তো কোনো নিস্তব্ধ বিমূর্ত রাতে।

ব্যস্ত সড়কে চোখ রেখে জুবায়েরের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তাঁর দুচোখে জলের ধারা। আনন্দ-অশ্রু। অথচ ভুল করে তিনি ওটিতে মৃত্যু কামনা করেছিলেন। জুবায়ের নতুন করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে প্রাণভরে কাঁদতে থাকেন।