ওকি গাড়িয়াল ভাই...

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাশিল্পী, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও কলামিস্ট হিসেবে আনিসুল হক গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তাঁর বহুলপঠিত উপন্যাস মা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাঙালির আত্মত্যাগ ও মমতার এক অবিস্মরণীয় দলিল। আজ ৪ মার্চ তাঁর ৬১তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রথমবারের মতো অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে প্রায় পঁচিশ বছর আগে স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যায় ছাপা গল্প ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই…’। জন্মদিনে প্রিয় লেখককে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে পাঠকের জন্য রইল এই অনন্য গল্পের পুনর্পাঠ।

অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী

হামেদ গাড়িয়ালের সুনাম সাতগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে কিংবদন্তির মতো। নানা উপকথা তাকে ঘিরে। যেমন ফজর আলি বেপারির তামাকবাহী তিনটা গরুগাড়ি চাঁদনি রাতে চলেছে বদরগঞ্জের দিকে, বোয়ালমারীর বটগাছের নিচে কালভার্ট ভাঙা, প্রথমে ছিল হবিবর গাড়োয়ানের গাড়ি, সেটা গাড়ায় পড়ল; হবিবর তাকে কিছুতেই তুলতে পারছে না, পেন্টি দিয়ে মেরে মেরে বলদ দুটোর পিঠে চাকা চাকা দাগ পড়ে গেল, চাঁদের আলোয় গরুর পিঠে সেই চাবুকাঘাত স্পষ্ট, গরু দুটো পিঠ বাঁকিয়ে এত চেষ্টা করছে, হবিবর গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির আগাটা ধরেছে, পেছনে গাড়ির চাকা দুটোর কাঁধ লাগিয়েছে ফজর আলির কামলা ছামেদ আর নজিবর গাড়িয়াল; গাড়ির চাকা একচুলও যেন নড়বে না, ফজর আলি হাট থেকে রওনা হয়েছিল সাইকেলে, সে এসে দেখে অবস্থা খারাপ, পেছনের গাড়িতে হামেদ বসে তামাশা দেখছে, ‘বাহে, তোমরা গাড়ি তোলেন গাড়াত থাকি, মুই একনা মুতি আসোম’ বলে গাড়ি থেকে নেমে পাশের খেতের ধারে বসে পড়ে লুঙ্গি তুলে: ফজর আলি বোঝে এ হলো জিনের কাজ, বোয়ালমারীর বটগাছে যে তেনারা আছেন, এটা কে না জানে; সে ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা...’ পড়ছে, অজু আছে কি না এ ব্যাপারে সে নিঃসন্দেহ নয় বলে এখনই সাইকেল দাঁড় করিয়ে আজান দিতে দাঁড়াতে পারছে না, এমন সময়ে চলে এল হামেদ গাড়িয়াল, তার চোখ পড়ল গরুর পিঠে বসে যাওয়া যষ্ঠির দাগে, চাঁদের আলোয় গরুর পিঠে সাপের মতো লম্বা সরু কালশিটে, তার অন্তরটা উঠল ছ্যাঁৎ করে। বলল, ‘সরেন দেখি বাহে তোমরা, গরু দুটাকে মারিয়া তো জখম করি ফেলাইছেন, গাড়িয়াল নাকি কসাই বাহে,’ সে চালকের আসনে বসে, বলদ দুটোর পিঠে হাত বুলোয়, মুখে কুচ্ছ বোল তোলে, ব্যস, গাড়ি যেন তুলোবাহী গাড়ি, ওজনবিহীন, আর গরু দুটো পঙ্খীরাজ, কিসের গাড়া, কিসের খন্দক; গাড়ি চলতে থাকে। ফজর আলি বেপারি বুকে থুতু দেয়। হামেদ গাড়িয়াল মানুষ তো! নাকি...সে তাড়াতাড়ি বিড়ি ধরায়, আগুনকে নাকি তেনারা খুব ভয় পান...

