রোহিঙ্গা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

পুলিশ প্লাজার সামনের ব্রিজটার রেলিংয়ে দুহাতের ওপর থুতনি রেখে হাতিরঝিলের ওপারের গাছের সারি, ছুটে চলা গাড়ি, সারি সারি দালানের চূড়া, কখনোবা ময়লাযুক্ত পানিতে দু-একটি ওয়াটার ট্যাক্সির আসা-যাওয়া দেখছিল তিমির মিশ্র। দূর আকাশে নাম না জানা পাখিদের আকস্মিক ওড়াউড়ি তার দৃষ্টি মাঝেমধ্যে আসমানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কয়েক দিনের টানা ভ্যাপসা গরমের পর এই জায়গার হঠাৎ আরাম বাতাসের বন্যা তিমিরের মতো আরও পথচারীকে আটকে দিয়েছে।

তিমির বিশেষ কিছু ভাবছিল বা দেখছিল, তা নয়। অভ্যাসবশত এদিকে নজর ফেলছিল, এই যা। খামখেয়ালে চোখ বুলাতে বুলাতে মুদ্রাদোষে সে আনমনা হয়ে যায়, কোলাহলেও আপন ভুবনে ডুবে যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এমন সময়, সামান্য দূর থেকে কে যেন ডাকছে, ‘তিমু! তিমু!’

অপ্রত্যাশিতভাবে এমন ডাকে তিমিরের আত্মভোলাভাবে কিছুটা ধাক্কা লাগে। বাঁ দিকে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, ক্রিমসন কালারের একটি গাড়ির আয়না নামিয়ে গলা বাড়িয়ে কেউ একজন তাকে ডাকছে। চোখে সানগ্লাস। তিমির তাকাতেই সে হাত উঁচিয়ে বলে, ‘হেই পোয়েট, দিস ইস নুসাইরা! কাম অন!’

তিমির এগিয়ে গিয়ে, ‘আরে তুই! ও মাই গড!’

নুসাইরা: রাস্তা পার হ। গাড়ি ফুডকোর্টে রাখি।

রাস্তা পার হয়ে বাস কাউন্টারের পেছনে খোলা ফুডকোর্টে গাড়ি পার্কিংয়ে যায় তিমির। এরই মধ্যে নুসাইরা গাড়ি পার্ক করে ফেলেছে। দুজন কাঠবাদামের গাছের নিচে এক পাশে একটি টেবিলে বসে। বসার আগেই প্রাথমিক আলাপ হয়ে যায়।

ক্যাম্পাস ছাড়ার প্রায় এক দশক পর তাদের মধ্যে দেখা। ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমেও তাদের যোগাযোগ ছিল না। তবে কে কী করছে, তা কিছুটা জানা ছিল।

নুসাইরা: তো, ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত মনোযোগে কী দেখছিলি বল? দুহাতের ভাঁজে থুতনিতে রেখে উদাসীনভাবে যেভাবে পা নাড়ছিলি, পেছন থেকে একপলক দেখেই মনে হলো, এ তো আমাদের তিমির না হয়ে যায় না! কবিতার রোগ এখনো ছাড়েনি?

তিমির: আরে, না। বউ আসবে অফিস থেকে। চক্রাকারে আসবে। এখানে নামবে। সারা দিন বাসায় ছিলাম। তাই বের হলাম। একসঙ্গে যাব।

নুসাইরা: তাহলে তো ভালোই। তোর বউয়ের সঙ্গেও দেখা হবে। কোথায় চাকরি করে?

তিমির: একটি সফটওয়্যার ফার্মে।

নুসাইরা: গুড।

তিমির: বললি, চাকরি ছেড়ে দিলি? বিদেশি এনজিওতে এত বড় চাকরি, কেন ছাড়লি? কারণ কী?

নুসাইরা: আমাকে তো চিনিস। চাকরি করি ঠিক আছে। তাই বলে, দেশ-বিদেশের নানা ইস্যুতে লেখালেখি তো বন্ধ করিনি। কোনো আপসও করিনি। কিন্তু গত জুলাই-আগস্টের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে গেল। দেশের চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখার বিষয়ে অফিস থেকে সরাসরি না করা হলো। কলিগদের অলমোস্ট কেউ এমনিতে আগে থেকেই কিছু লিখত না। ঘোরাঘুরি, ফ্যামিলি, কলিগ বা বন্ধুবান্ধবের ছবিটবিই সবাই পোস্ট দিত। দু-একজন কখনো কখনো ইয়ার্কি, নির্জীব বা অতিমোলায়েম সুরে দু-চার লাইন লিখতটিকত। আমিও যে খুব চড়া সুরে বিপ্লবী গোছের কিছু লিখতাম, তা নয়। অবশ্য কোনো দিন আমাকে কেউ কিছু বলেওনি। কিন্তু অফিসের দৃষ্টিভঙ্গিটা মানতে পারছিলাম না। তাই দুই মাস আগে রিজাইন দিলাম।

তিমির: হুম। বেশ ভালো। তোর মতো হতে পারলে বাঁচতাম। সবাই তো, আর নুসাইরা বিনতে হাবিব নয়, চিন্তার স্বাধীনতার জন্য লাখ টাকা দামের চাকরি ছাড়তে পারবে। আমাদের মন তো দমেছে আগেই, এখন শরীরও বশ হয়ে গেছে। শরীর সদা কর্তৃপক্ষের ভয়ে থাকে। খুব টায়ার্ড লাগে রে...

