আঠাশতম জন্মদিনে নেহাল অফিস থেকে একটু দ্রুতই বেরিয়ে যায়। ভাবে—মিরান, রাফসান, মিলি ও নিলয় তাকে নিশ্চয়ই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আসবে এবং পাঁচজন একটা রেস্তোরাঁয় বসে অন্তত পরোটা, সবজি, গরুর মাংস খাবে। বেরিয়েই প্রথমে একটা লাল বেনসন ধরায় নেহাল। একটা ব্লু জিন্সের সাথে কালো পোলো শার্ট পরেছে সে। তাকিয়ে দেখে—বেশ ভুঁড়ি হয়েছে তার। ভাবে নাহ! ভুঁড়ি হতে দেওয়া যাবে না। জিমে ভর্তি হতে হবে। এই ভাবতে ভাবতে নেহাল রেলস্টেশনের দিকে আগায়। তখন গোধূলি শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। সূর্যটা পাইনগাছগুলোর ওপর দিয়ে লাল আভা ছড়াচ্ছে। পাখিগুলো নীড়ে ফিরছে। এই ছোট্ট শহরের গৃহস্বামীরা ফিরছে হাতে ছোট ছোট বাজারের পোঁটলা নিয়ে। নিজেকে বাজারের পোঁটলা হাতে গৃহস্বামী ভেবে নেহাল একটা মুচকি হাসি দেয়। আবার ভাবে—গৃহস্বামী ব্যাপারটি নেহাত এত খারাপ নয় হয়তোবা। স্টেশন থেকে একটু দূরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। নেহাল এক কাপ রং–চা নেয়। দোকানি বেশ যত্ন করে পুদিনাপাতা, লেবু, আদা দিয়ে চা বানিয়ে দেয়। কারণ, তারা চার বন্ধু আগেও এসেছে এই দোকানে। দোকানি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনের বন্ধুরা কই ভাই? আর অই আপায়? হের কি বিয়া অইছেনি?’ নেহাল হাসিমুখে বলে, ‘হ্যাঁ, মামা। সুন্দরী, তার ওপরে ভালো চাকরি করে। বিয়া না অইয়া যায় কই? সরকারি অফিসারের লগে বিয়া অইছে। সোনালী ব্যাংকের অফিসার আপার স্বামী।’ চা শেষ করে নেহাল হাঁটে রেলস্টেশনের দিকে, যেখানে ট্রেন থামে। গিয়ে বসে একটা বেঞ্চিতে। সাতাশতম জন্মদিনের সেলিব্রেশনের স্মৃতি রোমন্থন করে নেহাল। পাঁচ বন্ধু মিলে গিয়েছিল খুলনা শহরের বিখ্যাত চায়নিজ রেস্তোরাঁ বেয়ার বাটে। বন্ধু, কলিগ মিলে পনেরোজনকে ডিনার করিয়েছিল। কত কী উপহার সামগ্রী পেয়েছিল! সবাই মিলে ডিনার শেষে রেলস্টেশনে বসে বিয়ার খেয়েছিল। আনন্দ-ফুর্তি করতে করতে রাত এগারোটা বেজে গিয়েছিল। বেয়ার বাট মানে নগ্ন নিতম্ব। এই নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল। বলেছিল, এখনই প্যান্ট খুলে দেখাতে হবে। আন্ডারপ্যান্ট থাকলে অসুবিধা নাই। মিলির জন্য এই চ্যালেঞ্জ নেওয়া হয়নি। মিলি বলেছিল, এটা না করলে সে খিচুড়ি আর গরুর মাংস নিজে রান্না করে খাওয়াবে। গত জন্মদিনে মা মোরগ-পোলাও রেঁধেছিল, পায়েস রেঁধেছিল। নেহাল বলেছিল ফ্রিজে রেখে দিতে, কাল খাবে। মা সেদিন কিছু বলেনি। নিঃশব্দে কেঁদেছিল আর না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। নেহাল জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘মা, এসব নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করতে হয় না। তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’ নেহালের মা রাজিয়া কিছু বলেনি। কেবল নিজের রুমের দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