হামেদ গাড়িয়ালের অল্প বয়স। তা বিশও হতে পারে, বাইশও। অল্প বয়সে বাবা মারা গেছে, তিন ভাই বাপের ভিটার তিন দিকে তুলে নিয়েছে তিনটা চালা, দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের বাবা ছগির গাড়িয়ালও ছিল এ এলাকায় অতিবিখ্যাত।

হামেদ গাড়িয়ালের অল্প বয়স। তা বিশও হতে পারে, বাইশও। অল্প বয়সে বাবা মারা গেছে, তিন ভাই বাপের ভিটার তিন দিকে তুলে নিয়েছে তিনটা চালা, দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের বাবা ছগির গাড়িয়ালও ছিল এ এলাকায় অতিবিখ্যাত। মৃত্যুর এক মাস আগে ছগির গাড়িয়াল এক রাতে তার খাটিয়ার পাশে দেখতে পেল অনেক বড় এক ধবধবে শাদা মনুষ্যাকৃতি মূর্তি। তা তিনটা তালগাছের সমান উঁচু তো হবেই, তার দোচালা বাংলাঘরের ভেতরে লোকটা সান্ধাল কী করে আল্লা মালুম, এরপরেই ছগির বুঝে ফেলল তার দিন শেষ; মরণ আসন্ন, তাকে চলে যেতে হবে, যেতে যখন হবেই, তখন তার গাড়ি আর গরু দুটোর ভারও হস্তান্তরিত করা দরকার; সে ডেকে নিল তিন ছেলেকে, তার বলদ দুটোর দড়ি ধরিয়ে দিল ছোট ছেলে হামেদকে। বলল, ‘বাপধন, বাপ-দাদায় যে কাম করি খাইত, তাক তোকেই করা লাগবে বাপ, নে ধর দড়িখান।’ এ ঘটনার তিন দিন পরে বাপ তাদের মরে পড়ে রইল ঘরের খাটিয়াতেই, বুড়ি মা তাদের ভোররাতে কেঁদে উঠলে হামেদ বুঝল আজ থেকে তার নামের সঙ্গে গাড়িয়াল কথাটা জুড়ে নিতে হবে চিরদিনের জন্য।

হামেদ গাড়িয়াল খালি গাড়ি নিয়ে ফিরছে ফকিরপাড়ার সামনে দিয়ে। চৈত্র মাস, রোদ কেবল তাতাতে শুরু করেছে, তবে আজ বেশ হাওয়া দিচ্ছে, দূর পাথারে তাকালে হামেদ গাড়িয়ালের চোখে পড়ে ঘূর্ণি বাতাস, সে গুনগুন করে গান ধরে, ‘বাউকৃষ্ঠা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে; ওরে, সেই মতো মোর গাড়ির চাকা পন্থে, পন্থে ঘোরে রে, ওকি গাড়িয়াল মুই চলং রাজপছে...।’ আকাশ ঝকঝকে, রাস্তার দুধারে গাছগাছালিতে নবকিশলয়, আমের গাছগুলোর নিচে ঝরে পড়া মুকুলের আকর্ষণে নানা মাছি ভনভনাচ্ছে, হামেদ গলা ছেড়েই দেয় উচ্চ স্বরে।

তা ফকিরপাড়ার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার গলাটা একটু চড়তে পারে বৈকি। আবদালের বউ ভাবিকে দেখা যাচ্ছে, হাতে একটা ডালি নিয়ে কলাগাছের ঝোপের পেছনের কাদায় ময়লা ফেলতে চলেছে সে, হামেদের গানের ঢেউ দক্ষিণা বাতাসের ধূলি ও ফুলগন্ধসমেত তার মাথার আঁচল ফেলে দিলে সে ডাক ছাড়ে, ‘ও দেওরা, কোটে থাকিয়া ফিরতোছেন বাহে,’ খুলির পাশ ঘেঁষে রাস্তা। এ জায়গাটা বাঁশঝাড়ের ছায়ায় ঠান্ডা। এক পাশে একটা টিউবওয়েল, তার পাশে একটা মুরগি-মার পেছনে কতগুলো হাঁসের ছানা কাদা খুঁটছে। ভাবি টিউবওয়েলের পাড়ে আসেন হাত ধুতে। হামেদ গাড়ি দাঁড় করায়। গরু জোড়াই থাকে গাড়িতে। ‘ভাবি, একধান পান খিলাও ক্যানে’—হামেদ গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসে ভাবির দিকে।

