লুতুর বেড়াল

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

‘অতি দর্পে হতা লঙ্কা’ শুনে আসা এই কলিযুগের বঙ্গদেশে লঙ্কা হরণের বদলে এখন ‘ভিউ’ হরণের মহোৎসব চলছে। এই আয়োজনে সর্বসমক্ষে যাকে পাওয়া যায়, তিনি আমাদের গল্পের নায়িকা লুৎফুন্নিসা ওরফে লুতু। তার লক্ষ্য মোক্ষলাভ নয়; বরং জেন-জির টিকটক সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হওয়া। বয়স মধ্য তিরিশের হলেও লুতুর সাজগোজ দেখলে ইস্ট ইন্ডিয়া যুগের খাস লর্ড সাহেবও ভিরমি খেতেন। রিং লাইটের আলোয় তার মুখের পাউডার যখন শরতের মেঘের মতো ভেসে বেড়ায়, তখন সে আর সাধারণ গৃহস্থ ঘরের কন্যা, জায়া, জননী কিংবা পৌরাণিক মেনকা, রম্ভা, উর্বশী থাকতে চান না, হয়ে উঠতে চান ‘ক্রেজি, হট, প্রিন্সেস’ সিলসিলা। কিন্তু হায়, কপাল মন্দ! হাজারো ছলাকলা, ওষ্ঠ সঞ্চালন আর চোখের পল্লবে কৃত্রিম ঝটকা দিয়েও যখন ভিউ ওই কয়েক ডজন পাড়াতো বখাটের লাইকেই থমকে রইল, তখন লুতুর মনে যে বিরহ উথলে উঠল, তা কালিদাসের যক্ষের বেদনাকেও হার মানায়। ঠিক তখন কেবল পাড়ার দোকানে বাজতে থাকা ‘না জানি কহি ক্যাসি হে এ জিন্দেগানি’ গানটাই প্রযোজ্য হয়ে ওঠে লুতুর জন্য।

সংসারের কাজ বলতে লুতুর আছে কেবল ‘পোস্ট’ আর ‘ক্যাপশন’ মারা। তার স্বামী কাইয়ুম সাহেব ব্যাংকের খাতায় অঙ্ক মেলাতে মেলাতে যখন বিধ্বস্ত হয়ে ফেরেন, তখন আশা করেন এক কাপ তপ্ত চায়ের। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে দেখেন, গিন্নি মুঠোফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরার সামনে কোনো এক ফরাসি পরির মতো লাস্যময়ী, হাস্যময়ী। এদিকে তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান রাফি, যে ইংরেজিতে ফেল করতে করতে প্রায় বিশ্ব রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, সে পড়ে থাকে ঘরের কোণে এক জরাজীর্ণ বালিশের মতো। লুৎফুন্নিসা দেবীর তাতে খেদ নেই, তার ধ্যান-জ্ঞান কেবলই ডিজিটাল ‘অ্যালগরিদম’। কী করে ভিউ বাড়বে এই ভিন্ন তার কোনো জগৎ নাই। নাই সংসার।

ছাইরঙা, আধমরা এক লোমশ শিশু বেড়াল। সাধারণ মানুষ হলে হয়তো ডাস্টবিন ভেবে এড়িয়ে যেত, কিন্তু লুতুর জহুরি চোখ। সে দেখতে পায় এই শাবককে ঘিরে তার অপার সম্ভাবনা, অজস্র ‘কনটেন্ট’। বেড়ালখানা তুলে নেয় দুই আঙুলের ডগা।

