অফিসার আশফাক রায়হান তখনো ফাইল হাতে টেবিলে। চোখে ঘুম, কপালে ক্লান্তির রেখা। সে ঠিক করেছিল, আজ রাতে আর কোনো ‘নন-ইমিডিয়েট’ কল রিসিভ করবে না।
তখনই বেজে ওঠে ফোন।
অফিসের রেড লাইন। ‘৯৯৯’ থেকে আসা কল; এই সময়ে?
আশফাক তাকায় হাবিলদার লতিফের দিকে। ধীরে ফোন তোলে।
‘হ্যালো।’
‘আমাকে বাঁচান। মেরে ফেলবে আমায়।’ এইটুকু সংক্ষিপ্ত বাক্যের পর ঠিকানা: রুকাইয়া, বাড়ি নম্বর ১২৪/সি, ফ্ল্যাট বি-৭১
‘আপনি ঠিক আছেন?’
কোনো উত্তর আসে না ওপাশ থেকে। লাইন কেটে যায়।
আশফাক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কণ্ঠটা কেমন যেন অস্বাভাবিক। আতঙ্কিত ঠিক, কিন্তু তার চেয়ে অধিক বাঁচার কাতরতা।
এ ধরনের ফোনে সাধারণত জোনে থাকা প্যাট্রল ইউনিট পাঠানো হয়। কিন্তু আশফাক আজ নিজেই যেতে চাইল। লতিফ অবাক হয়ে বলল, ‘স্যার, এখন তো আপনি ডিউটিতে নেই। দরকার হইলে ফোর্স পাঠাই?’
‘না, আমি যাচ্ছি।’
সময়ের নীরবতা ভেঙে আধা ঘণ্টার মধ্যেই আশফাক পৌঁছায় এক নিয়ন্ত্রিত ভাগ্যের অনিশ্চিত ভবিতব্যের দরজায়।
রুকাইয়ার ফ্ল্যাটের সম্মুখভাগ খোলা। লিফট থেকে বের হতেই হালকা মিউজিকের শব্দ, দূরে কোথাও কোনো পাগলের চিৎকারের প্রতিধ্বনি; অযথাই আশফাকের গা হিম হয়ে আসে। অশুভ নিশির ডাক যেন তাকে তাড়িত করে নিয়ে যায় এক মহাপ্লাবনের নৌকায়। ঘোরলাগা বিভ্রমে তাকে টানে আরও গভীরে। নিভু নিভু মোমের অগ্নিশিখার একটা নরম আলোর সঙ্গে তরুণীর ঠোঁটে লেপটে থাকা অ্যালকোহলের সামঞ্জস্যময় আহ্বানে আশফাক অবশ হয়। ঘরটার ভেতরে তীব্র সুগন্ধের বিহ্বলতা। সুইচবোর্ড খুঁজে পেলে উজ্জ্বল আলোয় স্পষ্ট হয়, বিছানায় এক তরুণীর অসাড় দেহ। নড়ছে না। তার গলায় দাগ, ঊরুতে চাপবাঁধা রক্ত। সামান্য কেটেছে যদিও। উঁচু নিতম্বের নগ্ন নিখুঁত শরীর। চুল ছড়ানো, চোখ অর্ধনিমীলিত, ঠোঁটে চাপা বিষাদ। যেন ঘুমিয়ে আছে সে, অথচ নিঃসন্দেহে মৃত।
পৃথিবীর সমস্ত রূপ যার পায়ে, তার নাম রুকাইয়া। এই সেই মেয়ে যে আশফাককে ডেকেছে ইমার্জেন্সি কলে।
এ ধরনের ফোনে সাধারণত জোনে থাকা প্যাট্রল ইউনিট পাঠানো হয়। কিন্তু আশফাক আজ নিজেই যেতে চাইল। লতিফ অবাক হয়ে বলল, ‘স্যার, এখন তো আপনি ডিউটিতে নেই। দরকার হইলে ফোর্স পাঠাই?’ ‘না, আমি যাচ্ছি।’
আশফাক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায় পাশে। পুলিশি চেতনা বলে, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টকে ডাকা জরুরি। এলাকা সিল করার তাগিদ তাকে ভাবায়।
কিন্তু অর্ধমৃত রমণীর মসৃণ ত্বক, নিখুঁত শরীর আর উজ্জ্বল সোনালি আভার এই নিষিদ্ধ গন্ধম তার চেতনাকে অবশ করে। তাকে ডাকে, ‘আয় আয়।’ এগিয়ে যায় সে। হাত বাড়ায়। ভূতে পাওয়া লোকের মতো উষ্ণ শ্বাস খোঁজে ঠান্ডা চামড়ার ভাঁজে। নিশ্বাস কি পড়ল একটু? ছোঁয় মেয়েটার ঠোঁট। বিকৃত উষ্ণতার উপভোগে চেপে ধরে কপোল। কণ্ঠার হাড়ের ভেতর ডেবে থাকা শ্বাসনালির শেষক্রিয়া থামায়। মুখগহ্বরের খোঁজে জিব। এখানো কী রসালো! চেখে দেখে। জান্তব শিহরণে কেঁপে ওঠে থরথর। রমণীয় সুডৌল স্তন এত চমৎকার! কী দুর্নিবার পুরুষী আগ্রাসন! একবার, দুবার। বিপরীত পক্ষের প্রতিরোধের সামর্থ্য নেই জেনে আশফাকও থামে না। যা ঘটে, তা বলতে নেই। মহাকাল আটকে রয় এখানে বেশ কিছু সময়। এক ঘণ্টা কিংবা হয়তো তার কাছাকাছি কিছু সময়, অতঃপর বিদ্যুৎ–চমকের মতো শত শত স্ফুলিঙ্গময় বিবেক তার হুঁশ ফেরায়। সহস্র প্রবাহে বাস্তবতা নামক বোধ তার চেতনায় তোলে প্রশ্ন। ভর্ৎসনা করে। দুয়ো দেয় তাকে। আশফাক দাঁড়িয়ে থাকে জান্তব আতঙ্কে। কী করল সে? এমন জান্তব পশু হওয়ার চেয়ে মৃত্যুই কি শ্রেয় নয়! রুকাইয়া ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে নরম সাদা বিছানায়, তার শরীরে ফুটে আছে অজস্র রক্তজবা, হিংস্র আশফাকের কামড়ে খাওয়ার চিহ্ন!
