তাহাদের ব্রেক আপ
প্রেমের গল্প লিখতে হবে ভাবলেই আমার গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। বলতে ইচ্ছে করে,প্রেমের গল্প লিখতে আমায় কহ যে, বিশুদ্ধ প্রেম যায় কি পাওয়া সহজে?
ওরহান পামুকের লেখা ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ দেখছিলাম নেটফ্লিক্সে, সত্তর দশকের ইস্তাম্বুল শহরে ধনবান ও অভিজাত বংশের কেমালের সঙ্গে ফুসুন নামের সাধারণ নিম্নবিত্ত কিন্তু প্রাণবন্ত সুন্দর লাবণ্যময়ী এক তরুণীর তুমুল শরীরি প্রেম। কেমালের আবার আরেকজন বাগদত্তা ছিল। সে কথা ফুসুনেরও জানা ছিল, তা সত্ত্বেও তাদের গভীর প্রেমের সম্পর্ক হয়। কেমালের আগের সম্পর্ক ভেঙে যায়। ফুসুনও আরেকজনকে বিয়ে করে। ঘটনার আরও নানা বাঁক পেরিয়ে কেমাল এক সময় মন্তব্য করে, ‘মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, প্রেম হচ্ছে একটা গভীর বিবেচনাবোধ ও সূক্ষ্ম আবেগময় কোমলতা।’ ইংরেজিতে যাকে বলে, ডিপ কনসিডারেশন ও টেন্ডারনেস। সেইটাই আজকাল কেন যেন পাওয়া যায় না।
আমাদের এক সিনিয়র বন্ধু বলত, ‘প্রেমের মধ্যে পুরাই ভেজাল ঢুইক্যা গেছে, দুধে যেমন পানি মিশাইলে পাতলা হইয়া যায়, প্রেমের ঘনত্বও এখন প্রতারণা, লালসা আর স্বার্থপরতা মিশে কেমন হালকা পানসে হয়ে গেছে। মজা নাই। দেখবি যে প্রেমিক বা প্রেমিকা, দুইজনই বা দুইজনের একজন মইরা গেলেই প্রেমটা টিকে, যদি বাঁচল তো প্রেম গেল! সোনার মোহর ধীরে ধীরে মাটির ঢেলায় রূপ নিল!’
কদিন আগেই আমার একুশ বছর বয়সী ছেলেকে তার এক বন্ধু ফোনে জিজ্ঞেস করছিল, ‘আচ্ছা, বল তো, ফোনে ব্রেক আপ করা সহজ নাকি সামনাসামনি, মুখোমুখি বসে...?’
ছেলে আমার সামনে বসেই বন্ধুকে পরামর্শ দিচ্ছিল, ‘আসলে, ফোনে বা টেক্সট করে ব্রেক আপ করাই সুবিধা, কারণ সামনে বসে ব্রেক আপ করলে অপর পক্ষের চোখের দিকে চোখ পড়ে, তখন এক পক্ষ কাঁদতে শুরু করে, দেখাদেখি আরেকজনও কাঁদে, একটা অকওয়ার্ড সিচুয়েশন তৈরি হয়। টেক্সটে বা ফোনে সেটা হয় না। তোর বলা তুই বলে দিলি, অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া কে দেখে!’
ছেলের সঙ্গে আমার একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সহজ সম্পর্ক থাকায় আমি হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাটা, এখনো প্রেম শুরু হয়নি আর ব্রেক আপ বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছিস!’
ছেলে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে, তুমি জানো না, শামসের এরই মধ্যে তিনটা ব্রেক আপ হয়ে গেছে।’
‘বলিস কী?’
‘আরে ধুর, এসব অ্যাপ-ট্যাপে বানানো সম্পর্কে আমার একটুও বিশ্বাস নেই। আমরা হলাম “প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে” টাইপের মানুষ।’ ‘ডাহা মিথ্যা কথা, বাবা। প্রেম মাত্র একবার আসে না। ধুর! অ্যাবসার্ড!’ ‘আচ্ছা বাদ দে, বরং প্রেম নিয়ে তোরা কী ভাবিস, তা–ই একটু শুনি! আমাকে আবার একটা আধুনিক প্রেমের গল্প লিখতে হবে কিনা!’