এরূপ দিনাতিপাতে একদিন পথে এক মার্জার-শাবকের সঙ্গে লুতুর মোলাকাত হয়। ছাইরঙা, আধমরা এক লোমশ শিশু বেড়াল। সাধারণ মানুষ হলে হয়তো ডাস্টবিন ভেবে এড়িয়ে যেত, কিন্তু লুতুর জহুরি চোখ। সে দেখতে পায় এই শাবককে ঘিরে তার অপার সম্ভাবনা, অজস্র ‘কনটেন্ট’। বেড়ালখানা তুলে নেয় দুই আঙুলের ডগায়, ফিসফিসিয়ে তাকে শুধায়, ‘ওহে মার্জার-শাবক, তুমিই হবে আমার চেলচেলিয়ে বৈতরণি পার হওয়ার একমাত্র মাস্তুল, তরি, নৌকা।’ বেড়ালটার নাম রাখা হয় ‘কিউটি’। লুতু ভেবে রাখে ওর জন্য একটা পেয়ার খুঁজে আনবে, নাম রাখবে তার ‘বিউটি’। ছেলে হলেও এই নামই ফিক্সড। ব্যস, শুরু হয় লুতুর জীবনের নতুন মার্জার-লীলা পর্ব। সকালেই লুৎফুন্নিসা তার টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রথম ভিডিও ছাড়ে। তবে এবার সে একা নয়, কোলে সেই দুস্থ শিশু বেড়াল। ভিডিওর ক্যাপশন দেয়: ‘আমার একাকী জীবনের একমাত্র সাথি, আমার রাজকন্যা কিউটি! জন্মের পর চোখ খুলে সে আমাকেই দেখেছে আমিই তার প্রিয়টি।’ ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে জুড়ে দেয় করুণ এক সুর। ‘এক পা এক পা করে এগিয়ে এসেছে ঘরে ছোট্ট এক পরি।’ লুৎফুন্নিসা বেড়ালটার কপালে চুমু খায় আর চোখে গ্লিসারিন দিয়ে জল মুছছেন। ব্যস! ম্যাজিকের মতো কাজ হতে শুরু হয়। দুই ঘণ্টার মধ্যে ভিউ ছাড়িয়ে যায় দশ হাজার। কমেন্টে একে একে ভেসে আসে: ‘আপু আপনার মনটা আপনার শরীরের চেয়ে বড়,’ ‘আপনি মানবতার ফেরিওয়ালা,’ ‘মাদার তেরেসার বোন আন্টি থেরেসা আপনি,’ ‘বেড়ালটা ঠিক আপনার মতোই কিউট।’

লুৎফুন্নিসা বুঝে যায়, তলোয়ার দিয়ে যা হয়নি, এবার এই বেড়ালের লেজ দিয়ে হবে। এর আগে সে সংসার ভাঙার নাটক করেছে, পুত্র হারানোর শোক করেছে কোনোটাই হিট করেনি। স্বামী-পুত্রের হাবাগোবা চেহারাই হয়তো এ জন্য দায়ী। ভিডিওর দুনিয়ায় ‘কিউটি’ তার পাশার দান। এখন কেবল শকুনি হয়ে উঠতে পারলেই হলো। লুৎফুন্নিসা উপর্যুপরি বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে গ্লিসারিনের মহিমায় এমন সব আবেগমথিত কনটেন্ট বানায় যে টিকটক ভিউয়ারদের হৃদয় বিগলিত হয়ে গঙ্গা-যমুনা বইতে থাকে। কমেন্ট আসতে থাকে স্রোতের মতো। লুৎফুন্নিসা একটু হাঁপ ছাড়তে পারে না কেবল উল্লসিত হয়ে পড়তে থাকে সেসব মধুবাক্যে। যাক অবশেষে পাওয়া গেল ভাইরালিটির আসল মহৌষধ।

এরপর লুৎফুন্নিসার জীবনে যা শুরু হয়, তাকে আর যা-ই হোক সাধারণ জীবনপ্রবাহে আখ্যায়িত করা চলে না। লুতু বিবি একদিন কিউটির জন্য মহা আড়ম্বরে পিৎজা আর বার্গার বানাতে বসে, সে কি এলাহি জোগাড়যন্ত্র! ময়দা মেখে, চিজের পাহাড় ছেনে বেড়ালের ভোজ সাজায়, ওপরে টপিং হিসেবে দেয় দামি টুনা মাছ। পাশে রাখা ছোট এক বাটি মেয়নেজ। এসব দেখেশুনে লুৎফুন্নিসার স্বামী বেচারা চিৎকার করে ওঠে, ‘লুৎফুন্নিসা! রাত নয়টা বাজে, অফিস থেকে ফিরেও চা পাইনি। ডিনারে কি দুটো ভাত জুটবে? পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।’

‘দৌড়াক না হয় হাঁটুক, দেখছ না কাজে আছি!’

