‘যাহ, শয়তানি করিস না। তুই কী করে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ পাবি? তোর তো জন্মই হয়নি তখন।’

‘মামা তুমি তখন বলছ কেন? আমি তো তোমার যুদ্ধের ময়দানেই চলে এসেছি! তবে আমার দিকে তোমার তাকাতে হবে না; তুমি গুলি চালাও।’

‘তুই এভাবে ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে আমার গুলি চালানো হবে না; তুই যা এখান থেকে।’

একটা মর্টার শেল উড়ে এসে মামার কাছেই পড়ে। তিনি হকচকিয়ে যান। তবে বুঝতে পারেন, শত্রুদের মনোযোগ এখন তার দিকে। একটু দূরে, ডান দিকে, কয়েকজন মানুষের কাদার মধ্যে হাঁটার শব্দ শোনা যায়। মামা আরও গুলি চালালেন। দু-তিনটে চিৎকারের শব্দও শোনা যায়।

মেশিনগান রেখে, সরে এসে, মামা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন। আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চান, ‘আসলে বল তো তুই কেন এসেছিস এখানে? তোর মা জানে?’

তার উদ্বিগ্নতা আমার ভালো লাগে, মায়ার ছোঁয়া মনে হয়।

‘না মামা, মা জানে না। মামা, তোমার কাছে একটা প্রশ্ন করতে এসেছি। উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না অনেক দিন ধরে।’

‘জলদি বল, গুলি চালাতে হবে।’

‘মামা, আমি আমাদের জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে ফেলেছি; যতগুলো বই লেখা হয়েছে, সব পড়েছি। জাতীয় পর্যায়ে যেসব ইতিহাস লেখা হয়েছে, সেগুলোও পড়েছি। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা দেখেছি। আমি কোথাও তোমার নাম খুঁজে পাইনি। তুমি নেই। ওই তালিকায় তুমি নেই কেন, মামা? আসলে সবকিছুই আমি করেছি তোমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। কিন্তু না পাওয়ায় মনে মধ্যে সারাক্ষণ অশান্তিতে লাগে।’

পিন্টু মামা চুপ মেরে যান। দূরে গোলাগুলির জোর শব্দ শুরু হয়েছে। তিনি সেদিকে তাকান। সেখানে তুমুল যুদ্ধ চলছে। তার কাজ সফল হয়েছে। তার চোখ উজ্জ্বল, মুখে রাজ্যের হাসি।

তবে একটু গম্ভীর দৃষ্টিতে বলেন, ‘তুই কি আমাদের পরিবারের যুদ্ধকালীন সব গল্প জানিস?’

‘কিছুটা জানি, যতটুকু মা আমাকে বলেছে—বড় মামা যুদ্ধের সময় এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, আর তুমি যুদ্ধের পর ভাতের যুদ্ধ করতে গিয়ে আর ফিরে আসোনি।’

‘তাহলে শোন, তোর বড় মামা কোনো আততায়ীর গুলিতে মরেননি। আমিই তাকে গুলি করে মেরেছিলাম। বড় ভাই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তাকে আমরা আর রাখতে চাইনি।’

‘কিন্তু মামা, আমি তো শুনেছি বড় মামার কারণে আমাদের পুরো গুষ্টি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।’

‘ভুল শুনেছিস। ওগুলো সব সুবিধাবাদীদের উছিলা, বুঝলি? পাপ করার পর পাপমোচনের একটা গল্প তৈরি করতে হয়, তুই সেই গল্পটাই শুনেছিস। শান্তি কমিটির জন্ম না হলে কি কেউ প্রাণে বাঁচত না? মুক্তিযোদ্ধারা কী ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছিল? আমাদের সেদিনের জীবন তোরা জানিস? তোর বড় মামা পাপ করেছিল, বুঝলি?’

‘নানা তো তোমাকে স্বাধীনের পর আর বাড়ি ফিরতে দেননি। কোনো সম্পত্তিও দেননি। তোমার ভাতের যুদ্ধে যাওয়াটা তিনি পছন্দ করেননি, মনে হয়।’

‘না রে; ভাতের যুদ্ধ না; আব্বা আমাকে তার বড় ছেলেকে মেরে ফেলার শাস্তি দিয়েছিলেন।’

মামা একটু থামেন। আমার ভেতরে তখন ঝড় বইছে। আমার দুই মামা দুই প্রান্তের মানুষ। আর নানা? তিনি কোন প্রান্তের ছিলেন?

মামা বলেন, ‘আব্বা আমাকে শুধু ত্যাজ্যই করেননি; তার প্রভাব খাটিয়ে, আমার নাম যোদ্ধাদের তালিকা থেকে মুছে দিয়েছিলেন; এটাই তোর উত্তর; সে কারণেই তুই কোথাও আমাকে খুঁজে পাচ্ছিস না। আমার কষ্ট নেই রে; আমি যুদ্ধ করেছি, শত্রু তাড়িয়েছি। তাই তোরা এখন হেসেখেলে বেড়াচ্ছিস।’

‘মামা, তোমার যুদ্ধ তো ছিল দুইটা—স্বাধীনতা আর ভাত।’

‘ওটা ভাতের নকল যুদ্ধ ছিল রে; সত্যিকারের ভাতের যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। সেই যুদ্ধ তো তোদের শুরু করার কথা। তোরা টের পাচ্ছিস না?’

আমি একটু চুপ করে থাকি। বলি, ‘তোমরা তো আমাদের কিছু শিখিয়ে যাওনি। তুমি যে যুদ্ধ আশা করছ, তা আর কোনো দিন হবে না। আমরা এখন সবাই ভবিষ্যৎ থেকে টাকা ধার করে জীবন চালাই। মামা, এ প্রসঙ্গ থাক। আমার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমার নামটা আবার যোদ্ধাদের তালিকায় তোলা।’

‘কী দরকার টিংকু? আমার মতো আরও লাখো নামহীন যোদ্ধা আছে যাঁরা তালিকায় নেই; নিজেকে কষ্ট দিসনে। এখন যা…’

‘মামা, তুমি আমার কাছে এক মস্ত বড় বীর; আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনবই।’

‘তুই বললেই হবে নাকি? আমি তো তা চাই না! আমি তোদের কাছে আর ফিরতে চাই না; আমার পাওনা আমি আদায় করে নিয়েছি, প্রতিশোধ নিয়েছি।’

আমি কিছু বলি না; অপেক্ষা করি মামার কথা শোনার।

মামা বলেন, ‘আমার মৃত্যুর আগে আমি তোর বড় মামার নাম যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় উঠিয়ে দিয়েই মরেছি। কোনো না কোনো দিন তার বিচার হবে। আর তোর নানা—তিনি আমার কোনো অসম্মান করতে পারেননি।’

মামা আর অপেক্ষা করেন না। আবার তার মেশিনগানের কাছে ফিরে যান। আমি শুধু বারুদের স্ফুলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকি।