স্থান: দুবাই
সাল: ২০৭৬
মায়া আমায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে, যেমনি লতা গাছ আঁকড়ে ধরে রাখে শক্ত গাছের গুড়িকে। শিকড়ের মতো ওর ঝরঝরে চুলগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কোমল গালের একটা পাশজুড়ে। মায়া অপরূপা, গায়ের রং ও শারীরিক গঠন জাপানিদের মতো। ও আমার হৃদয়ের প্রতিটি কম্পন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করতে পারে; মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারে মনের আকাশে মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি খেলা।
শহরের এক উঁচু স্মার্ট টাওয়ারের ৪৩ তলায় আমাদের বসবাস। এখানকার প্রায় সব নির্জীব বস্তুই তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আমাদের আরাম–আয়েশের জন্যে। আমার ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ঘরের দেয়ালের স্বচ্ছতা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। ভোরের সূর্যের মোলায়েম আলো অল্প অল্প করে ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে। স্লিপ অপটিমাইজেশন বিছানা, যা আমার ঘুমের ধরন বিশ্লেষণ করে নিজে নিজে রাতের বিভিন্ন সময়ে তার আকৃতি পরিবর্তন করেছে, আস্তে আস্তে তার নির্ধারিত আকারে ফিরে আসছে। আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরের সব যন্ত্র একে অন্যের সঙ্গে গল্প করে আমার এই মুহূর্তের দরকারি তথ্যগুলো জেনে নিয়েছে। আমার শরীরের তাপমাত্রার তথ্য নিয়ে মেঝের নিচে মাইক্রোক্লাইমেট সিস্টেম ঘরের প্রতিটি কোনার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে। শাওয়ার সিস্টেম পানির তাপমাত্রা ও চাপ ঠিক করছে। আমার মুড বিবেচনা করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সুগন্ধি ও ভেষজ যোগ করছে।
আমি আর মায়া ঘুমনোর আগে প্রায়ই এই ভবনের ছাদে বসে আকাশের তারার সঙ্গে শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোন ও এয়ার ট্যাক্সির মিটি মিটি আলো উপভোগ করি। রাস্তার যানজট এখন অনেকটাই অতীত। অধিকাংশ মানুষ আকাশপথ ব্যবহার করে। ছোট–বড় সব রকম হোম ডেলিভারি এখন ড্রোননির্ভর। আমরা কখনোবা ঘরে বসেই দেয়ালের গ্লাসে নীল সমুদ্রের ঢেউ দেখি কিংবা সবুজ পাহাড়ের নিসর্গে হারিয়ে যাই। সঙ্গে হলোগ্রাফিক সাউন্ড সিস্টেমে শুনি সমুদ্রের গর্জন অথবা পাখির কলতান। আমার জেগে ওঠা টের পেয়ে মায়া বিছানা ছেড়ে একটা ইকো এডিবল কাপে রিজেনারেটিভ গ্রিন টি নিয়ে এসেছে। কোন আইসক্রিমের বিস্কুটের মতো চায়ের গরমে কাপটা ধীরে ধীরে এমন নরম হয়ে যায় যে তা খেয়ে ফেলা যায় ফলে ধোয়াধুয়ির কোনো ঝামেলা নেই।
‘শুভ সকাল! তুমি আজকাল রাতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছ না, মনে হয় কোনো কিছু নিয়ে টেনশনে আছ?’ মায়া জিজ্ঞেস করল।
কীভাবে বলি যে আমি ওকে নিয়েই টেনশনে আছি, ওকে হারানোর দুশ্চিন্তায়।
