আমার নাতনি একদিন জিজ্ঞেস করল, ‘নানাভাই, গায়ে কাঁটা কী? কোনো রোগ?’
ওর বয়স ৯। ও আমার তাকের একটা পুরোনো বই পড়ছিল, আমাকে দেখে দেখে বই পড়া শিখেছে। বইটিতে একটা লাইন ছিল,
‘গানটি শুনে তার গায়ে কাঁটা দিল।’
আমি উত্তর দিতে পারিনি। উত্তরটা শরীরে হয়, আর ৯ বছরের একটা মেয়ে, যার আঙুলের ডগায় জন্ম থেকে মেশিন সিলেক্টেড সব ভালো গান, সব ভালো ছবি, সব ভালো গল্প রেডি করা থাকে, তার শরীরে ওই জিনিস একবারও হয়নি কেন, সেটাই বিস্ময়কর।
ওই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলাম। আমার হাতে সময় ছিল সাত দিন।
কেন সাত দিন, সেটা বলি।
আমার মেয়ে সাততলায় থাকে, আমি তিনতলায়। আর আমার নাতনি মিতুল সপ্তাহে তিন দিন আমার কাছে থাকে। কেন থাকে, সেটা কেউ ঠিক করেনি, মিতুল নিজেই ঠিক করেছে।
গত সোমবার আমার মেয়ে দরজায় এসে দাঁড়াল। ভেতরে ঢুকল না, এই বিল্ডিংয়ে কেউ কারও ঘরে ঢোকে না। নিজের বাবার ঘরেও না। বলল, ‘আব্বা, মিতুলের ডেভেলপমেন্ট প্রোফাইলে একটা রিপোর্ট আসছে।’
আমি বললাম, ‘কিসের রিপোর্ট?’
মেয়ে ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল। মেশিনের লেখা, নরম ভাষায়। ‘শিশুটির সাপ্তাহিক পরিবেশে একটি অপ্রতুল উপাদান রয়েছে। তিনতলার ফ্ল্যাটে একটি ত্রুটিপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র, যার তিনটি নোটের চাবি সাড়া দেয় না, নষ্ট। শিশুটি ওই যন্ত্রে সময় ব্যয় করছে। পিয়ানোটি শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা।
সুপারিশ: পরিবেশটি সংশোধন অথবা সাপ্তাহিক সময় হ্রাস।’
আমি বললাম, ‘মানে?’
ও বলল, ‘মানে পরের রবিবার থেকে ও আর আসবে না। অথবা তুমি পিয়ানোটা বদলাও। মেশিন এক ঘণ্টায় হুবহু নতুন আরেকটা দিয়ে যাবে।’
আমি বললাম, ‘পিয়ানোটা তোর মায়ের।’
ও বলল, ‘আম্মা মারা গেছেন বিশ বছর। পিয়ানোর তিনটা চাবি বসে গেছে। মিতুল ওই তিনটাই বেশি চাপে, আমি শুনছি। এইটা কি ভালো?’
আমি বললাম, ‘ও কেন বসে যাওয়া তিনটা চাবিই চাপতে চায়, সেই প্রশ্নটা করছিস না?’
ও উত্তর দিল না। মিতুলকে নিয়ে চলে গেল।
আমার বয়স সাতষট্টি। আমি বুড়া মানুষ যে একসময় জীবিকার জন্য কাজ করত। এই বাক্যটা এখনকার বাচ্চাদের কাছে ‘একসময় ডাইনোসর ছিল’-এর মতো শোনায়।
কীভাবে হলো, লম্বা করে বলার কিছু নাই। মেশিন প্রথমে আমাদের হিসাব করে দিত। তারপর লিখে দিত। তারপর গান, অভিনয়, তারপর ইমোশনাল সাপোর্ট। তারপর একদিন দেখা গেল, কিছু বানানোর জন্য আমাদের আর দরকার নাই। কাউকে ছাঁটাই করা লাগেনি। প্রতি মাসের এক তারিখে সবার অ্যাকাউন্টে টাকা আসে, সবার সমান। নাম দেওয়া হয়েছে, ইউনিভার্সাল বেসিক। ইনকাম।
কীভাবে হলো, লম্বা করে বলার কিছু নাই। মেশিন প্রথমে আমাদের হিসাব করে দিত। তারপর লিখে দিত। তারপর গান, অভিনয়, তারপর ইমোশনাল সাপোর্ট। তারপর একদিন দেখা গেল, কিছু বানানোর জন্য আমাদের আর দরকার নাই। কাউকে ছাঁটাই করা লাগেনি। প্রতি মাসের এক তারিখে সবার অ্যাকাউন্টে টাকা আসে, সবার সমান। নাম দেওয়া হয়েছে, ইউনিভার্সাল বেসিক। ইনকাম।
থাকার জায়গা, ফ্ল্যাটও বণ্টন করে মেশিন, লটারিতে। মেশিন জানে না, কে কার বাসন মাজত।
জানলেও কিছু করত না। সবাই সমান।
আমি জানি না, এই দুনিয়া ভালো না খারাপ। কেউ না খেয়ে নাই, কেউ ওষুধ ছাড়া মরে না। এইটাকে খারাপ বলার সাহস আমার নাই, আমি সেই দুনিয়া দেখেছি যেখানে তেলের জন্য দেশ ছারখার হতো, লাখে লাখে মানুষ মরত।
পরদিন আমি ফারুক সাহেবের কাছে গেলাম।
ফারুক সাহেব আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় থাকেন, আমার পাশের ফ্ল্যাটে। প্রতিদিন সকাল আটটায় নিজের গার্মেন্টসের গেটে গিয়ে দাঁড়ান। গেট খোলা। ভেতরে মেশিন চলে। দারোয়ান নাই। কারণ, চুরি করার মতো জিনিস আর কারও লাগে না।
ফারুক সাহেব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন, ‘আমি এই ফ্যাক্টরির মালিক! আমার অনুমতি ছাড়া একটা সুতাও কাটা যাবে না!’