‘হ্যাঁ। প্রথম মেয়েটা ওকে খুব সন্দেহ করত, কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারত না, কারও দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারত না, একেবারে দমবন্ধ অবস্থা। আর সেকেন্ডটা ওকে চিট করেছে, একসঙ্গে তার দুই-তিনটা রিলেশন ছিল। আর সবশেষে যে গার্লফ্রেন্ড ছিল, সেটা ওর সঙ্গে লিটারেরি কুত্তার মতো আচরণ করত। রাত-বিরাতে ফোন করে অর্ডার করত, তুই এক্ষুনি আমার কাছে আসবি। এক্ষুনি এইটা করবি, সেইটা করবি। ক্রেইজি এক্কেবারে। যা-তা বলে অপমান করত। পরে আর কী, ব্রেক আপ!’
আমি গদগদ কণ্ঠে বলি, ‘শোন, প্রেম ছিল আমাদের যুগে। আমরা ভাবতাম, স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে চলে যায় ...’
ছেলে ফিক ফিক করে হাসে। ‘হোয়াট? স্বর্গ থেকে?’
‘হ্যাঁ, সত্যি, হাসিস না। মানে প্রেম একটা স্বর্গীয় ব্যাপার ছিল তখন। লাভ ইজ হ্যাভেন, হ্যাভেন ইজ লাভ টাইপের। ধর, প্রেমিকাকে একটা চিঠি লিখে উত্তর পাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। পছন্দের মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিন দিন আগে জায়গা ঠিক করে রেখে দিন গুনে ধৈর্য ধরে প্রতীক্ষা। কবে দেখা হবে, কবে কথা হবে, বুকের মধ্যে ধুকপুক। মনের মধ্যে তোলপাড়, তোদের মতো মুহূর্তে মুহূর্তে ফোন–টেক্সটের বালাই তো আর ছিল না। ব্রেক আপ বলে যে অদ্ভুত একটা শব্দ তোরা বানিয়েছিস, আমাদের আমলে অমন কোনো শব্দও ছিল না। আমরা বলতাম বিচ্ছেদ, বিরহ বা নিদেনপক্ষে ছাড়াছাড়ি!’
ছেলের হাসি আরও বিস্তৃত হয়। সে হঠাৎ কী ভেবে বলে, ‘মা মারা যাওয়ার পর তোমার একাকিত্বটা বেড়েছে, বাবা। এক কাজ করো, তুমি একটা ডেটিং অ্যাপে যাও, গিয়ে কোনো একটা আন্টির সঙ্গে কথাটথা বলো। একটা নতুন রিলেশনশিপে যাও।’
‘বলিস কী? বাংলাদেশেও এসব আছে নাকি?’
‘আছে তো। তোমার ছবি, নাম, পরিচয়, পছন্দ এসব দিয়ে রাখবে। সেসব দেখে পছন্দ হলে কেউ না কেউ কথা বলবে। তুমিও অন্যদের ছবিটবি দেখে নক দিতে পারো।’
‘আরে ধুর, এসব অ্যাপ-ট্যাপে বানানো সম্পর্কে আমার একটুও বিশ্বাস নেই। আমরা হলাম “প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে” টাইপের মানুষ।’
‘ডাহা মিথ্যা কথা, বাবা। প্রেম মাত্র একবার আসে না। ধুর! অ্যাবসার্ড!’
‘আচ্ছা বাদ দে, বরং প্রেম নিয়ে তোরা কী ভাবিস, তা–ই একটু শুনি! আমাকে আবার একটা আধুনিক প্রেমের গল্প লিখতে হবে কিনা!’
তারপরে শোনো, এ রকম যখন সময়ের টানাটানি চলছে, তখন মাহিব আর শ্যামা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেই ঠিক করে যে ওরা তিন মাসের একটা টেম্পোরারি ব্রেক নেবে। এর মধ্যে মাহিব এই চাকরি বাদ দিয়ে নতুন চাকরি খুঁজবে।’ ‘যাহ্! এইটা হয় নাকি? তিন মাসের জন্য প্রেম স্থগিত? এটা সম্ভব? প্রেমকে কি থামিয়ে রাখা যায়? তোরা পারিসও ...’
