লোক
সন্ধ্যা হয়।
রহস্যময়।
কেন?
দুপুরের রহস্য নাই?
সকালবেলার?
তেমন ধরলে জগৎসংসারের পল অনুপল রহস্যমণ্ডিত। লোক সেই হিসাবের খাতা খুলে নাই। লোকনাথ দাস, বয়স ২৯। সে মনে করে ৩৯+। সন্ধ্যার এই সময়টার প্রতি টান আছে তার। টান। মায়া। গরিবের সন্ধ্যাবিলাসের মতো একটা ব্যাপার তাতে যেন ঘনীভূত হয়ে ওঠে। লোক একদা কবি ছিল। একদা কবিতা লিখেছিল: গরিব মানুষ সন্ধ্যার রূপ খায়।
কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকার কিছু খরচাপাতি আছে। কবিতা লিখে সেটা জোগাড় করা মুশকিল। পড়ালেখা করেছে বাংলায়। ইংরেজি ভালো পারে। ডিপার্টমেন্টের স্যারের সুপারিশে কাজ হয়েছে একটা প্রকাশনা সংস্থায়। কিছু বই অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ করে দিতে হয়।
থাকে নারিন্দায়। সাবলেট। শহীদুল জহিরের ‘দক্ষিণ মশুন্ডির’ বিখ্যাত ‘ভূতের গলিতে’। রামশংকর আচার্য থাকেন পরিবার নিয়ে, একটা ঘর সাবলেট দিয়েছেন লোককে। রামশংকর আচার্য জ্যোতিষার্ণব। হস্তরেখাবিশারদ এবং কুষ্ঠী বিচার পারেন। প্রভাবতী বউদি ইসলামপুর থেকে শাড়ি কিনে এনে বিক্রি করেন। যৎসামান্য লাভ তাতে থাকে। আচার্য দম্পতি নিঃসন্তান। জ্যোতিষার্ণব গণনা করে দেখেছেন, প্রভাবতী পরিণত বয়সে দুইবার সন্তানবতী হবেন। প্রভাবতী বউদির বয়স এখন একচল্লিশ–বেয়াল্লিশ হবে। হাসিখুশি মানুষ। লোককে ডাকেন বাবা লোকনাথ। বেশির ভাগ দিন সন্ধ্যায় এঁরা দুজন বাসায় থাকেন না, তনুগঞ্জ লেনে চেম্বার আছে, জ্যোতিষার্ণব সন্ধ্যায় সেখানে বসেন। প্রভাবতী বউদি শাড়ির ব্যাগ নিয়ে বের হন। লোকের তাতে যে লাভটা হয়, একা বসে সন্ধ্যার রূপ দেখতে পারে সে।
পুরোনো হলুদ রঙের তিনতলা বিল্ডিং। ঝরঝরে। তিনতলায় থাকেন আচার্যরা। দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদে ওঠা যায়। সন্ধ্যায় লোক একা ছাদে উঠে বসে থাকে।
পুরান ঢাকা, সন্ধ্যা হয়।
অধিকতর রহস্যময়।
লোক চায় না এই রহস্যের কিনারা হোক। সন্ধ্যার রহস্যময়তা চিরকাল অমীমাংসিত থাকুক মানে থাকবেই।
আজ বুধবার ২২ জুলাই। সারা দিন বৃষ্টি হয়েছে। ছাদ ভিজে গেছে, জল জমে গেছে। ঘুম ধরে গিয়েছিল লোকের। সুমধুর স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠেছে। আবদুর রহিম মধু স্যার তাকে ব্যাঙ হয়ে থাকতে বলেছেন। কুনিব্যাঙ না সোনাব্যাঙ ম্যানশন করেন নাই। স্বপ্নে কুনিব্যাঙ হয়ে ক্লাসরুমের জানালায় গোবরাটে বসেছিল লোক। মানুষ স্বপ্ন বানাতে পারে না—যে এই নির্দিষ্ট স্বপ্নটা দেখবে। যদি পারত? লোক প্রথম কী স্বপ্নটা বানাত? তার আর অত্রি সুরের মেয়ে হয়েছে।
অত্রি সুর অরবিন্দ সুরের দ্বিতীয় কন্যা? প্রথম কন্যা মৈত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে? লোক এসব কী ভাবছে? মাথামুথা গেছে? ছাদে কেউ উঠল। নারী জাতি। লোক তাকিয়ে দেখতে গেল না। মিষ্টি একটা ঘ্রাণে ভরে গেল ছাদ। সন্ধ্যার কিছু পাখি উড়ে গেল। ‘শুনছেন।’ চেনা কণ্ঠস্বর। লোক তাকাল। অত্রি সুর!
