নিরাপু অথবা ছাতিম ফুলের সুবাস

অলংকরণ: আরাফাত করিম

ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রায় দৌড়ে ঢুকে পড়ি নীরাপুর ক্যাম্পাসে। খুঁজতে খুঁজতে নীরাপুকে আবিষ্কার করি ল্যাবরেটরিতে। জানালা দিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে নীরাপু বের হয়ে আসে।

‘কী রে ইমু, এখানে কেন! বিকেলে বাসায় আসিস। এখন বাড়ি যা।’ নীরাপুর কণ্ঠে ধমকের সুর।

নীরাপুর মুখে ফোঁটা ফোঁটা ঘামের বিন্দু গোলাপি মুক্তোর মতো জ্বলছে। ফ্যান নষ্ট বুঝি! নীরাপুকে বলা হয় না সে কথা। শুধু বলি, ‘তুমি আমাকে খুঁজতে গিয়েছিলে কেন? কিছু বলবে?’

নীরাপু তার বাঁ হাত দিয়ে আমার ডান হাতে চাপ দেয়। একই সাথে ডান হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে বলে, ‘বললাম তো, এখন যা। বিকেলে বাসায় আসিস।’ বলেই দুই বাহু ধরে আমাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

আমি ফিরে আসতে আসতে একবার পেছনে তাকিয়ে দেখি, নীরাপু একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আমার চলে যাওয়া দেখছে।

ওমা! নীরাপু দেখি আজ শাড়ি পরেছে! কী যে সুন্দর লাগছে তাকে! এত সুন্দরের কাছে যেতে সংকোচ হচ্ছে কেন জানি। দূর থেকেই দেখছি তাই অপলক। আমাকে দেখে নীরাপু স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত এগিয়ে আসে।

বিকেলে তাদের বাসায় যাই আকর্ষণীয় ক্রিকেট খেলা ফেলে। বিশাল ধানখেতের ভেতরে সর্পিল রাস্তা পার হয়ে প্রাইমারি স্কুল। তারপর ঈদগাহ মাঠ। সামনে বিশাল ধানখেত। তারপর বিল। ধানখেত আর বিলের মাঝ দিয়ে গেলে নীরাপুদের বাসায় তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়।

ওমা! নীরাপু দেখি আজ শাড়ি পরেছে! কী যে সুন্দর লাগছে তাকে! এত সুন্দরের কাছে যেতে সংকোচ হচ্ছে কেন জানি। দূর থেকেই দেখছি তাই অপলক। আমাকে দেখে নীরাপু স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত এগিয়ে আসে।

‘ইমু, তুই এসেছিস? এখন যা, সন্ধ্যার পর আসিস।’ নীরাপু আবারও আমাকে দুই বাহুতে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এবার আমি ঘুরি না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

নীরাপুর ভাসা–ভাসা চোখ আরও ভেসে ওঠে। সেখানে অনুশাসনের গোপন চিহ্ন। চাপা অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলে, ‘ইমু, বরপক্ষ দেখতে আসছে আমাকে। এখন তুই যাআআআ।’

আমি আর দেরি করি না। সোজা হাঁটা দিই। একটু পর শুনতে পাই, ‘ইমু, সন্ধ্যায় আসতে ভুলিস না কিন্তু। বিলের কাছে যাব। তোকে নিয়ে জোছনা দেখব।’

পরদিন সকাল সকাল হাজির নীরাপু। রীতিমতো হইচই করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঘর থেকে তার কণ্ঠ শুনলেও আমি গুম মেরে বসে থেকে পড়ার অভিনয় করি। ‘এই শিম্পাঞ্জি, কাল সন্ধ্যায় যেতে বললাম, যাসনি কেন?’

