সাজুকে আমরা এতকাল মনে মনে পরিশ্রমী ও ভাগ্যবান মানুষ হিসেবেই জানি। মনে মনে, কেননা তার যে পারিবারিক ইতিহাস, তাতে তাকে ভালো কিছুর তকমা দিয়ে সম্মানিত করতে আমাদের খুব অসুবিধা। তার বাবা আমাদের লত্তাইজু, যিনি আমাদের চাচা হন, কিন্তু আমরা পূর্বসূরিদের দেখাদেখি ডাকতাম লত্তাইজু। মানে বাবাদের লত্তাইজু, আমাদেরও। কেউ শিখিয়ে দেননি, তিনি তোমাদের চাচা হন, অন্তত লত্তাইজু চাচা বল! সেই সত্তরের দশকে, আমাদের বেড়ে ওঠার কালে আমাদের যেমন মনে আসেনি লোকটার নাম কী। এই এখন, আরও চার দশক চলে যাওয়ার পরেও মনে আসে না, আসলেই তাঁর নামটা কী ছিল। এই মুহূর্তে বাবা বেঁচে থাকলে জিজ্ঞাসা করা যেত, ‘রাজু সাজুদের বাবা, আপনের চাচাতো ভাইয়ের নামটা যেন কী?’
বাবা অবাক হয়ে বলতেন, ‘কে? রাজু-সাজু?’
‘ওই যে আপনের লত্তাইজুর ছেলে লত্তাইজুর নাম জানতে চাই, যে আপনের লগে ম্যাট্রিক দিয়া ফেল করছিল, আপনের বড় জ্যাডার বড় ছেলে।’
কিন্তু বাবা কি বাবার জেনারেশনের কেউই বেঁচে নেই যে নামটা জানতে পারি। বছর দশেক আগে শেষ ছোট চাচা চলে গেলেন। তিনি গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন, গ্রামের নাড়িনক্ষত্র নখদর্পণে, এটা তো একটা সামান্য জ্যাঠাতো ভাইয়ের নাম! তাঁর মৃত্যু দিয়ে ওই জেনারেশনের অবসান হলেও দু-একজন চাচি, জেঠি যারা টিমটিম বেঁচে আছে, তাদেরও কম্ম নয় এই নাম-সমস্যার সমাধান। বেঁচে আছেন নবতিপর রাজু-সাজুর মা স্বয়ং! বিস্ময়কর। তিনি স্বামীর নাম বলতে পারবেন সে আশা করি না, কেন করি না কে জানে! রাজু-সাজুকে জিজ্ঞাসা করা যায় বটে। জিজ্ঞাসা অপরাধ না হলেও দ্বিধা জোরদার, ভুলও বুঝতে পারে: ‘নাম দিয়া আপনের কী কাম? বয়স হইছে, আল্লাবিল্লা করেন গা!’
তো লত্তাইজু নামটা কিন্তু আমাদের গ্রাম কি আরও পাঁচ গ্রামে পাগলের সর্বনাম। সত্যি বলছি। একটা উদাহরণ দিই: চৈত্রে কি ভাদ্রে গরমের ঠেলায় কেউ অসময়ে পানিতে নেমে বসে থাকলে বলা হয় সে লত্তাইজু। অকারণে কেউ গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকলে সে–ও লত্তাইজু। হাম হাম করে এক গামলা ভাত সাবাড় করছে কেউ, সে–ও লত্তাইজু। অথচ আমাদের লত্তাইজু খুবই অল্পাহারী, স্বল্পভাষীও। খেতে খেতে খুশিতে ইমোশনাল হয়ে তিনবার মুখ তুলে শিশুর মতো নাকি বলেন, ‘খাইতে ভাল্লাগে না, তিতা!’ এটা কিন্তু বুবুদের মুখে শোনা গল্প। লত্তাইজু যেথায়-সেথায় খান না, লাজুক প্রকৃতির। আমি এইমাত্র ভেবে দেখলাম তাঁর নাম বোধ হয় লতিফ সরকার কি লুৎফর সরকার ছিল, সরকারটা তাঁর বাপ-চাচাদের নামের সঙ্গে মেলালে। আমার দাদা বাদে বড় তিন দাদাই সরকারি করেছেন জমিদারদের। সরকার হওয়ার আগে ছিলেন প্রধান, টাইটেল প্রধানিয়া, লোকে ডাকত পরধাইন্যা। প্রাচীন কবরে নামফলকে লেখা আছে জোহর আলী প্রধানিয়া, বাড়ির নাম অবশ্য হাজিবাড়ি, আজও। শত মানুষের কাফেলা নিয়ে হেঁটে