আব্বা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শুক্রবারের সকালটা ভালো লাগে তাদের। শুধু এদিনটি তাদের কাছে আবছায়া নয়।

কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আবিষ্ট পুকুর থেকে ফোটা পদ্ম যেন চলে আসে তাদের কাছে। সকালের চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠায় আগের রাতের ওম থাকে। দুপুরে নামাজের পর বিকেলের আগ অবধি সুনসান নীরবতার ভেতর গ্রামের বাড়ির পেছনের যে লেবুগাছের নিচের সোঁদা গন্ধ বা ভোরবেলা মোরগ-মুরগির ডেকে ওঠা সেসব ধরা দেয় তাদের মধ্যে। তারা তখন আরও ঘনিষ্ঠ হয়। আর সেসব মুহূর্তে ফাতেমা জানতে চায়, ‘বাবা হইতে ইচ্ছা করে না তোমার?’

তখন খুব অসহায় লাগে হারুনের। শুধু অসহায় বললে ভুল বলা হবে, একটা অজানা ভয় কাজ করে, সে বালিশে মুখ গুঁজতে গুঁজতে হয়তো বলে, ‘না করে না।’ এ রকম মুহূর্তে হারুনের সামনে ফুল ফোটে যেন। হরেক রকম। শেফালি, বকুল, ছাতিম, ঘাস, গাদা, সূর্যমুখী—কত কী!

ফাতেমা একদিন বলছিল, ‘দুইবার অ্যাবরশন করাইছো। আরেকবার হইলে তোমারে জানাইমুই না। বাপের বাড়ি চইলা যামু।’

সেদিন আরও ভয় পেয়েছিল হারুন। সে জড়িয়ে ধরে ফাতেমাকে বলেছিল, ‘এমন কাজ কোনো দিনও করবা না।’

ফাতেমা মাঝেমধ্যে ভাবে, কেন হারুন বাবা হতে চায় না। সে তো অক্ষমও না। তাহলে? ফাতেমা দেখেছে হারুন শিশুদের আচরণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু সেটা দূর থেকে। তার যেন শিশুদের প্রতি সব মুগ্ধতা দূর থেকে।

আজ শুক্রবারের সকালটা বৃষ্টির কারণে শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া দিয়ে শুরু হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটা ব্যস্ত দিনের পেছনে ছোটার তোড়জোড় শুরু করার কিছু নেই। অন্য ছয় দিনের সকালের কোনো বৈশিষ্ট্যই হয়তো তেমন করে ধরা পড়ে না তাদের চোখে। নাশতা করা, হারুনের টিফিনবক্স রেডি করা, নিজে তৈরি হওয়া, এরপর মোটরবাইকে হারুনের পেছনে চেপে বসা। হারুন ফাতেমাকে তার স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যায়। অনেক অনেক স্ট্রেসের একেকটা দিন নয় আজ।

আজও ফাতেমার ঘুম ভাঙার পর হারুনকে দেখে শিশুর মতো শুয়ে আছে। বড় মায়া লাগে এই মুখের জন্য। সে কপালে চুমু খেয়ে চা বানাতে যায়। না, কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

নাশতার সময় হয়তো সকাল সাড়ে ১০টা বাজে। কারণ, এই একটা দিন তারা ঘড়ির টাইমে চলে না, ফাতেমা অনেক অনেক দিন পর আবারও হারুনকে বলে, ‘কি আব্বা হবা না?’