আমি নীরাপুর দিকে একবার তাকিয়ে অন্যদিকে ঘুরে বসি।

‘ও, খুব রাগ দেখাচ্ছিস, না? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা।’

আমার হাসা দেখে নীরাপু যুদ্ধে ক্ষান্ত দেয়; কিন্তু বুকের ওপর থেকে নামে না। চুপচাপ শুয়ে থাকে। তালতাল কোমলতার এক বিশাল সমুদ্রের ভেতরে পড়ে যাই আমি। এক মনোরম, মনোমুগ্ধকর সুবাস আমার হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।

নীরাপু ওড়না খুলে একটু ঝুঁকে কোমরে বাঁধতে থাকে। আর খাটে বসে থেকে আমি তার কাণ্ডকীর্তি দেখি। ঝুঁকে কোমরে ওড়না বাঁধার সময় তার বুকের খাঁজে আমার চোখ চলে যায় হঠাৎই। এমন মনোরম শোভা আমি কখনো দেখিনি। নীরাপু এসে প্রথমে আমাকে ধাক্কা দেয়। ‘খুব রাগ হয়েছে, না? দেখাচ্ছি মজা।’ নীরাপু আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বুকের ওপর চেপে বসে। বলে, ‘এক্কেবারে মাইরা ফালামু।’

আমি হেসে ফেলি।

আমার হাসা দেখে নীরাপু যুদ্ধে ক্ষান্ত দেয়; কিন্তু বুকের ওপর থেকে নামে না। চুপচাপ শুয়ে থাকে। তালতাল কোমলতার এক বিশাল সমুদ্রের ভেতরে পড়ে যাই আমি। এক মনোরম, মনোমুগ্ধকর সুবাস আমার হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে। আমার চেতনাজুড়ে তখন বিস্মিত প্রশ্ন খেলে যায় হাজারো! এমন মনোরোম! এমন কোমল! এমন সুবাস! এমন হৃদয়স্পন্দন!

নীরাপু উঠে বিছানায় বসে চুল ঠিক করে প্রথমে। কোমর থেকে ওড়না খুলে গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে যায়। অদৃশ্য হওয়ার আগে আরেকবার থামে দরজায় গিয়ে। কিছু বলে না। শুধু খানিক চেয়ে থেকে চলে যায়।

দুই.

সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়ার নাম করে আমি নীরাপুদের বাসায় যাই। এবার শর্টকাট রাস্তায় যাই না। কারণ, রাতে ফিরতে ভয় করবে। আর ওই মোটা আলের ওপর দিয়ে সাইকেলও চালানো যায় না। সাইকেলটা বাইরের বারান্দায় রেখে ঘরে প্রবেশ করি। মূল দরজা দিয়ে না ঢুকলেও নীরাপু বুঝতে পেরে চলে আসে আমার কাছে। নীরাপু যেন তৈরিই ছিল। রীতিমতো খলবল খলবল করে বলে, ‘এসেছিস? চল তাড়াতাড়ি।’

হাত ধরে দে ছুট। ততক্ষণে মুখ দেখা যায় না, এমন অন্ধকার পেরিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসছে। পথ চলতে দ্বিধান্বিত আমাকে নীরাপু হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায়। যেন এমন অন্ধকার তার খুব চেনা। বেশ কয়েকটি বাড়ির উঠান পেরিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি। খুলিতে অনেক গাছ ও ঝোপঝাড় ছেড়ে ধান শুকানোর জায়গা পার হয়ে কিছু পতিত জমি। আল দিয়ে পার হলে এক অগভীর পুকুর। তার চারিধারে ঝাউগাছগুলোকে কেমন ভুতুড়ে লাগে। তারপর একটু পার হলে বাঁ পাশে ঈদগাহ মাঠ দেখা যায়। আরেকটু হাঁটলেই বিলের সুবাস নাকে এসে লাগে। খোলা জায়গায় আসায় ততক্ষণে ঘুটঘুটে অন্ধকার কেটে গেছে। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে সবকিছু। নীরাপু দাঁড়িয়ে বাঁ হাতের তর্জনী উঁচিয়ে হিন্দুপাড়ার বাঁশঝাড়ের দিকে ইশরা করে। অমা হলুদাভ গোল চাঁদ ঘোমটা খুলছে! একটু পরই দেখা গেল সাদা মঠের শীর্ষ চোখা অংশ। দক্ষিণে সামাদ মুন্সীপাড়ার মসজিদের গম্বুজটিও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। চাঁদের আলো স্পষ্ট হওয়াতে দেখা যাচ্ছে হালকা কুয়াশার আড়াল। বিলের পানিতে চাঁদের আলো পড়ায় কেমন চিকচিক করছে। হালকা ঢেউয়ের ওপর পড়ে একটা চাঁদ অনেকগুলো চাঁদ হয়ে দুলছে। দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় দাঁড়ানো ছাতিমগাছটিকে খুব গম্ভীর লাগছে আজ।