‘পান খাইমেন! খাড়ান। মুই বাড়ির ভিতর থাকি আনি দেও।’

‘না ভাবি। তুমি ফির কাষ্ট করি ক্যান যাইবেন। তোমার ননদ কোটে। তাকে কইলেই তো হয়।’ ভাবি হাসে। হামেদ গাড়োয়ানের অল্প বয়স। চোখে নানা রং। তার ননদ জরিনার চেহারা-সুরত মাশাল্লা বেশ! ‘এ জরিনা, জরিনা রে’, ভাবি হাঁক ছাড়ে, ‘ভালো করিয়া এক খিলি পান বানি আনি দে ক্যানে। হামেদ গাড়িয়াল খাইবে, বুঝি আনিস...।’

হামেদ পান মুখে দেওয়া, জরিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনুরক্ত দৃষ্টিতে; কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ওরে বাপরে’ করে মুখের পান ফেলে দিয়ে দৌড়ায় টিউবওয়েল অভিমুখে...‘ওরে বাপরে, মুখ মোর পুড়ি আংরা হয়া গেল রে...’

জরিনা বাড়ির দাওয়ায় সামলাচ্ছিল তার দেড় বছরের ভাগনেকে। গায়ে শর্ষের তেল মাখান চলছে, ছাওয়ালটাকে এখন গোসল করাতে হবে। কিন্তু কাজে তার মন নাই, রাস্তা দিয়ে গরুগাড়ি যায়, ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ ওঠে, সে উতলা হয়, তার ওপর শোনা যায় গান, ‘বাউকুণ্ঠা বাতাস যেমন...’ হামেদ গাড়িয়ালের গলা, তার হাত আর চলে না, শর্ষের তেল হাতের মুঠোয় নিয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে শূন্যদৃষ্টিতে, তার বুকের মধ্যে ঢেঁকি পাড়ার শব্দ...। এখন ভাবির কণ্ঠস্বর, এই মধুর আদেশের জন্য সে ভাবির কাছে কৃতজ্ঞ হয়, দৌড়ে ঘরে ঢোকে পান সাজাতে, তবে তার মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে, সে পানে চুন দেয় মাত্রাতিরিক্ত, সুপুরি দেয়ই না। হামেদ পান মুখে দেওয়া, জরিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনুরক্ত দৃষ্টিতে; কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ওরে বাপরে’ করে মুখের পান ফেলে দিয়ে দৌড়ায় টিউবওয়েল অভিমুখে...‘ওরে বাপরে, মুখ মোর পুড়ি আংরা হয়া গেল রে...’ জরিনা খিলখিল করে হাসে।

এরপর বেশ কদিন হামেদ গাড়িয়ালের দেখা নেই। সে গেছে দূরের গঞ্জে। জরিনার মন ঘূর্ণিবায়ুর মতো মোচড়ায়; রাস্তায় গরুগাড়ির চাকার শব্দ উঠলেই সে তাকায় রাস্তার দিকে:

ও কি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে।
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়,
নারীর মন মোর জুরিয়া রয় রে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি চিলমারীর বন্দরে।
আর কী কর দুজের জ্বালা, গাড়িয়াল ভাই,
গাঁথিয়া চিকন মালা রে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই,
কত কান্দিম মুই নিধুয়া পাথারে।

তারপর একদিন দেখা পাওয়া যায় হামেদের। বাড়ির দাওয়ায় এসে সে হাঁক ছাড়ছে, ‘ভাবি ও ভাবি...’ ভাবি তখন পাকঘরে ডাল তেলানি দিচ্ছে, চুলা আর ছেলে সামলাতে হচ্ছে তাকে একই সঙ্গে, জরিনার পেটের মধ্যে গুড়গুড় শব্দ ওঠে, সে দৌড়ে বাইরে আসে। ‘ভাবি কোনটে?’ হামেদ বলে।

‘তাঁই তো এলা আসবার পারবার নোয়ায়’ জরিনা বলে।

‘তাইলে মুই যাঁও।’

‘ক্যানে, চলি যাইবেন ক্যানে?’