হারুন কোনো দিনই ফাতেমাকে বলতে পারবে না, সে কেন ‘বাবা’ হতে চায় না। সেই একটা ঘটনা ও কিছু অনুভূতি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যেসব কথা সে কাউকে বলেনি আর বলতে পারবে না। তবে এটা হারুন বুঝতে পারছে এত বছরে, ওই একটা ঘটনাই ঘটেছিল। সেই একটা ঘটনাই তাকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, যদিও ওই ঘটনার মতো কোনো নতুন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি।

হারুন নিরুত্তর। টিভিতে খবর দেখছিল। ফাতেমার হারুনের এই আচরণকে কেন জানি খুব অদ্ভুত মনে হয়। সে শিশু ভালোবাসে। একেকটা শিশুকে একেকটা ফুলের মতো দেখে আবার কোথায় যেন সে ভয়ও পায়। যেমন শিশুদের কোলে নেয় না। কাছে ভিড়তে দেয় না। আবার দূর থেকে দেখে। যখন দেখে তখন হারুনের চোখের ইজেল যেন স্থির। যেন সেই ইজেলে একটা চোখ অন্ধকার হিংস্র আবার মায়াবী, আরেকটা চোখ যেন ঘুরতে থাকে পৃথিবীর মতো।

না, কখনোই বাচ্চা নেওয়ার পক্ষে না হারুন। কিন্তু ফাতেমা মা হতে চায়। সংসারের বয়স প্রায় সাত বছর হলো। দুজনেই চাকরি করে। খুব ভালো না, খারাপও নয়। ফাতেমা একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। হারুন পরিসংখ্যান ব্যুরোতে, এটাও সরকারি। কিন্তু হারুন বিয়ের রাতেই অনেক আদরের পর, ‘কখনোই মা হতে চাইবা না, আমার কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু আমি আব্বা হতে চাই না’ বলার পর ফাতেমা এ কথাকে জাস্ট কথার কথা ভেবেছিল। কোনো গুরুত্বই দেয়নি। তারপর দিনে দিনে হারুনের ব্যবহারে, সম্মানে মুগ্ধ হয়েছে। টান জন্মেছে। কিন্তু এত বছর পরও হারুন অটল তার সিদ্ধান্তে। কেন, কেন, কেন—ফাতেমা জানতে চাইলেও হারুন কিছু বলে না। সব সময়ই এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়।

হারুন কোনো দিনই ফাতেমাকে বলতে পারবে না, সে কেন ‘বাবা’ হতে চায় না। সেই একটা ঘটনা ও কিছু অনুভূতি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। যেসব কথা সে কাউকে বলেনি আর বলতে পারবে না।

তবে এটা হারুন বুঝতে পারছে এত বছরে, ওই একটা ঘটনাই ঘটেছিল। সেই একটা ঘটনাই তাকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, যদিও ওই ঘটনার মতো কোনো নতুন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। এটা ভাবলেই ভালো লাগে হারুনের। চারপাশ সুন্দর মনে হয়।

দুপুরের নামাজের পরপরই কলোনির একটা পাশের একটা ভবনের নিচে শোরগোল শোনা গেল। ফাতেমা দৌড়ে এসে খবরটা দিল, ‘এই, শুনতেছ, ওই যে জানালা দিয়া দেখো, পুলিশে ওই বাসাটা ঘেরাও কইরা নিছে। কোন ফ্ল্যাটে নাকি একটা বাচ্চা মেয়ের মাথাকাটা লাশ পাওয়া গেছে।’

হারুন মোবাইল স্ক্রিনে স্ক্রল করছিল বিছানায় শুয়ে শুয়ে। সে দেখে, একটি ভিডিও রিলস এল সামনে। গানটি বাচ্চারা করেছে ভেবে চালু করতেই দেখল, একটা হিন্দি গানের রিমেক এবং আট–নয় বছরের দুটি ছেলে মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো আচরণ করে গান গাইছে ও নাচছে। ‘বেশরম রং’ গানে দীপিকা ও শাহরুখ যেভাবে নাচছিল। এটা দেখেই তার ভেতরে ভয় জাগে। আর এই ভয়জাগানিয়া মুহূর্তেই ফাতেমা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে কথাটা।