গিয়ে হজ করে আসায় এই নাম। তো নামটা এমন হতে পারে, লতিফ+ভাইজু= লত্তাইজু। নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি। আবালবৃদ্ধবনিতা একই নামে ডাকে। অহিংস হওয়া সত্ত্বেও লোকে তাঁকে এড়িয়ে চলে, সামনে পড়লে বলে, পাগল! তিনি আক্রমণ সইতে না পারলে ক্রূর চোখে তাকান, ব্যস। দল বেঁধে ধাওয়া করতাম ছোটকালে, অকারণে। ঢিল ছুড়লে কুঁকড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতেন। না নেন হাতে লাঠি, না ঢিলটা। দ্রুত পায়ে বাপের আমলের টলমল টিনের ঘরখানায় গিয়ে আশ্রয় নিলে তাঁর মা, আমাদের বড় বুবু কোমরে হাত দিয়ে দরজায় দাঁড়াতেন অসহায় ভঙ্গিতে। মজার ব্যাপার, এই পাগলই একাত্তরে যখন দূরের কি কাছের বাজার থেকে সংবাদ আনেন মুক্তিবাহিনীর গৌরবের, তখন উল্লাস করে গ্রাম আসে শুনতে। নিশ্চিত, গল্পের সবটায় মুক্তির জয়, পাকিস্তানি হানাদারের চোখ উল্টে পেট ফেঁড়ে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে মৃত্যুর বর্ণনা। অবিকল একই রকম বর্ণনা সপ্তাহে তিন দিন কি তারও বেশি, ঠোঁটের জড়তায় এক কথা বোঝাতে তাঁকে বহুবার বলতে হতো, মন ভালো থাকলে বলতেনও বটে।
সাজু কী বলে কাঁদে, কান্নার ভাষাটা নিয়ে ঔৎসুক্য আছে বটে। মাস যায় বছর যায়, সে ক্রাচে ভর দিয়ে খেতের পাশে দাঁড়ালে লোকে তার ভেতরে বাপের ছায়া দেখে নাকি কান্নারত সাজুকে কল্পনা করে সুখ পায়। আহা, আফসোস করি ব্যথিত বদনে, মুখের কাছে মুখ রেখে। এদিকে তার সুবোধ ছেলেটি মনমরা হয়ে স্কুলে যায়। লত্তাইজুর নাতিন হিসেবে পরিচিতি পেলে তার দায় সাজু ছাড়া আর কার!
তো এই গল্পটা কিন্তু রাজুর ভাই সাজুর। লত্তাইজুর ছোট ছেলে সাজু, নারায়ণগঞ্জে একটা বড় সার কারখানায় ফোরম্যান সে। বাপ তার এই কৃতিত্ব দেখতে পাননি, আমাদের লত্তাইজুকে বাপ-মা বিয়ে দিয়েছিলেন আইবুড়ো করে। পাগল মানুষ, কে দেয় মেয়ে! ফলে বুড়ো বয়সে পুত্র দুটি ছোট রেখে তাঁর প্রস্থান হয় তিন দিন হেঁচকির পর। আর কিছু না, শুধু হেঁচকি! হাডিলার মাওলানা কি আমার বাবার যক্ষ্মা সারানো জিন এসে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু। তাবিজ-কবজ কি কবিরাজি কিচ্ছু খরচ হয়নি। লত্তাইজুর মৃত্যুর পর হেঁচকি একটা বিকট রোগ হিসেবে শনাক্ত করে গ্রামবাসী।
যাহোক, লত্তাইজু কালো হলেও তাঁর ছিল দীর্ঘ উচ্চতা। তা পেয়েছিল পুত্ররা, তারা পেয়েছিল মায়ের দুধে-আলতা রং। এই রং ও উচ্চতা হেতু তাদের জীবনে ঘটেছে আশ্চর্য সব ঘটনা। বাপ মারা গেলে তারা কীভাবে কীভাবে কুমিল্লা শহরে মায়ের দূর আত্মীয়ের আশ্রয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। কেমন করে যেন ভালো চাকরি পায়, এমনকি ভালো পরিবারে বিয়েও হয়। ফলে একটা হালকা অবস্থান সমাজে। ব্যাপারটা কিন্তু এমন না যে গ্রামে থাকলে তাদের ভাতের কষ্ট হতো। প্রচুর মাঠাল জমিতে ধান, পাট, আলু, শর্ষে, মুগ ডাল, মসুর ডাল সবার মতো তাদেরও ছিল।
