পেইড ফ্রেন্ড
সকাল আটটা সাত মিনিটে তিলোত্তমার ফোনে একটি মেসেজ এল, ‘আজ বিকেল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আপনার পেইড ফ্রেন্ড নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তিলোত্তমা ভাবল, এটি কোনো বিজ্ঞাপন। সে মেসেজটি মুছে ফেলল। তারপর আবার মেসেজ এল, ‘আপনার পেইড ফ্রেন্ডের নাম: অলকানন্দা, বরাদ্দকৃত সময়: তিন ঘণ্টা, স্থান: চলতি পথের মাঝে, উদ্দেশ্য: আপনার পছন্দ অনুযায়ী।’
তিলোত্তমা ইনস্টল করেনি, অথচ তার ফোনের স্ক্রিনের এক পাশে ‘পেইড ফ্রেন্ড’ নামের একটি অ্যাপ ভেসে উঠল। আইকনটি সে আগে কখনো দেখেনি। অফিসে যাওয়ার পথে সে অ্যাপটি খুলল। সেখানে লেখা, ‘আপনার পছন্দ নির্বাচন করুন।’
নিচে অনেকগুলো অপশন—‘একসঙ্গে হাঁটা, মিনিটপ্রতি দশ টাকা; রিকশা ভ্রমণ, মিনিটপ্রতি পঁচিশ টাকা; কফিশপে আড্ডা, মিনিটপ্রতি পঞ্চাশ টাকা’ ইত্যাদি।
তিলোত্তমা অ্যাপটি বন্ধ করে দিল।
দুই
অফিস থেকে ফেরার পথে বাস থেকে জিগাতলায় নেমে কয়েক পা হেঁটে একটি কফিশপে বসল তিলোত্তমা। ক্যাপুচিনো অর্ডার করল। এখান থেকে পায়ে হেঁটেই বাসায় যাবে। শুক্র–শনিবার তো বাসা থেকে বের হওয়াই হয় না। তাই অফিস থেকে ফেরার পথে হাঁটার এই সুযোগটুকু সাধারণত মিস করে না।
কফির জন্য অপেক্ষমাণ তিলোত্তমার সামনে একজন এসে দাঁড়াল।
‘তিলোত্তমা?’
‘জি।’
‘আমি অলকানন্দা। আজ তিন ঘণ্টার জন্য আপনার বন্ধু।’ আগন্তুক খুব স্বাভাবিকভাবে হাসল।
তিলোত্তমা বলল, ‘আমি তো আপনাকে বুক করিনি।’
অলকানন্দা চেয়ার টেনে বসল। ‘আপনি করেননি, কিন্তু আপনার হয়ে সিস্টেম নিজেই বুক করেছে।’
‘আমার হয়ে?’
‘তা না হলে আপনার সময়, লোকেশন, নাম—এসব মিলালাম কীভাবে?’
‘কে বানাল আপনার শিডিউল? আপনি নিজে?’
‘তা কেন? আপনার ফোন থেকে সিস্টেমে যেভাবে অপশন সিলেক্ট করা হয়েছে, সেভাবেই আমার শিডিউল।’
তিলোত্তমা কিছু বলল না।
অলকানন্দা বলল, ‘চিন্তা করবেন না। তিন ঘণ্টাই আমি আপনার বন্ধু। আপনি চাইলে আপনার সঙ্গে হাসব, আপনার কথা শুনব, এমনকি আপনার ওপর রাগও করতে পারি।’
‘আপনার আসল নাম কী?’ ‘বলা নিষেধ। বুকিং পিরিয়ডে ব্যক্তিগত কোনো কিছু বলা নিষেধ। মক্কেলের কথা মন দিয়ে শোনা এবং আন্তরিকভাবে মক্কেলের প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেওয়া ছাড়া সব নিষেধ। আপনার আসল নাম কি তিলোত্তমা?’
‘আপনি কে আসলে, বলেন তো? কে পাঠিয়েছে আপনাকে?’