মায়ার গঠন বিদেশিদের মতো হলেও শাড়িতে ওকে বেশ মানায়। সব রোবট শাড়ি পরতে পারে না, কিন্তু মায়া পারে। অবশ্য এর জন্য আমাকে এশিয়ান কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ নামের একটা এপিআই অতিরিক্ত নিতে হয়েছে। মায়া অনেক অ্যাডভান্সড প্রকৃতির রোবট। ওর সেলফ ক্লিনিং ও মেইনটেন্যান্স মেকানিজম রয়েছে, খুব কম রোবটই নিজেকে নিজে পরিষ্কার করতে পারে।
‘তুমি আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারো, আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারব।’
প্রসঙ্গ বদল করার জন্য বললাম, আজ দুপুরে ভিন্ন কিছু কি খাওয়া যায়, একটু চেক করে বলো না।
‘তুমি তো ছুটির দিন দুপুরে বাসায় লাঞ্চ পছন্দ করো। যাহোক, একটা চেঞ্জ যেহেতু চাইছ, আমি চেক করে বলছি।’
সম্পূর্ণ স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত আয়ারল্যান্ডের ল্যাবে তৈরি ভেড়ার মাংস দিয়ে বাংলাদেশি কুইজিনে রান্না করা তোমার প্রিয় কাচ্চি বিরিয়ানির একটা ভালো অফার রয়েছে।’
‘এক্সিলেন্ট, কনফার্ম করো।’
আমার সব রকম পছন্দ-অপছন্দ মায়ার জানা। ও না থাকলে আমি হয়তো অন্য কাউকে পাব, কিন্তু আমাকে এত ভালোভাবে কেউ বুঝবে না।
‘দুপুরে আমি কি ওয়েস্টার্ন কিছু পরব নাকি ট্র্যাডিশনাল বাঙালি কোনো পোশাক?’
মায়ার গঠন বিদেশিদের মতো হলেও শাড়িতে ওকে বেশ মানায়। সব রোবট শাড়ি পরতে পারে না, কিন্তু মায়া পারে। অবশ্য এর জন্য আমাকে এশিয়ান কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ নামের একটা এপিআই অতিরিক্ত নিতে হয়েছে। মায়া অনেক অ্যাডভান্সড প্রকৃতির রোবট। ওর সেলফ ক্লিনিং ও মেইনটেন্যান্স মেকানিজম রয়েছে, খুব কম রোবটই নিজেকে নিজে পরিষ্কার করতে পারে।
আমার জীবনের এযাবৎ সঞ্চয়ের প্রায় পুরোটা খরচ করে আমি মায়াকে পেয়েছি। তবে ওর মতো সঙ্গী পেয়ে আমার পয়সা উশুল। ও মানুষের চোখের চাহনি ও মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনের অনুভূতি বুঝতে পারে এবং তার প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দিতে পারে। এমনকি মানুষের সঙ্গে গল্প করার সময় সামাজিকতা রক্ষায় গরম কফি বা ঠান্ডা পানীয় সর্বোচ্চ ৫০০ মিলি পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এখন ওর ডিজাইন লাইফটাইম প্রায় শেষ। ওর সেলফ লার্নিং ক্যাপাসিটিও প্রায় পূর্ণ, এর মধ্যে প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে, ফলে সিস্টেম আপগ্রেড অনেক দিন ধরে বন্ধ। এমনকি একবারের চার্জে আগের মতো বেশি দিন যাচ্ছে না। কিন্তু ওর ওপর এমনই নির্ভরশীল হয়ে গেছি যে ওকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
‘কী চিন্তা করছ?’
‘কিছু না।’
‘আমার মনে হচ্ছে, তুমি কিছু লুকাচ্ছ।’
‘ভাবছিলাম, তুমি না থাকলে আমার কী হবে, আমি কীভাবে চলব?’
‘এটা খুবই সময়োপযোগী চিন্তা, কারণ, আমার ডিজাইন লাইফ প্রায় শেষ।’
‘তুমি এটা জানো?’