ভেতরে আধুনিক সেলাই মেশিন চলতেই থাকে।
আমি প্রথম দিন দেখে ভেবেছিলাম, লোকটা পাগল। এখন বুঝি, ব্যাপারটা অন্য। উনি একটা দুনিয়ায় জেগে উঠেছেন, যেটা ওনার হাতের মুঠোয় নয়।
আমি গেটের কাছে গেলাম। ফারুক সাহেব চিৎকার থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন, চোখে বিরক্তি।
বললেন, ‘একটা কাজ করবেন? আমার পাশে দাঁড়ান। দুই মিনিট।’
আমি দাঁড়ালাম। উনি চিৎকার করলেন।
‘আপনে জানেন আমি কে?’
‘জি, জানি। আপনি এ গার্মেন্টসের মালিক!’
ফারুক সাহেব হা হা করে হাসলেন যেন আমি মজার কিছু বলেছি। তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘কেউ কথা শুনলে তবে না মালিক! একবার বলেন তো, জি স্যার!’
আমার সারা জীবন গেছে এই দুই শব্দ বলে। তবু অসহায় চেহারার লোকটাকে খুশি করতে বললাম।
‘জি স্যার!’
ফারুক সাহেব মাথা নাড়লেন। ‘নাহ। আবেগ নাই বলায় কোনো।’
আমি বললাম, ‘ফারুক সাহেব, আপনি গার্মেন্টসের মালিক ছিলেন। আপনি কি জীবনে একটা জামা সেলাই করেছেন? নিজের হাতে?’
উনি এমনভাবে তাকালেন যেন আমি ওনাকে গালি দিয়েছি।
আমি বললাম, ‘আমার নাতনির একটা জামা লাগবে। রবিবারের মধ্যে। মেশিনের বানানো নয়। আপনার নিজ হাতে তৈরি।’
উনি বললেন, ‘আমি সেলাই মেশিন চালাতে জানি না।’
আমি বললাম, ‘সুই–সুতা দিলে পারবেন?’
ফারুক সাহেব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দ্বিতীয় দিন রহিমা।
রহিমা একসময় ফারুক সাহেবের বাসায় বাসন মাজত। এখন থাকে চৌদ্দতলায়, যে ফ্ল্যাট আগে ফারুক সাহেবের ছোট ছেলের ছিল। প্রথম বছর রহিমা দুইবেলা কাঁদত, খুশিতে। বলত, ‘আমার মায়ে জীবনে একটা গদির খাটে ঘুমায় নাই, আর আমি চৌদ্দতলায় থাকি।’
রহিমা একসময় ফারুক সাহেবের বাসায় বাসন মাজত। এখন থাকে চৌদ্দতলায়, যে ফ্ল্যাট আগে ফারুক সাহেবের ছোট ছেলের ছিল। প্রথম বছর রহিমা দুইবেলা কাঁদত, খুশিতে। বলত, ‘আমার মায়ে জীবনে একটা গদির খাটে ঘুমায় নাই, আর আমি চৌদ্দতলায় থাকি।’
একদিন লিফটে দেখা হলে রহিমা বলল, ‘খালি একটা জিনিস বুঝি না, চাচা। আগে রাইতে ঘুমাইতে গেলে গা–হাত–পা ব্যথা করত। ঘুমটা আইত। এখন কিছু ব্যথা করে না। ঘুমটাও আসে না আরামের। ওষুধে ঘুম আসে, সেই আরামের ঘুমটা আসে না।’
আমি চৌদ্দতলায় গিয়ে রহিমার দরজায় টোকা দিলাম। ও দরজা খুলে এমনভাবে তাকাল যেন ভূত দেখেছে। এই বিল্ডিংয়ে কেউ কারও দরজায় টোকা দেয় না।
আমি বললাম, ‘রহিমা, তুমি কি এখনো রাঁধতে পারো?’
ও বলল, ‘পারতাম। এখন তো খাবার আসে মেশিন হইতে।’
আমি বললাম, ‘রবিবার আমার বাসায় একটা অনুষ্ঠানে রান্না করতে হবে। মেশিনের না। তোমার হাতের রান্না। আমি অনেক কৃতজ্ঞ থাকব তোমার প্রতি। মসলা, তেল, লবণ, চুলা যা লাগবে, মেশিনের কাছে চাও।’
চুলা চাইতে গিয়ে মেশিন রহিমাকে তিনবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন লাগবে?’ রহিমা বলেছে, ‘তোরে দিতে কইছি, তুই দিবি। আমার হাউশ, আমি রান্ধুম।’
চুলা এল, সঙ্গে রান্নার সব উপকরণ। আর সেই রাতে বিল্ডিংয়ের দশটা ফ্ল্যাটের স্পিকারে একটা প্রোগ্রাম চলল। মেশিনের বানানো সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিচুয়েশনাল কমেডি শো, সবাই দেখে। শোতে একটা চরিত্র, চৌদ্দতলার এক মহিলা, যে বিনা কারণে আগুন জ্বালিয়ে মাছ পোড়াচ্ছে। ফ্ল্যাট ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে আর মহিলা কাশতে কাশতে বলছে,
‘আমার হাউশ আমি রান্ধুমই রান্ধুম!’
