গল্প
কাগজের এরোপ্লেন
শাহাদুজ্জামানের গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যার ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে। তখনো প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই গল্পটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। গল্পটি আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
ব্রিজের রেলিংটি বুঝিবা পাখিদের খুব প্রিয়। প্রায়শই পাখিদের এখানে বসতে দেখি। যদিও ওদের তাড়া থাকে বলে কয়েক মুহূর্ত বসেই পাখিরা উড়ে যায়। পাখি নই, তবু ব্রিজের রেলিংয়ে গিয়ে বসি। আমার তাড়া নেই, আমি বসে থাকি। রাত গভীর হয়েছে। রেলিংপ্রেমিক পাখিরা কেউ নেই আশেপাশে। চারদিক সুনসান। একটু দূরে নদীর ওপারে চাঁদের আলোয় থমথমে বটগাছ। আমার চুলে নদীর বাতাস।
ব্রিজের একপ্রান্তে আলো-আঁধারিতে একজন মানুষকে দেখতে পাই। সে এদিকেই এগিয়ে আসে। এ সময় এখানে একাকী মানুষটিকে কেমন অস্বাভাবিক ঠেকে। সে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। দেশলাই চায়। আমার কাছে দেশলাই নেই। মানুষটা ঝুঁকে আমার খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলে, ‘আই ফল আপ অন দ্য থর্নস অব লাইফ, আই ব্লিড!—বলুন এটি কার লেখা?’
কিছুক্ষণ উত্তরের অপেক্ষা করে মানুষটি শিস দিতে দিতে আবার হাঁটতে শুরু করে। বহুদিন শিসে মগ্ন মানুষ দেখি না। কিছুদূর গিয়েই লোকটি আবার ফিরে আসে। এসে বলে, ‘শুনুন, প্রাগৈতিহাসিক মালভূমির ওপাশ থেকে একটি বালক সেদিন “নেকড়ে, নেকড়ে” বলে চিৎকার করে দৌড়ে আসছিল এবং তার পেছনে ছিল একটি অতিকায় বাদামি নেকড়ে, সাহিত্য সেদিন সৃষ্টি হয়নি, সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেই দিন, যেদিন বালকটি “নেকড়ে, নেকড়ে” বলে চিৎকার করছিল এবং তার পেছনে কোনো নেকড়ে ছিল না।’
আমি মৃদু হাসি। মানুষটি তার হাতের সিগারেটটি শূন্যে ছুড়ে আবার মুঠোয় ধরে নিয়ে হেঁটে যায় অন্যদিকে। মানুষটি কে? জ্যোৎস্নাতাড়িত সম্ভাবনাময় কোনো কবি?
একটি ভারী ট্রাক সশব্দে ব্রিজ পেরিয়ে যায়। ব্রিজের রেলিং থিরথির করে কাঁপে। তারপর নিস্তব্ধতা আবার। অনেক দূরের গ্রামে কেউবা মাইকে গান বাজায়। অস্পষ্ট ভেসে আসে গানের কলি—‘মন-জালুয়া জাল ফালাইল এই ভবসংসারে, জালে মাছ ওঠে না’। গায়ে এসে লাগে নদীর হুঁ হুঁ বাতাস।
‘রানী পুবে দাঁড়াইলেন, বাতাস দ্বিগুণ, রানী পশ্চিমে দাঁড়াইলেন বাতাস আগুন।’ নেশাজাগানিয়া ঠাকুরমার ঝুলির ভাষা মনে আসে। যদিও বাতাস এখানে আগুন নয়, বরং নদীর পানি ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস। আগুন, পানি আর বাতাস—কে বেশি শক্তিমান? উদ্ধত আগুন বলে, আমিই শক্তিমান, কারণ আমি পুড়িয়ে দিই সবকিছু। শুনে পানি বলে, শক্তিমান আমিই, আমি আগুনকে নিভিয়ে ফেলি। তখন বাতাস বলে, আমি পানিকে উড়িয়ে নিয়ে যাই মেঘের ভেলায়, অতএব শক্তিমান আমিই।
ব্রিজের রেলিংয়ে বসে একটি অন্যমনস্ক রাত—হাওয়ায় ভেসে আসা এলোমেলো ভাবনার প্রহেলিকা।
আমার শিশুকন্যা প্রায়ই এক অভিনব খেলায় মেতে ওঠে আমার সঙ্গে। ছুটে এসে বলে, ‘আমাকে ধরো তো দেখি বাবা।’ আমি তাকে ধরি। সে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে বলে, ‘এ কী, তুমি তো আমার হাত ধরেছ, আমাকে ধরেছ কই?’ আমি এবার তার মাথায় হাত রাখি। সে বিপুল কৌতুকে বলে ওঠে, ‘এ তো আমার মাথা, আমি বলেছি আমাকে ধরতে।’ আমি এই অদ্ভুত বোধিতাত্ত্বিক ক্রীড়ায় পরাজিত হই। আমি আমার কন্যাকে ধরতে পারি না।
একজন বিমর্ষ রূপসী একদিন বলে, যদি কেউ তোমাকে কোনো দুঃখ দেয়, তবে সেই দুঃখের নাম দিয়ো ‘কন্যা’। বলে, প্রথম ঋতুস্রাবের দিন অনেক রাত অবধি ঘুম আসেনি রূপসীর। দরজা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে সে ভেবেছে। রুদ্ধদ্বার বিনিদ্র সেসব ভাবনার কথা কি পুরুষেরা জানে?
