নির্বাণের শহরে বুদ্ধ ও মীরা

অলংকরণ মাসুক হেলাল

প্রভাতের সংলাপ:
ঢাকা শহরের সকালটা অ্যাবসার্ডিটির মতো নিষ্প্রভ পরম্পরাহীন। ছুটে চলা ব্যস্ত মানুষদের চোয়ালের নিচে ঝুলে আছে ধোঁয়ার মতো অস্পৃশ্য নাগরিক ক্লান্তি। কারওয়ান বাজারের রাস্তার ধারে এক নারী বসে আছেন। জীর্ণ নীল শাড়ি পরনে, চুলে ধুলো, হাতে ভাঙা তানপুরা। আর কণ্ঠভরা গান।
‘যে দুটি আঁখি সদা শ্যাম হেরে নয়নে
যে মাথা নুয়ে পড়ে প্রভু প্রেম বয়ানে
এমনি লাগিলো বাঁধন মীরা হইলো মগন।
...
মরেও সে জীব অমর এ পৃথিবীতে
প্রভুর প্রেমে যে জীব জীবন পারে দিতে
অলিতে গলিতে মীরা হরি-গুণ গায়
প্রাসাদে পালিতা রানী যোগী হয়ে যায়।’
রাস্তার লোকজন অদ্ভুত চোখে তাকায় নারীটির দিকে। কেউবা পাগল বলে টিটকিরি দিয়ে যায়। লাল বাস, মোটরসাইকেল, হকারের ডাক, স্কুলগামী কিশোরীর তাড়াহুড়ো, পোস্টারে মোড়া পিলার, ঝুলছে ব্যানার; প্রতিটি ব্যানারের ভাষাই প্রতিহিংসাত্মক। প্রতিটি পোস্টারেই ধর্মোপদেশ। সেসবের ছত্রে ছত্রে শ্রেষ্ঠ ধর্মের কীর্তন ছড়ানো। সেই কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ান মেয়েটির সামনে। সাদা পোশাক, মাথা মুড়ানো, তাঁর মুখে শান্তি, চোখে নরম জ্যোতি, মধ্যদুপুরে পুকুরের জলের মতো শান্ত অচঞ্চল। বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে বহুক্ষণ শোনেন তরুণীর গান।
বৃদ্ধ: তুমি গান করছ, অথচ চারদিকে অস্থির–অসুস্থ কোলাহল।
তরুণী মুখ তুলে তাকালেন, চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি।
তরুণী: আমি গান করি, কারণ কর্কশ কোলাহল আছে। আমি যদি চুপ হই, তবে পৃথিবী সুর হারাবে, অন্ধ ও বধির হবে।
বৃদ্ধ: গানে তুমি কাকে ডাকো, কন্যা?
তরুণী: (চমকে!) ‘যাকে পৃথিবী হারিয়ে ফেলেছে... সেই প্রেমময় কৃষ্ণকে।’
বৃদ্ধ ধীরে বসে পড়লেন তাঁর পাশে।
তাঁদের দুজনের ছায়া পড়ে ওভারব্রিজের পাদদেশজুড়ে। যেন যুগের পর যুগ দূরত্ব পেরিয়ে দুই সত্তা এসে মিলেছে একবিংশ শতাব্দীর নিঃসঙ্গ সকালে।
বৃদ্ধ: আমার নাম সিদ্ধার্থ। অনেকে বুদ্ধ বলে।
তরুণী: আমি মীরা। মীরাবাই।
বুদ্ধ একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
‘তুমি কণ্ঠে গান রাখো, আমি হৃদয়ে নিঃশব্দে ধ্যান রাখি। তুমি প্রেম খোঁজো, আমি মুক্তি খুঁজেছি। তবু দুজনের গন্তব্য এক। দুজনেই আলোর সন্ধানী।’
আলো? মীরা মৃদু হাসে!
মীরা: তুমি কি শুনছ না সারা দেশের স্লোগানের ভাষা? নারীদের জীবন হয়ে উঠেছে অভিশপ্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায়ের নামে উদ্বাস্তুদের শেষ সম্বল কেড়ে নেয় ওরা। কেড়ে নিতে চায় কণ্ঠের গান আর সুর। সকল শিল্পকলা হয় নিষিদ্ধ। আলো? এখানে? এই নগরীতে? এই ভূখণ্ডে?
বুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে চারদিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ধর্ম যদি রাগ শেখায়, ধর্ম যদি ভাগ শেখায়, তবে সে ধর্ম নয়—অসুখ।’
মীরা তানপুরা কোলে নিয়ে ফিসফিস করে বলেন, ‘আমি তো প্রেমের পাগল, হে কৃষ্ণ, ঘৃণার আগুনে পোড়াতে পারবে না কেউ।’