হঠাৎ নেহালের মনে হয়, গত ছয় মাসে সে কোনো বন্ধুকে রেস্তোরাঁয় নিয়ে খাওয়ায়নি। গিফট করেনি। তাই বন্ধুদের কাছেও বুঝি সে আর আগের মতো প্রিয় নেই। দুয়েকজন সুন্দরীর সাথে পরিচয় হয়েছিল। প্রত্যেকেই নেহালের ম্যানলি চেহারায় মুগ্ধ হয় কিন্তু সবাই চায় গিফট, চাইনিজ রেস্তোরাঁয় ডিনার।
হঠাৎই নেহাল খেয়াল করল, একটু দূরে সেই বেঞ্চিতে ওই চাচা এসে বসেছে। নেহাল এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম চাচা। বসতে পারি?’ ভদ্রলোক বলেন, ‘বসেন বাবা।’ নেহাল জিজ্ঞেস করে, ‘চাচা কিছু যদি মনে না করেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’ ভদ্রলোক বলে, ‘জি বলেন বাবা।’ নেহাল জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি প্রতিদিন কার জন্য স্টেশনে এসে অপেক্ষা করেন?’ ভদ্রলোক একটু চুপ থেকে বলেন, ‘ও শুনে কী করবেন বাবা?’ নেহাল বলে, ‘বলেন না চাচা!’ ভদ্রলোক বলেন, ‘ছেলে মালয়েশিয়ায় গেছে এক বছর। পাঁচ মাস ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। তাই ছেলের জন্য অপেক্ষা করি। একদিন ঠিকই আইসা বুকে ঝাঁপ দিয়া পইড়া বলবে, বাজান আমি আইছি!’ নেহাল জিজ্ঞেস করে, ‘আপনে কি একা চাচা? চাচি কই?’ ভদ্রলোক বলেন, ‘সে মারা গেছে দুই মাস। আমার পোলায় সেই খবরও জানে না।’ রাত তখন আটটা ত্রিশ মিনিট। একটু পর ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটা বেদনাবিধুর, শূন্য চেহারা নিয়ে নিঃশব্দে চলে যায়।
অপেক্ষারত বৃদ্ধ পিতার এই অসহায়ত্ব নেহালকে সমূহ নাড়িয়ে দেয়। সে ভাবে, পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষ বহু সম্পর্কে সম্পর্কিত হলেও মানুষ আসলে ওই চরিত্রগুলোতে অভিনয় করে। কেউ আসলে কারও কিচ্ছু হয় না—না আত্মীয়, না বন্ধু, না পরিজন। মানুষ নিজের প্রয়োজন এবং নিজেকেই সারাক্ষণ বন্দনা করে। আদতে ভীষণ স্বার্থপর এক প্রাণী মানুষ। নিজের ক্ষুধাকেই ক্ষুধা ভাবে আর অন্যেরটা ভাবে বিলাসিতা। এসব ভাবতে ভাবতেও সে চিন্তা করে, বন্ধুদের একটা ফোন দেবে। সবার প্রথমে দেয় মিলিকে। এই মাস ছয়েক হয়েছে মিলির বিয়ে হয়েছে। বিয়েতে মিলি চার বন্ধুকেই নিমন্ত্রণ করেছে। চারজন মিলে মিলিকে একটা ল্যাপটপ উপহার দিয়েছিল। কালেভদ্রে মিলি নিজেও ফোন করে। এই পাঁচ বন্ধুই তো শেষ অবধি ছিল, যখন গ্রাফিকস ডিজাইনের তিন বছর মেয়াদি কোর্স করেছিল। মিলিকে ফোন দেওয়ার পর মিলি ফোন রিসিভ না করে এসএমএস পাঠিয়েছে, ‘বন্ধু, দেবরের জন্মদিন পার্টিতে। পরে কথা হবে। ভালো থাকিস।’ এরপর ফোন দেয় রাফসানকে। রাফসান ধরেই বলে, ‘মামা, আমি খালাতো বোনের আকদের অনুষ্ঠানে আইছি যশোরে মা-বাবারে নিয়া।’ এরপর সে ভাবে, নিলয়ের তো তেমন ব্যস্ত থাকার কথা না। ওকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। ফোন বেজে উঠতেই ফোন কেটে দেয় নিলয়। আবার ফোন দেয়। আবার কেটে দেয়। পরে মেসেজ দেয়, ‘বাসায় প্রচুর গেস্ট। কারণ, নানু অসুস্থ হয়ে পড়েছে খুব।’