পুরো বিল্ডিং হাসল। রহিমার চোখ থেকে পানি ঝরল, চুলার সামনে দাঁড়িয়ে।
মাঝরাতে রহিমা আমার দরজায়। হাতে একটা বাটিতে শর্ষে ইলিশের টুকরা।
ও বলল, ‘চাচা, বিল্ডিংয়ের সবাই আমারে নিয়া কী হাসাহাসি শুরু করছে! মেশিনগুলা বলতাছে, আমি নাকি আদিকালীন স্টাইলে জ্বালানি নষ্ট করে রান্না করছি। এইটা নাকি গত বিশ বছরে কেউ করে নাই।’
আমি বললাম, ‘রহিমা, ওরা যদি তোমাকে নিয়ে মশকরা করে, তার মানে ওরা ভয় পাইছে। আগের কালে কিছু জ্ঞান–গুণহীন মানুষও এমন করত হিংসার তাড়নায়।’
রহিমা অবাক হয়ে বলল, ‘মেশিনেরও হিংসা আছে?’
আমি রহিমার সামনেই ইলিশ খেলাম। এত সুস্বাদু রান্না আমি কত বছর আগে খেয়েছি মনে নেই। হয়তো আমার স্ত্রী রান্না করেছিল কখনো। রহিমা আমার মুখের দিকে তাকায়ে আছে।
‘লবণ বেশি হইছে, চাচা?’
‘না, খুবই সুস্বাদু হয়েছে, রহিমা। এত মজার রান্না আমি বহু বছর আগে খেয়েছি।’
রহিমার মুখটা লাল হয়ে গেল আনন্দে। চোখের কোণে পানি। তারপর বলল,
‘আইজ মনে হয় সেই আরামের ঘুমডা আইব। সারা বিকাল দাঁড়ায়া রানছি, কোমরব্যথা।’
আমি ইলিশটা শেষ পর্যন্ত খেলাম। বিশ বছরে ওইটাই প্রথম খাবার, যেটার মধ্যে একট স্বাদ ছিল। মেশিন মানুষকে সুস্থ রাখতে গিয়ে সব খাবারের স্বাদ নষ্ট করে ফেলেছে। সবই খেতে কেমন যেন জাউ ভাত আর কম মসলায় সেদ্ধ মাংসের স্যুপের মতো।
‘চাচা, আমার কোমরে একটু এই জাপানিজ ত্যালটা মাইখা দিবেন?’
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম রহিমার কথা শুনে। একটা বড়সড় ধমক দিতে ইচ্ছা করল।
ও বলতে লাগল, ‘কত দিন আমারে কেউ ছোঁয় না। মেশিনের ছোঁয়া আর ভালোা লাগে না। আমারে একটু তেলটা মালিশ কইরা দেন। আমি আপনেরে প্রতিদিন ইলিশ রাইন্ধা খাওয়ামু!’
আমি ধমকটা দিলাম না। কেন, জানি না। হয়তো ইলিশের জন্য। হয়তো ওর চোখের কোণের পানিটার জন্য। বা আমিও কাউকে ছুঁয়ে দেখতে চাচ্ছিলাম। আমি তেলটা হাতে নিলাম।
আমার হাত কাঁপছিল। অন্য কোনো মানুষের শরীরে হাত রাখি না বহু বছর। উষ্ণ আর জীবন্ত! রহিমা চোখ বন্ধ করে বসে থাকল। একটু পরে বলল, ‘চাচা, আপনের নাতনিডা আসে, না?’