‘হ্যাঁ তুমি বানাচ্ছ বেড়ালের পিৎজা, সঙ্গে দিচ্ছ মেয়নেজ!’

লুৎফুন্নিসা ভ্রু কুঁচকে মুঠোফোনের ক্যামেরা সেট করতে করতে বলে, ‘আহ জানো না তো! ফ্যানরা দেখতে চেয়েছে কিউটি ডিনারে কী খায়। লুতুর কিউটি কি সাধারণ ভাতের ফ্যান খাবে? ও তো এখন সেলিব্রিটি!’

লুৎফুন্নিসা বুঝে যায়, তলোয়ার দিয়ে যা হয়নি, এবার এই বেড়ালের লেজ দিয়ে হবে। এর আগে সে সংসার ভাঙার নাটক করেছে, পুত্র হারানোর শোক করেছে কোনোটাই হিট করেনি। স্বামী-পুত্রের হাবাগোবা চেহারাই হয়তো এ জন্য দায়ী।

সেই রাতে কাইয়ুম সাহেব আর রাফি বিস্কুট খেয়ে ঘুমালেন, তার মনে পড়ে, একবার লুতু তাকে তিন শ ফিটে হাঁস রান্নার প্রস্তাব দিয়েছিল। পারলার থেকে সেজেগুজে স্মার্ট লুকে টুকটাক ইংরেজি বলতে বলতে নেইলপলিশ দেওয়া নখে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে লুতু হাঁসের লোম বাছবে আর কাইয়ুম সাহেব ভিডিও করবেন, লোকজন স্মার্ট রাঁধুনীর হাঁস না খাক, কনটেন্ট ঠিক খাবে। পর্যাপ্ত এনার্জির অভাবে কাইয়ুম সাহেব রাজি হননি। এখন আফসোস হচ্ছে, বেড়ালের চেয়ে হাঁসই মনে হয় উত্তম ছিল, অ্যাটলিস্ট পেটের ক্ষুধায় হাঁস খাদ্য হিসেবে মন্দ নয়। বেড়াল তো যাচ্ছেতাই। তা ছাড়া এর লোমও অনেক! খাওয়ার কথা চিন্তায়ও আনা যায় না। যাক তার এসব ভাবনায় আর কী হবে সবই কর্মফল, এই যে লুতুর কর্মে কিউটির পিৎজা খাওয়ার ভিডিও এখন টিকটকের ট্রেন্ডিংয়ে। এটা তো যেনতেন কর্ম নয়। রীতিমতো অর্থকরী কর্ম।

লুৎফুন্নিসা কিউটির পড়াশোনায়ও রীতিমতো যুদ্ধংদেহী। নিজ পুত্র যখন গন্ডায় গন্ডায় ফেল নিয়ে বাসায় ঢুকছে, তখন সে কিউটিকে চার্ট পেপার ধরিয়ে অক্ষর চেনাতে ব্যস্ত। বিড়ালটা যখন ‘মিউ’ করে হাই তোলে, লুতু তখনই ফোনের স্পিকারে চিৎকার করে বলে, ‘বন্ধুরা, শুনলেন তো? ও ‘এম’ ফর ‘মিউ’ বলেছে! দেখলেন, দেখলেন আমার কিউটি কত্ত ট্যালেন্ট!’ বেড়ালটার এরূপ সফলতায় রাফি ভাবে, জন্মান্তরে সে নিশ্চয়ই ‘লুতুর বেড়াল’ হয়েই জন্মাতে চায়। লুৎফুন্নিসা নামের মায়ের পুত্র নয়।