আশফাক জানে না, কেন সে এমন! স্ত্রীসঙ্গ কখনোই তার উপভোগ্য লাগে না। যা কিছু অপ্রীতিকর, অপ্রাকৃত, সেসবের প্রতি তার অসীম তৃষ্ণা। মায়ের এক দূরসম্পর্কের বোন ছিল। কুৎসিত, কদর্য; সিতারা নাম। কুরূপের জন্য বিয়ে হয়নি। আশফাকের প্রথম বীর্যপতনের ইতিহাসে এই নাম ভাস্কর। যে বন্ধুর শরীর নরম, তার সঙ্গে হোস্টেল জীবনের ইতিকথায় বন্ধুত্ব নেই, আছে অজস্র নিষিদ্ধ সুখ–সুখ মুহূর্ত।
রুকাইয়া যেন কুকুরে খাওয়া অর্ধগলিত দেহ নিয়ে শুয়ে আছে চুপচাপ। মেঝে পরিষ্কারে নামে আশফাক। লাশ হাওয়ায় মিলিয়ে দিতে হবে; যেন রুকাইয়া নামের কেউ ছিলই না পৃথিবীতে। মনে আসে পুলিশি তদন্তের প্রতিটি ধাপ।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আশফাককে। যদি কেউ দেখে থাকে, সিসিটিভি ফুটেজ তো মিথ্যা বলবে না। অপরাধের ছাপ সব সময়ই অন্ধ। আশফাক একবার তাকায় ঘুমন্ত রাজকন্যার দিকে, রুকাইয়া যেন কুকুরে খাওয়া অর্ধগলিত দেহ নিয়ে শুয়ে আছে চুপচাপ। মেঝে পরিষ্কারে নামে আশফাক। লাশ হাওয়ায় মিলিয়ে দিতে হবে; যেন রুকাইয়া নামের কেউ ছিলই না পৃথিবীতে। মনে আসে পুলিশি তদন্তের প্রতিটি ধাপ। আলামত, ডিএনএ, ফুটপ্রিন্ট—সবকিছুকে পরমাণু স্তরে মুছতে কতটা সময় প্রয়োজন? জরুরি পুলিশ কিটে বহন করা গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে দেহটি একটি বড় পাত্রে রাখে দ্রুত। ধীরে ধীরে শরীর দ্রবীভূত হয়। নিচে এবং আশপাশের মেঝেতে ছিটিয়ে দেয় লাইম পাউডার। গলে যাওয়া নারী টয়লেটের ফ্ল্যাশে বিলীন হয় তার তড়িৎ–তৎপরতায়। বিছানার চাদর এবং রুকাইয়ার ব্যবহৃত সমস্ত পোশাক, যা রক্ত বা ডিএনএ ধারণ করতে পারে, সেগুলো একত্র করে নিঃশেষ করে। চামড়ার গ্লাভস পরে থাকা সত্ত্বেও দরজার লকে, সুইচবোর্ডে, অ্যালকোহলের গ্লাসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট অপসারণকারী তরল ঢালে। ব্যবহার করে প্রমাণ মুছতে যা কিছু অতি প্রয়োজন। আশফাক কেন যে সরঞ্জামাদি সঙ্গে রাখে, জানে না। তার ইনটিউনেশনের বাজে অপরাধের প্রগাঢ় ডাক; এড়িয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। আশফাক এতক্ষণ চেপে রাখা অস্বস্তির দীর্ঘশ্বাস নেয়। প্রতিটি পদক্ষেপ এত অস্বস্তিকর নিখুঁত হয়, যেন কোনো নিঃসঙ্গ ঈশ্বর নিঃশব্দ শিল্পকর্মের মতো নিজের অপরাধটিকে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল করে তুলতে তৎপর। অবশেষে নিঃসন্দেহ অবস্থা এলে থামে; জানে পাশার দান পড়ে গেছে। ঘরে ফিরতে ফিরতে অন্ধকার শেষ। শহর তখনো নিশ্চুপ। আগতপ্রায় প্রত্যুষে দরজা খুলে দেয় সদ্য ঘুমভাঙা ক্লান্ত স্ত্রী ফারিহা:
‘এত রাত করতে হয়! ভোরই তো।’
‘রেইড ছিল।’
‘আয়নায় চোখ দেখো একটু।’