ধীরে ধীরে আটাশতম জন্মদিনে নেহাল হাওলাদার বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিজেকে তার মনে হয় এক বিচ্ছিন্ন নির্জন দ্বীপ কিংবা তীব্র কোলাহল বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা একলা দেবদারু গাছ। এবার এই গল্পের নায়ক ভাবে, নাহ! মায়ের কাছে যাবে। গিয়ে মায়ের কোলে শুয়ে পড়বে।
হঠাৎ নেহালের মনে হয়, গত ছয় মাসে সে কোনো বন্ধুকে রেস্তোরাঁয় নিয়ে খাওয়ায়নি। কাউকে সিগারেট গিফট করেনি। মদ খাওয়ায়নি কাউকে। তাই বন্ধুদের কাছেও বুঝি সে আর আগের মতো প্রিয় নেই। ফেসবুকে দুয়েকজন সুন্দরীর সাথে পরিচয় হয়েছে, হয়েছিল। প্রত্যেকেই নেহালের পাঁচ ফিট, ছয় ইঞ্চি হাইট, শ্যামলা ম্যানলি চেহারা এসবে মুগ্ধ হয় কিন্তু সবাই চায় গিফট, চাইনিজ রেস্তোরাঁয় ডিনার, সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়া বা আউটিং..। ধীরে ধীরে আটাশতম জন্মদিনে নেহাল হাওলাদার বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিজেকে তার মনে হয় এক বিচ্ছিন্ন নির্জন দ্বীপ কিংবা তীব্র কোলাহল বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা একলা দেবদারু গাছ। এবার এই গল্পের নায়ক ভাবে, নাহ! মায়ের কাছে যাবে। গিয়ে মায়ের কোলে শুয়ে পড়বে। বলবে আজ জন্মদিনে চিংড়ি কারি আর ডাল ভুনার সাথে গরম ভাত খাবে। তারপর অনেকক্ষণ মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে গল্প করবে। মা আজ খুব খুশি হয়ে যাবে।
২
সুরুজ হাওলাদারের এক ছেলে, এক মেয়ে। ছোট্ট ছিমছাম সংসার। স্ত্রী রাজিয়া একটু চাপা স্বভাবের সংসারী মেয়ে। তাই কোনো দিন ঝগড়াঝাঁটি, বিপত্তি খুব একটা হয়নি। মান-অভিমান অল্পবিস্তর কিছু ছিল, কিন্তু তাতে সুখের তেমন ঘাটতি হয়নি। খুলনা নিউমার্কেটে শাড়ি-থ্রিপিসের দোকান। মাসে অন্তত পঞ্চাশ হাজার টাকা উপার্জন ছিল। দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সংসারের খরচ—সবই সুন্দরভাবে চলছিল। সুরুজ হাওলাদার খেত প্রচুর বিড়ি, সিগারেট। পুত্র নেহাল যখন বিকম পড়ে, তখনই ধরা পড়ল ফুসফুস ক্যানসার। আর তাতে চলে গেল, সেই কাপড়ের দোকানের ব্যবসার সবই। সব খুইয়ে সুরুজ হাওলাদার এক বছর ক্যানসারে ভুগে মারা গেলেন। সোনার সংসার যেন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তখন নেহালের বিকম পরীক্ষার আর চার মাস বাকি।
ধীরস্থির রাজিয়া সেই ছাইভস্মের ভেতরই আবার স্বপ্নের চারা গাছ রোপণ করতে শুরু করলেন। আগে থেকে সংসারে কেক, বিস্কুট, পিঠা বানাতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি কোর্স নামে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন প্রশিকা থেকে। এরপর শুরু করেন বেকারিতে বিস্কুট, ব্রেড, কেক সাপ্লাই দেওয়ার ব্যবসা। নেহালের বিকম পাস হয়ে গেলে গ্রামের বাড়ির জমি বিক্রি করে দেয় রাজিয়া। একটা প্রসিদ্ধ ইনফরমেশন টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে গ্রাফিকস ডিজাইন কোর্স করিয়ে