২.
গোধূলির সংলাপ:
বুদ্ধ ও মীরা দুজন নদীর ধারে বসেছেন। গোধূলির আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে পলিথিন। বুড়িগঙ্গার দূষিত জলে ময়লার স্রোত। পাশের এক বস্তি থেকে শিশুর কান্না ভেসে আসে। বুদ্ধ চোখ বন্ধ করেন, মীরা চেয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। তাঁর চোখে কৃষ্ণ নেই, আছে ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি।
মীরা: এই যুগে মানুষ ঈশ্বর বানায়, কিন্তু মানুষকে মানুষ ভাঙে। মন্দিরে ফুল দেয়, মসজিদে দান করে, কিন্তু পাশের ক্ষুধার্তের দিকে তাকায় না।
বুদ্ধ: মানুষ জেগে থেকেও ঘুমিয়ে আছে। তারা আড়ম্বরপূর্ণ প্রার্থনার ভাষা জানে, কিন্তু নীরবতার নয়। তারা ভক্তি শেখে, কিন্তু করুণা শেখে না।

সেই কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ান মেয়েটির সামনে। সাদা পোশাক, মাথা মুড়ানো, তাঁর মুখে শান্তি, চোখে নরম জ্যোতি, মধ্যদুপুরে পুকুরের জলের মতো শান্ত–অচঞ্চল। বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে বহুক্ষণ শোনেন তরুণীর গান।

