আষাঢ়ে গল্প
২০৪৬-এর বিশ্বকাপে যা যা ঘটল
জমেছে মেঘ, জমে উঠেছে জম্পেশ আড্ডা। আষাঢ়ে বৃষ্টিতে ঘনীভূত হচ্ছে অবিশ্বাস্য আর আজগুবি সব গল্প। এমনই জমজমাট আষাঢ়ে গল্প নিয়ে এ আয়োজন
২০৪৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই যখন শুরু হলো, একটা দেশ খুব ভালো করতে শুরু করল। দেশটার নাম আমি বলে দিতে চাই না।
ধরা যাক, দেশটার নাম আন্দিরা। তাদের দলে মেসি ২ জন, এমবাপ্পে আছে ২ জন, হল্যান্ড আছে ২ জন, হাকিমি ২ জন, গোলকিপার মার্তিনেজ ২ জন। সব মেড ইন আন্দিরা। তাদের নামও মেসি কিংবা মার্তিনেজ নয়। মেসি ১-এর নাম লিং, আর মেসি ২–এর নাম পিং। এই রকম আরকি।
২০২২ সালে যেসব ফুটবলার বিশ্বকাপে খুব ভালো খেলেছে, তাদের প্রত্যেকের ক্লোন করে ফেলল তারা। ২০২৩ সালে তাদের ফুটবল একাডেমি গবেষণা কেন্দ্রে দেখা গেল সারা পৃথিবীর সেরা সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের ক্লোন ২০০ কপি। সবার বয়স ১ দিন, ২ দিন। এই শিশুদের তারা মাতৃস্নেহ দিয়ে মানুষ করতে শুরু করল। সে জন্য তারা নিয়োগ দিল ২০০ মা। শুধু মা নিয়ে কোনো শিশু পূর্ণাঙ্গ হয়ে বড় হতে উঠতে না–ও পারে। সে জন্য তাদের জন্য বাবাও নিযুক্ত করা হলো।
হাঁটা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তারা পায়ে ফুটবল নিয়ে চলতে শুরু করল।
২০২৮ সালে সব বাচ্চার বয়স ৫ বছর। বাচ্চাগুলো লেখাপড়া করে, গান করে, নাচ করে, প্রার্থনা করে, আর ফুটবল খেলে। এইভাবে তারা বড় হতে লাগল। বয়স যখন ১০, তখন থেকে তারা নিজেদের মধ্যে ম্যাচ খেলতে লাগল। ৮টা দল তাদের; ভাগ করে টুর্নামেন্ট খেলে। কোনো দল হারে, কোনো দল জেতে। ম্যাচ শেষ হলে কেউ হাসে, কেউ কাঁদে। ২০৪৩ এসে সবার বয়স ২৩। ২৩ বছর আগে পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড় যারা ছিল, সেরা গোলকিপার, সেরা ডিফেন্ডার, সেরা মিডফিল্ডার, সেরা স্টপার, সেরা আক্রমণভাগ—সেই সব খেলোয়াড় ২৩ বছর বয়সী, মাঠে কিলবিল করছে। তারা আন্দিরার ভাষায় কথা বলে। আন্দিরার ভাষায় গান গায়। আর ফুটবল খেলে।
জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হলো। সেখানে এমবাপ্পের মতো দেখতে ২৩ বছরের পিন ইয়াং এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করল। সে বলল, ‘আপনারা যা করবেন, তা করবেন আপনাদের নিয়মের অধীনে। এর আগে পৃথিবীতে আরও অনেকবার বিশ্বকাপ ফুটবল হয়েছে, আপনারা কি কোনো দেশ বা টিমকে সেই টিমের খেলোয়াড়দের কালার, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন? একজন লিওনেল মেসির জিন কোনো দিন পরীক্ষা করে দেখেছেন? আমরা সবাই জানি, লিওনেল মেসি এক্সট্রা–টেরেস্ট্রিয়াল। কিন্তু আপনারা কি কখনো তার জিন পরীক্ষা করে দেখেছেন, সে এই পৃথিবীর, নাকি সে এলিয়েন?