মানুষেরা কি শুনতে পায় গাছের মগডালে দুই বন্ধু আমের আলাপ? একটি আম অন্যদিকে বলে, মাটিতে তাকিয়ে দেখো, মানুষের কী বিশ্রী হিংসা, হানাহানি। দারুণ হতো যদি মানুষেরা না থাকত আর আমরা এই আমেরা মিলে পৃথিবী শাসন করতাম? চমৎকার ভাবনা, কিন্তু বন্ধু আম জানতে চায়, আমাদের মধ্যে কারা শাসন করত—কাঁচারা না পাকারা?
একটি নাইট কোচ ছুটে যায়। বাসের ছাদে বহন করা কাঁঠালের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
আমার শিশুকন্যা প্রায়ই এক অভিনব খেলায় মেতে ওঠে আমার সঙ্গে। ছুটে এসে বলে, ‘আমাকে ধরো তো দেখি বাবা।’ আমি তাকে ধরি। সে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে বলে, ‘এ কী, তুমি তো আমার হাত ধরেছ, আমাকে ধরেছ কই?’ আমি এবার তার মাথায় হাত রাখি। সে বিপুল কৌতুকে বলে ওঠে, ‘এ তো আমার মাথা, আমি বলেছি আমাকে ধরতে।’ আমি এই অদ্ভুত বোধিতাত্ত্বিক ক্রীড়ায় পরাজিত হই। আমি আমার কন্যাকে ধরতে পারি না। ভুল করে ধরে বসি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। তোকে কোনো দিন কি ধরতে পারব কন্যা আমার? একটা মদির ব্যর্থতা জেগে থাকে মনের মধ্যে।
আমার কন্যা এঘর–ওঘর করতে করতে সুর করে পড়ে—
চড়ই পাখি বারোটা
ডিম পেড়েছে তেরোটা
একটা ডিম নষ্ট
চড়ই পাখির কষ্ট।
এই ছড়ার অন্তর্গত পরাবাস্তব বেদনাটিকে লক্ষ্য করে বন্ধু রফিক খুবই উৎফুল্ল হয়েছিল। জীবনের জন্য এত অসহ্য ব্যথা ছিল ওর, এত অসহ্য আনন্দ। ও কবর দেখেও কাঁদত, বাসর দেখেও। অনেক অনুরোধ করে রফিকের মায়ের কাছ থেকে ওর ডায়েরিটা চেয়ে এনেছি। অদ্ভুত দিনলিপি। একেকটি দিনে একটি মাত্র সংবাদ, একটি মাত্র ভাবনা। একটি দিন যেন একটি অ্যাপেলের মতো সম্পূর্ণ নিটোল।
রবিবার
কী আশ্চর্য বৃষ্টি সারা দিন। কাগজের ফুলই শুধু বৃষ্টিকে ভয় পায়।
সোমবার
বহুদিন জোনাকি দেখি না। জোনাকি দেখা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার
বাইরে বেরিয়ে আসার আগে সবকিছু শুরু হয় ভেতরে, নিচে, দৃষ্টির আড়ালে, যেমন বীজ আর বৃক্ষ।
বুধবার
জ্ঞানীরা এমন হয়, ছেলেমানুষ, উন্মাদ, পৈশাচিকও বটে।
বৃহস্পতিবার
ভোরে যখন সূর্য ওঠে কোনো কোনো দিন বিশ্বাস হতে চায় না যে কোথাও কখনো রাত ছিল। যেন আজ।
শুক্রবার
একটা নিভৃতি প্রয়োজন, যেখানে বসে অসম্ভব সব ভাবনাগুলো ভাবা যায়।
শনিবার
পৃথিবীর সমস্ত মোহই চারদিকে কেমন যেন মাছি পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রফিকের শেষ চিঠিটিও আমি সংরক্ষণ করেছি। সে লিখেছিল—
ব্রিজের রেলিংয়ে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় ওপারে বটগাছ দেখি, আকাশের তারা দেখি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদী দেখি। মনে হয় এসবই যেন একেকটি প্রতীক, যেন এদের সবারই অন্য কোনো অর্থ আছে। ব্রিজের অপর প্রান্ত থেকে সেই মানুষটিকে আবার হেঁটে আসতে দেখি। এবার তার ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। কারও কাছে দেশলাই পেয়েছেন বুঝিবা। মানুষটি আমার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখে রহস্যময় হাসি।
‘...হ্যাঁ, মিথ্যা প্রচুর বলি, অফুরন্ত বানিয়ে বলতে পারি। আমার চরিত্রের এই এক কলঙ্ক। কবে ঘুচবে কে জানে? তবু বলতে পারি, অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা বলি না। প্রিয়জনের ভালোবাসার চরাচরে মিথ্যার কী প্রয়োজন?...
