ডাস্টি রোজ

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

হৈমন্তিকার সঙ্গে আমার দেখা আকস্মিক। তবে একদম আকস্মিক বলা যাবে না। তার সাথে আমার দেখা হওয়াটা অনিবার্য ছিল। প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে। প্রকৃতির সব রহস্য আমরা বুঝতে পারি না। হৈমন্তিকা আমার জীবনের অনিবার্য সেই প্রকৃতির রহস্য। তবে সে কথা আজ নয়। অন্য কোনো দিন, অন্য কোনোখানে।

চাবি দিয়ে বন্ধ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার হাতে ছোট ট্রলি ব্যাগ আর কাঁধে ব্যাকপ্যাক। ল্যাপটপ, কাগজপত্র আছে। সকালবেলা এ অবস্থায় আমাকে দেখে বোধ হয় হৈমন্তিকা খানিক বিস্মিত হয়েছে। অবশ্য তার বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। সে জানে, এ রকম হুট করে যেকোনো সময় আমি তার কাছে চলে আসতে পারি। সে আমার খুব ভালো বন্ধু। বেস্টি টাইপ। মানে সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এই ফ্ল্যাটে সে একা থাকে। বাসার কাজের বুয়া আর আমার কাছে ফ্ল্যাটের চাবি আছে। যখন ইচ্ছা আসতে পারি।

হৈমন্তিকাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। তার পরনে চিকন লাল পাড়ের অফ-হোয়াইট শাড়ি। তাতে মাঝে মাঝে লাল সুতার কাজ। আর্টিস্টদের প্রেজেন্টেশনই অন্য রকম। হৈমন্তিকার ঘরের এক জানালায় সাত রঙের পর্দা। সে চারুকলার টিচার। ছেলেমেয়েদের আর্ট অ্যান্ড সিভিলাইজেশন পড়ায়, পেইন্টিং শেখায়। শিল্পী হবে বলে বিয়ে করেনি, নাকি বিয়ে করলে শিল্পী হওয়া যায় না—সে কথা বলেনি। তবে হৈমন্তিকা বিয়ে করেনি।

সকালবেলা এ অবস্থায় আমাকে দেখে বোধ হয় হৈমন্তিকা খানিক বিস্মিত হয়েছে। অবশ্য তার বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। সে জানে, এ রকম হুট করে যেকোনো সময় আমি তার কাছে চলে আসতে পারি। সে আমার খুব ভালো বন্ধু। বেস্টি টাইপ।

বেরোচ্ছে মনে হলো। জরুরি কাজ না থাকলে তার বেরোনোর সময় আরও পরে। হৈমন্তিকার সঙ্গে দেখা হবে বলে সময় হিসাব করে এসেছি। গিফট এনেছি। সেটা সকালেই তার হাতে দিতে চাই। আজ আঠারো। হেমন্তকাল। হৈমন্তিকার বার্থডে। ইচ্ছে করেই উইশ করলাম না। সারপ্রাইজ থাক। ধোঁয়া ওঠা গরম কফির কাপে চুমুক দিয়ে দ্রুত হাতে রিস্টব্যান্ডে ঘড়ি বেঁধে নিল।

বাইরের দরজা ঠেলা দিয়ে বন্ধ করলাম। লাগেজ টেনে ভেতরে যেতে যেতে বললাম, ‘তোর এখানে কয়েক দিন থাকতে হবে। ঝামেলা হয়ে গেছে। কী ঝামেলা পরে বলব।’

হৈমন্তিকা আমাকে সহ্য করে কীভাবে জানি না। আমার সাথে নাকি থাকা যায় না। হৈমন্তিকার ভাষায় পুরো উইয়ার্ড ক্যারেক্টার। পারমিতাও থাকতে পারেনি। আমাকে ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কানাডায় চলে গেছে।

হৈমন্তিকা বলল, ‘রিজু শোন, লাইফ কোনো ক্যাসিনোর বাজি নয়। ডিলারের ছুড়ে দেওয়া কার্ডের ওপর তোর–আমার জীবন নির্ভর করে না।’