একদিন লুৎফুন্নিসা ঠিক করলেন কিউটির জন্য ‘হোম স্পা’ ভিডিও করবেন। তিনি নিজের দামি ফেসপ্যাক, শসা আর গোলাপ জল নিয়ে বসলেন। বেড়ালটার মুখে জোর করে শসার টুকরা ধরে রেখে ভিডিও করা শুরু হলো। একদিন শখ হলো তো করল ম্যানিকিউর-পেডিকিউর। সাবান ফেনায় ডুবিয়ে রাখল কিউটির হাত-পা-লেজ কয়েক ঘণ্টা। হুট করে তার সাধ হয় একে বিবাহ দেবে। পাশের বাসার মিসেস জামানের কালাপাহাড়কে করা হয় বর। আংটিবদল পর্বে লুতু বাজার থেকে এক হাত লম্বা একখানা লাল রঙের জর্জেট আনায়। তার সঙ্গে মখমলের লাল ব্লাউজ। বেড়ালটার নাভিশ্বাস ওঠার দশা, কিন্তু লুতু নাছোড়বান্দা। সে ওকে টেবিলের ওপর রেখে ডাকাতের মতো চেপে ধরে শুরু করে ড্রেসিং। প্রথমে বেড়ালের পেটে শক্ত করে সেফটিপিন দিয়ে আটকায় শাড়ি। বেড়াল মিউ করে প্রতিবাদ জানাতেই লুতু বললেন, ‘আহ কিউটি, নড়ো না সোনা! আস্তে আস্তে মিউ করো, যত মিউ তত ভিউ’ কিউটি কথা শোনে না, বেড়াল হয়েও গরুর মতো চেঁচায়। এরপর আসে গয়নার পালা। নিজের এক জোড়া ভারী ঝুমকো দুল কায়দা করে কিউটির কানের ওপর সেট করে। ভার সইতে না পেরে কিউটির মাথা যখন একপাশে হেলে যায় প্রগাঢ় ব্যথায়, লুতু তখন আবার তা টেনে ওঠায় মহা উল্লাসে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে মেকআপে। লুতু তার দামি লাল লিপস্টিক দিয়ে বেড়ালটার ছোট ছোট গোলাপি ঠোঁট রাঙিয়ে দেয়। সে যখন জিব দিয়ে সেটা চাটতে চাইল, লুতু ধমক দিলেন, ‘খবরদার! স্মাজ হয়ে যাবে!’ এরপর চোখের পাতায় আইলাইনার টানার চেষ্টা করতেই কিউটি দেয় লাফ। সর্বশক্তি দিয়ে নখ বের করে মহিষের মতো আঁচড়ায়। কিন্তু লুৎফুন্নিসা দেবী কি কম চালাক। সে বেড়ালটার চার পায়ে শক্ত করে বেঁধে দেয় ঘুঙুর। বলে, ‘নে এবার হাঁট কিউটির বাচ্চা, দেখি কেমন পারিস।’

গলায় ভারী হার, কানে ঝুমকো, পরনে শাড়ি, আর কপালে একটা প্রকাণ্ড টিপ দিয়ে যখন কিউটিকে আংটিবদলে পাঠানো হয়, তখন ঘটে মহানাটক। কিউটি হাঁটতে গেলেই পায়ের নূপুর শাড়ির কুঁচিতে আটকে যায়। সে তিন পা এগোয় তো দুইবার খায় ডিগবাজি। বেড়ালের সেই করুণ আর্তনাদকে লুতু ক্যামেরাবন্দী করে ক্যাপশনে লেখে, ‘দেখুন বন্ধুরা, প্রথমবার শাড়ি পরে আমার কিউটি লজ্জায় কেমন টলোমলো! ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে সাজানজি ঘর আয়ে, দুলহান কিউ শরমায়ে।’

সবশেষে তিন-তিনবার দ্বিপক্ষীয় মিউ বলার পর লাল বেনারসি জড়ানো কিউটি আর জবরজং শেরওয়ানি পরিহিত কালাপাহাড়কে নিয়ে লুতু যখন লাইভে আসে তখন মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই রাজকীয় পরিণয় পর্ব দেখার জন্য। কিন্তু এই অবস্থায় বেড়াল কি আর বেড়ালের ধাতে থাকে? প্রথমেই সে দানবের মতো কালাপাহাড়কে বেশ একচোট কামড়ায়। গোঁ গোঁ শব্দে তুমুল কলহ বাধায়, বেচারা নতুন বর কিছু না বুঝিয়ে শুরু করে দেয় ফিরতি মিউ মিউ বিবাদ। বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ যত বাড়ে দুজনের লড়াই ততই জমে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে লেজ তুলে কালাপাহাড় পালিয়ে যায় পাশের ঘরে। এদিকে স্বামী পেয়ে কিংবা হারিয়ে কিউটির হয়ে যায় উন্মাদ দশা। এমন এক লম্ফ দেয় যে লুৎফুন্নিসার শখের চীনা মাটির ফুলদানিগুলোর ভেঙে হয় খানখান। এখানে-ওখানে কোকাকোলা গড়িয়ে পড়ে, চিপটে যায় রসগোল্লা। দেখলে মনে হবে এই ঘর যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো বাংকার। যেন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ময়দান।