তাদের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো ২০৪০ সালে ইউরো জেতা কোচ ফার্নান্দেজকে। এর আগে বিভিন্ন দেশ থেকে কোচ গিয়ে সেই একাডেমিতে কোচিং করেছেন। এই সময় ফিফা আপত্তি করে বসল। স্বয়ং ৫৯ বছর বয়সী মেসি বললেন, ‘হুবহু আমার ২৩ বছর বয়সী একটা ভার্সন মাঠে খেলছে, যে আবার আন্দিরার ভাষায় কথা বলে, এটা কীভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই ওরা ক্লোন করেছে।
মানুষের ক্লোন করা পৃথিবীতে নিষেধ। এই দেশ গোপনে আমার ক্লোন করেছে, এমবাপ্পের ক্লোন করেছে, আমাদের সময়ে যারা বিভিন্ন পজিশনে ভালো করেছে, তাদের সবার ক্লোন করেছে। এই টিমকে নিষিদ্ধ করা উচিত।’
ফিফার সভাপতি বিপদে পড়লেন। কারণ, আন্দিরা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ। তাদের টাকাপয়সা বেশি, জ্ঞানগরিমা বেশি, অস্ত্রশস্ত্র বেশি। তারা ফিফা সভাপতি জনসনকে বলে দিয়েছে, আন্দিরার টিমকে যদি খেলতে না দেওয়া হয়, পৃথিবীতে বিশ্বকাপ ফুটবল হতে দেওয়া হবে না। যে দেশেই বিশ্বকাপ ফুটবল হবে, সেই দেশেই তারা রোবট বাহিনী পাঠিয়ে বিশ্বকাপ ভন্ডুল করে দেবে। শুধু তা–ই নয়, ফিফার পুরো কমিটিকেই তারা গুম করে ফেলবে।
জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হলো। সেখানে এমবাপ্পের মতো দেখতে ২৩ বছরের পিন ইয়াং এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করল। সে বলল, ‘আপনারা যা করবেন, তা করবেন আপনাদের নিয়মের অধীনে। এর আগে পৃথিবীতে আরও অনেকবার বিশ্বকাপ ফুটবল হয়েছে, আপনারা কি কোনো দেশ বা টিমকে সেই টিমের খেলোয়াড়দের কালার, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন? একজন লিওনেল মেসির জিন কোনো দিন পরীক্ষা করে দেখেছেন? আমরা সবাই জানি, লিওনেল মেসি এক্সট্রা–টেরেস্ট্রিয়াল। কিন্তু আপনারা কি কখনো তার জিন পরীক্ষা করে দেখেছেন, সে এই পৃথিবীর, নাকি সে এলিয়েন? তা যদি না করেন, আমি একটা মানবশিশু, আমি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে বড় হয়েছি, আমার মা আছেন, বাবা আছেন; এই যে তাঁরা ওখানে বসে আছেন (এই সময় পিন ইয়াংয়ের মা ও বাবার দায়িত্ব পালনকারী দুজন উঠে দাঁড়ালেন); আপনারা নিয়মকানুন করেন আপনাদের জন্য, আমি কীভাবে সেই নিয়ম ভঙ্গ করলাম, সেটা কি আপনারা আমাকে বলবেন?
আন্দিরা ভয়াবহ শক্তিশালী একটা দেশ। তাদের অঙ্গুলি হেলনেই পৃথিবী চলে। বিশ্ব রোবট ফুটবল প্রতিযোগিতায় তারা চ্যাম্পিয়ন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোলামি করে। কাজেই জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব পাস করল যে আন্দিরা বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিতে পারবে। মেসি, এমবাপ্পে, হলান্ডরা খুব আপত্তি করলেন। কিন্তু ওই বুড়োদের আপত্তি ধোপে টিকল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০৪৬ বিশ্বকাপে আন্দিরা প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারেনি।
আমরা কেউই আমাদের জন্মের জন্য দায়ী নই। জন্মাবার পরে আমরা দেখি, আমরা একটা মানবজনম পেয়েছি। একটা শরীর পেয়েছি। আকার পেয়েছি। দুটো করে হাত, পা, আর চোখ পেয়েছি। একটা পরিবার পেয়েছি। একটা ভাষা পেয়েছি। একটা এলাকা পেয়েছি। একটা দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি। সে জন্য আমরা কেউই দায়ী নই। তারপর সেই পরিচয়, সেই দেহ, সেই ভাষা, সেই দেশপ্রেম নিয়ে আমরা পৃথিবীতে দিন যাপন করি, বড় হই, একটা সময় মারা যাই। আমি কী করি, কী বলি, তার ওপরে আমার হাত থাকতে পারে, কিন্তু আমি কীভাবে জন্ম নেব, কোন পরিবারে, কোন সমাজে, কোন শরীর নিয়ে, এটা তো আমার ওপরে না। যে জন্য আমি দায়ী নই, সে জন্য আপনি আমাকে শাস্তি দিতে পারেন না। আমরা আন্দিরার ফুটবল টিমের প্রত্যেক সদস্য একজন করে মানুষ, আমরা আমাদের মানবাধিকারের দাবি নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমাদের ফুটবল খেলার অধিকার আমরা চাই। আমাদের খেলতে দিন।’