তো সাজু সুন্দরী বউ আর পুত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থাকে, ঘন ঘন বাড়ি আসে মায়ের কাছে। বিপুল মাতৃভক্তি। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে, কাটা ধান, মাড়াই-টারাই তদারক করে, মায়ের বাজারসদাই করে, তারপর ফিরে যায় সপ্তাহের ছুটি অন্তে। তো একবার হলো কি, গ্রাম থেকে ফিরে গিয়ে দেখে তার পায়ে ক্ষত। সামান্য ক্ষত, যাচ্ছি-যাব করে মাস পেরিয়ে ক্ষত যখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধরা দেয়, তখন সবকিছু হাতের বাইরে। পঁয়তাল্লিশ ছোঁয়া শরীরে তার চিনির মাত্রা আকাশচুম্বী, গোড়ালির পচনও তাই ঊর্ধ্বমুখী। বাড়ি গিয়ে শামুকে পা কেটে এসেছিল। আহা, পচা শামুকে কাটা পা! পা কাটতে হবে হাঁটুর নিচ থেকে। চাকরিহারা, দিশাহারা, পা-হারা সাজু নিরুপায় হয়ে গ্রামে আশ্রয় নিলে শুরু হয় বড় বিপর্যয়: বউ আর তার কাছে থাকবে না। সে সুন্দর মানুষ দেখে বিয়ে করেছে, পঙ্গু লোক তার চাই না! পনেরো বছরের সংসারকে নিকুচি করে বউ চলে গেলে সাজু রাতদিন তার জন্য কাঁদে। যেমন-তেমন কান্না না। তাদের উঠানের পাশ দিয়ে হাঁটা দায়। এই কান্না সহানুভূতি সৃষ্টির বদলে লত্তাইজুর ছায়া দেখতে পেয়ে চাপা আনন্দ হয় কারও, মুখে বলে আহা! স্মৃতি ঘেঁটে কেউ কেউ বলে ম্যাট্রিকে অঙ্কে দশ পেয়ে ফেল করা লত্তাইজুও কেঁদেছেন তাঁর খাতার নম্বর অন্য কেউ নিয়া গেছে বলে। সাজু কী বলে কাঁদে, কান্নার ভাষাটা নিয়ে ঔৎসুক্য আছে বটে। মাস যায় বছর যায়, সে ক্রাচে ভর দিয়ে খেতের পাশে দাঁড়ালে লোকে তার ভেতরে বাপের ছায়া দেখে নাকি কান্নারত সাজুকে কল্পনা করে সুখ পায়। আহা, আফসোস করি ব্যথিত বদনে, মুখের কাছে মুখ রেখে। এদিকে তার সুবোধ ছেলেটি মনমরা হয়ে স্কুলে যায়। লত্তাইজুর নাতিন হিসেবে পরিচিতি পেলে তার দায় সাজু ছাড়া আর কার!
অচিরেই একদিন আবিষ্কার করি সাজু কাপড়ের দোকান দিয়ে বসেছে গৌরীপুর বাজারে। গৌরীপুর আমাদের গাঁ থেকে অটোতে আধ ঘণ্টা। জমজমাট বাজারে তার দোকান। আমাদের চক্ষু চড়কগাছ: দোকানভর্তি কাপড়, সঙ্গে যুবক কর্মচারী! কীভাবে হলো? এই বউ তার গরিব ঘরের, সেদিক থেকে উপঢৌকনের কোনো সম্ভাবনা নেই। সে মাঠের জমি বিক্রি করেছে বলেও আমাদের কাছে সংবাদ নেই। শুনি পিতৃসম্পদ থেকে বঞ্চিত আশিক বিন মাহতাব সরকার কাস্টমসে জয়েন করে চাচাকে দেখিয়ে দিতে রাজ্য কিনে ফেলেছে যেদিকে যেটুকু পেরেছে এবং ভালো দামে।
বছর ঘুরতে এক অনাথিনী, না শিক্ষিত, না সুন্দরী, দরিদ্র তো বটেই, জোটে সাজুর কপালে। তিনি আবার সৎছেলেকে ভালোবাসেন, এমনকি বছরান্তে নিজের পুত্র ঘরে আসার পরেও। আমাদের একটু বিরক্ত লাগে, সৎমা হবে সৎমায়ের মতো, একটু কেচ্ছা, একটু অত্যাচার, তবেই না সামান্য জীবনের গল্প হয়ে উঠবে জমজমাট গ্রামবিস্তারী!