‘না, সেদিন তোমরা যা কুয়ারা করছেন, মুখ মোর পুড়িয়া যাও হয়া গেইছে...যাওঁ মুই। ম্যালা কাম পড়ি আছে।’

জরিনা এখন কী করে তাকে আটকাবে? তাড়াতাড়ি বলে, ‘গাড়োয়ানের বেটা, এক কাম করো ক্যানে, গুয়ার গাছত চড়িয়া মোক দুকনা গুয়া পাড়ি দেও ক্যানে?’

হামেদ রাজি হয়। সে সুপারিগাছ বেয়ে উঠতে থাকে তরতরিয়ে। তারপর, কী যে হয়...‘ওরে বাগো মুই মরি গেনু’ বলে সে ধপাস করে পড়ে যায় পশ্চিম পাশের চষা জমিতে...তারপর কঁকাতে থাকে এমন করুণ স্বরে যেন সে মরেই যাবে। জরিনা দৌড়ে তার কাছে যায়, সে প্রায় দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য, বলে, ‘কোটেকোনা লাগছে?’ হামেদ তার হাত ধরে, বুক দেখিয়ে বলে, ‘এটে।’ তারপর হেসে ওঠে হি হি করে। ‘সেদিন তোমরা মোকে ঠক খিলাইছেন, এলা তোমরা কেমন ঠক খাইলেন...’

প্রতিবছর একবার করে ভাবি নাইওর যায়। ভাবির সঙ্গে হামেদের খায়-খাতিরটা বেশ। সে সূত্রে তার ননদের সঙ্গেও হামেদের অম্লমধুর সম্পর্ক। নানা রঙিন গল্প। অর্থহীন অথচ অর্থপূর্ণ। স্বপ্নভরা, আবেগে কাঁপা গল্প সব।

আবদালের বউ ভাবির সঙ্গে হামেদের পরিচয়টা আবদালের বিয়ের দিনই। বরযাত্রীর বরের গাড়িটা ছিল হামেদ গাড়োয়ানের, বিয়ে করে বউ নিয়ে আবদাল ওঠে হামেদের গাড়িতে, তখন রাত প্রায় ভোর হয়ে এসেছে, গাড়িতে ছইয়ের নিচে আবদাল, তার বউ আর দূর–সম্পর্কের এক ছোট্ট শ্যালিকা। গরুগাড়ির দুলুনিতে আবদাল ঘুমায়, তার শ্যালিকা ঘুমায়, আর হামেদ শুনতে পায় নববধূর বিনবিনিয়ে কান্না।...শেষে থাকতে না পেরে হামেদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, ‘ভাবি, না কান্দেন বাহে, এত ভালো ঘরত বিয়াও হইছে...’

প্রতিবছর একবার করে ভাবি নাইওর যায়। অনিবার্যভাবে ডাক পড়ে হামেদ গাড়িয়ালের। ভাবির সঙ্গে হামেদের খায়-খাতিরটা বেশ। সে সূত্রে তার ননদের সঙ্গেও হামেদের অম্লমধুর সম্পর্ক।

নানা রঙিন গল্প। অর্থহীন অথচ অর্থপূর্ণ। স্বপ্নভরা, আবেগে কাঁপা গল্প সব।

ওরে বান্ধিনু বাড়ি
গুয়া উন্ন সারি সারি
গুয়ায় বাওচায় ঘিরি লইলে বাড়ি রে।
আসিবে মোর প্রাণের মায়া,
তায় পাড়াইবে গাছের গুয়া, মুই নারীটা ফাঁকিয়া খাইম তাক।
ওকি ও প্রাণকালা রে
ওরে মহাকালের ফল যেমন, মোর নারীর যৈবন তেমন,
খায়া দেখ কালা যৈবন কেম্ব মিঠা রে।

কার্তিক মাসে এসে হামেদ গাড়িয়াল পড়ে মুশকিলে। এবার এমন আকাল পড়েছে যে এলাকাতেও কোনো খ্যাপ নাই, সবার ঘরে চাল বাড়ন্ত। তার দুই ভাই স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে পড়েছে ভীষণ মুশকিলে। এলাকার ইউপি মেম্বারদের ঘরে পর্যন্ত ভাত এক বেলা জোটে তো আরেক বেলা জোটে না।