খানিকটা বিরক্ত যে হচ্ছি না, তা নয়। এখানে আসব বলে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। এই ভোর সকালে কারও দেওয়া হার্ড লিকার মার্কা জ্ঞান ভালো লাগছে না। বিরক্তি প্রকাশ করলাম না। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। হৈমন্তিকা কোথায় যাচ্ছে যাক। সে বেরিয়ে গেলে ঘুমাব। আমার থাকার জন্য আলাদা ঘর আছে। ব্যাগ নিয়ে সেদিকে যাচ্ছি।

হৈমন্তিকা টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজ গোছাতে গোছাতে বলল, ‘কোনো দিন কারও ব্যাপারে কখনো তোর কোনো অ্যাটেনশন ছিল, নাকি আছে! সত্যি করে বল দেখি, তুই কখনো কাউকে গভীরভাবে খেয়াল করেছিস! কারও পছন্দ সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা আছে! সব তোর আলগা পিরিত। ইলিসিট লাভ। খুব বেশি হলে ইনফ্যাচুয়েশন। ফালতু ইমোশন।’

ক্লান্ত গলায় বললাম, ‘তোর ওপর জোর করছি, আমি জানি। আমার সব আবদার তোর কাছে। তোকে কিছুই দিতে পারিনি। তুই তো জানিস, আমি জীবনে আমার মনমতো কিছু করতে পারিনি। প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের ভেতর পড়ে গেছি। কোনো কিছু মেলাতে পারছি না। নিজেকে কেমন যেন অ্যালিয়েনেটেড মনে হচ্ছে। আমি কী চাই, তুই ছাড়া সে ব্যাপারে কেউ কখনো মনোযোগ দেয়নি। না আমার মা–বাবা, না পারমিতা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি সবকিছু থেকে। আমি আর কোথাও নেই।’

সত্যি করে বল দেখি, তুই কখনো কাউকে গভীরভাবে খেয়াল করেছিস! কারও পছন্দ সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা আছে! সব তোর আলগা পিরিত। ইলিসিট লাভ। খুব বেশি হলে ইনফ্যাচুয়েশন। ফালতু ইমোশন।

থেমে গেছে হৈমন্তিকা। কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে গরম কফির কাপে আবার চুমুক দিয়েছে। তবে এবার তাড়াহুড়ো করে নয়। চুমুক দিয়েছে শান্তভাবে। হৈমন্তিকার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়েছি। তার চোখে কোনো বিরক্তি বা তাচ্ছিল্য নেই। প্রশ্রয় দেওয়ার মতো প্রশান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বললাম, ‘মনে হচ্ছে, কত দিন ভালোমতো ঘুমুতে পারিনি। কোনোরকম টেনশন ছাড়া নিশ্চিন্তে আমার খানিকক্ষণ ডিপ ঘুম দরকার। ভারশূন্য হয়ে ঘুমাব বলেই তোর কাছে এসেছি। এর চেয়ে এখন তোর কাছে আর বেশি কিছু চাইছি না।’

নরম গলায় হৈমন্তিকা বলল, ‘নাশতা খাবি তো!’

বললাম, ‘কিছু খাব না। খেতে ইচ্ছে করছে না।’

হৈমন্তিকা কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়েছে। টেবিলের ওপর কাপ নামিয়ে রেখে বলল, ‘অ্যাডমিশন টেস্ট চলছে। চাপ যাচ্ছে। লাঞ্চে চারুকলায় কিছু খেয়ে নেব। ফ্রিজে ভাত আছে, তরকারি আছে দেখিস। বের করে ওভেনে দিস।’

কিছু বললাম না। হৈমন্তিকার দিকে তাকিয়ে আছি। তাকে দেখলে আরাম লাগে। অমনি চোখ নামিয়ে নিয়ে হৈমন্তিকা সরে গেল। সে মেকআপ ধুয়েছে। আরেকটা এসপ্রেসো বানাবে। এখন আমাদের দুজনের পছন্দ একই। হৈমন্তিকা বলল, ‘কফি বানিয়ে রেখে যাচ্ছি। ব্রেড বাটার দুধ কর্নফ্লেক্স সব আছে। খেতে ইচ্ছে করলে খেয়ে নিবি। আমার ফিরতে দেরি হবে। দুপুরেও খেয়ে নিস।’