এরই মধ্যে তৃপ্তি চৌধুরী চলে এসেছে। নুসাইরা দেখে বুঝল, তিমিরের বউ। সে উচ্ছ্বাসে গদগদ হয়ে গেল। এক প্লেট সোবার অর্ডার দিয়ে সে–ও তিমির-নুসাইরার খইফোটা আড্ডায় যোগ দেয়।

তিমির: নুসা, এখন কী করবি ভাবছিস?

নুসাইরা: আচ্ছা, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করাতে চেষ্টা করছি, আন্দোলনও বলতে পারিস। আন্দোলন বললে রাজনৈতিক রংটি বেশি চোখে লাগে, তাই প্ল্যাটফর্ম বলছি। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস, মিয়ানমারে তাদের নিপীড়ন, নাগরিকত্ব বাতিল, বাস্তুচ্যুত করার কৌশল, বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি, তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার খতিয়ান, এথনিক ক্লিনজিং, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি, সরকার ও নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি, রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক দাবার ঘুঁটি হয়ে ওঠার সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে আমরা কাজ করব।

তিমির: ভালো। বিষয়গুলো ডিল করার মতো যোগ্য ছেলেবেলে আছে তো? ফান্ডেরও তো ব্যাপার আছে।

নুসাইরা: ফান্ড একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা দেশ-বিদেশে নানা জায়গায় যোগাযোগ করছি, চেষ্টা করছি। আর এসব বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী ছেলেমেয়ের অভাব নেই। কিন্তু বেশির ভাগের স্বাদ আছে সাধ্য নেই গোছের অবস্থা। তবে আমরা গড়েপিঠে নিচ্ছি। কাজ করতে করতে শিখতে হবে, এ ছাড়া উপায় কী?

তৃপ্তি: একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা এল ২০১৭ সালে। তখনই এল বোধ হয় ৭-৮ লাখ। এরপর নানা সময়ে হয়তো আরও কয়েক লাখ এসেছে। বাংলাদেশ আশ্রয় দিচ্ছে খুব ভালো কথা। কিন্তু আট বছর পার হতে চললেও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরকারের পরিষ্কার কোনো চিন্তাভাবনা, বিশেষ কোনো মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না।

নুসাইরা: রাইট, সরকারের তো নেই। নাগরিক পর্যায়ে দু-একটি সেমিনার ও টক শো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি। রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নিবেদিতভাবে কাজ করছে, এমন কোনো সংগঠন গড়ে ওঠা দরকার ছিল। এমন সংগঠন থাকলে তারা সরকারকে রোহিঙ্গা বিষয়ে নীতি প্রণয়নে, মিয়ানমার, প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় সহায়তা করতে পারত। আমরা, সেই গ্যাপটা পূরণ করার চেষ্টা করছি।

তিমির: সরকার যে তোমাদের কথা কানে তুলবে, তার কোনো গ্যারান্টি আছে?

নুসাইরা: গ্যারান্টি নেই। কিছুরই তো গ্যারান্টি নেই। গবেষণামূলক কাজের পাশাপাশি আমরা মাঠেও কাজ করব। কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ—এই পুরোনো পদ্ধতিতে আমাদের কাজ চলছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দেশের জনগণের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তাই আমাদের যথাযথ গবেষণা থাকলে, যুক্তিতর্ক শক্ত হলে সরকার আমাদের কথা শুনতে বাধ্য হবে। আমাদের বিশ্বাস, বিদেশি চাপ উপেক্ষা করে রোহিঙ্গাবিষয়ক নীতি প্রণয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার আমাদের যুক্ত করবে। না করলেও সমস্যা নেই। এই প্ল্যাটফর্মের কাজ বৃথা যাবে না। হয়তো অন্য কোনো সীমান্তে, এশিয়ার অন্য কোনো দেশে, আমাদের কাজ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

তৃপ্তি: কিছু রোহিঙ্গাকে তো ভাসানচরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের এমন ঝুঁকিতে পাঠানো নিয়ে কাউকে কোনো কথাই বলতে দেখিনি। এ পর্যন্ত কতগুলো রোহিঙ্গা নারী-শিশু ও পুরুষকে খুন হতে দেখলাম, এসব নিয়ে তো কেউ জোরেশোরে কথা বলছে না। এখন আবার অনেক বিদেশি সহায়তাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। ক্যাম্পের এনজিও স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য বিদেশি তহবিল ও সরকারের বরাদ্দ কমায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিহেলথও প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুনলাম। আচ্ছা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া যায় না?

