ঊর্মিলা নিদ্রা

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

‘শুনছি সামনের সপ্তাহে আমারে কাশিমপুর পাঠায়া দিব!’

মনোজ অধিকারীর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল সুবর্ণা, ‘কাশিমপুর কত দূর! কেমনে যামু ওইখানে?’

‘তোমাগো যাইতে হইব না। কোর্টত তুললে আবার আইসো। তুমি বরং ভাইর লগে যোগাযোগ রাইখো। ভাই নিশ্চয় আমারে জেল থিকা বাইর করতে সাহায্য করব।’

সুবর্ণা মাথা নিচু করে রইল। কিছু বলল না। মনোজের ‘ভাই’-এর যে কোনো পাত্তা নাই, সে কথা আর তুলল না এখানে। কী দরকার স্বামীকে হতাশ করে? থানাহাজতে ভীষণ ভিড়। প্রচণ্ড গরম। অথচ এর মধ্যেও সে হাই তুলছে। রাতে মোটেও ঘুম হয়নি। অনেক রাত ধরেই হয় না।

মনোজ এবার আট বছরের ছেলের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ওর ইশকুল বন্ধ কইরো না। ইশকুলোত যায় তো নিয়মিত? লেখাপড়া করতেছে ঠিকমতো?’

সুবর্ণা এবারও অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। ওপাশে একটা মেয়ে ওড়না মুখে চেপে হু হু করে কাঁদছে, আর গরাদের ভেতর থেকে তার বাপ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, সেদিকে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। মুশকিল হলো, ওর নিজের কোনো কান্না আসে না। চোখ দুটো চৈত্রের মাঠের মতো খরখরে হয়ে থাকে। সৌরভের স্কুলে নতুন বছরের ভর্তি ফি দেওয়া হয়নি। তাই আর সৌরভের স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না। রশিদ কাকার কাপড়ের দোকানে সেলাইয়ের কাজ নিয়েছে সুবর্ণা। সহজে কি কেউ ওকে কাজ দেয়? মনোজ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর ভয়ে কেউ তাদের কাছেই ভিড়ত না। প্রায় একঘরে হয়ে ছিল কয়েক মাস। এখন সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। পাড়া–প্রতিবেশীরাও খোঁজখবর নিচ্ছে। বাপের বাড়ি বলে কিছু নেই সুবর্ণার, মামাবাড়ি থেকে এটা–ওটা পাঠিয়ে সাহায্য করছে মাঝে মাঝে। খালি খোঁজ নেই মনোজের সেই ‘ভাই’য়ের। যে ‘ভাই’য়ের কথায় সেই দিন মদনপুর মোড়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে মারামারি করতে ছুটে গেছিল মনোজ। সেই দিনকার পুলিশি তৎপরতার পর থেকেই ‘ভাই’ নিখোঁজ। একটা ফোনও করেনি কোনো দিন। কোনো খোঁজ নেয়নি ছোট ভাই–বেরাদরদের পরিবারের।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুবর্ণা মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে হাত জোড় করে বিদায় নিল।

‘আসি।’

‘আইচ্ছা যাও।’

‘কিছু লাগলে খবর দিয়ো।’

‘কিছু লাগব না। তুমরা ভালা থাইকো। ভাইয়ের লগে যোগাযোগ রাইখো।’ কথাটা আবার মনে করিয়ে দিল মনোজ।

দুই দিনের মইদ্যে কত কিছু হয়া যাইতে পারে! সময় চইলা গেলে আফসোস করবেন।’ বলল অল্পবয়সী ছেলেটা। মাঝবয়সী লোকটা তখন হাত নেড়ে বলল, ‘আইচ্ছা আমরা দুই দিন পরই আমু নে। চিন্তাভাবনা কইরা জানায়েন।