হারুনের সেই কৈশোরের ঘটনাটা মনে পড়তে থাকে। দৃশ্যের ভেতরে দৃশ্য জন্ম নিচ্ছে। হারুনের তখন কতই-বা বয়স। চৌদ্দ, পনেরো হবে। সে নানুবাড়িতে গিয়েছিল। তখন স্কুল গ্রীষ্মকালীন ছুটি দিত। নানুবাড়ির পেছনে অনেক জায়গা। একেবারে শেষ মাথায় তেঁতুলগাছ। এরপর বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে ধূ–ধূ ধানখেত। সেই ধানখেত ধরে হাঁটতে হাঁটতে উত্তরের দিকে গেলে মালো পাড়া।

তারা দুজনেই নিরীহ জীবন পছন্দ করে। কোনো ঝুটঝামেলায় জড়াতে পছন্দ করে না। সন্ধ্যার দিকে খবর পায়, ওই বাসায় একটা শিশুকে খুন করার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।

এই প্রথম শুক্রবার তারা কোথাও বেড়াতে বের হয় না। ঘটনাটি জানার পর দুজনেই টিভি নিউজ ও নিউজ পোর্টালে এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট সব নিউজ দেখতে থাকে।

হারুন পরিসংখ্যান ব্যুরোতে কাজ করার সুবাদে জানে, গত বছরই তিন শর অধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ বছর যেন মাত্রা আরও বাড়ছে। সে ভয় পায়। রাতে ফাতেমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়। বলে, ‘দেখছ, এই জন্যই আমি আব্বা হইতে চাই না। আমার শিশুর নিরাপত্তা আমি দিতে পারুম না।’

সে যে কান্না করেছে, এটা অতি নাটকীয় মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু এই কান্নার পেছনেও তার একটি গোপন গল্প আছে। যেটা একজন সাইকোলজিস্ট ছাড়া আর কেউ জানে না। আর সেই কান্নার পেছনের গল্পের কারণেই সে আব্বা হতে চায় না।

হারুন সেই রাতে প্রায় ঘুমাতে পারে না। ফাতেমা বলে, ‘অহরহ ঘটতেছে। কিন্তু তুমি তো অ্যাবনরমালের মতো আচরণ করতেছ। ঘুমাইতে পারতেছ না, আমাকে জড়াইয়া ধইরা রাখতে বলতেছ।’

হারুনের সেই কৈশোরের ঘটনাটা মনে পড়তে থাকে। দৃশ্যের ভেতরে দৃশ্য জন্ম নিচ্ছে। হারুনের তখন কতই-বা বয়স। চৌদ্দ, পনেরো হবে। সে নানুবাড়িতে গিয়েছিল। তখন স্কুল গ্রীষ্মকালীন ছুটি দিত। নানুবাড়ির পেছনে অনেক জায়গা। একেবারে শেষ মাথায় তেঁতুলগাছ। এরপর বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে ধূ–ধূ ধানখেত। সেই ধানখেত ধরে হাঁটতে হাঁটতে উত্তরের দিকে গেলে মালো পাড়া। অবশ্য ধানখেত আর মালোপাড়ার মধ্যে একটা মরা খাল। হেঁটেই পেরোনো যায়। মালোপাড়াতে হিন্দুদের বসবাস। সন্ধ্যার পর কাসার ঘণ্টা বেজে ওঠে। শঙ্খ ধ্বনি বেজে ওঠে। তিন বছরের ছোট খালাতো বোন তিতলিকে নিয়ে রোকন গিয়েছিল। ধানখেত আর খালের ওপারে সনকাপনের মাঠ পেরিয়ে চড়কপূজা দেখতে।