৩.
আগুনের রাত:
গভীর রাত। চাদরের মতো নিস্তব্ধতা বিছানো শহরজুড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে বুদ্ধ বসে আছেন পদ্মাসনে আর মীরা পাশে বসে গান লিখছেন। হঠাৎ রাজু ভাস্কর্যের দিক থেকে তাঁরা শুনতে পান মিছিলের স্লোগান। আকাশজুড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মানুষের হাতের তৈরি আগুন। সেই আগুনে লালন সাঁইয়ের ভাস্কর্য দাউ দাউ করে পুড়ছে। পাশেই রবীন্দ্রনাথের মুখ কুঁচকে গেছে বীভৎস যন্ত্রণায়। ছাইয়ের গন্ধে মিশে আছে মাটি, কাঠ আর উন্মত্ত ক্রোধ। মীরা বুদ্ধর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন ভাস্কর্য থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে জ্বলছে একটা চায়ের দোকান। দোকানে মুসলিম ও হিন্দু কর্মচারী দুজনেরই পবিত্র কোরআন ও গীতা পুড়ে ছাই। ওরা কাঁদছে। বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে ভাস্কর্য পোড়ানোর আগুনকে ঘিরে অপরিমিত উল্লাসে মত্ত। চারদিকে তখন হট্টগোল। কেউ চিৎকার করছে, কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় আগুনের চিত্র ধারণ করছে। বুদ্ধ ধীরে ধীরে সেই দৃশ্যের দিকে এগোলেন। একটি তরুণের মুখের দিকে তাকালেন; ছেলেটির চোখে ভয়, কিন্তু মুখে বর্বর উল্লাস।
বুদ্ধ নরম স্বরে বললেন,
‘তোমরা ভাস্কর্য পোড়াচ্ছ কেন?’
তরুণটি যেন বুদ্ধর শান্ত স্বরে খানিক বিরক্ত হয়। সে চিৎকার করে বলে,
‘এরা দুজন শাস্ত্রবিরোধী। ওদের পথে আমাদের ধর্ম অপমানিত হয়। আমাদের লোকদের ভক্তির নামে বিপথে নেয় ওরা।’
বুদ্ধ শান্তভাবে বললেন,
‘ধর্ম অপমানিত হয় না, পুত্র। ধর্ম এত ঠুনকো নয়। যে ধর্মকে কথায় কথায় অপমান করা যায়, অপমানের দায়ে যে ধর্ম ক্ষণে ক্ষণে ক্রোধ ছড়ায়, সেটা ধর্ম নয়, সেটা কেবলই অহংকার।’
ছেলেটি ভয়ানক রেগে যায়। বুদ্ধর ওপর ফেটে পড়ে ক্রোধে। ডেকে আনতে যায় সঙ্গী–সাথিদের।
বুদ্ধ: এ কেমন আগুন, মীরা? আমি তো দুঃখের আগুন চিনতাম, কিন্তু এ তো ক্রোধের আগুন।
মীরা নরম স্বরে বললেন,
‘প্রভু, এ আগুন প্রেমের শূন্যতা আর মিথ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার থেকে জন্ম নেয়। যখন মানুষের ভেতর প্রেম থাকে না, তখন সে ভাস্কর্য পোড়ায়। পুঁথিগত ধর্মকে অতিক্রম করে যাওয়া মানবধর্মী লালনকে পুড়িয়ে মানুষ ভাবে, ওরা নিজেই সত্যের রক্ষক। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রদীপকে নিভিয়ে দিতে চায়।’
বুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
‘সাঁইজি ও রবীন্দ্রনাথ যেন সেই ভাগ্যহত রাজপুত্র, এমন প্রদীপ তাঁরা জ্বালিয়েছেন, যা নিভানোর জন্য রাক্ষসের দল শতাব্দী ধরে নানা ছলচাতুরীতে কাজ করে চলেছে। কিন্তু হায়, জ্ঞানের প্রদীপ নেভে না—এই সামান্য খবরটুকু রাক্ষসেরা আগেও যেমন বোঝেনি, এখনো জানে না। সত্যকে মুছে ফেলা যায় না মিথ্যের আগুন দিয়ে। যতবার মুছবে, ততবারই সত্যের ওই পঙ্‌ক্তিমালা আবার কেউনা কেউ লিখবেই। সত্য তো প্রবহমান সেই নদী মীরা, যাকে কেউ বাঁধতে পারে না। ওরা আগুন জ্বালিয়ে কেবল পুড়িয়ে ফেলে নিজেদের বিবেককে।’
মীরা: প্রভু, ওরা ধর্ম কায়েম করতে এসে ধর্মই পুড়িয়ে ফেলল?
বুদ্ধ: অন্ধ উগ্র আগুন কখনো বেছে পোড়ায় না। সে যেমন কাঠ পোড়ায়, তেমন বিশ্বাসও।
মীরা অপলক তাকিয়ে আছেন ধোঁয়ার দিকে। তাঁর চোখে যেন সহস্র যুগের আর্তি।
‘প্রভু, আমি তো বহু বছর আগে স্রষ্টার প্রেমে উন্মত্ত ছিলাম। এখনো আছি। আমি তো এমন ঘৃণার আগুন জ্বালাইনি। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিলাম সে প্রেমের খোঁজে। তুমিও তো রাজপ্রাসাদ ছেড়ে ঈশ্বরের খোঁজেই পথে নেমেছিলে। তুমিও তো এমন করোনি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এ লগ্নে আমি কী দেখছি? আজও মানুষ রাজপ্রাসাদেই বন্দী, তবে সেটা রাজপ্রাসাদ নামক ধর্মীয় শাস্ত্রের বন্দিশালায়। ওদের ভেতর প্রেম নেই, মায়া নেই। ওরা নাম নেয় ঈশ্বরের, কিন্তু হৃদয়ে রাখে ভয়।’
বুদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
‘ভয়! এটাই সব আগুনের উৎস।
ভয় মানুষকে করে সংকীর্ণ, তাকে নিজের সীমার ভেতর আবদ্ধ করে। যখন কেউ ভয় পায় ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন পথ, ভিন্ন মুখ, ভিন্ন গানকে, তখনই সে জ্বালিয়ে দেয় মূর্তি, তখনই সে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় অন্যকে। কিন্তু মূর্তি পোড়ালেই কি চিন্তা পোড়ে, মীরা?’
মীরা কাঁপা গলায় বললেন,
‘না, প্রভু। চিন্তা আগুনে পোড়ে না। আগুনে সে রং বদলায়, কিন্তু থামে না।
রবীন্দ্রনাথের শব্দ এখন ভেসে বেড়ায় বাতাসে,
লালনের সুর মিশে গেছে শিমুল ফুলের গন্ধে।’
দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
কোথাও দূরে এক খ্যাপা ভবঘুরে বাউলের গানের সুর ভেসে আসে—
‘কেউ মালা কেউ তসবিহ গলে/ তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে।/ আসা কিংবা যাওয়ার কালে/ জাতের চিহ্ন রয় কারে।।’
বুদ্ধ ও মীরা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
আকাশে তখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।
বৃষ্টিতে আগুনের শিখা নিভে আসে একটু একটু করে। মাটিতে ছাইয়ের গন্ধ, কিন্তু সেই গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে মাটির তাজা সোঁদা সুবাস। আগুন, ছাই, বৃষ্টি, প্রেম—সব একাকার হয়ে যায়।