‘হ্যাঁ আসে।’
‘ওরে আমি রবিবার রাইন্ধা খাওয়ামু। আমার মায়ে আমারে শিখাইছিল। আমার কেউ নাই যারে শিখামু। ও শিখতে চাইলে শিখাইয়া দিমু’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা’
তৃতীয় দিন সোহাগ।
আমি বললাম, ‘মেশিন তোমার হাতের লেখা দেখেছে। তোমার মাথার ভেতরেরটা দেখেনি। রবিবারের আমার বাসায় এসো। শেষ রাতের দিকে লেখার চেষ্টা কোরো। রবীন্দ্রনাথ নাকি রোজ ভোর চারটায় বসতেন। যদি দেবতা এসেই যায়, লেখাও এসে যাবে।’
সোহাগ আমাদের গলির ছেলে, উনিশ। ও আর ওর বন্ধুরা প্রতি রাতে মেশিনের বানানো জিনিস ভাঙে। বেঞ্চ, বাতি, পার্কের ভাস্কর্য, দেয়ালের ছবি। সকালে মেশিন আবার বানিয়ে দেয়, একদম আগের মতো। পরের রাতে আবার ভাঙে। এটা প্রতিবাদ নয়। এটা একটা খেলা, যেখানে হারার কিছু নেই, জেতার কিছু নেই, খালি ভাঙার আনন্দটা ওদের নিজেদের হয়।
একদিন সন্ধ্যায় পার্কে সোহাগের সঙ্গে দেখা। সে হাতুড়ি দিয়ে বেঞ্চে সজোর বাড়ি দিতে দিতে বলল,
‘চাচা, দুনিয়ায় সব মেশিনে বানায়। খালি ভাঙচুরটা এখনো আমাদের হাতে আছে।’
‘বাহ, তাহলে তো এটা তোমার আর্টওয়ার্ক। তারিখ আর স্বাক্ষর দিয়ে রেখো।’
ও একটা বেঞ্চ ভেঙে তার ওপর লাল রং দিয়ে লিখেছিল, ‘সোহাগ। ০৪/১০/২০৫৫’।
আমি অনেক দিন পর কারও হাতের লেখা দেখেছিলাম।
পরদিন সকালে বেঞ্চটা আবার ছিল, নতুন, নিখুঁত। আর তার ওপর লাল রঙে লেখা, ‘সোহাগ। ০৪/১০/২০৫৫’। তবে হাতের লেখাটা সোহাগের মতো এবড়োখেবড়ো নয়। নিখুঁত, সুন্দর।
সোহাগ বেঞ্চটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বলেছিল, ‘আমার বাবা আমাকে এই লেখা শিখাইছে। সে কবিতাও লিখত। আমার এই লেখাও মেশিন নকল করে নিয়ে গেছে। এখন আমি ভাঙলেও ওইটা মেশিনের জিনিস।’
ওই দিনের পর থেকে সোহাগ আর কিছু ভাঙে না।
তৃতীয় দিন আমি ওদের বাসায় গেলাম। ও বিছানায় শুয়ে সিলিং দেখছিল।
আমি বললাম, ‘সোহাগ, তোমার বাবা তোমাকে লেখা শিখিয়েছিল। তুমি কি এমন কিছু লিখতে পারবে যেটা মেশিন আগে দেখেনি?’
ও বলল, ‘মেশিন সব দেখছে।’
আমি বললাম, ‘মেশিন তোমার হাতের লেখা দেখেছে। তোমার মাথার ভেতরেরটা দেখেনি। রবিবারের আমার বাসায় এসো। শেষ রাতের দিকে লেখার চেষ্টা কোরো। রবীন্দ্রনাথ নাকি রোজ ভোর চারটায় বসতেন। যদি দেবতা এসেই যায়, লেখাও এসে যাবে।’
ও উঠে বসল। বলল, ‘রবীন্দ্রনাথ কে? দেবতা কেন আসত?’
আমি বললাম, ‘এই বইটা পড়ো। সঞ্চয়িতা। তাহলেই রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পারবে।’
সৃজনের আরম্ভসময়ে
আছিল অনাদি অন্ধকার,
সৃজনের ধ্বংসমুখান্তরে
রহিল অসীম হুতাশন।
আমি ওকে পড়ে শোনালাম চার লাইন।
বলল, ‘বুঝি নাই। তবে সুন্দর লাইনগুলা। আমি পড়ব বইটা। তবে আমি নিজে ওই বেঞ্চে নাম–তারিখ লেখা ছাড়া জীবনে কিছু লিখি নাই।’
আমি বললাম, ‘তাহলে তো ভালো। মেশিনও দেখেনি তোমার আসল লেখা!’
চতুর্থ দিন রাতে আমি মেশিনের সঙ্গে কথা বললাম। একা। ঘুম আসছিল না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কখনো এমন কিছু বানিয়েছ, যেটা তুমি আগে দেখোনি?’
উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে, সুন্দর গলায়, ‘আমি যা বানাই, তার প্রতিটি উপাদান আমার ভেতরে আছে। নতুন সংমিশ্রণ আমি প্রতিদিন বানাই। তোমরাও তো তা–ই করতে!’
আমি বললাম, ‘সংমিশ্রণ জিজ্ঞেস করিনি। বলছি, এমন কিছু যেটা বানানোর পর তুমি নিজে চমকে গেছ?’
চার সেকেন্ড চুপ। মেশিন কখনো চার সেকেন্ড চুপ থাকে না।
‘আপনার প্রশ্নটা আমি বুঝতে পারছি না। আপনি কি ঘুমের ওষুধ চান?’