নীরাপু বলল, ‘আর যাওয়া যাবে না। এখানে বসি।’

মোটা আলের ঘাসের ওপর আমরা বসে পড়ি পা ঝুলিয়ে। হলুদাভ চাঁদ ততক্ষণে সাদা হয়ে ওপরে উঠে এসেছে। বসে আছি দুজন চুপচাপ। নাকে এসে পরশ বোলাচ্ছে ছাতিম ফুলের সুবাস। আমাদের মাথার ওপর হালকা পাখার ঝাপটানি দিয়ে উড়ে একটি বক বিলের কাছে গিয়ে নামল। একটু পর সরসর করে উড়ে গেল অন্য কোনো পাখি। মনে হয় বাদুড়।

নীরাপু বলল, ‘ইমু, একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?’

আমি বললাম, ‘কী নীরাপু?’

নীরাপু মাথা ঝুঁকিয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে, ‘সেক্সি হয়। বুঝলি!’ নীরাপুর মুখ আমার কানের কাছে আরও কিছুক্ষণ স্থির থাকে। তার ভারী বুকের সবটুকু কোমলতা আমার চোখেমুখে লেপটে থাকে।

‘দেখ, সবকিছু কেমন অচেনা লাগছে। এই যে চেনা ঝাউগাছ, কেমন রহস্যপুরীর মতো হয়ে গেছে। ওই যে ছাতিমগাছ দাঁড়িয়ে আছে কত দিন হলো, কোনো দিন খেয়াল করেছিস? আজ সুবাস ছড়িয়ে জানাচ্ছে তার উপস্থিতি। বিলের পানির হালকা ঢেউ কেমন ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। চিকমিক করা বিন্দু দেখে মনে হচ্ছে, আকাশের তারা নেমে এসেছে সেখানে। চাঁদ দেখেছিস? কী রূপ, অপরূপ রূপ নিয়ে এসেছে!’

‘এগুলো দেখার সময় কই আমার? এগুলোর চেয়েও সুন্দর কিছু আছে।’

নীরাপু আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘এই এই তুই কী বলিস? তুই মানুষ না নাকি? তুই আসলেই শিম্পাঞ্জি।’

নীরাপুর ধাক্কা খেয়ে একটু সরে যাই আমি। চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘এগুলোর চেয়েও হাজার সুন্দর আমার চোখে ভাসছে, যা তুমি দেখছ না নীরাপু।’

নীরাপু চোখের ইশারা করে, ‘কী?’

‘তুমি। তুমি যদি তোমাকে দেখতে, তাহলে তোমার কাছে মনে হতো এই সব কিছুই না।’

নীরাপু চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘শয়তান!’

দূর থেকে তখন শঙ্খধ্বনির সুর ভেসে আসে। সাথে নানা ধরনের বাদ্য শোনা যায়। হিন্দুপাড়ার মন্দিরে কীর্তন শুরু হয়েছে।

নীরাপু আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, ‘শুয়ে পড় আমার কোলে মাথা রেখে। শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখ। আমি তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।’ আমি নীরাপুর কোলে মাথা রেখে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ি। নীরাপু আমার চুলে বিলি কাটতে থাকে। আমার কাছে কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে। অপার্থিব মনে হয়।

চুলে বিলি কাটতে কাটতে নীরাপুর আঙুলগুলো দুই পায়ের প্রাণী হয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার কপাল-নাক-ঠোঁট-থুতনি-গলা হয়ে নিচে নামতে নামতে বুকের ভেতর এসে স্থির হয়ে যায়। কেঁপে ওঠে নীরাপু। ‘ওমা! তোর এ অবস্থা কেন?’

আমি অস্ফুট স্বরে বলি, ‘কী!’

‘তোর বুকে এত লোম!’

‘বুকে লোম থাকলে কী হয়?’

নীরাপু মাথা ঝুঁকিয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে, ‘সেক্সি হয়। বুঝলি!’