ছেলেকেও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একটা বড় বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে চাকরি করছে। পাশাপাশি শুরু করেছে নিজের ছোট একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কিছুদিন আগে বিয়ে দিয়েছে বোনকে। প্রায় আট-দশ লক্ষ টাকা খরচ করেছে নেহাল। আবার নিজের অফিসের ইন্টেরিয়র, একটা হাই কনফিগারেশন পিসি—এসব মিলে গেছে আরও পাঁচ লক্ষ। তাই আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগের মতো রেস্তোরাঁয় যাওয়া হয় না। মদ-বিয়ারেও সন্ধ্যা ঝলসে ওঠে না। সেসব বন্ধুরও চেহারা আর দৃশ্যমান হয় না। বরং কারও কারও কথার টোনে ঠান্ডা ঈর্ষা ঝরে পড়ে। সখ্য হারিয়ে যায় পথের মতো।
মেয়ে থাকে ঢাকায়। ছয় মাসে একবার হয়তো খুলনা বেড়াতে যায়। তখন কিছুদিন ব্যস্ত সময় কাটে রাজিয়ার। এ ছাড়া আলস্য আর নিঃসঙ্গতায় রেহানা কেবলই হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছিল। বোনের বিয়ের পর নেহাল মাকে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। এ ছাড়া নিজের বেকারি আইটেমের জন্য একটা পেজও খুলে দেয়।
মেয়ের বিয়ের পর রাজিয়া একদম একা হয়ে গেছে। মেয়ে থাকে ঢাকায়। ছয় মাসে একবার হয়তো খুলনা বেড়াতে যায়। তখন কিছুদিন ব্যস্ত সময় কাটে রাজিয়ার। এ ছাড়া আলস্য আর নিঃসঙ্গতায় রেহানা কেবলই হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছিল। বোনের বিয়ের পর নেহাল মাকে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। এ ছাড়া নিজের বেকারি আইটেমের জন্য একটা পেজও খুলে দেয়। একটা ভালো স্মার্টফোন কিনে দিয়ে এর অপারেশন শিখিয়ে দেয় মাকে। ভাবে, মা নিজের ব্যবসা এবং মেয়েবোনদের সাথে গল্প করে ভালো থাকবে। নিজের জগতে ব্যস্ত থাকবে। নেহালও নিজের কাজগুলো নিজের মতো করতে পারবে। স্মার্টফোন খুব ভালো অপারেট করতে শিখে গেছে রাজিয়া। নিজের ব্যবসাও বেশ ভালো প্রসারিত হয়েছে। ফেসবুকে ভালোই অর্ডার পায়। রেখেছে একজন স্থায়ী সহকারী। চেহারায় বেশ সুখী–সুখী একটা ভাব এসেছে রাজিয়ার। কাপড়চোপড় পরে ভালো। ভালো খাওয়াদাওয়া করে তাই চুয়ান্ন বছরের রাজিয়াকে কখনো কখনো পঁয়তাল্লিশ বলে ভ্রম হয়। ফেসবুকে আজকাল বেশ বন্ধুবান্ধব জুটেছে তার। নেহাল নিজেকে নিয়ে এবং নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাতে বাসায় ফিরলে কখনো একসাথে খায়, আবার কখনো খেয়েই ফেরে। রাজিয়াও অনুযোগ, অভিযোগ বাদ দিয়ে নিজের জগতে ব্যস্ত হয়ে যায়, যেমন ব্যস্ত হয়ে গেছে তার ছেলে নেহাল।
৩