মালোপাড়ায় হারুন তিতলির আঙুল জড়িয়ে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে ভেসে আসছিল ছাতিমফুলের গন্ধ। তারা দেখছিল একটা উঁচু কাঠের খুঁটি বা চড়কগাছ। এই গাছের চূড়া থেকে সন্ন্যাসীদের পিঠে বা শরীরে বড়শি বিঁধে দেওয়া হয়েছে। চড়কি পাক খাচ্ছে। সন্ন্যাসীরা বড়শি বাঁধা অবস্থায় ঘুরছে। আর মুখে ‘হরে হরে হরে হরে’ শব্দ করছে। অল্প দূরে আরেক ভক্ত ধারালো বঁটির ওপর দাঁড়ানোর মতো নানা ভয়ংকর শারীরিক কসরত প্রদর্শন করছিল। এসব দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসে। সে সময় হারুনের মধ্যে প্রথম কী জানি কী হয়, তিতলিকে চুমু খায়, কিছু স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতে থাকে। অথচ তিতলির বয়স মাত্র ছয় বছর।

হারুন ওই একটা ঘটনার পর ভেতরে ভেতরে শিশুদের দেখলেই নিজেকে ‘আব্বা’র অবস্থানে খুঁজে নেয় এবং তার ওই যৌন প্রবৃত্তি ক্রমশ নাই–ই হয়ে গিয়েছে। তবু ও রকম কিছু ঘটলে তার ভেতর ভয় কাজ করে। তার শিশুধর্ষককে গিয়ে মারতেও ইচ্ছা করে।

তিতলির কাছে এটাকে বড় ভাইয়ের আদরই হয়তো মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রথম হারুন রাতে ঘুমানোর সময় ভয় পেল, মনে প্রশ্ন জাগে সে এমন করল কেন? তার মধ্যে শিশুদের দেখলে আদর করার গোপন ইচ্ছা জাগে কেন? এবং এই আদরের গোপন ইচ্ছাটা তো স্বাভাবিক না, নোংরা চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে। হারুনের নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। অপরাধবোধ থেকে তার মনে হয় সে যেন ছিটকে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন। তার ওপর সবাই থুতু ফেলছে। মাছি ভিড় করছে। সে পড়ে আছে। কোনো খাদের পাশে, কোনো দুর্ঘটনার পর বেওয়ারিশ লাশ যেমন পড়ে থাকে।

হারুন সেই থেকে শিশুদের দূর থেকে দেখতে শুরু করে। কাছে যায় না। তারপর ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর মোহাম্মদপুরে এক সাইকোলজিস্টের কাছে যায়। তিনি হারুনকে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি দেন। একজন সাইকিয়াট্রিকের হেল্প নিতে বলেন। সাইকিয়াট্রিক হারুনকে হরমোন নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেন। জানান, হারুন পেডোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত। তার বিয়ের পর কখনো সন্তান না চাওয়াই ভালো। আর শিশুদের ফুলের মতো দেখার কথা বলেছিলেন। শিশুরা ফুল। ছাতিম ফুল। বকুল ফুল। শেফালি ফুল। শিশুদের হামাগুড়ি দেওয়া, প্রথম শব্দ উচ্চারণ, প্রথম কিছু ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, ঘুমের ভেতর ঠোঁট বাঁকিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করা, ঘুম শেষে অপার বিস্ময়ে চারপাশ দেখা, বাসার দরজার আড়ালে লুকিয়ে ‘আব্বু–আম্মু কই আমি’ বলা—এসবই ট্রেজার অব হ্যাভেনলি জয়। এই হ্যাভেনগুলোর সব শিশুরই আপনি ‘আব্বা’ হয়ে উঠুন।

হারুন ওই একটা ঘটনার পর ভেতরে ভেতরে শিশুদের দেখলেই নিজেকে ‘আব্বা’র অবস্থানে খুঁজে নেয় এবং তার ওই যৌন প্রবৃত্তি ক্রমশ নাই–ই হয়ে গিয়েছে। তবু ও রকম কিছু ঘটলে তার ভেতর ভয় কাজ করে। তার শিশুধর্ষককে গিয়ে মারতেও ইচ্ছা করে।

কিন্তু সে এত ভিতু যে তার যেন কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই। সে শুধু ফুল দেখে সেসব বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে।

হারুন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এখন।

তার শরীরে অনেক থুতু লেপ্টে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এমন।