এপাশ থেকে ঘুরে সামনের চেয়ার সরিয়ে হৈমন্তিকার নিশ্বাসের দূরত্বে এসে দাঁড়ালাম। বলা যায়, তার আকর্ষণে এগিয়ে এসেছি। তাকে দেখতে ভালো লাগছে। স্নিগ্ধ শান্ত গভীর দিঘির মতো চোখের দৃষ্টি। কালো ফ্রেমের চশমার নিচে লম্বা মুখের দুই চোখে চওড়া ঘন কাজল। কপালে ছোট্ট হলুদ টিপ। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি।

আমার কাছে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে গলার তিল দুটো। খুব কাছেও নয়, আবার দূরেও নয়। ঠিক যতটা দূরত্ব থাকলে দৃষ্টি আটকে যায় ততটুকু। দেখলে মনে হয়, ঈশ্বর হৈমন্তিকার গলায় আকাশ থেকে কালপুরুষকে নামিয়ে এনে মিলিমালিস্ট করে এঁকে দিয়েছেন। আশপাশের আর সব তারা মুছে দিয়ে শুধু যেটুকু দরকার, সেই দূরত্বটুকু ওখানে রাখা আছে। হৈমন্তিকার গলার দিকে তাকালে আমার মনে হয় সব সৌন্দর্যের উৎস আদতে ওই তিল দুটোর মাঝের ফাঁকটুকুতে।

হৈমন্তিকার শরীর থেকে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ আসছে। ঝাঁজালো নয়, আবার এড়িয়ে যাওয়ার মতো অতটা হালকাও নয়। শাড়ির ভাঁজ থেকে উঠে আসা আদর মেশানো গন্ধ। লম্বা শ্বাসে বুকের ভেতর সেই অসাধারণ পারফিউমের গন্ধ টেনে নিলাম। টমি গার্ল। আমার ভীষণ পরিচিত। হৈমন্তিকার পছন্দের পারফিউম।

হৈমন্তিকা আবার তাকিয়েছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুই ফেরা পর্যন্ত মরার মতো ঘুমাব। আমার কিচ্ছু খেতে হবে না, তুই যদি এখন শুধু একটা কিউট চুমু খেতে দিস।’

চেয়ারের ওপর থেকে ব্যাগ তুলে নিয়ে হৈমন্তিকা বলল, ‘ক্যাবিনেটে পরিষ্কার চাদর আছে। বিছানায় পেতে নিস।’

হাতে ধরে রাখা ছোট গিফট বক্স এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আসার সময় মনে হলো খালি হাতে যাওয়া কেমন দেখায়! তোর জন্য কিছু এনেছিলাম।’

আমার কাছে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে গলার তিল দুটো। খুব কাছেও নয়, আবার দূরেও নয়। দেখলে মনে হয়, ঈশ্বর হৈমন্তিকার গলায় আকাশ থেকে কালপুরুষকে নামিয়ে এনে মিলিমালিস্ট করে এঁকে দিয়েছেন।

হৈমন্তিকা বের হয়ে যেতে যেতে ঠোঁট উলটে বলল, ‘উন্নতি হচ্ছে রে, রিজু। তোর বউ মনে হয় ফিরবে এবার। আমার বেডরুমে ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিস, এসে দেখব।’

হৈমন্তিকা বের হয়ে যাচ্ছে। তার কাঁধের ঠিক নিচে মাঝের কলাপাতার মতো মসৃণ খোলা পিঠে গাঢ় কালো স্কপিয়নের ট্যাটু যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে আছি। স্করপিয়ন হৈমন্তিকার পিঠে হাঁটতে শুরু করেছে। নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। হৈমন্তিকা দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।

আমি গিফটের বক্স নিয়ে হৈমন্তিকার বেডরুমে ঢুকলাম। বিছানায় স্কেচ খাতা। খাতার ওপরে লেখা ‘বিষণ্নতা আমার পোষা কাক’। হৈমন্তিকার স্কেচ খাতার নাম। খাতার পাতায় কেমন যেন মন খারাপ করা সব ছবি। শেষ ছবিটা আজকের তারিখ লিখে আঁকা। ভোরে এঁকেছে হয়তো। কতগুলো মুখের আদল। ভাঙাচোরা, অবসন্ন। মুখগুলো এঁকেবেঁকে গেছে। নিচে লেখা, যে মানুষ চলে যেতে জানে, তাকে ধরে রাখতে নেই।