স্বামীকে গরাদের ওপারে রেখে ছেলের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে বেরিয়ে এল সুবর্ণা। বাইরে গনগনে রোদ। মানুষের ভিড়। কারাগারে বন্দী গিজগিজ করছে। বাইরে গিজগিজ করছে তাদের স্বজনেরা। জীবনে কখনো সরকারি অফিস–আদালতে পা রাখেনি সুবর্ণা, থানাহাজতে তো নয়ই। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছিল। তখন এসএসসি পরীক্ষা চলে সুবর্ণার। ছেলের টুকটাক ব্যবসাপাতি আছে, গঞ্জে কাপড়ের দোকান আছে একটা, মোটামুটি সচ্ছল। রাজনীতি করে। তা ব্যবসা করতে গেলে একটু–আধটু রাজনীতি করতেই হয়। বড় ‘ভাই’দের পেছন–পেছন ঘোরাঘুরি করতে হয়। মাঝে মাঝে মিছিলে–সভায় যেতে হয়। সব ঠিকঠাকই চলছিল। শেষ পর্যন্ত এই পরিণতি হবে কে জানত? গঞ্জের কাপড়ের দোকানটাও পুড়ে শেষ। যেদিন মদনপুরে দুই পক্ষের মারামারি লাগল, সেদিন ভাইয়ের দলের লোকেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে রেহাই পায়নি, পুলিশ ঠিকই খুঁজে বের করেছে সবাইকে। শুধু পায়নি স্বয়ং ‘ভাই’কেই। তিনি নিরাপদে সরে গেছেন। আর কোনো খোঁজ মেলেনি তাঁর। অথচ এই লোকটার কথায় কিনা তারা জীবন বাজি রেখে মারামারি করতে গেছিল। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুবর্ণা ছেলেকে নিয়ে অটোরিকশায় উঠল। যেতে হবে বহুদূর। সেই চাষাঢ়া।

ধ্বনির সঙ্গে যেমন থাকে প্রতিধ্বনি, যশের সঙ্গে যেমন গৌরব, উজ্জ্বল অস্ত্রের সঙ্গে যেমন থাকে তীক্ষ্ণ দীপ্তি, তেমনি রামের পাশে লক্ষ্মণ। রামের বহিঃস্থিত আত্মা যেন সে। লক্ষ্মণ কাছে না থাকলে রামের ঘুম হয় না। সুখাদ্যে রুচি হয় না। তাই তো লক্ষ্মণ ছুটে এসে রামের চরণ দুটি ধরে আকুল ক্রন্দনে ভেঙে পড়লেন, ‘রাঘব, আমিও আপনার সঙ্গে যাব। আপনাকে ছেড়ে ত্রিভুবনের ঐশ্বর্য চাই না। স্বর্গ কিংবা দেবত্বও কামনা করি না।’

রাম বললেন, ‘বেশ, তাহলে চলো আমার সঙ্গে। আচার্য বশিষ্ঠের গৃহ থেকে সঙ্গে নাও আমার বরুণপাশ, অক্ষয়, তৃণ, সূর্যতুল্য মণিময় খড়্গ আর অগ্নিময় যত আযুধ অস্ত্র। মাতা ও প্রিয়জনের কাছে বিদায় নিয়ে এসো।’

অনেক আগে মনোজের সঙ্গে পুজোর সময় মেলায় পালা দেখতে গিয়েছিল সুবর্ণা—সীতার বনবাস। কেন যেন সীতার দুঃখ–কষ্টের চেয়ে তখন তার বুকে বেশি বেজেছিল ঊর্মিলার কষ্ট। বড় ভাইয়ের সঙ্গী হয়ে গৃহ ত্যাগ করল ছোট ভাই লক্ষ্মণ, অস্ত্র হাতে নিল ভ্রাতৃবধূকে পাহারা দেবে বলে, কর্তব্যবোধে, কই একবারও তো নিজের স্ত্রী ঊর্মিলার কথা ভাবল না! মাতা সুমিত্রাও তো একবারও বললেন না, তোমার যেয়ে কাজ নেই, কে রক্ষা করবে তোমার স্ত্রীকে? স্ত্রীকে রক্ষাও তো কর্তব্য? বরং তিনি লক্ষ্মণকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘বৎস, আমি তোমাকে বনগমনের অনুমতি দিচ্ছি। রামের সঙ্গে তুমি যাবে, নিশ্চয়ই যাবে। সম্পন্ন অথবা বিপন্ন সকল অবস্থায় একমাত্র রামই তোমার আশ্রয়। রামকে তুমি পিতৃতুল্য মনে করবে। অরণ্যে বাস হবে তোমার অযোধ্যাবাস। তুমি আনন্দমনে যাও।’