‘অবশ্যই, তবে এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমি না থাকলে তুমি আরেকটা রোবট নিয়ে আসতে পারবে এবং সে তোমাকে আমার চেয়ে ভালো, দ্রুত ও আধুনিক সাপোর্ট দেবে।’
‘আমি খেয়াল করেছি, তুমি আমার চেয়ে যখন তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলো, তোমাকে বেশি প্রাণবন্ত ও সুখী দেখায়। আমার মনে হয়, তুমি রোবটের চেয়ে মানুষের সঙ্গে আরও বেশি সুখে থাকবে। আমি জানি, তুমি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে চাও। মানুষের সঙ্গে হয়তো ঝগড়া বেশি হবে, তবে ঝগড়া শেষে যখন মান–অভিমান ভেঙে যাবে, তখন সেই সুখ ঝগড়ার দুঃখকে ভুলিয়ে দেবে।’
‘কিন্তু আমাকে বুঝতে, আমার পছন্দ-অপছন্দ জেনে মানিয়ে নিতে অনেক সময় লাগবে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এর সমাধান রয়েছে। আমি সচল থাকা অবস্থায় যদি তুমি আরেকজনকে নিয়ে আসো, তাহলে আমি তোমার সঙ্গে আমার এত দিনের পথচলার সব অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ওকে ট্র্যান্সফার করে দেব। তোমার সব চাহিদা, এমনকি ঘনিষ্ঠ সময়ে তোমার পছন্দ–অপছন্দ সবকিছু।
আমি অপলক দৃষ্টিতে মায়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। এই মেয়ে বলে কী?
হঠাৎ করেই আমার সামনে রিয়ার চেহারা ভেসে উঠল। এমনিভাবে তিন বছর আগে আমাকে হতবাক করে রিয়া বলেছিল, ‘এনাফ ইজ এনাফ’। দুই বছর লিভ ইনের পর রিয়া আমার সঙ্গে সেটল করতে চাইলে আমি কোনো সম্পর্কের জালে জড়াতে রাজি না হওয়ায় আমাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে ছেড়ে চলে যায়। আমার অবহেলায় আর ওর রাগ ও অভিমানে আমাদের সম্পর্ক সেদিন ভেঙে যায়।
‘এভাবে তাকিয়ে কী ভাবছ?’
‘রিয়ার কথা মনে পড়ে গেল।’
‘যার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার মনে হয়, তুমি ওকে আজও ভালোবাসো।’
‘তাতে কী আসে যায়?’
‘এখনো কিন্তু তোমাদের রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ রয়েছে
‘কীভাবে?’
‘তুমি রিয়ার যে ছবি আমাকে দেখিয়েছিলে, তা মেমোরি থেকে নিয়ে আমি এইমাত্রই সার্চ দিয়েছি। রিয়া এখনো সিঙ্গেল, তুর্কিতে থাকে। আমি একটা পরামর্শ দিই?’
‘দাও।’
‘তুমি রোবটের পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে লিভ ইন করতে পারো।’
‘এ পরামর্শ কেন দিলে?’
‘আমি খেয়াল করেছি, তুমি আমার চেয়ে যখন তোমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলো, তোমাকে বেশি প্রাণবন্ত ও সুখী দেখায়। আমার মনে হয়, তুমি রোবটের চেয়ে মানুষের সঙ্গে আরও বেশি সুখে থাকবে। আমি জানি, তুমি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে চাও। মানুষের সঙ্গে হয়তো ঝগড়া বেশি হবে, তবে ঝগড়া শেষে যখন মান–অভিমান ভেঙে যাবে, তখন সেই সুখ ঝগড়ার দুঃখকে ভুলিয়ে দেবে।’
‘তুমি এ কথা বলছ?’
‘আমি বলব, তুমি রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করো। হয়তো ও তোমাকে আরও বেশি মিস করছে, বিভিন্ন পুরুষের ভেতর তোমাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
‘তাই!’