বড় ভাইজান বলে, ‘হামেদ, খ্যাপ তো আসে না। বলদ দুটো হাটত তুলি চল। বাপের গরু। হামার তিন ভাইয়েরে হক আছে গরু দুতনার ওপর। বেচি দিয়া ট্যাকা তিন ভাগ করি নেমো। গাড়িটারও খরিদ্দার খোঁজ।’

হামেদ রাগ করে। কান্নাকাটি করে। কিন্তু এমন মঙ্গা গত কয়েক বছরে দেখা দেয় নাই এলাকায়। না খেয়ে, কচুমেডু খেয়ে পেটের পীড়ায় লোক মারা যাচ্ছে এ ঘরে ও ঘরে। তার দুই শরিকের বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো না খেতে পেয়ে ‘ভাত খামো মাও ভাত দে’ বলে কাঁদছে, হামেদ তাই বা সহ্য করে কী করে!

বলদ দুটো হাটে নিয়ে যায় তার দুই ভাই। সে শুকনো পাথারে বসে তাকিয়ে থাকে দিগন্তবিস্তৃত আমন ধানের সবুজ খেতের দিকে। কবে ধান পাকবে, কাটামারি হবে, ঘুচবে এই তীব্র অভাব। গরু বিক্রি হয়ে যায়। গাড়িও।

কাজের সন্ধানে দল বেঁধে গ্রামবাসী চলে যায় শহরে—ভাটির দিকে—খিয়ার অঞ্চলে। হামেদ গাড়িয়ালকেও যেতে হয়। রংপুর শহরে গিয়ে রিকশা চালানোর কাজ জুটিয়ে নেয় হামেদ।

‘গাড়িয়ালের বেটা তোমরা আসছেন। বইসেন। গুড়-মুড়ি দেওঁ, খান।’ ‘আচ্ছা। তাক তো খামোয়। তা তোমরা ননদেক যে দেখোম না।’ ‘তুই খবর জানিস না। জরিনা তো ঢাকাত চলি গেছে। ওটে কোনা গার্মেন্টের কাজ নিছে।’

কার্তিক মাসটা কোনো রকমে পার হয়ে গেলে আসে অগ্রহায়ণ। ধান কাটামারি শুরু হয়েছে পুরোদমে। গ্রামে এখন ঘরে ঘরে ঢেঁকির শব্দ। হামেদ গাঁয়ে চলে আসে। নগদ কিছু টাকা আছে তার ট্যাঁকে। গরু বেচা টাকা, রিকশা চালানোর টাকা।

হামেদ যায় জরিনাদের ভিটায়। জরিনা আসে, ভাবি আসে। ভাবি বলে, ‘তুমি কেমন চ্যাংড়া বাহে, গাড়ি বেচায়া দিলেন। কত তোমার নাম হইছিল।’

‘মুই কি হাউশ করি বেচছম ভাবি। মোর কলজাটা কি পুড়ি যাইতোছে না।’

জরিনা মাটিতে পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে বলে, ‘ভাবি, তোমরা তোমার দেওরাকে বলি দেন, হামেদ গাড়োয়ানক মুই ভালো পাঁও, কিন্তুক উয়ার যদিল গরুগাড়িট না থাকিল, উয়ার সাথে মোর কিসের কথা।’

বড় আঘাত, বড় জেদ হয়ে বেঁধে হামেদ গাড়োয়ানের বুকে। অবশ্যই একটা গরুগাড়ি কেনার পুঁজি জোগাড় করতে হবে তাকে। যেভাবেই হোক।

জরিনাকে শুনিয়ে শুনিয়ে সে বলে, ‘ভাবি, মুই কাইলকায় যাবার লাগছোম টাউনোত। কাম মুই একটা কিছু জোগাড় করি নেমোই। ট্যাকা জোগাড় করি তারপরে ফেরমো। দেইখেন গরুগাড়ি সাজোয়া চালেয়া আসমো।’

ভাবি যাচ্ছে বাপের বাড়ি, শুকানপুকুর। সঙ্গে নিয়েছে জরিনাকে। তারা ছইয়ের মধ্যে বসা। বাচ্চাটা কেঁদে উঠছে বারবার। উঁচু-নিচু পথ। তবে হামেদ গাড়োয়ানের গাড়ি বলে কথা। গাড়ি ছুটে চলেছে—বনবনিয়ে। ভাবি সারা পথ গল্প করে।

পাশেই একটা শাদা মসজিদ। পুরোনো, ছাদের ওপরে গোল গম্বুজ। ভাবি বলে, ‘শুনছ নাকি দেওরা, এ মসজিদ কেমন করি বানান হইছে?’