অফিসের কলিগ অত্রি সুর। কম্পিউটার সেকশনের একনিষ্ঠ কর্মী। তাকে নিয়ে আবোলতাবোল ভাবার একটা ফুরসত ইদানীং লোকের হয়েছে, যদিও সেটা অযথাই। অত্রি সুর কিছুই জানে না, জানবে না। অফিস কলিগ, দেখা হয় কথা হয়, এ পর্যন্ত একটা সম্পর্ক। কুশল বিনিময়ের অধিক কথা কখনো হয় নাই। অত্রি সুরকে কেউ যদি বলে দেয়, লোক স্বপ্ন বানায় অত্রি সুরের পেট থেকে তার কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে, সর্বনাশের চূড়ান্ত হবে। অত্রি সুর কী মনে করবে লোককে? তেইশ-চব্বিশ বছর হবে বয়স, অত্রি সুরের কি বয়ফ্রেন্ড নাই? এক হারামজাদাকে লোক একদিন দেখেছে, নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে অত্রি সুরের সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছিল। হারামজাদাকে ঘাড়ে দুইটা দিতে পারলে হতো। দ্বিতীয় স্বপ্নটা হতে পারে লোক উক্ত হারামজাদাকে ধরে বানাচ্ছে। স্বপ্ন যদি মোবাইল ফোনে ভিডিও করা যেত, তবে সেই স্বপ্নটা ভিডিও করে লোক ভাইরাল করে দিত। ভাইরাল ভিডিও অত্রি সুর নিশ্চয় দেখত। লোকের বন্ধু কাফিল সাইপ্রাসে থাকে। এসেছিল। মিলিত্তা কফি দিয়ে গেছে। সেই কফি এক মগ বানিয়ে মেঘলা সন্ধ্যা দেখতে লোক ভেজা ছাদে উঠেছে। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে হাজার বছর ধরে হাঁটছে এবং আকাশকুসুম ভাবছে যে মেয়েটাকে নিয়ে, তার নাম অত্রি সুর। অত্রি সুর কি গান গাইতে পারে? রবীন্দ্রসংগীত? অত্রি সুরের সঙ্গে যদি লোকের বিয়ে হয়, বিয়ের কার্ডে কী লেখা থাকবে? প্রজাপতয়ে নমোঃ। স্বর্গীয় মনোধীর দাসের একমাত্র পুত্র শ্রীযুক্ত লোকনাথ দাসের সহিত শ্রী অরবিন্দ সুরের দ্বিতীয় কন্যা অত্রি সুরের বিবাহ ধার্য হইয়াছে?
অত্রি সুরের বাবা কি অরবিন্দ সুর?
অত্রি সুর অরবিন্দ সুরের দ্বিতীয় কন্যা? প্রথম কন্যা মৈত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে?
লোক এসব কী ভাবছে?
মাথামুথা গেছে?
ছাদে কেউ উঠল। নারী জাতি। লোক তাকিয়ে দেখতে গেল না। মিষ্টি একটা ঘ্রাণে ভরে গেল ছাদ। সন্ধ্যার কিছু পাখি উড়ে গেল।
‘শুনছেন।’
চেনা কণ্ঠস্বর।
লোক তাকাল।
অত্রি সুর!
‘ওরে! ও তো আমার ছোড়দা। ছোড়দা কী রঙের ফতুয়া পরেছিল মনে রেখে বসে আছেন! আমি কী পরেছিলাম মনে করতে পারেন?’ ‘ফ্লোরাল প্রিন্টের কামিজ, গাঢ় নীল রঙের ওড়না, সবুজ রঙের সালোয়ার। চুলে কমলা রঙের গার্ডার।’ ‘ওররে!’
সত্যি অত্রি সুর! লোকের মাথায় কিছু ঢুকল না।
সন্ধ্যা হয়।
রহস্যময়।
এ আবার নারিন্দা ভূতের গলির সন্ধ্যা। শহীদুল জহিরের ভূতের গলি। লোক বিস্ময় গোপন করল না, ‘আপনি! কফি খাবেন?’