 হুট করে তার সাধ হয় একে বিবাহ দেবে। আংটিবদল পর্বে লুতু বাজার থেকে এক হাত লম্বা একখানা লাল রঙের জর্জেট আনায়। তার সঙ্গে মখমলের লাল ব্লাউজ। বেড়ালটার নাভিশ্বাস ওঠার দশা, কিন্তু লুতু নাছোড়বান্দা।

কিন্তু লুতু তো লুতুই, সে ভাঙা ফুলদানির টুকরা দেখিয়ে লাইভে কাঁদে, ‘দেখেন গাইজ, আমার কিউটির ওপর খারাপ নজর পড়েছে! দুনিয়ায় নজর লাগার মতো বিষাক্ত কিছুই নাই, আমার সুখের দুনিয়া তছনছ করে দিচ্ছে এই নজর আর নজর।’ বেশ কিছু সময় সে টিস্যু নাকে চেপে চেপে কাঁদে আর বলে, ‘দুনিয়ায় আমার কেউ নাই। মা, বাবা, ভাই বোন, স্বামী, সন্তানের সোহাগ কিছুই জোটেনি। মাটির ঘরে বড় হয়েছি, পড়ালেখা করেছি ল্যামপোস্টের আলোয়। আমার জীবনে একমাত্র টিউবলাইটের বাতি এই কিউটি। আমার একমাত্র সুখ, একমাত্র আশ্রয়। অথচ নিন্দুকের খারাপ নজরে আমার সুখের দুনিয়া তছনছ হয়ে যাচ্ছে।’ এই ‘নজরতত্ত্বে’র ভিডিও এক রাতেই লুৎফুন্নিসাকে সেলিব্রিটির চূড়ান্ত শিখরে বসিয়ে দেয়। অন্যদিকে তার মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-সন্তান পরম বিস্ময়ে অনুভব করে তাদের অজ্ঞতা, অন্ধত্ব। কেননা, লুৎফুন্নিসা ঢাকার আগারগাঁওয়ে যে অফিসার্স কোয়াটারে থাকত, সেটা যে মাটির ঘর ছিল তারা কখনোই এর আগে বুঝতেই পারেনি। গভর্নমেন্ট স্কুলে সেকেন্ডারি–হায়ার সেকেন্ডারি মেয়ের সহায়ক ছিল কোন ল্যাম্পপোস্ট, তা-ও তাঁরা অজ্ঞাত। ইলেকট্রিসিটি গেলে যে মেয়ের চার্জার ফ্যান ছাড়া ঘুমই হতো না, তার এত অবর্ণনীয় কষ্টে সবাই পরিমাণমতো আবেগতাড়িত।

লুৎফুন্নিসার কর্ম কিংবা ভাষ্যে তার পরিবার-পরিজনই শুধু বিস্মিত এমন নয়, কিউটি নিজেও হতবাক। সে জানেই না একটা মুহূর্ত পরেই তার ভাগ্যে কী জুটবে। কী সে খাবে, কী সে পরবে। একেক সময় দেখা যায়, ফ্যান-ফলোয়ারের পাঠানো খাবার বা পোশাকের ধাক্কা সইতে না পেরে কিউটির পেট নেমে যায়। গায়ে হয় অ্যালার্জি। কিউটি যতবার পটি করে, গা ঝাঁকায় লুৎফুন্নিসা ততবার ভিডিও করে। লাইভে শেয়ার করে তার নিস্তেজ মুখ। ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে। যত ভিউ তত ডলার। ডলারের চাপে লুৎফুন্নিসার অবস্থা বেতাল। বলতে থাকে বলতেই থাকে, এক কথা অজস্রবার। কোনো কোনো দিন কিউটির অবস্থা বেশি বেগতিক ঠেকলে কাঁচি হাতে লাইভে আসে লুৎফুন্নিসা, সন্ধ্যার মধ্যে কিউটি সুস্থ না হলে সে তার শখের চুল কেটে ফেলবে। এই চুল রেখে কী করবে যদি তার বাচ্চা সুস্থই না থাকে! বেড়ালের অসুস্থতার সঙ্গে চুলের কী সম্পর্ক—এই প্রশ্ন কেউ করে না; বরং এসব কান্নাকাটি পর্ব শেষ হলেই লুৎফুন্নিসা দেখতে পায় কত শত অফার। ‘আপু বিলাই কোলে নিয়া ব্রাইডাল শুট করবেন? রেমুনেশন দিব কিছু, পারলারটার প্রমোশন করে দিয়েন একটু।’ লুৎফুন্নিসা দেয়ও। ঘরে আসে নতুন নতুন পিআর। ড্রেস পাঠায় ওমুক পেজ, তমুক ব্র্যান্ড। কয়েকটা ইভেন্ট শোতেও অংশগ্রহণ করে লুৎফুন্নিসা ও কিউটি। প্রচারেই প্রসার, প্রসারেই ভাইরাল।