‘না তো ভাবি।’

‘এক আইতে এই মসজিদ বানাইছে। চৌধুরী সাহেব স্বপ্ন দেখছে, মায়ের অসুখ ভালো হইবে, কিন্তুক এক আইতে মসজিদ বানান লাগবে। দুই হাজার মিস্ত্রি, তাও কি কাজ ফুরায়? তখন জিনেরা আসিয়া হাত লাগাইছে!’

‘কহ কী ভাবি!’ জরিনার কণ্ঠে বিস্ময়।

হামেদ এক গল্প ভাবির মুখে অনেকবার শুনেছে। তার বিস্ময় জাগে না। জরিনাকে আশ্চর্য হতে দেখে সে বলে, ‘জিনেরা হাত লাগাইছে। কন কী ভাবি।’

‘আচ্ছা দেওরা’, ভাবি বলে, ‘তোমার সাথত নাকি জিন আছে?’

‘জিন নাই, কিন্তুক এলা মোর গাড়িত পরি আছে! হে হে হে...।’

ভাবি ঘুমিয়ে পড়ে। জরিনা জেগে থাকে। ছইয়ের সামনের দিকে চলে আসে। ছইয়ের মুখে লাগানো শাড়ি...

অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী
পরিমার্জন: আলাদিন আল আসাদ

দুবছর পর এক দিন হাটবেলে গ্রামে হইহই রব পড়ে যায়। কী ব্যাপার? ‘বাহে দেখো, হামেদ গাড়িয়াল আসতেছে, কেমন গরুগাড়ি হাঁকেয়া।’ সুন্দর দুটো শাদা বলদ, যেন বোররাক, আর নতুন গাড়ি, তার চাকায় আবার টায়ারও লাগানো, গরুর গলায় মুষ্টি বাজছে, আর হামেদ গলা ছেড়ে গান ধরেছে—‘বাউকুণ্ঠা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে, ওরে সেই মতো মোর গাড়ির চাকা...’

গাড়িয়ালদের রাজা হামেদ ফিরে এসেছে। সবাই বড় তারিফ করে তার।

হামেদ যায় ফকিরপাড়ায়। ‘ভাবি, ভাবি, মুই ফির গাড়ি ধরি আসছোম।’

ভাবি বের হয়। তার কোলে আরেকটা বাচ্চা। বড় ছেলে সোনা মিয়ার বয়স এখন চার। সে এখন কোমরের মুণ্ডুর বাজিয়ে সারা পাড়া মাতিয়ে বেড়ায়।

‘গাড়িয়ালের বেটা তোমরা আসছেন। বইসেন। গুড়-মুড়ি দেওঁ, খান।’

‘আচ্ছা। তাক তো খামোয়। তা তোমরা ননদেক যে দেখোম না।’

‘তুই খবর জানিস না। জরিনা তো ঢাকাত চলি গেছে। ওটে কোনা গার্মেন্টের কাজ নিছে।’

হামেদের মনটা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যায়। কী রাজার বেশেই না সে গাড়ি নিয়ে এসেছিল। ভেবেছিল জরিনাকে তুলে নিয়ে গ্রামটাতে একটা পাক দেবে। আর কী উল্টো পরিস্থিতিতেই না পড়তে হলো।

এদিকে নদীর পাশ দিয়ে নির্মিত হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ। বড় বাঁধ। এই বাঁধ রাস্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। দয়ালগঞ্জ থেকে কালীতলা বন্দর পর্যন্ত পাকা সড়ক।

এলাকার অর্থনীতিতে যুক্ত হয় গতিবেগ। গাঁয়ের রাস্তায় দেখা দেয় রিকশাভ্যান। বড় রাস্তা দিয়ে ধুলা উড়িয়ে যায় ভটভটি।

হামেদ গাড়িয়াল জরিনার ছোট্ট বস্তিঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার পথে নামে। চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, রিকশা, গাড়ি, বাস...কী ভীষণ শব্দ...। তার নিজের গরুগাড়িটা কি সে বিক্রি করে দিয়ে ঢাকায় চলে আসবে রিকশা চালাতে?