অলকানন্দা মৃদু হাসল।
‘অমন কিছুই না। আমি পেইড ফ্রেন্ড অ্যাপের সার্ভিস প্রোভাইডার।’
ওয়েটার এক কাপ ক্যাপুচিনো নিয়ে এল। তিলোত্তমা তাকে বলল, ‘আরেকটা দিন।’
‘না। আমি কফি খাই না। আমাকে একটা কোল্ড ড্রিংক দিন,’ ওয়েটারের উদ্দেশে বলল অলকানন্দা। তারপর তিলোত্তমাকে বলল, ‘আর বলবেন না। যে ফ্রেন্ড সার্ভিসটি শেষ করে আমাকে আপনার এখানে আসতে হলো, সেখানে ব্যাপক খানাপিনা হয়েছে। দুই ঘণ্টার বুকিং ছিল, দেড় ঘণ্টায় ছেড়ে দিয়েছে। হা হা হা! ত্রিশ মিনিটের সার্ভিস চার্জ লস।’
‘নাম কী আপনাদের কোম্পানির? পেইড ফ্রেন্ড সার্ভিসে আপনারা কতজন সার্ভিস প্রোভাইডার?’
‘কোম্পানির নাম জানি না। কতজন সার্ভিস প্রোভাইডার, তা–ও জানি না। আজই জয়েন
করেছি এবং আপনি আমার দ্বিতীয় মনিব, মক্কেলও বলতে পারেন।’
‘অফিসটা কোথায় আপনাদের?’
‘জানি না। একটা অ্যাপের মাধ্যমে আজ সকালেই যুক্ত হয়েছি। দুপুরে অ্যাসাইনমেন্ট শিডিউল পেয়েছি।’
‘সত্যি করে বলেন তো, কে আপনাকে পাঠিয়েছে? আপনার কথাবার্তায় রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।’
‘রহস্যের আবার গন্ধ হয় নাকি?’
‘হ্যাঁ, হয়। রহস্যের গন্ধ হয়, ছন্দ হয়, কবিতা হয়, গল্প হয়; তারপর সবকিছুই নাই হয়।’
‘আচ্ছা।’
‘কে পাঠিয়েছে বলেন তো, বলেন।’
‘আমাকে পাঠিয়েছে পেইড ফ্রেন্ড নামের একটি অ্যাপ। আপনাকে তিন ঘণ্টা সময় দেওয়ার জন্য আমাকে তিন হাজার টাকা পে করা হয়েছে।’
‘পেইড ফ্রেন্ড অ্যাপের নাম আগে তো কখনো শুনিনি। অলকানন্দা কি আপনার আসল নাম?’
‘না। এর আগে যে সার্ভিসটি দিয়ে এলাম, সেখানে আমার নাম ছিল পরমা।’
‘আপনার আসল নাম কী?’
‘বলা নিষেধ। বুকিং পিরিয়ডে ব্যক্তিগত কোনো কিছু বলা নিষেধ। মক্কেলের কথা মন দিয়ে শোনা এবং আন্তরিকভাবে মক্কেলের প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেওয়া ছাড়া সব নিষেধ। আপনার আসল নাম কি তিলোত্তমা?’
তিলোত্তমা ও অলকানন্দা আবার হাঁটতে শুরু করল। ফুটপাথে জোড়ায় জোড়ায় মানুষ। কেউ ফুল কিনছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ কারও কোলে ঢলে পড়ছে। অলকানন্দা মাঝেমধ্যে তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসছিল, যেন তারা বহু বছরের বন্ধু।
‘বাহ্, আপনি তো খুব চালাক। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি উঠব এখন।’
‘দেখুন, সঙ্গ দেওয়ার জন্যই আপনি আমাকে তিন ঘণ্টার জন্য ক্রয় করেছেন। অতএব আপনি যা করবেন, তাতে আমার দ্বিমত করার সাধ্য নেই। তবে কোম্পানির শর্ত অনুযায়ী আপনি কফিশপ থেকে চলে গেলে আপনার সঙ্গে আমাকেও যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গ দেওয়ার মিনিটপ্রতি রেট কফিশপে সঙ্গ দেওয়ার রেটের চেয়ে অনেক কম। তাই আপনি এখন হাঁটা শুরু করলে আমার পেমেন্ট থেকে টাকা কেটে রাখবে কোম্পানি। এতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব।’
‘মানে, কী বলতে চান? আপনার জন্য আমি তিন ঘণ্টা এখানে বসে থাকব?’
‘সেভাবেই কিন্তু আপনি বুকিং করেছেন। মানে, আপনার ফোন থেকে সিস্টেমে যেভাবে অপশন সিলেক্ট করা হয়েছে আরকি!’
‘আপনি কে আসলে?’