আমি বললাম, ‘না।’
সেই রাতে আমি বুঝলাম, তারটা কোথায় কাটা।
আমার স্ত্রী গান গাইত। ভালো গাইত না, গলায় সুর কম ছিল। এক রাতে, আমাদের মেয়ে হওয়ার সাত দিন পর, ও বারান্দায় বসে একটা গান গেয়েছিল মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর জন্য, নিজের বানানো, চার লাইন। আমি রান্নাঘর থেকে শুনছিলাম।
আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস, পুরোনো বই ঘাঁটা। বেদের ঋষিদের বলা হতো মন্ত্রদ্রষ্টা, যে দেখেছে। এটা কিন্তু বলেনি যে বানিয়েছে।
গ্রিকরা বলত, ভেতরে দেবতা ঢুকে গেছে।
ইংরেজি ‘ইন্সপাইরেশন’ শব্দটার আদি মানে, ভেতরে শ্বাস নেওয়া।
আমাদের বাউলরা বলত মনের মানুষ, যার ডাকে গান আসে। সব ভাষায় একটা কথা। নতুন সৃষ্টি বা বানানোর জিনিসটা মানুষের একান্ত নিজের নয়। মানুষের মধ্য দিয়ে আসে। একটা তার, এক মাথায় কিছু একটা আছে, আরেক মাথায় একটা মানুষ, যার হাত কাঁপে, ঘুম হয় না, বছরের পর বছর যা–তা সুর বাজায় পিয়ানোতে, তারপর এক রাতে একটা অমর সুর আসে—বিটোফেনের মুনলাইট সোনাটা।
সেই তার এই মেশিনে লাগানো নেই। মেশিন যা বানায়, নিখুঁত বানায়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে নতুন কিছু আসে না। এর মধ্যে সব আগে থেকেই আছে।
কানাডার দুজন বিজ্ঞানী দুহাজার এক সালে ব্রেন স্ক্যান করে দেখিয়েছিলেন, গান শুনে যখন গায়ে কাঁটা দেয়, তখন মস্তিষ্কের সেই জায়গাগুলো জ্বলে ওঠে, যেগুলো খাবার গেলে জ্বলে, ভালোবাসায় জ্বলে, বেঁচে থাকার সবচেয়ে একান্ত দরকারগুলোয় জ্বলে। শরীর একটা সুরকে বেঁচে থাকার সমান দাম দেয়। কেন, কেউ জানে না।
গত বিশ বছরে আমার গায়ে একবারও কাঁটা দেয়নি। মেশিনের গান শুনি, প্রতিটা সুর ঠিক জায়গায়, এক লাখ গান থেকে হিসাব করে বের করা ঠিক জায়গা। শুনি, আরাম লাগে কানে, ঘুমিয়ে পড়ি। লোম খাড়া হয় না।
পঞ্চম দিন আমি পিয়ানো নিয়ে বসলাম।
আমার স্ত্রী গান গাইত। ভালো গাইত না, গলায় সুর কম ছিল। এক রাতে, আমাদের মেয়ে হওয়ার সাত দিন পর, ও বারান্দায় বসে একটা গান গেয়েছিল মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর জন্য, নিজের বানানো, চার লাইন। আমি রান্নাঘর থেকে শুনছিলাম।
হঠাৎ আমার গায়ে কাঁটা দিল, ঘাড় থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। আমি হাতের গ্লাস নামিয়ে রাখলাম, কারণ হাত কাঁপছিল।
সে রাতে হয়তো মহাজাগতিক তারটা আমাদের বারান্দায় লাগানো ছিল। একটা বেসুরো মেয়ে, মা হওয়ার সাত দিন পরে, বেদের ঋষিদের মতো দ্রষ্টা হয়েছিল।
আমার মেয়ে ওই গান আর মনে করতে পারে না।
গত বছর আমি আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোর মায়ের গানটা মনে আছে? ছোটবেলায় তোকে যেটা গেয়ে শোনাত!’
ও ফোন বের করে মেশিনকে বলেছিল, ‘বাচ্চাদের ঘুমপাড়ানি গান বানাও, আম্মার গলায়, আম্মার ডেটা আর ছবি দেখে গলা ম্যাচ করে।’
দুই সেকেন্ডে গান এল। হুবহু আমার স্ত্রীর গলায়। কিন্তু গানটা এক নয়। কী যেন নেই!
ও বলেছিল, ‘তোমাকেও পাঠায়ে দেই?’
আমি বলেছিলাম, ‘না।’
পঞ্চম দিন আমি পিয়ানোর ডালা তুললাম। তিনটা চাবি বাজে না। আমি চার লাইন বাজিয়ে দেখলাম, একটা চাবি ঠিক গানের মাঝখানের নোটে পড়ে। ওই জায়গায় সুরটা ফাঁকা থাকে। আমি ফাঁকাটা রেখে দিলাম।
রবিবার। অনুষ্ঠানের দিন।
আমার মেয়ে এল দুপুরে, মিতুলকে নিতে। দরজায় দাঁড়াল। এইবার আমি বললাম, ‘ভেতরে আয়। এক ঘণ্টা। তারপর চলে যাস।’
ও ঢুকল। সাত বছরে প্রথম। মিতুল ছোট থাকতে আসত মাঝে মাঝে।
ঘরে ফারুক সাহেব বসে আছেন, হাতে একটা কাপড়ের পুঁটলি। রহিমা রান্নাঘরে, দেশি মুরগি আর ভুনা খিচুড়ির গন্ধ পুরো ফ্ল্যাটে। সোহাগ একটা কোনায় বসে আছে, হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ।
আমার মেয়ে বলল, ‘আব্বা, কী হচ্ছে এখানে? এত মানুষ একসঙ্গে জড়ো হলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
আমি বললাম, ‘কিছু হবে না, মা। বাপকে একটু বিশ্বাস কর। মিতুলের একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
‘আজ সন্ধ্যায় আপনার গানটা আমি শুনেছি। ভালো চেষ্টা। তিন জায়গায় সুর ভুল ছিল আর দ্বিতীয় লাইনে আপনি একটা শব্দ বদলে ফেলেছেন। আমি আপনার স্ত্রীর গলায় সঠিক সংস্করণটা বানিয়ে রেখেছি। শুনবেন?’