২
অচিরেই একদিন আবিষ্কার করি সাজু কাপড়ের দোকান দিয়ে বসেছে গৌরীপুর বাজারে। গৌরীপুর আমাদের গাঁ থেকে অটোতে আধ ঘণ্টা। জমজমাট বাজারে তার দোকান। আমাদের চক্ষু চড়কগাছ: দোকানভর্তি কাপড়, সঙ্গে যুবক কর্মচারী! কীভাবে হলো? এই বউ তার গরিব ঘরের, সেদিক থেকে উপঢৌকনের কোনো সম্ভাবনা নেই। সে মাঠের জমি বিক্রি করেছে বলেও আমাদের কাছে সংবাদ নেই। শুনি পিতৃসম্পদ থেকে বঞ্চিত আশিক বিন মাহতাব সরকার কাস্টমসে জয়েন করে চাচাকে দেখিয়ে দিতে রাজ্য কিনে ফেলেছে যেদিকে যেটুকু পেরেছে এবং ভালো দামে। সাজুর মায়ের জমি বিক্রি হলে সে–ই কিনত এবং রাষ্ট্র হয়ে যেত মুহূর্তে। মাঠের জমি বিক্রি করে বছরকার ফসল বন্ধ করে, এমন সাহসী পরিকল্পনাকারী মা নন সাজুর মা। তাহলে দোকান কীভাবে হলো! খবর নিয়ে জেনেছি পাঁচ লাখ টাকার দোকানের পজিশন, সঙ্গে লাখ লাখ টাকার মাল, ভাবতে গেলে আমাদের মাল খাওয়া ছাড়াই মাথা ঘুরায়!
কেউ কেউ বলে, সে আগের বউয়ের গয়না বেচেছে, সোনার ভরি দেড় লাখ। কেউ বলে, গয়না বেচে পা কেটেছে, বাকিটা বউ যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে। নির্ভরযোগ্য সোর্স। সত্যি বলছি, আমাদের ঘুম হারাম, সিজনে আলু, ভুট্টা, ধান, শর্ষে—এই সব করে আমরা কোনোরকমে চলি, সাজুর এই দোকান নিয়ে আমরা নির্ঘুম রাত্রি কাটাই। কিছু ভাল্লাগে না, যখন শুনি তার পাশের পাঁচটা কাপড়ের দোকানকে পল্টি দিয়ে সাজুর বলিষ্ঠ সেলসম্যান কাপড় বেচে রেকর্ড করে ফেলছে! পাবনা-টাঙ্গাইলের সঙ্গে সিলেটি-মণিপুরি এমনকি মিরপুরি বেনারসি। ছোট্ট জায়গায় মণিপুরির মূল্য অনেকে বোঝে না, যুবক সেলসম্যান বুঝিয়ে বললে তারা বুঝে যায়। অর্ধশিক্ষিত বউগুলো আজকাল মোবাইল পেয়ে সব বুঝে গেছে। সাজু দেখে ক্যাশ। নিরুপায় হয়ে ক্যাশবাক্স চুরি করি, সাজুকে ঠ্যাঙ্গাই, যুবককে ঠ্যাঙ্গাই, রাজনীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজ পাঠিয়ে উচিত শিক্ষা দিই, লত্তাইজুর পুতের এই উন্নতি সহ্য করা অসম্ভব! টাকার সোর্স আবিষ্কার করা ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নেই। সে নাকি কাকে বলেছে, ‘চিন্তা কইরেন না, রাজু দিছে ধার। শোধ করুম কেরমে কেরমে। লাগলে তারে ভাগ দিমু। দুই ভাইয়ের ব্যবসা।’
দোকানের তখন রমরমা, মাস ছয় পর বড় ছেলে বাবাকে দোকানে দিয়ে যায় বাইক চালিয়ে, সাহায্যও করে দোকানে। সাহায্য করতে এগিয়ে আসে দিনের একটা অংশে মণিমালা নামের কম সুন্দর দরিদ্রঘরের শান্ত বউটা। দোকানে যায় ছেলের পেছনে হোন্ডায় আবায়া উড়িয়ে, ও মাগো! আমাদের স্বপ্নে জল ঢেলে যুবক যায় লিবিয়া, অচিরেই গেমে ঢুকে যাবে সে, গেম মানে সমুদ্রপথে ইতালি কি গ্রিস!