ঠাট্টা করতে করতে চিঠির পরের অংশে যে কথাগুলো ও লিখেছিল, ভাবতে পারিনি তার পরিণতি এমন ভয়াবহ।
‘...সাহিত্য আমার কাছে ধন উপার্জন কিংবা খ্যাতির পরিপূরক কোনো মাধ্যম ছিল না। ছিল বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যমাত্র। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যমাত্র। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকার একটাই তাৎপর্য: লিখব। লেখালেখি ছাড়া পৃথিবীর বাকি যাবতীয় কাজ আমার কাছে হাস্যকর। কিন্তু ক্রমশ টের পাচ্ছি লেখালেখি আমাকে দিয়ে হবে না। সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার। সেই প্রজ্ঞার উৎসভূমি আমার মধ্যে নেই, যাকে বলে প্যাশন। সেই প্যাশনের অভাব রয়েছে আমার মধ্যে। আছে প্রবঞ্চনা। এ ছাড়া লিখতে পারি অন্যের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। কিন্তু তাতে কী লাভ? যার ভালো লাগার আমি না লিখলেও সে পড়বে। বাকি রইল সাহিত্যপাঠ। এযাবৎকাল বেশ কিছু পরিমাণ সাহিত্য পড়ে মনে হয়েছে, না পড়লেও বিশেষ ক্ষতিবুদ্ধি ছিল না। অতএব স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আমার যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল, হয় এবং হবে।...’
আমি ইচ্ছা করে ট্রেনের চাকায় পিষ্ট রফিকের শরীর দেখতে গেছি। শীতল চোখ রেখেছি ছিন্নভিন্ন মাংসের ওপর, মৃত্যুর ওপর। যারা ট্রেনের চাকায় আত্মহত্যা করে, তাদের সম্পর্কে তিনটি কথা বলা যায়—
এক. তারা একটি বীভৎস মৃত্যু চায়।
দুই. তারা জনসমক্ষে মৃত্যু চায়।
তিন. তারা অন্যের দ্বারা নিহত হতে চায়।
একটিই জীবন আমাদের। তুলনা করার মতো পূর্ববর্তী কোনো জীবন আমাদের হাতে নেই, হাতে নেই শুধরে নেওয়ার মতো পরবর্তী কোনো জীবনও। তাহলে কী করে বোঝা যাবে জীবনের কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক, কোনটি ভুল?
ব্রিজের রেলিংয়ে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় ওপারে বটগাছ দেখি, আকাশের তারা দেখি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদী দেখি। মনে হয় এসবই যেন একেকটি প্রতীক, যেন এদের সবারই অন্য কোনো অর্থ আছে। ব্রিজের অপর প্রান্ত থেকে সেই মানুষটিকে আবার হেঁটে আসতে দেখি। এবার তার ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। কারও কাছে দেশলাই পেয়েছেন বুঝিবা। মানুষটি আমার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখে রহস্যময় হাসি। বলে—
মরণে কে হবে সাথি?
প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশি রাতি।
সিগারেটের ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে মানুষটি হেঁটে চলে যায়। মানুষটি কি আমার চেনা?