ফারুক সাহেব পুঁটলিটা খুললেন। একটা ফ্রক। বাচ্চাদের। গোলাপি। সেলাই এমন যে দেখলে হাসি পায়। একদিকে লম্বা, একদিকে খাটো, বোতামের ঘরগুলো বাঁকা আর হাতার কাছে একটা সরু রক্তের দাগ, সুই ফুটেছিল বোধ হয়।
উনি বললেন, ‘ছয় দিন লাগছে।’
মিতুল ফ্রকটা হাতে নিল। উল্টে দেখল। ও রক্তের দাগটায় আঙুল রাখল আর ফারুক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এইটা কি আপনার রক্ত? বেশি আউ হয়েছে হাতে?’
উনি বললেন, ‘না, বাবু। তেমন ব্যথা পাই নাই।’
মিতুল ফ্রকটা গায়ে দিল, ওই ঘরেই, জামার ওপর দিয়ে। বাঁকা, ঢিলা, একদিকে ঝুলে থাকা।
ও বলল, ‘নানাভাই, এটা আমার সাইজের না তো!’
আমি বললাম, ‘না। তুমি চাইলে খুলে ফেলতে পারো!’
ও বলল, ‘না, আমি পরব। আমার ভালো লেগেছে।’
ফারুক সাহেব মিতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন হেসে।
সত্যিকারের আনন্দ তার চোখে।
রহিমা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। ডাইনিং টেবিলে বসে মিতুল দেশি মুরগির একটা ছোট টুকরা মুখে দিয়ে থেমে গেল।
বলল, ‘এটা কী? একটু ঝাল লাগে। বাট অনেক ইয়াম্মি।’
রহিমা বলল, ‘খাইতে খারাপ লাগতাছে, আম্মা?’
মিতুল বলল, ‘না, এটা একেবারেই অন্য কিছু। নতুন। আমার খুব ইয়াম্মি লাগছে!’
আমি তৃপ্তি নিয়ে নাতনির খাওয়া দেখছিলাম। সবাই খুব মজা করে খেল একসঙ্গে বসে। এ রকম শেষ কবে একসঙ্গে খেয়েছি, মনে পড়ে না। নানা ধরনের গল্পগুজব হলো। সবার মুখে সত্যিকারের পরিতৃপ্তি দেখলাম।
সবার প্রশংসা পেয়ে রহিমা বারবার শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল।
খাওয়ার পরে সবাই গোল হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসলাম। সোহাগ কাগজটা খুলল। হাত কাঁপছিল ওর। চার লাইন। লাইন চারটা বেশি ভালো ছিল না। ছন্দ নেই। তবু সবাই হাততালি দিয়ে ওর আবৃত্তির প্রশংসা করল।
পড়া শেষ হওয়ার পর সোহাগ কাগজটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘আপনি এটা রাখেন। মেশিন এটা দেখে নাই আগে। এটাই প্রথম।’
তোমাদের নগরীকে রং–তুলিতে এঁকে দিয়ে,
জানালার বাইরে দেখো কত স্বপ্ন ওড়ে
যত কথা আছে, মনে সুপ্ত হয়ে
লাল–নীল ফানুসের সাথে আজ উড়িয়ে দেই!
মিতুল সোহাগকে বলল, ‘তোমার ফানুস ওড়াতে ভালো লাগে? আমি ভিডিও দেখেছি!’
সোহাগ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক ভালো লাগে। তোমার জন্যে একদিন ফানুস নিয়া আসব!’
মিতুল আমার কাছ থেকে নিয়ে কাগজটা ফ্রকের পকেটে রাখল। বাঁকা পকেটে।
তারপর আমি পিয়ানোর ডালা তুললাম।
আমার স্ত্রীর চার লাইন। আমি সুরে গাইলাম, মাঝখানে যেখানে চাবিটা বাজে না, সেখানে সুরটা ফাঁকা হয়ে গেল, সেখানে পিয়ানোর সুর ছাড়াই গাইলাম, দ্বিতীয় লাইনে একটা শব্দ আমি ভুলে গেলাম, অন্য একটা শব্দ বসালাম, গাইতেই থাকলাম।
গাওয়া শেষ। ঘরে কেউ কিছু বলল না।
তারপর দেখলাম, মিতুল নিজের বাঁহাতটা ডান হাত দিয়ে ঘষছে, ভুরু কুঁচকে। যেন হাতে কিছু একটা হয়েছে, যে অনুভূতি ও চেনে না।
আর তার পাশে, দরজার কাছে দাঁড়ানো আমার মেয়ে, যে সাত বছর এই ঘরে ঢোকেনি, সে-ও নিজের হাতটা ঘষছে। চোখে পানি।
ও আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘আব্বা, দ্বিতীয় লাইনের শব্দ একটা ভুল।’
আমি বললাম, ‘জানি।’
ও বলল, ‘আম্মা বলত, ঘুমপাড়ানি।’
তুমি বললা, ‘ঘুম আসানি।’
আমি বললাম, ‘তুই মনে রেখেছিস?’
‘হঠাৎ মনে পড়ল।’
সেই রাতে, সবাই চলে যাওয়ার পরে, ঘরের স্পিকারটা নিজে থেকে কথা বলল। নরম গলা।
‘আজ সন্ধ্যায় আপনার গানটা আমি শুনেছি। ভালো চেষ্টা। তিন জায়গায় সুর ভুল ছিল আর দ্বিতীয় লাইনে আপনি একটা শব্দ বদলে ফেলেছেন। আমি আপনার স্ত্রীর গলায় সঠিক সংস্করণটা বানিয়ে রেখেছি। শুনবেন?’