আন্দিরা ভয়াবহ শক্তিশালী একটা দেশ। তাদের অঙ্গুলি হেলনেই পৃথিবী চলে। বিশ্ব রোবট ফুটবল প্রতিযোগিতায় তারা চ্যাম্পিয়ন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোলামি করে। কাজেই জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব পাস করল যে আন্দিরা বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিতে পারবে। মেসি, এমবাপ্পে, হলান্ডরা খুব আপত্তি করলেন। কিন্তু ওই বুড়োদের আপত্তি ধোপে টিকল না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০৪৬ বিশ্বকাপে আন্দিরা প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারেনি।
এর কারণ কী হতে পারে? বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন দৈনিক প্রথম আলোর ক্রীড়াবিশেষজ্ঞ ৭৯ বছর বয়সী উৎপল শুভ্র লিখলেন:
‘আন্দিরা যদি মেসি, এমবাপ্পে, হ্যারি কেইনের ক্লোন বানিয়ে থাকে, বুঝতে হবে, ওঁরা ছিলেন ২০২২, ২০২৬ সালের সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু এটা ২০৪৬ সাল। এর মধ্যে সারা পৃথিবীতেই নতুন শিশুরা বড় হয়েছে, যাদের প্রতিভা আরও বিস্ময়কর, সুযোগ আরও বিচিত্র, সৃজনশীলতা আরও বহুমাত্রিক। নতুন দিনের মেসি, এমবাপ্পেরা আজকের বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড় ডিউক, কালনা, শাম্প্রা, দাবিরের মধ্যেই নিহিত। তারা ২০ বছর আগের সেরা খেলোয়াড়ের চেয়ে সর্বাংশে সেরা, কোনো অংশে কম নয়। আপনি কি লেওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চেয়ে পাবলো পিকাসোকে কম প্রতিভাবান মনে করছেন? না। যে যুগে যে শিল্প করা দরকার, সেই যুগের সেরারা তা-ই করে থাকেন। মেসি একসময় মাঠকে ক্যানভাস বানিয়ে মোনালিসা এঁকেছেন, কিন্তু পিকাসোরা এসে এখন আঁকছে গুয়ের্নিকা। সত্যিকারের মেসিকে এখন মাঠে নামালে যেমন কোনো সুফল পাওয়া যাবে না, তেমনি মেসির ক্লোনকে নামিয়েও ফল ভালো পাওয়া গেল না।’
মেসি, এমবাপ্পের ক্লোন ছিল ২টা করে। একজন করে আন্দিরার ফুটবল দলে খেলেছে, দ্বিতীয়জনেরা স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল। কেউ কোনো দিন জানতেও পারল না, প্রায় ১০০ যুবক কোথায় গেল।
এই লেখা ছাপা হওয়ার পর প্রথম আলো খুব মুশকিলে পড়ল। কারণ, আন্দিরার দূতাবাস থেকে ফোন এল: ‘আমরা ক্লোন করেছি, এটার কোনো প্রমাণ কোথাও নেই। আপনারা গুজবের ওপরে ভিত্তি করে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন। আপনাদের পত্রিকা আমরা বন্ধ করে দেব।’
উৎপল শুভ্রকে বলা হলো লেখাটা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। অনলাইনের কোথাও এই লেখার চিহ্নমাত্র থাকবে না। উৎপল শুভ্র খিটখিটে বুড়ো, বললেন, ‘তা যদি হয়, আমি প্রথম আলোর ১০৪ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেব। একটা বিদেশি দূতাবাসের ফোন পেয়ে আমরা লেখা গিলে খাব। এর চেয়ে ফেলা থুতু চেটে খাওয়া সহজ। এই জন্য আমি বলি কি, সংবাদমাধ্যমে কেউ কাজ করতে আসবেন না, পদে পদে বিপদ। এমনিতেই এআইয়ের যুগে চাকরি পাওয়া যায় না, তার ওপর এত এত হস্তক্ষেপ। এর চেয়ে ফুটবলার হওয়া ভালো। সবই এআই দখল করে নিয়েছে, কিন্তু ফুটবলে ক্রিকেটে এখনো মানুষের কোনো বিকল্প নেই।’
মেসি, এমবাপ্পের ক্লোন ছিল ২টা করে। একজন করে আন্দিরার ফুটবল দলে খেলেছে, দ্বিতীয়জনেরা স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল।
কেউ কোনো দিন জানতেও পারল না, প্রায় ১০০ যুবক কোথায় গেল।