চারদিকে উৎসবের আলোকসজ্জা, বাজনা, ভোজনের মৌতাত। এরই মধ্যে বোনেরা আমাদের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে। আমরা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে সংসারে পাঠাই। বলি, কাঁদে না বোন। অথচ রান্নার তদারকিতে গিয়ে ধোঁয়ার ছলে কাঁদি। আমাদের মুখে সারা জীবন লেগে থাকে বাবার দেওয়া কদমার মায়াবী স্বাদ, চোখে ভাসে রঙিন কাঠিলজেন্স, আমাদের তাড়া করে ফেরে মায়ের গন্ধভরা শৈশবের বাতাস। বিনিময়ে কী দেব ওদের—ভেবে ভেবে বুক কাঁপে আমাদের।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বেবুনের গল্প মনে আসে। অথচ বেবুনের গল্প মনে আসার কোনো মানে হয় না।
কারণ, আমরা তো ছেলের পা বুকে নিয়ে চাঁদমামাকে ডাকি। আঁচলে ঢেকে রাতভর মেয়েকে দিই উত্তাপ। আমরা ওদের চুল আঁচড়ে, গাল টিপে বলি, সাবধানে রাস্তা পার হবে।
মেঘলা রাত, ঝোড়ো হাওয়ায় আমাদের জানালায় আছড়ে পড়ে কাঁঠালপাতা। চমৎকার রান্না হয় সেদিন। ঘরময় পাঁচফোড়নের ঘ্রাণ। চারদিকের বাতি নিভে যায় হঠাৎ। আমরা সুখী দম্পতি মোমের আলোয় খেতে বসি। তারপর আলো-আঁধারিতে বিছানায় যাই। আমরা প্রমাণ করি দম্পতির বিছানায় অশ্লীলতাই নৈতিক, নান্দনিক। আমরা পরস্পরকে বলি, তোমাকে ভালোবাসি অস্থিমাংসসহ।
চারদিকে উৎসবের আলোকসজ্জা, বাজনা, ভোজনের মৌতাত। এরই মধ্যে বোনেরা আমাদের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে। আমরা ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে সংসারে পাঠাই। বলি, কাঁদে না বোন। অথচ রান্নার তদারকিতে গিয়ে ধোঁয়ার ছলে কাঁদি।
আমাদের মুখে সারা জীবন লেগে থাকে বাবার দেওয়া কদমার মায়াবী স্বাদ, চোখে ভাসে রঙিন কাঠিলজেন্স, আমাদের তাড়া করে ফেরে মায়ের গন্ধভরা শৈশবের বাতাস। বিনিময়ে কী দেব ওদের—ভেবে ভেবে বুক কাঁপে আমাদের।
কিন্তু তবু বেবুনের গল্প মনে আসে।
একটি বেবুন মা তার শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। নদীতে তখন জোয়ার আসে। হঠাৎ স্রোত যখন বাড়তে থাকে, বেবুন মা তখন একটি পাথরখণ্ডের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়, বুকে শক্ত করে চেপে রাখে তার শিশুটকে। কিন্তু নদীর পানি বাড়তে থাকে। পাথর ডুবে যায়, পানি বাড়তে বাড়তে ডুবে যায় বেবুনের বুক। বেবুন তখন তার শিশুটিকে কাঁধের ওপর বসিয়ে দেয়। কিন্তু পানি তবু বাড়ছে। বেবুন মা শেষে তার শিশুটিকে দুই হাতে মাথার ওপর উঁচু করে শূন্যে ধরে রাখে। বাঁচাতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, তার সন্তানকে। তবে পানি যখন আরও বাড়তে থাকে, তখন সহসা বদলে যায় সবকিছু। পানি বাড়তে বাড়তে যখন বেবুন মায়ের গলা ডুবে যায় এবং যে মুহূর্তে পানির স্তর তার নাক স্পর্শ করে, অমনি সে একটানে শিশুটিকে নিয়ে আসে তার পায়ের নিচে। জলমগ্ন পাথরের ওপর শিশুটিকে রেখে তার ওপর দাঁড়ায় সে। এবার তার নাক পানি থেকে যথেষ্ট উঁচুতে, নিরাপদ দূরত্বে। বেবুন প্রাণভরে নিশ্বাস নেয় এবার।
খুব চকিত এ সময় ব্রিজ পেরিয়ে যায় আরেকটি নাইট কোচ। বাসের জানালা থেকে হঠাৎ আমি ব্রিজের রেলিংয়ে বসে দেখি—জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নদীর ওপর হাওয়ায় তিরতির ভেসে যাচ্ছে রাতজাগা খেয়ালি এক যাত্রীর তৈরি কাগজের এরোপ্লেন।