অত্রি সুর হাসল, ‘দেন। খাই।’
লোক তার মগ বাড়িয়ে দিল। অত্রি সুর নিল। চুমুক দিয়ে বলল ‘এহ্! এত চিনি খান!’
লোক হাসল।
জ্যোতিষার্ণব রামশংকর আচার্যের কাছে এসেছে অত্রি সুর। তার ভাইয়ের কুষ্ঠী বিচার করতে দিয়েছে। জ্যোতিষার্ণবের চেম্বারে গিয়ে তাকে পায় নাই, ভেবেছিল জ্যোতিষার্ণবের বাসা থেকে ভাইয়ের কুষ্ঠী নিয়ে যাবে। জ্যোতিষার্ণবের কার্ডে তার চেম্বার ও বাসার ঠিকানা আছে। নিচে কলবেল দিয়েছে অনেকক্ষণ। জ্যোতিষার্ণবের মোবাইল ফোন বন্ধ। ছাদের গেইট খোলা দেখে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে মনে করে অত্রি সুর ছাদে উঠে পড়েছে। ভালো করেছে। খুবই ভালো করেছে।
‘আপনাকে এখানে দেখব চিন্তা করি নাই।’ অত্রি সুর বলল।
লোক হাসল, ‘সাবলেট থাকি আপনার জ্যোতিষার্ণব মশাইয়ের বাসায়।’
‘সত্যি?’
‘না মিথ্যা। আমি মই বেয়ে মেঘে উঠছিলাম। আপনাকে দেখে মই থেকে লাফ দিয়ে এই ছাদে নেমে পড়েছি।’
অত্রি সুর খুব হাসল।
‘সেদিন আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?’ লোক বলল।
অত্রি সুর বলল, ‘কবে? কোন দিন?’
‘নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন রিকশায়, সাথে একটা ছেলে ছিল। চুল লম্বা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি–গোঁফ। সবুজ ফতুয়া পরে ছিল। সিগারেট টানছিল।’
‘ওরে! ও তো আমার ছোড়দা। ছোড়দা কী রঙের ফতুয়া পরেছিল মনে রেখে বসে আছেন! আমি কী পরেছিলাম মনে করতে পারেন?’
‘ফ্লোরাল প্রিন্টের কামিজ, গাঢ় নীল রঙের ওড়না, সবুজ রঙের সালোয়ার। চুলে কমলা রঙের গার্ডার।’
‘ওররে!’
সন্ধ্যা হয়। রহস্যময়। কফি শেষ। লোক দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদ থেকে নামল। জ্যোতিষার্ণব বা প্রভাবতী ফিরেছেন? ঘরে বাতি জ্বলছে। ধীরে–সুস্থে লোক কলবেল দিল। দরজা খুলে দিল অত্রি সুর।
অত্রি সুরের বাবার নাম অরবিন্দ সুর। বড় বোনের নাম মৈত্রী সুর—তার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন অত্রি সুরের জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকাপ্রবাসী গোটা আষ্টেককে খারিজ করে দিয়েছে অত্রি সুর। বিদেশ যদি যায় ঘুরতে যাবে, বৈবাহিক সূত্রে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক না সে। দেশি পাত্র যারা, তারা বোরিং। ভীষণ মনোটনাস। রেস্টুরেন্টে ট্রিট দিতে চায় শুধু। আধা বাংলা আধা ইংলিশে কথা বলে।
‘আপনার তো দেখি কাউকে পছন্দ না?’ লোক বলল।
অত্রি সুর বলল, ‘আপনাকে পছন্দ।’
‘কী?’
‘আপনি আমাকে বিয়ে করবেন? আমি আপনাকে বিয়ে করব।’
জয় বাবা লোকনাথ!
অত্রি সুর বিয়ে করল লোককে। নির্দিষ্ট সময়ে মেয়ে বিয়োলো। লোক সে সময় ছাদে বসে সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাতারা দেখছিল। তার মেয়ের নাম সে সন্ধ্যাতারা রাখল।
সন্ধ্যা হয়।
রহস্যময়।
কফি শেষ।
লোক দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদ থেকে নামল। জ্যোতিষার্ণব বা প্রভাবতী ফিরেছেন? ঘরে বাতি জ্বলছে। ধীরে–সুস্থে লোক কলবেল দিল। দরজা খুলে দিল অত্রি সুর।