অবশেষে যা হওয়ার তা-ই হয়। একটা ইভেন্ট শোয়ের পচা কেক খেয়ে বেড়ালটার দফারফা হয়ে যায়। দু-তিনদিন ঝিমিয়ে তৃতীয় দিনে ফি সাবিলিল্লাহ। বিষয়টা প্রথমে বুঝতেই পারে না লুৎফুন্নিসা। যথারীতি লাইভে এসে শুরু করে নাটক। কিন্তু এত দিনে জনগণের প্রায়োরিটি লিস্টে লুতুর চেয়ে কিউটির অবস্থান শক্ত। ওর কান্নাকাটির লাইভ দেখেই লুৎফুন্নিসার ভাষ্যের একদল ‘কু নজরের লোক’ ক্ষেপে ওঠে। ‘প্রাণী কল্যাণ’ সংগঠনের টিম এসে কিউটির মরদেহ নিয়ে যায়। তাদের রেসকিউ টিমে রাখতে না পারলেও কবর দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে একটু মানবতা দেখানোর সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় না। শুরু হয় লুৎফুন্নিসার নাজেহাল পর্ব। মারমুখী মনোভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আম-জাম-কলা-শসা—সব জনতা। ট্রলের শেষ থাকে না। যারা এত দিন বাহ বাহ করে তাকে আকাশে তুলেছে, এখন তারাই তাকে অতি দ্রুত নামাতে নামতে পাতালে পুঁতে দিতে চায়। প্রাণী নিপীড়নের জন্য লুৎফুন্নিসার কঠোর শাস্তি দাবি করে শাহবাগে আন্দোলনের ডাক দেয় আন্তর্জাতিক ‘সেলিব্রিটি বিলাই সংঘ’। অতি উৎসাহী কেউ কেউ ফাঁসিও চায় লুৎফুন্নিসার। ঘরের জানালায়ও পড়ে ঢিল।

একলা ঘরে নানা দিককার এই সব হিংস্র আক্রমণে লুৎফুন্নিসা হতভম্ব হয়ে যায়। এই প্রথম অসহায় প্রাণীদের মতো নিজেকেও তার অবলাই মনে হয়। কিউটির মতো তারও একটু আশ্রয়ের প্রয়োজন মনে হতে থাকে। অথচ লুতু জানে এখন আর কেউ নেই তার। পাশার দান উল্টে গেছে। কী এক সর্বস্ব হারানোর বোধ ধেয়ে আসতে থাকে লুতুর কাছে। কাকে দেখাবে সে এই অপদার্থতা?