হামেদ গাড়িয়াল মুশকিলে পড়ে। তার গরুগাড়ি কেউ আর ভাড়া চায় না। তার দুই ভাই সারা দিন গজর গজর করে। না, এভাবে বসিয়ে বসিয়ে তারা একজন সেয়ানা পুরুষ মানুষকে খাওয়াতে পারবে না। তা ছাড়া বলদ দুটো পুষতেও তো খরচ কম যাচ্ছে না।

দিন যায়। হামেদ গাড়িয়াল আশায় আশায় থাকে—এই বুঝি তার খ্যাপ আসে। না। গত তিন মাসে সে একটা খ্যাপও পায়নি। সবাই এখন পছন্দ করে রিকশাভ্যান। সময় বাঁচে, খরচও।

হামেদ ভাবির কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে রওনা হয় ঢাকার দিকে। ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের করে জরিনার ঘর। জরিনা তাকে দেখে কেঁদে ফেলে। বলে, ‘এত দিন পর আসলেন। মুই এত দূর এটে কোনা বাঁচি আছি না মরি গেছি, একবার খোঁজও নিলেন না, তোমরা কেমন মানুষ বাহে?’ চোখ মোছে সে। দেশের নানা খবর জিজ্ঞেস করে। বিস্কুট আর চা খেতে দেয়।

হামেদ তাকে সবচেয়ে খুশির খবরটা দেওয়ার জন্য ছটফট করে। তারপর সে মওকাও মেলে—‘জরিনা, মুই একখান নয়া গাড়ি কিনছোম, ধবধবা শাদা দুইটা বলদ...’

জরিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘গরুগাড়ি কিনছেন। ভালো করছেন। কিন্তুক আমি চাই তোমরা ঢাকাত থাকেন। মোর কাছে কাছে থাকেন।’

‘ঢাকাত মুই কী করিম।’

‘এই বস্তিত তো রিকশার গ্যারেজ আছে। মুই কইলে তোমাকে ওমরা রিকশা ঠিকে ভাড়া খাটবার দিবে।’

‘মোর গরুর গাড়ি?’

‘বেচায়া দিমেন।’

হামেদ গাড়িয়াল জরিনার ছোট্ট বস্তিঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার পথে নামে। চারদিকে গিজগিজ করছে মানুষ, নানা যানবাহন, রিকশা, গাড়ি, বাস...কী ভীষণ শব্দ...। তার নিজের গরুগাড়িটা কি সে বিক্রি করে দিয়ে ঢাকায় চলে আসবে রিকশা চালাতে? আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটা ধূসর। তাতে খাবলা খাবলা লাল রং। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। তার বলদ দুটোকে কি মেজ ভাইজান ঠিকমতো গোয়ালে তুলেছে। কী জানি।

হঠাৎই, সোডিয়াম লাইটের আলোয় তার চোখে পড়ে এক রিকশাওয়ালার নাঙা পিঠ, তাতে কতগুলো কালশিটে, একটু আগে এক ট্রাফিক পুলিশ বেদম মারছিল এক রিকশাওয়ালাকে, বোয়ালমারীর বটগাছের নিচে চাঁদের আলো, ফজর আলি বেপারির তামাকের গাড়ি, বলদের পিঠে অক্ষম ক্রুদ্ধ গাড়িয়ালের পেন্টির দাগ...রিকশাওয়ালার পিঠ, বলদের পিঠ, কালশিটে...চাঁদ...সোডিয়ামের আলো হলদে আলোয় হামেদের চোখের নিচে লটকে থাকে দুই ফোঁটা সোনালি জল, সে ফুঁপিয়ে ওঠে।

ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরারে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু,
কয়া যাও, কয়া যাও রে
যদি বন্ধু যাবার চাও, ঘাড়ের গামছা ঘুরা যাও রে।
বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে...
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে।
ফান্দ বসাইবে ফান্দুয়া ভায়া পুঁটি মাছ দিয়া
ওরে মাছের লোভে বোকা বগা গড়ে উড়াও দিয়া রে।
বগাক দেখিয়া বগি কান্দে রে।
বণিক দেখিয়া বগা কান্দে রে।