বুদ্ধ ও মীরা দুজন নদীর ধারে বসেছেন। গোধূলির আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে পলিথিন। বুড়িগঙ্গার দূষিত জলে ময়লার স্রোত। পাশের এক বস্তি থেকে শিশুর কান্না ভেসে আসে। বুদ্ধ চোখ বন্ধ করেন, মীরা চেয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। তাঁর চোখে কৃষ্ণ নেই, আছে ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি।

৪.
মধ্যরাতের কথা:
আগুন নিভে গিয়েছে, কিন্তু বাতাসে ভেসে আছে এক অনন্ত প্রশ্ন। নগরের ছাদের ওপর দুজন বসে আছেন।
বুদ্ধ ও মীরা নক্ষত্র গুনছেন না, গুনছেন মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন। মীরার চোখে জল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
মীরা: আমি কৃষ্ণর প্রেমে পুড়েছি।
এখন দেখি, এই পৃথিবীও পুড়ছে; তবে প্রেমে নয়, ঘৃণায়।
বুদ্ধ: তুমি আগুনের ভাষা জানো, মীরা।
আমি শিখেছি জলের ভাষা। আগুন পুড়িয়ে শুদ্ধ করে, জল ধুয়ে দেয়। আগুনে পুড়ে সবকিছু ছাই হয়, কিন্তু সেই ছাইয়ে বৃষ্টির জল পড়লে মাটি হয় উর্বর। ওই মাটিতেই জন্ম নেয় নতুন বীজ। মানুষ হয়তো আজ ভাস্কর্য পোড়াচ্ছে, কিন্তু আগামী প্রজন্ম সেই ছাই থেকে খুঁজে নেবে গান। মানুষের প্রয়োজন দুটোই।
মীরা নিঃশব্দে তানপুরা বাজান। তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে একবিন্দু জল, যেন যুগযুগান্তের যন্ত্রণার সারাংশ। তানপুরার সুর তাঁর হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। সমগ্র শহরের মাটি ভিজে যায় সুরের জলে। শহরের আকাশে ছুঁয়ে যায় সে সুর, যেখানে অসংখ্য মৃত শুদ্ধ আত্মা তাদের প্রার্থনা রেখে গেছে পৃথিবীটাকে নির্মল করার জন্য।
মীরা: আমি গান গাইব, প্রভু! আমি গাইব সেই প্রেমের গান, যা কাউকে দগ্ধ করে না। যে গানে লালনের সুর আর রবীন্দ্রনাথের শব্দ মিশে একাকার হয়ে যায়।
বুদ্ধ মাথা নত করে বললেন,
‘গাও, মীরা।
যত দিন কেউ গাইবে,
তত দিন পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকবে।’

৫.
ভোরের পূর্বে:
ভোরের আগে সবচেয়ে বেশি অন্ধকার।
বুদ্ধ তখন ধ্যানমগ্ন, আর মীরা চুপচাপ বসে গান লিখছেন। হঠাৎ কণ্ঠে তুলে নিলেন বাউল সুর, ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান/ জাতি গোত্র নাহি রবে।।/ শোনায়ে লোভের বুলি/ নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি/ ইতর আতরাফ বলি/ দূরে ঠেলে নাহি দেবে।।’
 