কিউটির আকিকা, খতনা, জন্মদিন, বিয়ের দিনের চাপে ইতিমধ্যে কাইয়ুম তাকে ছেড়েছে অনেক আগেই। ছেলেও হাত ধরেছে বাবার। শুনেছে গ্রামে গিয়ে ভালোই আছে বাপ-ব্যাটা দুজন। কাইয়ুম বড় করে গরুর খামার করেছে।

কিউটির আকিকা, খতনা, জন্মদিন, বিয়ের দিনের চাপে ইতিমধ্যে কাইয়ুম তাকে ছেড়েছে অনেক আগেই। ছেলেও হাত ধরেছে বাবার। শুনেছে গ্রামে গিয়ে ভালোই আছে বাপ-ব্যাটা দুজন। কাইয়ুম বড় করে গরুর খামার করেছে। পুকুর কেটে মাছ ছেড়েছে। ওদের জমিতে নাকি এবার প্রচুর সবজির ফলন। লুৎফুন্নিসা নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে বসে থাকে একা, ঘরের কোথাও রাফির কান্নার আওয়াজ নেই, নেই আবদার করা ঘরের মানুষটার নিঃশব্দ উপস্থিতি। এসিটাও নিঃসার। শীত শেষ হয়েছে বেশ অনেক দিন হলো; কিন্তু তবু লুৎফুন্নিসার ঠান্ডা লাগে। ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে, তাকে আর তার কিউটিকে নিয়ে কনটেন্ট দিচ্ছে কত কে। জ্বলন্ত ক্যাপশন—‘বেড়াল কি প্রদর্শনী বস্তু, খেলনা, মোয়া? ওকে সাধারণ মাছ-ভাত না দিয়ে পিৎজা খাইয়ে, চিজ খাইয়ে ওর লিভার পচিয়ে ফেলেছে, বেড়াল ব্যবসায়ী লুৎফুন্নিসাকে কালাপাহাড়ের ব্রাইডাল, ইভেন্ট শোয়ের প্রতিটা পয়সার পইপই করে হিসাব দিতে হবে। এই সব বেড়াল চোষকদের বিলাইপ্রেমীদের হাত থেকে মুক্তি নাই। নির্মম শাস্তি তার হবেই।’

হঠাৎ লুৎফুন্নিসার খুব হাসি পায়। বুঝতে পারে, এই ডিজিটাল লাইক আর ভিউয়ের ভিড়ে তার মানবিক সত্তার কতই না রুগ্‌ণ দশা ছিল। এত বোকা সে! অথচ এমনটা তো চাইলেই হতো—লুৎফুন্নিসা রান্নাঘরে গিয়ে তেল, নুন মাখিয়ে মাছ ভাজছে, কালাপাহাড় পায়ের কাছে এসে মাথা ঘষছে, রাফি একটু নুডলসের জন্য বায়না করছে আর কাইয়ুম...থাক আর ভাবতে চায় না, বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস নামে। তার তো পড়াশোনা কম ছিল না। চাইলেই একটা দশটা-পাঁচটার চাকরি জুটিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু কী যেন চেয়েছিল সে! যুগের হাওয়ায় ভিড়ের হতে গিয়ে এই নির্জনতায় সদ্য নির্বাসিত লুৎফুন্নিসা হঠাৎই অনেক কিছু দেখতে পায়। দেখতে পায় অতীত, দেখতে পায় ভবিষ্যৎ। দেখতে পায় কতটা পথ হেঁটে হেঁটে নিজেই এসেছে এই খাদে। খাদ না ফাঁদ? এই দ্বিধা নিয়েই একলা ঘরে সে শাওয়ার নেয় অনেকক্ষণ। ছোটবেলায় প্রবল বৃষ্টি হলে দল বেঁধে কলোনির সবাই ভিজত যেমন, তেমন করে। এরপর ধীরে ধীরে চুল শুকায়, সব কয়টা লাইট জ্বেলে দেয়। কাল সকালে রোদ পোহাবে ভাবে, আরাম দেবে শরীরকে। চোখে কাজল পরবে, পরবে শুভ্র সুন্দর শাড়ি। কত দিন বাচ্চাটার সঙ্গে আইসক্রিম খাওয়া হয় না। কাইয়ুমকেও একটা কল দিতে ইচ্ছা হয়, দেবে? না থাক। ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। উনুনে পানি চড়িয়েছিল চা খাবে বলে। বিনা দ্বিধায় ফোনটা গুঁজে দেয়। বন্ধ ঘরের দরজা খুলে আয়োজন করে বাইরে তাকায়। অন্ধকার দেখে ভয় হয় না আর। জানে কিছুক্ষণ পর চাঁদ উঠতেও পারে আবার না-ও পারে। জীবন হয়তো এমনই।