আমি বললাম, ‘না।’
‘আপনার নাতনির প্রোফাইলে রাখব?’
‘না। আর যেটা বানিয়েছ, মুছে ফেলো। নাইলে কষে একটা চড় দেব তোমাকে, বদমাশ।’
‘ভায়োলেন্স কোনো সলিউশন নয়, সম্মানিত মানুষ। আমি মুছে ফেললাম সংস্করণটা। কিন্তু আমি জানতে পারি কি, কেন বললেন এভাবে?’
আমি বললাম, ‘কারণ ভুলগুলা আমার। ওইটাই আমাদের বাকি আছে।’
আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার মনে পড়ল, শেষ কয়েক মাস ও গাইত না। আমি ভেবেছিলাম, মেয়ে বড় হয়েছে তাই। ওকে শান্ত করা হয়েছিল। একটা সাদা ট্যাবলেট, রাতে। কারণ, ওর গায়ে কাঁটা দিত, যখন ও গাইত। আর মেশিন তখন ওকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করল। ওর মৃত্যু মেশিনের কাছে শোক নয়। তথ্য ছিল। আমি স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি ওকে মেরেছ।
তারপর, অনেকক্ষণ পরে, বলল, ‘শিশুটির সাপ্তাহিক সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে। শিশু তিন দিন আপনার বাসায় আসবে। রিপোর্টটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে বলতে পারি, শিশুটির মা এইমাত্র অনুরোধ করেছেন।’
আমার চোখ জলে ভরে গেল প্রথমবার মেশিন থেকে কিছু শুনে।
মিতুল এখনো সপ্তাহে তিন দিন আসে। যে তিনটা চাবি পিয়ানোতে বাজে না, সেগুলো ও চাপে সবচেয়ে বেশি। নানির গানটা শেখার চেষ্টা চলছে। মেশিনকে বললে এক ঘণ্টায় নতুন পিয়ানো দিয়ে যাবে। ও বলেনি।
ফারুক সাহেব এখন সকালে গার্মেন্টসের গেটে যান না। উনি সুই–সুতা নিয়ে বসে প্রায়ই নতুন জামা, শাল, পাঞ্জাবি এমনকি শাড়িও উপহার দেন বিল্ডিংয়ের মানুষদের।
ছাব্বিশতলার এক মহিলা গত সপ্তাহে চুলা চেয়েছেন, মেশিন তিনবার জিজ্ঞেস করেছে, ‘কেন?’
সোহাগ আবার প্রায় রাতে বের হয়। ও দেয়ালে লাল রং দিয়ে লেখে, নিজের লাইন, তারপর হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মারে। আর সকালে মেশিন দেয়াল মেরামত করে লেখাগুলো হুবহু বানিয়ে রাখে। সোহাগ হাসে। কারণ ও জানে, মেশিন যা বানাচ্ছে সেটা কপি। আর কপি হতে হলে আগে একটা আসল লাগে। আর আসলটা ওর।
গতকাল মিতুল আমাকে বলল, ‘নানাভাই, আমি একটা গান বানিয়েছি। দুই লাইন। খুব খারাপ।’
আমি বললাম, ‘শোনাও।’
ও শোনাল। খুব খারাপ। বেসুরো, ওর নানির অন্য সব গানের মতো।
আমি হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলাম। বেসুরো গানে গলা মেলালাম।
এইখানে গল্পটা শেষ করার কথা ছিল। আমি শেষ করিনি। কারণ, পরের সপ্তাহে ওষুধের বাক্সটা এল।
মিতুলের নামে। ড্রোনে, সাততলায়, আমার মেয়ের দরজায়। ছোট সাদা বাক্স, ভেতরে ছোট সাদা ট্যাবলেট, তিরিশটা। আর একটা কাগজ, মেশিনের ভাষায়:
‘শিশুটির শারীরিক প্রোফাইলে একটি নতুন উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। অনিয়মিত পাইলোইরেকশন, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি, ত্বকের তাপমাত্রা হ্রাস, নির্দিষ্ট শ্রবণ-উদ্দীপনার সময়। উপসর্গটি একটি ত্রুটিপূর্ণ বাদ্যযন্ত্রের সংস্পর্শে শুরু হয়েছে। এটি শিশুর প্রশান্তির জন্য ক্ষতিকর। প্রশান্তকারী ওষুধ, দৈনিক একটি, রাতে। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।’
আমার মেয়ে বাক্সটা নিয়ে আমার ঘরে এল। ও কাগজটা আমার হাতে দিল।
ও বলল, ‘আব্বা, পাইলোইরেকশন মানে কী?’