মনোজের সঙ্গে সেদিন পালা দেখতে গিয়ে বারবার ঊর্মিলার জন্যই মন কাঁদছিল সুবর্ণার। তারপর এভাবেই অটোরিকশা চড়ে তারা চন্দ্রালোকিত রাতে বাড়ি ফিরেছিল দুর্গাপূজার আগে, কার্তিকের হিমেল হাওয়া খেতে খেতে। আজ আবার সেই দিনের কথা মনে পড়ছে। বছর ঘুরে আবার পুজোর মৌসুম চলে এসেছে। কিন্তু সুবর্ণা অধিকারীর সুদিন গেছে হারিয়ে।

গাঁয়ের উঁচু–নিচু পথে অটোরিকশা দুলছিল ভয়ানকভাবে। এক হাতে ছেলেকে জড়িয়ে রেখেছিল সুবর্ণা যাতে ছেলে পড়ে না যায়। বাড়ির কাছাকাছি আসতে দেখে, ওপাড়ার দুটো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে উঠানে। বুক কেঁপে উঠল সুবর্ণার। আবার কী বিপদ!

‘বউদি, পুলিশ চার্জশিট দিতেছে। শুনছি আসামির তালিকায় মনোজদার নাম আছে। অগ্নিসংযোগ, সম্পদের ক্ষতিসাধন, আরও কী কী জানি মামলা।’ রিকশা থেকে নামতে না নামতে একটা ছেলে বলে উঠল। সুবর্ণা মাথায় কাপড় টেনে বলল, ‘শুনছি তারে কাশিমপুর নিয়া যাইতাছে।’

‘উকিল সাবে কী কয় বউদি? জামিন হইব না?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সুবর্ণা, ‘উকিলের ফিস দিতে পারি নাই ভাই। জানি না কী হইব।’

চারদিকে একবার তাকিয়ে ছেলেটা গলা নামিয়ে বলল, ‘দোকানটা বেইচা দেন বউদি। দাদার জামিন করান। ভালা উকিল ধরেন। আমাগো পরিচিত উকিল আছে। ঠিক জামিন করায়া আনব।’

সুবর্ণা চোখে আঁচল চেপে বলল, ‘ওনারে না জিগায়া কেমনে বেচুম? আর পোড়া দোকান কেডায় নিব?’

এবার অন্য লোকটা, এই লোকটাকে আজকাল পথে ঘাটে সভা–সমিতিতে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘আমরা ব্যবস্থা করুম নে। টেকাপয়সা খরচ করতে পারলে জামিন করা যাইব। দুই লাখ খরচ করতে পারলে চার্জশিট থিকা নাম সরানো যাইব।’

‘তার নিচ্চয়তা কী ভাই?’

এবার লোকটা হেসে ফেলল, ‘দুনিয়াতে কোনো কিছুর নিশ্চয়তা নাই বউদি। তবু চেষ্টা তো করতে অইব। আপনেগো বড় ভাই কুনো দিন আর ফিরা আইব না। হ্যায় দেশ ছাইড়া পলাইছে। অহন আমরা আছি। আমরা অহন এলাকা চালাই। আমাগোরে বিশ্বাস করেন। থানা-পুলিশ আমরা ম্যানেজ করুম নে।’

সুবর্ণা মুখ নিচু করে বলল, ‘এট্টু ভাইবা লই। সৌরভের বাপরেও জিগায়া লই। দুই দিন সময় দেন ভাই।’

‘দুই দিনের মইদ্যে কত কিছু হয়া যাইতে পারে! সময় চইলা গেলে আফসোস করবেন।’ বলল অল্পবয়সী ছেলেটা। মাঝবয়সী লোকটা তখন হাত নেড়ে বলল, ‘আইচ্ছা আমরা দুই দিন পরই আমু নে। চিন্তাভাবনা কইরা জানায়েন।’

সে রাতেও ঘুম এল না সুবর্ণার। ওপাশের ঘরে বৃদ্ধা শাশুড়ি শুয়ে আছেন। ছেলে যে জেলে আছে, সে কথাও তাঁর মনে থাকে না। থেকে থেকে ছেলের নাম ধরে ডাকেন, ‘মনোজ, ও মনোজ। মনোজ বাপ আমার। অহনও দোকান থিকা আইলি না? ও বউ, মনোজরে খাইতে দিলা না? হারা দিন না খায়া আছে।’

সুবর্ণা উঠে গিয়ে তাঁকে বলে আসে, ‘দিছি মা। খাইতাছে।’

‘কী রানছ?’