কার কথা লিখেছে হৈমন্তিকা! আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে থাকল। এখানে কি কোথাও আমি আছি! নাকি অন্য কেউ! সেই অন্য কেউটা কে! আমার মনে হলো আবার আমি গহিন শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেলাম। ঘুমানো দরকার। ঘুমানো মানেই তো মরে যাওয়া। মৃত্যু আমাদের জীবনের মধ্যেই থাকে। আমরা মৃত্যুর সাথে বাস করি।

হৈমন্তিকা ফিরল সন্ধ্যার পর। দিনের আলো তখন ফুরিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর জমাট অন্ধকার। কিছুক্ষণ আগে আমার ঘুম ভেঙেছে। বেশ ঝরঝরে বোধ হচ্ছে। যেন বহুদিন পর গভীরভাবে ঘুমিয়েছি। তবে উঠে আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করছিল না। হৈমন্তিকা বাসায় ঢুকে আলো জ্বালিয়েছে। আমার ঘরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘উঠেছিস! ঠিকঠাক সব! ঘুমিয়েছিস! খেয়েছিস কিছু!’

কিছু বললাম না। চুপচাপ শুয়ে থাকলাম। শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে। হৈমন্তিকা বলল, ‘শাওয়ার নেব। ফ্রেশ হয়ে নে। একসাথে চা খাব।’

হৈমন্তিকা ডাইনিং–ঘেঁষা বেডরুমে চলে গেল। বিছানা ছেড়ে এসে ডাইনিংয়ে বসেছি। বেডরুমের দরজা খোলা। ঘরের আলো জ্বালিয়েছে। মেইন লাইট জ্বালায়নি। স্ট্যান্ড ল্যাম্পে শেড থেকে আলো এসে ঘর ভরে গেছে। আলো খুব উজ্জ্বল নয়, তবু স্পষ্ট সব কিছু। ম্লান গোলাপি, পুরোনো গোলাপের মতো। চোখে আরাম দেয়। দেয়ালের কোনায় কোনায় নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে বসেই ঘরের উষ্ণতা অনুভব করছি, তবে ভারী নয়। দিনের সব ক্লান্তি শুষে নিয়ে এ আলো প্রশান্তি মেলে দিয়েছে। হৈমন্তিকার প্রিয় রং, এখন আমারও প্রিয় হয়ে গেছে—ডাস্টি রোজ।

নরম গোলাপি আধো আলোর ভেতর বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে শান্ত হৈমন্তিকা। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছে। বিছানাজুড়ে তার কোঁকড়ানো এলোমেলো ঘনকালো চুল ছড়িয়ে আছে। যেন দিঘল কালো জলের কোনো দিঘিতে হৈমন্তিকা ভেসে আছে। তার গা খালি। ডাস্টি রোজ কালারের আলো তার খোলা ত্বককে আরও অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর করে তুলেছে। বুকের কাছ অবধি চাদর দিয়ে রেখেছে। ডান বুকের ওপর রহস্যময় গভীর তিল। আমাকে কেবল টানে। হৈমন্তিকার গলায় চিকন চেইন। নাগরাজ বাসুকি যেন পাহারায় আছে।

অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের ভয়, হিম!’ শীতল গলায় হৈমন্তিকা বলল, ‘ভেঙে পড়া মানুষ খুব দুর্বল হয়। তাদের কমিটমেন্ট থাকে না। হঠাৎ সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে আড়াল করে ফেলতে পারে। ভেঙে পড়া মানুষ মানে ভীতু মানুষ।’

হৈমন্তিকা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। বাথরুমে গেল শাওয়ার নিতে। খুব মৃদু আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে। হৈমন্তিকা আয়োজন করে শাওয়ার নিতে পছন্দ করে। এখন যে মিউজিক বাজছে, সেটা রাগ ইমন। সন্ধ্যার আলাপ। মিউজিকের সাথে ভেসে আসছে সুগন্ধ। হৈমন্তিকা বাথরুমে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়েছে। শাওয়ার থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে। তার মানে সে বাথটাবে ডোবেনি। শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শাওয়ার থেকে পানি পড়ার আওয়াজের সঙ্গে সুগন্ধি আর মিউজিক মিশে অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছে। মনের ভেতর জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘বনলতা সেন’ কবিতার শেষ লাইনগুলো ভেসে উঠল,