বাসায় ফিরে কলিং বেল টিপতেই এসে দরজা খোলে রাজিয়ার কাজের সহকারী ফিরোজা। ফিরোজা অত্যধিক কালো ও স্থূল। তার স্তন দুটো যেন শরীরের বাঁধ ভেঙে ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু হাসিটা একেবারে বর্ষাভেজা পাতার মতো সতেজ, সুন্দর। সে–ই সতেজ হাসি দিয়ে বলে, ‘ভাইজান, আপনে কিছু খাইবেন এহন? চা বা কিছু?’ নেহাল বলে, ‘চা দিতে পারিস এক কাপ। মা কোথায়?’ ফিরোজা বলে, ‘খালাম্মায় তো আইজকাইল নিজেই রুমেই দরজা আটকাইয়া থাহে। আগে তো টিভি দেকতে আইজকাইল টিভিও দেহে না।’ নেহাল বলে, ‘আচ্ছা, তুই যা চা নিয়া আয়।’ কাপড় ছেড়ে নেহাল বিছানায় শুয়ে পড়ে। হঠাৎই নিজের প্রিয় একটা গান শুনতে ইচ্ছে হয়। নেহাল আবার ভাবে, একটা মুভি দেখলে কেমন হয়? তারপর ভাবে, ‘আচ্ছা, আগে একটা গান শুনি, তারপর চা খেয়ে মাকে গিয়ে ডাকব।’ মায়ের সাথে বসেই একটা কলকাতার মুভি দেখব। যেটা মায়ের সাথে দেখা যাবে। অথবা শুয়ে শুয়ে মায়ের সাথে গল্প করবে। মাকে বলবে চুলে হাত দিয়ে দিতে।
পুরুষ কণ্ঠ বলছে, ‘রাজি না হওয়ার কিছু নেই। তুমি সব দায়িত্ব পালন করেছ। তোমার নিজের জীবনের ভাবনা তুমি ভাবতেই পারো। তাতে দোষের কিছু নেই। তা ছাড়া আমি উকিল। এসব বিষয় আমি দেখব। আমার ছেলে দেশেও নেই, কিন্তু সে-ও ঝামেলা করতে পারে। এসব আমি দেখব। তুমি ভেবো না।
ফিরোজার দেওয়া চা খেয়ে নেহাল একদম রিফ্রেশ হয়ে যায়। ভাবে, নাহ মেয়েটা কাজ শিখেছে। আর গানটা যেন তাকে একদিকে বিবশ করে দেয় ভালোলাগায়, অন্যদিকে গভীর ভাবনায় ফেলে দেয়। নিজের ভেতর ডুব দিয়েই ভাবতে থাকে, মানুষ সম্পর্ক ছাড়া থাকতে পারে না। আবার কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়। মানুষের কখনো কখনো একাকিত্ব চাই, আবার কখনো গভীর সখ্যে জড়ানো সঙ্গ চাই। প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজেও কি জানে কী তার সুখ, কী তার দুঃখ! কোনটা তার প্রাপ্তি, কোনটা তার অপ্রাপ্তি!
৪
বারান্দায় গিয়ে একটা লাল বেনসন ধরায়। কয়েক টান দিয়ে ফেলে দেয় সিগারেট। তারপর এগিয়ে যায় মায়ের রুমের দিকে। নেহাল গিয়ে মাকে ডাকবে, এর মধ্যে শুনতে পায়—মায়ের কিটকিট করা হাসি। একটা পুরুষ কণ্ঠ দরাজ গলায় বলছে, ‘রাজিমনি তুমি এখানে অনেক সুন্দর। তোমার বয়স চুয়ান্ন কে বলবে? শোনো, তুমি ছেলের বিয়ে দাও। তারপর তুমি-আমি আবার সংসার করব। তুমি চুয়ান্ন, আমি আটান্ন তাতে কী? আমাদের মন তো আর বুড়ো হয়নি।’ রাজিয়া বলছে, ‘আমার ছেলে রাজি না হয় যদি?’ পুরুষ কণ্ঠ বলছে, ‘রাজি না হওয়ার কিছু নেই। তুমি সব দায়িত্ব পালন করেছ। তোমার নিজের জীবনের ভাবনা তুমি ভাবতেই পারো। তাতে দোষের কিছু নেই। তা ছাড়া আমি উকিল। এসব বিষয় আমি দেখব। আমার ছেলে দেশেও নেই, কিন্তু সে-ও ঝামেলা করতে পারে। এসব আমি দেখব। তুমি ভেবো না। তোমার বেকারি ব্যবসা আর আমার ওকালতি ব্যবসা দুই মিলে আমাদের বেশ ভালোই চলবে। তুমি ক্যামেরা অন করো। কী রঙের জামা পরেছ? ব্রা পরেছ?’ রাজিয়া, ‘বলছে ছি, ছি! সালাম তুমি খুব খারাপ! একটুও লজ্জা নেই তোমার!’ পুরুষ কণ্ঠ বলছে, ‘প্লিজ রাজিমনি, ক্যামেরা অন করে একটু তোমার অই দুটো দেখাও। কাল একবার তোমাকে বাসায় নিয়ে আসব, আসবে তো?’ রাজিয়া হাসতে হাসতে বলছে, ‘জানি না, যাও! ডাকাত কোথাকার!’ নেহালের মনে হয়, দেয়ালের ওপাশে একটা উত্তাল সমুদ্র। দরোজা খুললেই সে সেই সমুদ্রে ডুবে মরে যাবে।