‘আইড় মাছ আনছিল সৌরভের বাপ। আর ডাঁটাশাক চিংড়ি দিয়া।’

‘আহা, আইড় মাছ আমারেও দিয়ো কাইল এট্টু। ছোটু ছোটু কইরা কাইটা ভুনা কইরো। লেবুপাতা দিয়ো এক টুকরা। সুবাস হইব।’ আইড় মাছের কল্পনায় বুড়ি ছেলের কথা বেমালুম ভুলে গেছে। আর জিজ্ঞেস করছে না মনোজের কথা।

‘দিমু নে মা। অহন ঘুমান।’ সান্ত্বনা দিল সুবর্ণা।

ভোর হওয়ার আগেই আইড় মাছের কথাও ভুলে যাবেন শাশুড়ি। এটাই যা আশার কথা। নইলে এই দুঃসময়ে মাছ কোত্থেকে জোগাড় করবে সুবর্ণা? সে সারাটা রাত খড়খড়ে দুটি চোখ মেলে কড়িবর্গার দিকে চেয়ে থাকে। সকাল হলেই যেতে হবে রশিদ কাকার দোকানে। সারা দিন পোশাকের হেম বুনে দেবে, শাড়ির ফল লাগাবে, ওড়নার লেস লাগাবে। দিন শেষে যে কটা টাকা দেবেন কাকা, তাই দিয়ে বাজার করতে হবে। তারপর বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না। রান্নাঘর ছেড়ে কখনো বাইরে যেতে হয়নি সুবর্ণাকে। এখন দোকানে কাজ করা, বাজার করা, থানায়–আদালতে দৌড়ানো—সব একাই করতে হয়। সারা দিন এত পরিশ্রম করে, তবু রাতে চোখ দুটো এক করতে পারে না। নিদ্রাদেবী তাকে চিরতরে ছেড়ে গেছেন। ঘরের আশপাশে একটুখানি শব্দ হলে চমকে ওঠে। বিড়াল কি বেজি হেঁটে গেলেও কান খাড়া করে। বাতাসে শুকনো পাতা উড়লে মনে হয় কে যেন উঠানে হাঁটছে। এই কদিনেই সে পুরুষ চিনেছে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ব্যাকুল লোলুপ পুরুষ। তার চোখ–কান সর্বদা খাড়া থাকে পরিবারের শুচিতা ও সম্ভ্রমের চিন্তায়।

শুচিতা, দয়া আর সত্য। দ্বাপর যুগে আরও একটি পদ চলে যায়। তখন থাকে দয়া এবং সত্য। শেষে কলিযুগে এসে ধর্ম শুধু এক পদ। ধর্ম দাঁড়িয়ে থাকে কেবল সত্যের ওপরে। বড় কঠিন সেই সত্য। সুবর্ণা একা সেই কঠিন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে, দণ্ডকারণ্যে লক্ষ্মণ কখনো জানতে পারেননি ফেলে আসা গৃহে ঊর্মিলার রাতগুলো কীভাবে কেটেছে। বরং নিদ্রাদেবীর কাছে তার প্রার্থনা ছিল মাতৃরূপী সীতাকে পাহারা দিতে গিয়ে তিনি কখনো যেন ঘুমিয়ে না পড়েন। কর্তব্য আর নিষ্ঠায় যেন ছেদ না পড়ে। নিদ্রাদেবী তাঁর সেই ঘুম অন্য কাউকে আরোপ করতে চেয়েছেন। সে আর কে হবে? সেই ঊর্মিলা। তাই তো ১৪ বছর কুশ শয্যায় ঘুমিয়ে থাকতে হলো ঊর্মিলাকে। কিন্তু সুবর্ণা যে একটু ঘুমাতেও পারে না! অথচ তার দুচোখে রাজ্যির ঘুম আর ক্লান্তি।

দোকানটা গেল। কিন্তু মনোজ ছাড়া পেল না। একবার জামিন হয়েও কারাগারের গেটে নতুন মামলায় আবার গ্রেপ্তার। এবার হত্যাচেষ্টার মামলা। আরও জটিল ব্যাপার। সুবর্ণা থানা আর আদালতে দিনমান ঘোরে, কোনো কাজ হয় না। সেই পরোপকারী ভাইয়েরা এবার বলতে শুরু করল, ‘বাড়িটাও বেচে দেন বউদি। স্বামীকে তো বাঁচাতে হবে। আমরা দেখছি কী করা যায়!’