তিমির: আমারও একই কথা, রোহিঙ্গারা তো এখন মদিনায়, মানে নতুন শহর বা দেশে। তাদের হয় মক্কায়, তথা আরাকান বা রাখাইনে পাঠানো হোক, নয় নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হোক। বছরের পর বছর তাদের চলাফেরা করতে দিবা না, কাজ করতে দিবা না, সন্ত্রাস-ডাকাতির অজুহাতে বিনা বিচারে গুলি করা মারবা, তা তো হয় না। ফিলিস্তিনিদের নাকবা, ৬৭ সালের যুদ্ধ–পরবর্তী উদ্বাস্তু পরিস্থিতি বা চলমান হত্যাযজ্ঞ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিলাম?

নুসাইরা: রোহিঙ্গাদের প্রতি তিলে তিলে যে বর্ণবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ সমাজে তৈরি হয়েছে, তাতে করে এটা এতটা সহজ হবে না। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গারা আসার পরপরই আমরা এখন যে রকম একটি প্ল্যাটফর্মের কথা ভাবছি, তেমনটি তৈরি করা গেলে ভালো হতো। তাহলে আর কিছু না হোক, সমাজে হয়তো এত রোহিঙ্গাবিদ্বেষ ছড়াত না। অন্তত রোহিঙ্গাবিদ্বেষের পাল্টা একটি ভাষ্য তৈরি করা যেত।

বেশির ভাগ মুসলমান হওয়ায় শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই শুরুর দিকে দেশের একটা বড় অংশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াকে সমর্থন করেছে। ঘটনা হলো, বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার গতিপ্রকৃতি, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর এথনিক ক্লিনজিং (অনেকের মতে জেনোসাইড) চালানোর বিষয়ে তেমন একটা জানেন না। এখন তারা চরম রোহিঙ্গাবিরোধী ও বিদ্বেষী হয়ে উঠেছে। এই তো গেল একদিক।

বিষয় হলো, বাংলাদেশ কিন্তু জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক ১৯৫১ সালের কনভেনশন বা ১৯৬৭ সালের প্রটোকল কোনোটিতেই সই করেনি। ১৯৮২ সালে চীন করলেও ভারত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়াও তাতে সই করেনি।

যা–ই হোক, আমার মতে, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোটাই, মিয়ানমারকে নিজ দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় বাধ্য করাটাই যথাযথ সমাধান। কিন্তু তা পারা না গেলে, কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়াকেই আমি ইনসাফ মনে করি। এখন তো পশুপাখিদেরও অধিকার দেওয়ার কথা উঠেছে, যা অত্যন্ত ন্যায্য। তাহলে, রোহিঙ্গারা বাদ যাবে কেন?

তুমি তো ফিলিস্তিনের কথা টানলা। মনে রাখতে হবে, আরাকান সংকট কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটার ওপরই আসন্ন আসাম সংকট কীভাবে সমাধান করা হবে, তার অনেক কিছুই নির্ভর করছে। কাজেই দূরদর্শীভাবে কাজ করতে হবে। দেরি যা হওয়ার হয়েছে, আর দেরি করা যাবে না।

নুসাইরার কাণ্ডজ্ঞান, ক্যাম্পাস জীবনের সেই তেজ এখনো অটুট আছে দেখে অম্লান খুশিতে তিমির মিশ্রের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটি কল আসে, তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা শুরু করে তৃপ্তি। নুসাইরা দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ধরায়। আড়মোড়া ভেঙে তিমিরও ওঠে দাঁড়ায়। মোবাইলে সময় দেখে, নুসাইরা ব্যস্ত হয়। বলে, মা বাসায় একা। ওষুধ খাওয়াতে হবে। এখন যাই। নম্বর তো পাওয়া গেল। শিগগির আবার দেখা হবে। তৃপ্তিকে হাই দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয় তিমিরের ক্যাম্পাসের বোহিমিয়ান জীবনের সতীর্থ নুসা। যে গান গাইতে পারে না, কবিতা লেখে না, ছবি আঁকে না—সেই নুসাই শুধু কবিতা লেখে বলে তিমিরের মতো দুর্বল পকেটের নিশাচরদের চা-সিগারেট খাওয়াত।

ব্যাক গিয়ারে টান দিয়ে চলে যাওয়ার আগে, গলা বাড়িয়ে তিমির ও তৃপ্তির দিকে আবার হাত নাড়ে নুসাইরা। পার্কিং এরিয়া থেকে বের হয়ে গুলশান ১ নম্বরের দিকে যাওয়ার সময় তিমির দেখে, নুসার গাড়ির পেছনের কাচে বড় বড় অক্ষরে লেখা: রোহিঙ্গা।