তখনই কয়েকজন তরুণ আসে, চোখে বীভৎস রাগ। আজানের আগে গান? আর জাতি–গোত্র থাকবে না, এসব গানের কথা? তারা বলে,
‘আপনারা কারা? কী বলেন এসব? এ দেশে জাতি–গোত্র না থাকার কথা বলেন! এ দেশ চলবে নির্দিষ্ট ধর্মের আইনে। যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলবে, তার কোনো চিহ্ন বা জীবনের শান্তি রাখব না আমরা।’
বুদ্ধ মীরার হয়ে মৃদু হেসে বলেন,
‘শান্তি কারও দলীয় সম্পত্তি নয়।
যার হৃদয়ে করুণা আছে, সেখানেই শান্তি আছে, সেখানেই ধর্ম আছে। ঈশ্বরের নাম নেওয়া যায়, কিন্তু তাঁকে অধিকার করা যায় না। ভক্তি যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ও শাসনের যন্ত্র হয়, তবে তা তো ভক্তি নয়, সেটা দাসত্ব।’
তরুণেরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মীরা উঠে দাঁড়ান, বলেন,
‘আমরা আন্দোলন করতে আসিনি।
আমরা কেবল একটা সুর রাখতে এসেছি; যেন মানুষ মনে রাখে, ধর্ম নয়, ভালোবাসাই শেষ আশ্রয়। মানুষের ধর্ম একটাই—‘করুণা’। যে তা ভুলে যায়, সে যতই স্রষ্টার নাম জপুক, তার প্রার্থনা বাতাসে ঝরে যায়।’
ছেলেগুলো বিহ্বল হয়ে চলে যায়।
বুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে বললেন,
‘তুমি আজ গান হয়ে গেলে, মীরা।
তুমি ভক্তি নয়, মানবতার প্রতীক।’
মীরা নিঃশব্দে কাঁদছে, কিন্তু তাঁর মুখে হাসি।

সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে। শহরের ওপর নরম আলো। আজও মানুষের মুখে ক্লান্তি, কিন্তু কোথাও কোথাও এক অচেনা প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। বুদ্ধ রমনা পার্কে এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

৬.
প্রভাত এবং নির্বাণের আলো:
সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে। শহরের ওপর নরম আলো। আজও মানুষের মুখে ক্লান্তি, কিন্তু কোথাও কোথাও এক অচেনা প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। বুদ্ধ রমনা পার্কে এক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘নির্বাণ মানে পালানো নয়, থেমে দেখা।
যে নিজের রাগের মধ্যে আলো খুঁজে পায়, সেখানেই মুক্তি।’
মীরা মৃদু হেসে বলেন,
‘প্রেমই বিপ্লব, করুণাই রাজনীতি। প্রভু, এই অন্ধকারে তোমার শান্তির সুর কৃষ্ণর প্রেম হয়ে বাজে মানুষের অন্তরে।’
তাঁদের কণ্ঠ মিশে যায় শহরের কোলাহলে,
কিন্তু মানুষ জানে না এই মুহূর্তে কোথাও একজন কৃষ্ণ হাসছেন, আর নির্বাণের পথে ফের একবার আলো জ্বলে উঠছে।
বহু বছর পরে মানুষ বলেছিল,
সেদিন নাকি এক নারী ও এক বৃদ্ধকে দেখা গিয়েছিল নগরের প্রান্তে। তাঁরা কিছু বলেননি, শুধু তাঁদের চোখে এক অদ্ভুত গভীর দ্যুতি ছিল।
কেউ বলেছিল, তাঁরা ছিলেন বুদ্ধ ও মীরা। কেউ বলেছিল, সম্ভবত তাঁরা মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা দুই আলোকরেখা! তাঁরা আসলে আমাদের ভেতরের শান্তি ও প্রেম। তাঁরা ফিরে গিয়েছেন হয়তো অন্য যুগে, অথবা রয়ে গিয়েছেন আমাদের মধ্যেই। আর হয়তো সত্যিই তাই। যখন পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই তাঁরা ইতিহাস হয়ে ফিরে আসেন অন্য নামে। কখনো বুদ্ধ, কখনো মীরা, কখনোবা অন্য কেউ হয়ে। আমাদের শেখাতে,
‘মানুষ হও, তাহলেই ঈশ্বরকে পাবে।’