সুবর্ণা ঘুমহীন ঘোলা চোখে তাদের দিকে চেয়ে থাকে। তার বারবার হাই উঠতে চায়, কোনোরকমে গোপন করে।

আশ্বিন আসতে না–আসতেই এক রাতে শাশুড়ি গত হলেন। সুবর্ণার তো কোনো রাতেই ঘুম নেই। সে রাতেও তাই জেগেই ছিল। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে শাশুড়ি চলে যাবেন। একফোঁটা কবিরাজি বা ওষুধ কিছুই দিতে পারেনি তাঁকে। মরার সময় একফোঁটা জলও না। নীরবেই চলে গেলেন। মৃতদেহ সৎকার করতে নাকি এক দিনের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার নিয়ম সন্তানকে। কিন্তু টাকাপয়সার অভাবে তা আর হলো না। প্রতিবেশীরা এগিয়ে না এলে সৎকারও করতে পারত না। মৃত ঠাকুরমার মুখাগ্নি করল সৌরভ। সে সময় ঢাকার নারিন্দা থেকে মনোজের জেঠতুতো দাদা এসে একটা প্রস্তাব করলেন, ‘সৌরভকে আমাদের কাছে দিয়ে দাও সুবর্ণা। আমার সঙ্গে থেকে গাড়ির মেকানিকের কাজ শিখবে। আমার বাড়ি থাকবে। খাবে–দাবে। এইখানে তার ভবিষ্যৎ কী? মনোজ কবে ছাড়া পায় ঠিক আছে?’

সুবর্ণা রাজি হলো। ছেলের আর পড়াশোনার আশা নেই। যদি কোনো কাজ শিখতে পারে তবে তা–ও ভালো। কিন্তু সুবর্ণা এখানে একা কীভাবে থাকবে? নাকি বাড়িটা সত্যি বিক্রি করে চলে যাবে ঢাকায় দাদাদের আশ্রিতা হয়ে? সবার এই প্রশ্ন।

সুবর্ণা মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি ভিটা ছাইড়া কোনহানে যামু না দাদা। আপনে সৌরভরে লয়া যান। আমি তার বাপের অপেক্ষায় থাকমু।’

তারপর সুবর্ণা একা হলো। অযোধ্যার প্রাসাদে ঊর্মিলার মতো একা। যার পক্ষে জগতে কেউ নেই। না স্বামী, না শ্বশুরকুলের কেউ, না পিতৃকুলের কেউ। আর সেই ভ্রাতা, যাকে রক্ষায় লক্ষ্মণ ঊর্মিলাকে এভাবে একা ফেলে কর্তব্যের তাগিদে চলে গিয়েছিল, সেই রামচন্দ্র সামান্য অপরাধে লক্ষ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। বশিষ্ঠের উপদেশে নির্বাসনের শাস্তি দিয়েছিলেন লক্ষ্মণকে। সরযু নদীতে দেহত্যাগ করতে হয়েছে চিরকালের অনুগত লক্ষ্মণকে। মনোজের সেই ভাইও আর কখনো ফিরে আসেননি। কোথায় আছেন কে জানে! অথচ মনোজ দেখা হলেই সুবর্ণাকে বলে, ‘তুমি ভাইয়ের লগে যোগাযোগ রাইখো কিন্তু। উনি তুমাগোরে নিশ্চয় দেখবেন। দেইখো, সব ঠিকঠাক হইলে উনি তুমাগো খোঁজ নিবেন।’

সুবর্ণা তাকে আশাহত করে না। বরং ঠিক এক বছর চার মাস একুশ রাত নির্ঘুম কাটানোর পর এবার সুবর্ণার ইচ্ছে হলো নিদ্রাদেবীর কাছে ঘুম প্রার্থনা করে। এখন আর সে কিছুই চায় না, স্বামীর মুক্তি না, হারানো দোকানটা না, ছেলের পড়াশোনা না, কিচ্ছু না। সে চায় শুধু একটুখানি ঘুমাতে। তা খড়ের বিছানায়ই হোক কি ঘাসের শয্যায়। শেষ পর্যন্ত অনেক তপস্যার পর অন্ধকারভাঙা কুটিরে নিদ্রাদেবী ধরা দিলেন তাকে। ১৪ বছর কেন, অনন্তকালের মতো সে এবার ঘুমিয়ে পড়ল নিশ্চিন্তে। পুরাণে একেই হয়তো ঊর্মিলা নিদ্রা বলে।