‘আমি আসলেই পেইড।’
‘আচ্ছা। আপনি থাকুন আমার সঙ্গে, আমি আমার কাজ করি।’
অলকানন্দার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে গেল তিলোত্তমা। অলকানন্দাও তার সঙ্গে সঙ্গে চলল।
তিন
সাতমসজিদ রোড ধরে ছায়ানটের দিকে যাচ্ছে দুজন। আবাহনী মাঠের বিপরীত দিকে রাস্তার চটপটির দোকানির দিকে তাকিয়ে আছে একটি মা কুকুর। নাদুসনুদুস চারটি বাচ্চাও মা কুকুরটির পাশে বসে দোকানির দিকে একইভাবে তাকিয়ে।
তিলোত্তমা মা কুকুরটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটি বাচ্চাকে কোলে তুলে নিল। মা কুকুরটি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তিলোত্তমা দুই বাটি চটপটি কিনে পলিথিনে ঢেলে দিতেই মা কুকুরসহ বাচ্চাগুলো চুকচুক শব্দ করে খেতে শুরু করল।
তিলোত্তমা ও অলকানন্দা আবার হাঁটতে শুরু করল। ফুটপাথে জোড়ায় জোড়ায় মানুষ। কেউ ফুল কিনছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ কারও কোলে ঢলে পড়ছে। অলকানন্দা মাঝেমধ্যে তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসছিল, যেন তারা বহু বছরের বন্ধু।
‘মহুয়াগাছ শুনে মনে হলো গল্পটা রোমান্টিক হবে। কাকের নাম শুনে তো আর শুনতে ইচ্ছে করছে না।’ ‘শুনতেই হবে। কারণ, তিন ঘণ্টার জন্য কেনা হয়েছে আপনাকে।’ অলকানন্দা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আপনার সময় শেষ। এখন রাত আটটা বেজে বত্রিশ সেকেন্ড।’ ‘আর পাঁচ মিনিট বসো, অলক।’
সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিলোত্তমা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাকে কী বলে ডাকব, অলকা নাকি নন্দা? আমি অত বড় নাম বলতে পারব না—অ-ল-কা-ন-ন্দা!’
‘কোনোটাই না। বিকৃত নামে আমাকে ডাকলে অতিরিক্ত পাঁচ শ টাকা দিতে হবে। এটা কোম্পানির নিয়ম নয়, আমার নিয়ম।’
তিলোত্তমা থেমে গেল।
‘তবে অলক বলতে পারেন। এ জন্য অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য হবে না।’
তিলোত্তমা হাসল। ষাট ছুঁই ছুঁই বয়সেও সুস্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, অর্থ—সবকিছুর শীর্ষে বসে একা থাকার বিলাস তাকে একা করতে পারেনি কখনো। অফিস, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, হইহুল্লোড় করেই সময় কাটে তার। তবু অলকানন্দার কথায় প্রাণের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা আজকের এই হাসি, যেন অনেক দিন পর হাসল সে।
‘আপনার বাড়ি কোথায়, অলক?’
‘মক্কেলের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে কোম্পানির নিষেধাজ্ঞা থাকায় সত্য বলতে পারছি না। আমার বাড়ি রংপুর।’
‘আচ্ছা! ঠিক আছে। আমি যা বলছি, সেগুলোকে মিথ্যা মনে করিয়েন না যেন।’
‘আপনি সত্য, অসত্য যা-ই বলবেন,
আমি তা-ই শুনতে নিজেকে বিক্রি করেছি তিন ঘণ্টার জন্য।’
‘জানি। তো, ছায়ানটের সামনে যে মহুয়াগাছটা দেখছেন, ওখানেও একদিন দাঁড়িয়েছিলাম আমরা।’
‘আপনি আর কে?’
‘ধরুন, একটা কাক।’
‘মহুয়াগাছ শুনে মনে হলো গল্পটা রোমান্টিক হবে। কাকের নাম শুনে তো আর শুনতে ইচ্ছে করছে না।’
‘শুনতেই হবে। কারণ, তিন ঘণ্টার জন্য কেনা হয়েছে আপনাকে।’
অলকানন্দা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আপনার সময় শেষ। এখন রাত আটটা বেজে বত্রিশ সেকেন্ড।’
‘আর পাঁচ মিনিট বসো, অলক।’
‘দুঃখিত। এ জন্য আপনাকে নতুন সেশন খুলতে হবে। সেই সেশনে আমি থাকব, এমন গ্যারান্টি নেই। আপনি নতুন সেশন চালু করুন, কোম্পানি উপযুক্ত একজনকে পাঠাবে।’
অলকানন্দা চলে গেল।