‘আচ্ছা, তাহলে তোমাকে আমাদের সিনিয়র, মাহিব ভাইয়ের প্রেমের গল্পটা বলি। ধরা যাক, তার প্রেমিকা শ্যামা। ওদের প্রায় আড়াই বছরের সম্পর্ক। এর মধ্যে মাহিবের একটা ব্যাংকে চাকরি হলো, শ্যামাও ঢুকে গেল একটা আইটি কোম্পানিতে। একটু সেটেল হলেই ওরা বিয়ে করবে, এমন ভাবনা। দুই ফ্যামিলিও সব জানে। তো মাহিবের বসটা ছিল মহা খারুস। বিকেল পাঁচটায় যখন ছুটির সময়, তখন তার মনে পড়ত ইম্পরট্যান্ট সব কাজের কথা। শ্যামা ওর অফিসের নিচে এসে বসে থাকত, কল করত, মেসেজ দিত, কিন্তু বসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাইরে বের হওয়ার সাধ্য ছিল না মাহিবের।’
‘বসরা তো প্রেমের শত্রু!’ আমি ওর গল্পের মাঝখানে ফোঁড়ন কাটি। ‘কতবার তোর মাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। বসের নির্দেশে নাকমুখ গুঁজে অফিসের ফাইল দেখতে হয়েছে!’
‘মা রাগ করে নাই?’
‘রাগ না, আমাদের আমলে কথাটা ছিল অভিমান। এটা এমন একটা অনুভূতি যেটার সঠিক ইংরেজি প্রতিশব্দই তোরা খুঁজে পাবি না!’
ছেলে একদম তার মায়ের মতো ভঙ্গিতে ঠোঁট ওলটায়। ‘তা–ও কি হয় নাকি? ... উম্, দাঁড়াও, অভিমানের একটা ইংরেজি শব্দ আছে ... সাল্ক। এস ইউ এল কে। সাল্ক, সাল্কিং ...’
পুত্র তার ইংরেজি জ্ঞান জাহির করে। আমি গুগলে সার্চ করে দেখি, এর অর্থ লেখা আছে মুখ গোমড়া করা বা অসন্তুষ্ট হয়ে চুপচাপ থাকা বা অভিমান করা। আমি ছেলেকে বললাম, ‘এই সাল্কিংও কিন্তু ঠিকঠাকমতো অভিমান জিনিসটা বোঝায় না। অভিমান আসলে রাগ আর ভালোবাসায় মাখামাখি খুব সূক্ষ্ম একটা অনুভূতি, একটা অন্য রকম ব্যাপার। পশ্চিমারা বা তোরা এই সব অনুভূতির নাগাল পাবি না। বরং তোর প্রেমের গল্পটা বল, শুনি!’
ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোনায় একটা কৌতুকপূর্ণ অবিশ্বাসের হাসি ঝুলিয়ে দুই কাপ কফি বানিয়ে এনে জুত করে গল্প শোনাতে বসে। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। কী একটা সরকারি ছুটি ছিল বলে আমরা দুজনই ঘরে।
‘তারপরে শোনো, এ রকম যখন সময়ের টানাটানি চলছে, তখন মাহিব আর শ্যামা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেই ঠিক করে যে ওরা তিন মাসের একটা টেম্পোরারি ব্রেক নেবে। এর মধ্যে মাহিব এই চাকরি বাদ দিয়ে নতুন চাকরি খুঁজবে।’
‘যাহ্! এইটা হয় নাকি? তিন মাসের জন্য প্রেম স্থগিত? এটা সম্ভব? প্রেমকে কি থামিয়ে রাখা যায়? তোরা পারিসও ...’