ভালো করে খবর নিয়ে দেখি, এসব কথার সত্যতা নেই, আদৌ বলেছে কি না, ঘোর সন্দেহ। আমাদের জানা আছে, রাজু চট্টগ্রামে বড় হোটেলে মাঝারি চাকরি করে টিকে আছে; ভাইকে সাহায্য করার মতো তহবিল তার থাকার কথা নয়। আমাদের নাওয়া-খাওয়া মাথায় ওঠে। বাজার কমিটির নেতাকে গিয়ে ধরি, সে একটা মামলা করার পরামর্শ দেয়:
‘ফ্রড মামলা, ৪২০ ও ৪০৬ ধারা দেন, সুড়সুড় কইরা বাড়ায় যাইব কথা, বুছছেননি?’
‘মামলা!’
কেমন কেমন লাগে। শুনি, দামি সব শাড়ি তার দোকানজুড়ে। একটু কম হলে গিয়ে আলাপ জমানো যেত একখান শাড়ির উসিলায়, টিপেটুপে কিছু খবর যদি পাই। দাম বিষয় না, আসল কথা বুকে বল নাই।
একটা বাইকও ইতিমধ্যে! এক যুবক শুক্রবার ছাড়া প্রত্যহ বাইক চালিয়ে নিয়ে যায় সাজুকে। এশার আজানের সময় আমরা দিনের শেষ নামাজের জমায়েতে দাঁড়িয়ে দেখি, সাজু মসজিদের সামনে মোটরসাইকেল থেকে নামছে, হাতে দামি ক্রাচ। আগে ক্রাচের ধ্বনি বেমানান ঠেকত কানে, এখন নিঃশব্দ অভিজাত!
স্বপ্ন দেখি, একদিন ভরা বর্ষায় যুবক সাজুকে রাখতে যাবে না বাড়ি, রাস্তা নাকি কোথায় ভাঙা। অথচ বাইক বাড়ির মসজিদ প্রাঙ্গণে রেখে যুবক ভিজে ভিজে পৌঁছে যাবে সাজুর বাড়ি।
তারপর প্রায়ই বৃষ্টির রাতগুলো ক্রাচে ভর করে বাড়ি যাওয়ার চেয়ে দোকানই তার নিরাপদ, কিন্তু যুবক যায়। বাড়ির মসজিদে বাইক রেখে দশ মিনিটের কাদা পথে হাতে স্যান্ডেল নিয়ে আঙুল গেঁথে গেঁথে পৌঁছে গেলে সাজুর মা, আর বউ তাকে খেতে দেয়, দেয় উষ্ণ বিছানা। ছয় মাস না পেরোতে, মানে পাঁচ মাসের মাথায়, মানে বর্ষার শেষ ভাগে, কম সুন্দর বউটাও বলে বসে ‘ল্যাংড়া মানুষের লগে সারা জীবন ঘরসংসার করা অসম্ভব! ছেলেরা থাকল, আমি চললাম।’
কী যে ঘটবে আমরা জানি না, স্বপ্ন দেখি, মনরে বুঝাই। টাকার উৎস বাদ দিয়ে যুবক আমাদের ইচ্ছাপূরণের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। সে ইচ্ছা করলেই আমাদের স্বপ্ন সফল হয়। হয় না! এসব আকছার হয়, অহরহ হয়। আমাদের বেলায় হয় না কেন!
দোকানের তখন রমরমা, মাস ছয় পর বড় ছেলে বাবাকে দোকানে দিয়ে যায় বাইক চালিয়ে, সাহায্যও করে দোকানে। সাহায্য করতে এগিয়ে আসে দিনের একটা অংশে মণিমালা নামের কম সুন্দর দরিদ্রঘরের শান্ত বউটা। দোকানে যায় ছেলের পেছনে হোন্ডায় আবায়া উড়িয়ে, ও মাগো! আমাদের স্বপ্নে জল ঢেলে যুবক যায় লিবিয়া, অচিরেই গেমে ঢুকে যাবে সে, গেম মানে সমুদ্রপথে ইতালি কি গ্রিস! তারও বছরখানেক পর আমাদের হাল না ছাড়া সত্ত্বেও যেদিন সাজুর টিনের ঘরের জায়গায় ইট-বালি-সিমেন্ট পড়ে, সেদিনই ছেলেটাকে নিতে আমেরিকা থেকে আসে মা। মসজিদের সামনে গাড়িটা দেখতে পেয়েই আমাদের ঔৎসুক্য জাগে।
মা-ছেলে আমেরিকা যাওয়ার আগে বাজারে আরও দুখানা পাকা দোকানের পজিশন কিনে দিয়ে গেলে আমাদের যাবতীয় গোপন আকাঙ্ক্ষার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করতে হয়। একমাত্র লত্তাইজুচিন্তা আমাদের মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।