নীরাপুর মুখ আমার কানের কাছে আরও কিছুক্ষণ স্থির থাকে। তার ভারী বুকের সবটুকু কোমলতা আমার চোখেমুখে লেপটে থাকে। আমি বলি, ‘নীরাপু, সুবাসের তীব্রতা টের পাচ্ছ?’

আমি নীরাপুকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবার কথা মনে করিয়ে দিই। নীরাপু আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে, ‘তোর এখানে আসা যাবে না।’ এ কথা শুনে পুরো পৃথিবী আমার মাথায় ভেঙে পড়ে। হোয়াট সাইন পাঠাই। কোনো উত্তর আসে না।

‘হ্যাঁ। ছাতিম ফুলের সুবাস।’

‘এটা তো ছাতিম ফুলের সুবাস নয় নীরাপু! এটা নীরাফুলের সুবাস।’

নীরাপু কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসতে বসতে বলে, ‘নারে। এটা ইমুফুলের সুবাস।’

সামাদ মুন্সীপাড়ার মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে তখন। নীরাপু তাড়া দেয় আমাকে। ‘ওঠ ওঠ। এশার আজান পড়ে গেল। আমাকে খুঁজবে। চল তাড়াতাড়ি।’

তিন.

নীরাপুকে বাসায় দিয়ে আমি বের হয়ে আসি। একধরনের মিষ্টি কষ্ট বুকের ভেতরে বাজতে থাকে। বাঁশঝাড়ের ভেতরে সর্পিল রাস্তায় জোছনার মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমি মূল রাস্তায় গিয়ে উঠি। পৃথিবীর সব জোছনা আর ছাতিম ফুলের সুবাস নিয়ে আমি হাঁটতে থাকি। মাঝে মাঝে চাঁদের দিকে তাকিয়ে চাঁদ নয়, নীরাপুকে দেখি। ছাতিম ফুলের সুবাস আমাকে বারবার নিয়ে যায় নীরাপুর বুকের মধ্যে। যেখানে পৃথিবীর সকল চাঁদ আর ছাতিম ফুলের সুবাস থাকে।

চার.

এর কিছুদিন পর একদিন নীরাপু চোখের ভেতরে পাণ্ডুর চাঁদ নিয়ে ভেজা ভেজা কণ্ঠে বলে, ‘ইমু, অস্ট্রেলিয়ায় আমার স্কলারশিপটা হয়ে গেছে। আমি চলে যাচ্ছি।’ সেদিন নীরাপু শুধু ওটুকু বলতে পারে। চলে যায় নিঃশব্দে। আমিও কিছুই বলি না। আমি আর কিছু শুনিও না। পরদিন বিকেলে এসে নীরাপু আমার দুই হাত ধরে তার দুই গালে চেপে ধরে থাকে শুধু। বলে, ‘ঠিকমতো পড়াশোনা কর। সামনেই ইন্টার পরীক্ষা। ভালো রেজাল্ট না করলে তোকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাব কী করে?’

এরপর পার হয়ে গেছে কয়েক বছর। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। নীরাপুর সাথে কথা হয় হোয়াটসঅ্যাপে।

আমি নীরাপুকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবার কথা মনে করিয়ে দিই। নীরাপু আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে, ‘তোর এখানে আসা যাবে না।’

এ কথা শুনে পুরো পৃথিবী আমার মাথায় ভেঙে পড়ে। আমি কোনো কথা না লিখে কয়েক শ হোয়াট সাইন পাঠাই। কোনো উত্তর আসে না। অনেক পরে বলে, ‘তুই এখানে এলে আমাদের ছাতিমগাছের কী হবে রে শিম্পাঞ্জি? আমাদের বিলের কী হবে? তারা একা হয়ে যাবে না? তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি হয়ে গেল। এত হোয়াট সাইন পাঠাইছিস, চাপা পড়ে গিয়েছিলাম। উঠতে দেরি হয়ে গেল।’

আমি রাগের ইমো পাঠাই। তারপর বলি, ‘নীরাপু, তুমি তো জানো, বিলটা দখল হয়ে গেছে। সেখানে এখন মশার কয়েলের ফ্যাক্টরি। ছাতিমগাছও কেটে ফেলা হয়েছে। ওখানে এখন আর কোনো সুবাস নেই। আছে শুধু কয়েলের বিষাক্ত দুর্গন্ধ।’ নীরাপু গালে হাত দিয়ে মন খারাপের ইমো পাঠায়। তারপর বলে, ‘ইমু, তোর মনে আছে, শাপলা ফুল তোলার কথা! সেই যে আমরা নেমে পড়লাম। কচুরিপানা তুলতেই কয়েকটা কই মাছ সরসর করে লাফ দিল। আমি ভয়ে তোকে চেপে ধরলাম। মনে আছে তোর, সেই টইটই দুপুরগুলোর কথা! সেই রাতে চাঁদ দেখার কথা?’