‘তুমি যদি এভাবে বারবার বাধা দাও, তাহলে তো গল্প শেষ হবে না। আমাকে আবার বের হতে হবে। একটা বিয়ের দাওয়াত আছে।’
ছেলে চমৎকার একটা আকাশি রঙের পাঞ্জাবি পরে পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ভারি সুন্দর লাগছে ওকে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার বিয়েতে যাচ্ছিস?’ ‘ওই যে তোমাকে বললাম, মাহিব ভাইয়ের কথা, তারই বিয়ে। গেস করো, কার সঙ্গে?’ ‘কার সঙ্গে? সেই নতুন গার্লফ্রেন্ড?’ ‘উঁহু। ওইটাও ব্রেক আপ হয়ে গেছে। বিয়ে হচ্ছে তার সেই পুরোনো গার্লফ্রেন্ড, শ্যামার সঙ্গেই।’
পুত্র এবার খানিকটা অধৈর্য। আমি দ্রুত বলি, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, আর কিছু বলব না। তুই বল।’
‘তারপর কী হলো, তুমি অনুমানও করতে পারবা না। শ্যামা আশফাক নামে ওদের অফিসের এক সিনিয়রের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। আশফাকেরও কিন্তু গার্লফ্রেন্ড আছে। তার নাম উজমা। এইবার অফিসের পর শ্যামা আর আশফাক একসঙ্গে সময় কাটায়। ওরা একদিন একটা বারেও যায়। সেখানে আশফাক শ্যামাকে কিস করে।’
আমি চুপচাপ ছেলের তরুণ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তার শেভ করা গালে সবুজ আভা। সামনের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়েছে। মনে হয়, অচেনা একটা মানুষ আমার সামনে বসে আছে।
‘শুধু কিস না, আমার মনে হয়, ওদের মধ্যে ফিজিক্যাল রিলেশনও হয়েছিল। এদিকে তিন মাস পর শ্যামা আর মাহিবের ব্রেক আপ শেষ। আবার ওরা একসঙ্গে। একদিন দুজনে রেস্টুরেন্টে খেতে গেছে। তো শ্যামা ওয়াশরুমে গেছে। ফোনটা সঙ্গে নিতে ওর মনে নাই। এই সময় টুক করে আশফাকের মেসেজ এল। ভাবো! মাহিব দেখল সেখানে লেখা: “আমাদের ব্যাপারটা মাহিব জেনে যায় নাই তো?”’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী! মাহিব চেপে ধরল শ্যামাকে, “কী হয়েছে, বলো। কোন ব্যাপারটার কথা বলেছে আশফাক? বলতেই হবে।” প্রথমে শ্যামা এটা-সেটা বলে অস্বীকার করল। বলল, কিছু হয় নাই, হেনতেন। তারপর মাহিব যখন সম্পর্ক ভাঙার হুমকি দিল, তখন শ্যামা কেঁদেকেটে সবই স্বীকার করল।’
‘তুই এসব জানলি কীভাবে?’
‘আরে... আমাকে তো মাহিব ভাই-ই বলছে। তারপর আবার তার নতুন গার্লফ্রেন্ডও হইছে!’
ছেলে গল্প শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকে গেল, দাওয়াতে যাওয়ার জন্য রেডি হতে। আমার সেই প্রথম টলমল পায়ে হাঁটতে শেখা ছোট শিশুটির কথা মনে পড়ল, যে কিছু হলেই ঠোঁট বেঁকিয়ে কেঁদে ফেলত। সে আমাকে আজ যে হৃদয়ভাঙা গল্প শুনিয়ে গেল, তা আমার অভিজ্ঞতায় অজানিত।
‘বাবা, গেলাম।’
ছেলে চমৎকার একটা আকাশি রঙের পাঞ্জাবি পরে পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। ভারি সুন্দর লাগছে ওকে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার বিয়েতে যাচ্ছিস?’
‘ওই যে তোমাকে বললাম, মাহিব ভাইয়ের কথা, তারই বিয়ে। গেস করো, কার সঙ্গে?’
‘কার সঙ্গে? সেই নতুন গার্লফ্রেন্ড?’
‘উঁহু। ওইটাও ব্রেক আপ হয়ে গেছে। বিয়ে হচ্ছে তার সেই পুরোনো গার্লফ্রেন্ড, শ্যামার সঙ্গেই।’