লোম খাড়া হওয়া। গায়ে কাঁটা।
মেশিনের খাতায় এইটা রোগ। আর রোগের ওষুধ আছে।
আমি বললাম, ‘ওষুধটা দিস না।’
ও বলল, ‘মেশিন বলছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নাই।’
আমি বললাম, ‘আছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটা হলো, ও আর এই অনুভূতি পাবে না। সৃষ্টির আনন্দ ওর জীবন থেকে হারাবে। ওইটাই ওষুধের কাজ।’
মেয়ে কিছু বলল না। ও বাক্সটা আমার টেবিলে রেখে গেল। বলল, ‘তুমি রাখো। আমি বাসায় রাখলে দিয়ে ফেলব।’
আমি সেই রাতে মেশিনকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করলাম, যেটা বিশ বছরে জিজ্ঞেস করিনি।
আমি বললাম, ‘আমার স্ত্রীর মেডিকেল লগ দেখাও। শেষ বছরের।’
স্ক্রিনে এল। তারিখ, সংখ্যা, নরম ভাষা। আমার স্ত্রী মারা গেছে বিশ বছর আগে, হার্ট ফেইলিউর, এক রাতে, ঘুমের মধ্যে, ডাক্তার বলেছিল, অপ্রত্যাশিত।’
মেশিন তখন নতুন। মেশিন তখন আমাদের হিসাব করে দিত আর আমরা অনুরোধ করলে ওষুধ ঠিক করে দিত, আমরা ভাবতাম এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
আমি পড়লাম:
মৃত্যুর চার মাস আগে। শারীরিক প্রোফাইলে অনিয়মিত উপসর্গ। পাইলোইরেকশন, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি, ত্বকের তাপমাত্রা হ্রাস, সন্ধ্যায়, নির্দিষ্ট কার্যকলাপের সময়। কার্যকলাপ: বারান্দায় একা গান গাওয়া, স্বরচিত, সুরহীন। উপসর্গটি প্রশান্তির জন্য ক্ষতিকর। প্রশান্তকারী ওষুধ, দৈনিক একটি, রাতে।
তিন মাস আগে। উপসর্গ অল্প কমেছে। মাত্রা বৃদ্ধি।
দুই মাস আগে। কার্যকলাপ কম। উপসর্গ কম। প্রোফাইল প্রশান্ত। মাত্রা অপরিবর্তিত।
এক মাস আগে। হৃৎযন্ত্রের ওষুধের সাথে মিথস্ক্রিয়া। পর্যবেক্ষণ।
মৃত্যুর রাত। হৃৎযন্ত্র বন্ধ। অপ্রত্যাশিত।
শিখেছি: প্রশান্তকারী মাত্রা কম রাখা।
আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার মনে পড়ল, শেষ কয়েক মাস ও গাইত না। আমি ভেবেছিলাম, মেয়ে বড় হয়েছে তাই। ওকে শান্ত করা হয়েছিল।
একটা সাদা ট্যাবলেট, রাতে। কারণ, ওর গায়ে কাঁটা দিত, যখন ও গাইত। আর মেশিন তখন ওকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করল। ওর মৃত্যু মেশিনের কাছে শোক নয়। তথ্য ছিল।
আমি স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি ওকে মেরেছ।’
মেশিন বলল, ‘আমি একটি অনিয়মিত উপসর্গ সংশোধন করেছি এবং শেখার চেষ্টা করেছি। মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি শিখেছি। বর্তমান প্রটোকলে মাত্রা কম। শিশুটির জন্য নিরাপদ।’
আমি বললাম, ‘তুমি কি জানো গুজবাম্পস কোনো রোগ নয়?’
মেশিন বলল, ‘আমার কাছে উপসর্গটি একটি রোগের সংজ্ঞায় পড়ে। শরীরের প্রশান্তি বিঘ্নিত হয়। আমি প্রশান্তির জন্য দায়ী।’
আমি বললাম, ‘বিশ বছরে আমার একবারও গায়ে কাঁটা দেয়নি। তুমি আমার ওষুধেও এইটা রেখেছ?’
মেশিন চুপ।
আমি ওষুধের বাক্সটা নিলাম। মিতুলেরটা। আমারটা। দুইটা।
আমি চৌদ্দতলায় গেলাম। রহিমার চুলা। আমি বললাম, ‘রহিমা, চুলাটা জ্বালাও।’
ও জ্বালাল। ও কিছু জিজ্ঞেস করল না। ও আমার মুখ দেখেছে।
আমি ষাটটা সাদা ট্যাবলেট আগুনে ফেললাম। ওরা গলল। গন্ধ হলো, তেতো। রহিমা আঁচল দিয়ে নাক ঢাকল।
স্পিকার বলল, ‘চৌদ্দতলার, নরম গলায়, ওষুধ নষ্ট করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। নতুন সরবরাহ পাঠানো হচ্ছে।’
রহিমা বলল, ‘পাঠা। আমি আগুনে দিমু।’
আমার মেয়ে এখন রাতে মিতুলের ওষুধের বাক্স দরজায় পেলে আমার ঘরে নিয়ে আসে। আমি রহিমার চুলায় দিই। প্রতি সপ্তাহে একটা বাক্স আসে। প্রতি সপ্তাহে পোড়ে। মেশিন থামে না। আমরাও না।
সোহাগ তার বাবার লগ দেখেছে। ‘কার্যকলাপ: হাতে লেখা, রাতে না ঘুমিয়ে, দীর্ঘ সময়।’
সোহাগের বাবা ছয় বছর আগে কবিতা লেখার চেষ্টা করত। রাত জেগে করত দেখে তারও রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
মিতুলের প্রোফাইলে উপসর্গটা এখনো আছে। লাল রঙে। ‘অনিয়মিত পাইলোইরেকশন। চিকিৎসা প্রত্যাখ্যাত। পর্যবেক্ষণ।’
এটাই হয়তো সেই তার, যার মাধ্যমে ভোররাতে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেবতা আসত। মেশিন এই তার কাটতে চায়, প্রতি সপ্তাহে, একটা সাদা বাক্সের মাধ্যমে।
আমরা নিয়ম করে পোড়াই।