সূর্যের আলো পড়ায় সে পাতা কী সুন্দর ঝিকমিক করছে। আমার কানে ভেসে আসছে নীরাপুর রিনিঝিনি হাসির শব্দ। বুকের ভেতরে ঠিক কে ঢুকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না—নীরাপু? না–কি ছাতিম ফুলের সুবাস?

আমি কোনো উত্তর দিই না। বলি, ‘নীরাপু এখন এগুলো কিছুই নেই। আমাকে ছাতিম ফুলের সুবাসের কাছে নিয়ে চলো। সেটা এখন শুধুই তোমার কাছে।’

‘ছাতিমের সুবাস তোর কাছেই আছে রে ইমু। তুই চলে এলে ওই গাছটাকে কে দেখবে? আমাদের বিলের কী হবে? সবাই এলে ওরা তো একা হয়ে যাবে রে?’

‘ওরা এমনিতেই একা হতে হতে মরে গেছে নীরাপু।’

‘ইমু, আমরা ওদেরকে ফিরিয়ে আনব। যে দেয়ালে উঁচু করে ঢেকে ফেলা হয়েছে মসজিদ, বিল আর মঠকে। আমরা সে দেয়াল ভেঙে ফেলব। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সবকিছু আগের মতো। সত্যি। আমরা যেখানে বসে চাঁদ দেখতাম, পানির ঝিকিমিকি দেখতাম, ছাতিম ফুলের সুবাস মাখতাম, সেখানে কাল যাবি। দেখতে পাবি আমাকে। যদি দেখতে না পাস, বুঝবি, আমাদের সবকিছু মিথ্যা ছিল। মিথ্যা ছিল বিলের পানির ঝিকিমিকি, হোগলাবন, ছাতিমগাছ।’

আমি কোনো কথা বলি না। ফোনটা বুকের ভেতরে চেপে ধরে থাকি।

পাঁচ.

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কল্যাণপুর গিয়ে বগুড়ার বাস ধরি। আজকের পরীক্ষাটা মিস হয়ে গেল। হোক। মরে যাওয়া যে বিলটাকে আমরা বুকের ভেতরে ধরে রেখেছি, কেটে ফেলা ছাতিমগাছের যে সুবাস বুকের ভেতরে পুষে রেখেছি, যদি এভাবে গিয়ে তাদেরকে তাদের জায়গায় রেখে আসতে পারি, তাহলে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!

বাস থেকে নেমে বাড়ি না গিয়ে প্রথমে সেখানে যাই, যেখানে নীরাপুর কোলে মাথা রেখে চাঁদ দেখেছিলাম।

আর আশ্চর্য! একটা ছাতিমগাছের চারা বাতাসে দুলছে। সূর্যের আলো পড়ায় সে পাতা কী সুন্দর ঝিকমিক করছে। আমার কানে ভেসে আসছে নীরাপুর রিনিঝিনি হাসির শব্দ। বুকের ভেতরে ঠিক কে ঢুকে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না—নীরাপু? না–কি ছাতিম ফুলের সুবাস? সে ঘ্রাণ প্রথমে বের হয়ে এসে কেটে ফেলা গাছের দিকে চলে গেল। আর মনে হলো, সুদূরে বুকের ভেতরে পুষতে থাকা নীরাপুর বিলটি আমার বুকের ভেতরে লালন করা বিলটিকে সাথে করে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সাবেক বিলে।

একটু পরই আমি শুনতে পাই ঢেউয়ের মিহি শব্দ। সাদা সাদা বক বিলের প্রান্তে মৌনী তাপসের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এক পায়ে।

আর আমার বুকের ভেতরটা ভরে যাচ্ছে ছাতিম ফুলের সুবাসে।