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

হৈমন্তিকা বাথরুম থেকে বের হয়েছে। তার মাথায় চূড়া করে জড়ানো ধবধবে সাদা টাওয়েল। পরনে গোলাপি রঙের বাথরোব। হৈমন্তিকা এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। তীব্র আকর্ষণে মাতাল হয়ে যাওয়ার মতো গন্ধ আসছে হৈমন্তিকার শরীর থেকে। তা কতখানি তার প্রিয় টমি গার্লের আর কতখানি ভেজা শরীরের বুঝতে পারলাম না।

হৈমন্তিকা বলল, ‘দুপুরে খেয়েছিস?’

বললাম, ‘তোর স্কেচ খাতা দেখলাম।’

‘নাটক করবি না। ভাত গরম করে দিচ্ছি, খাবি চল। বিফ আছে, খাবি নাকি ডিম ভাজব?’

‘হিম, তোকে আমি খুব বিরক্ত করি, তাই না?’

হৈমন্তিকা একদম স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘তুই ভেঙে পড়া মানুষ। ভেঙে পড়া মানুষ বিরক্ত করতে পারে না। তারা ভয় ধরায়।’

অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের ভয়, হিম!’

শীতল গলায় হৈমন্তিকা বলল, ‘ভেঙে পড়া মানুষ খুব দুর্বল হয়। তাদের কমিটমেন্ট থাকে না। হঠাৎ সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে আড়াল করে ফেলতে পারে। ভেঙে পড়া মানুষ মানে ভীতু মানুষ।’

আস্তে করে বললাম, ‘হ্যাপি বার্থডে, হিম। মেনি হ্যাপি রিটার্নস...।’

উইশ শেষ করার আগেই হৈমন্তিকা দুই চোখ বড় বড় করে ফেলল। তার চোখে বিপুল বিস্ময়। ঘুরে ড্রেসিং টেবিলের কাছে গেল। আমার আনা গিফট বক্স হাতে নিয়ে সেটা খুলেছে। ভেতরে পারফিউম। টমি গার্ল।

হৈমন্তিকা ফিরে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। গভীর চোখে বলল, ‘সকালে চুমুর কথা বললি, সিরিয়াসলি বলেছিলি!’

আমার শরীর কাঁপছে। কেন কাঁপছে, বুঝতে পারলাম না। গলা শুকিয়ে আসছে। শুকনা ঠোঁট নেড়ে বললাম, ‘জানি না রে।’

হৈমন্তিকা অস্থির গলায় বলল, ‘তুই কিছু জানিস না কেন? তুই যদি পুরো মানুষ হতিস, তাহলে তোকে চুমু দেওয়া যায় কি না সত্যি ভেবে দেখতাম। তুই আদতে অসম্পূর্ণ মানুষ।’

বুকের ভেতর থেকে বাতাস ছেড়ে দিয়ে কাতর গলায় বললাম, ‘মানুষ কি কখনো পুরো মানুষ হতে পারে!’

হৈমন্তিকার ভেতর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। শরীর থেকে টমি গার্লের গন্ধ ছাড়াও অন্য আরেক রকম গন্ধ আসছে। আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে যেতে থাকল। মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। পাথর হয়ে যেতে যেতে বললাম, ‘হিম, তোর কাছে আমি থাকতে পারি না। আবার তোকে ছেড়েও যেতে পারি না।’

হৈমন্তিকা শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার নিশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। হৈমন্তিকার ঠোঁট আমার খুলে যাওয়া ঠোঁটের ওপর। চাপ বাড়ছে। দুই ঠোঁটের ভেতর দিয়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে আমার পুরো দেহে। হিম যেন ইভ। সৃষ্টির আদি থেকে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে পরম আদরে নির্ভরতা আর প্রশ্রয়ের নিশ্চিত চুমু দিয়ে।