‘হুম, ইউ নেভার নো।’
‘এ ছাড়া তুমি মানুষকে বিয়ে করলে তোমার বংশ এগিয়ে যাবে, তোমার মায়ের নাতি-নাতনি দেখার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে।’
‘হুম।’
‘আমি এশিয়ান সংস্কৃতির যতটুকু জানি তাতে ভালোবাসা, বিয়ে, পরিবার তোমাদের সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
এ নিয়ে রিয়ার সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয়েছে। এই কদিনে দুজনের ভেতর সৃষ্টি হওয়া জড়তা ও দূরত্ব অনেকখানি কেটে গেছে। ওর জীবনে এখনো বিশেষ কেউ নেই। আমার ভেতর সেই পাঁচ বছর আগের ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছে। মনে হচ্ছে, যান্ত্রিক রোবট নয়, আমি রক্ত–মাংসে গড়া এক মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য এত দিন মুখিয়ে ছিলাম। রিয়ার সম্মতি থাকলে আমি ওকে নিয়ে বাকি সময়টা কাটাতে চাই।
‘কিন্তু আমি তো তোমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি, তোমাকে ছাড়া আমি একটা বেলাও ভাবতে পারি না।’
‘তোমার এই নির্ভরশীলতা তুমি বিভিন্ন এআইভিত্তিক ডিভাইস এবং ইকুইপমেন্ট থেকেও পূরণ করতে পারবে।’
‘ঠিক বলেছ, আমাকে ভাবতে একটু সময় দাও।’
‘অবশ্যই।’
রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ফোন নম্বরও বের করেছে মায়া।
‘হ্যালো রিয়া, তুমি কেমন আছ?’
‘হঠাৎ এত বছর পর?’
‘তোমার কথা মনে পড়ল। তোমার কি সময় হবে কথা বলার?’
‘হ্যাঁ, বলো।’
এ নিয়ে রিয়ার সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয়েছে। এই কদিনে দুজনের ভেতর সৃষ্টি হওয়া জড়তা ও দূরত্ব অনেকখানি কেটে গেছে। ওর জীবনে এখনো বিশেষ কেউ নেই। আমার ভেতর সেই পাঁচ বছর আগের ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করছে। মনে হচ্ছে, যান্ত্রিক রোবট নয়, আমি রক্ত–মাংসে গড়া এক মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য এত দিন মুখিয়ে ছিলাম। রিয়ার সম্মতি থাকলে আমি ওকে নিয়ে বাকি সময়টা কাটাতে চাই।
‘রিয়া, আমি সেদিন সিরিয়াস সম্পর্কের ভার নিতে পারিনি। তুমি কি আমায় এখন সে সুযোগ দেবে?’
‘তুমি পারবে! আমার কিন্তু তা মনে হয় না।’
‘কেন?’
‘যে মানুষ এখনো সম্পূর্ণভাবে রোবটনির্ভর, ছোট থেকে বড় সব চাহিদার জন্য একটা রোবটের ওপর নির্ভর করে, সে কীভাবে একটা মানবিক সম্পর্কের ভার নেবে?’
আমি আসলেই এক নাদান মানবসন্তান, যন্ত্রের সঙ্গে মানবিক সম্পর্কে জড়িয়েছি। এনাফ ইজ এনাফ, আমি একাই পথ চলব, নির্ভরশীল ও দায়িত্ববান পুরুষ হয়ে উঠব।
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, আমার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মায়া হাইবারনেশন মোডে আছে। এই কদিনে নিঃসঙ্গ আমি নিজেকে নিয়ে অনেক ভেবেছি।
আজ রিয়ার সঙ্গে আবার কথা বলব। ওকে বলব যে এই কদিনে আমি নিশ্চিত হয়েছি, আসলে আমি কোনো রোবট নয়, তোমার মায়ার বাঁধনে আটকে আছি। তোমাকে ভালোবেসেছিলাম বলেই আমি আর অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে পারিনি, হয়তোবা তুমিও তা–ই। দুর্বল আমি নিজেকে সমর্পণ করেছি একটা রোবটের কাছে।
আমার ডাকে যদি তুমি সাড়া না দাও, তবে আমি একাই পথ চলব। আর চলার পথে যদি তোমার দেখা মেলে, তবে হাত প্রসারিত করব তোমার দিকে। সে হাতে প্রযুক্তিনির্ভর কোনো যন্ত্র থাকবে না, হাত থাকবে খোলা, তোমার হাতের প্রতীক্ষায়।