আশফাক মাথা নত করে ভেতরে ঢুকে জুতার ফিতা খুলতে খুলতে ফারিহার পায়ের আওয়াজ শোনে। রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে।
‘ভাত বেড়ে দিচ্ছি, খেয়ে নিয়ো।’
সে কিছু বলে না। ফারিহার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কটি যেন রোজই একটু একটু করে নীরব থেকে সরব প্রতিপক্ষের দিকে যাচ্ছে। সে যেন জানে যে তার স্বামী মিথ্যা বলছে, কিন্তু কখনো প্রচণ্ডতায় দাঁড়ায় না। তার সহানুভূতিহীন সেবাদান, নিষ্কাম শীতলতা ভীষণ পাহাড় হয়ে এক গ্লানিকর মনস্তাত্ত্বিক পীড়নে তাকে বিদ্ধ করে। ফারিহা তার আকর্ষণ জানে, উত্তাপের ভাষা বোঝে; কিন্তু না জানার ভান করে এই মিথ্যা জীবন মেনে নিয়ে আশফাককে মুক্তি দেয় না। অদ্ভুত!
কেউ তার বন্ধু হয়ে ওঠেনি। কাছে আসেনি কোনো প্রণয়ী। আয়োজন করে ঘৃণা দিয়েছে সবাই। যেন তারা জানতই আশফাকের স্নায়ুতে লুকানো উদগ্র বাসনা বদলাবার নয়। আদতেই আশফাক বদলায়নি।
সকালের আলো ফুটে গেছে। খিদে নষ্ট হয়েছে অনেক আগে, তবু আশফাক ডাইনিংয়ে বসে থাকে বেশ কিছু সময় ধরে। প্লেটে ধোঁয়া ওঠা ভাত, পাশে ডিমভাজি, আলুভর্তা। খাবারে সুগন্ধি পারিবারিক গন্ধ আকর্ষিক, হাত বাড়ায়, কিন্তু চামচ তুলতেই হাত কেঁপে ওঠে। গলার ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসে। কার ওপর যেন হঠাৎ এক অদম্য ক্রোধ ফুঁসে ওঠে তার। কী হতো একটু ভালোবাসার ক্ষমতা পেলে? এই নিরুত্তাপ সংসার, প্রেম, প্রবৃত্তির দাস তাকে হতেই হলো? পৃথিবীর আনাচে–কানাচে কত ভালোবাসাবাসির গল্প, কত পারিবারিক সুখ, দরদের কারবার। কোথাও কি থাকতে পারত না তার জন্য একটু মমতা? সে তো কেবল পুরুষ হতে চায়নি, অথচ সে শুধু তা–ই। প্রসূতি কুকুরের স্তনও তাকে তাড়িত করে কামনায়। রাস্তায় এত এত মানুষের ভিড়ে তার চোখ আটকায় কেবল স্থূল নারীর শরীরে; যেখানে সৌন্দর্য নেই, কেবল মাংস। বিকলাঙ্গ, মৃত অথবা ভীত এই তার মগজকে অধিকার করে রাখে মোহে। একটা ঢোক গিলে হজম করে ফেলতে চায় সব। অনেক কিছু আছে যা গলায় আটকে থাকে অদৃশ্য মৃতদেহের মতো, সেখানেই পচে–গলে দুর্গন্ধ করে পুরো শরীর। আশফাকের অনুভূতি এখন ঠিক তা–ই। প্রথম যখন প্রবৃত্তির কাছে পর্যুদস্ত হয়েছিল; হতভম্ব হয়েছিল নিজের কাছেই। লজ্জা লুকানোর প্রয়াস থেকেই মেরে ফেলেছিল একটা পেটমোটা ঢাউস বিড়ালকে। চারটা ফুটফুটে বাচ্চা দিয়েছিল বিড়ালটা। অথচ আশফাক তাকে দলিত–মথিত করে নিয়েছে বিকৃত সুখ। কত দিন আগের কথা, তবু স্মৃতি বারবার ফিরিয়ে দেয় ছটফটে সেই মুহূর্ত। খাবারের প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়ায় আশফাক, ছুটে যায় বাথরুমে। কেঁপে কেঁপে ওঠে শরীর। ভেতর থেকে পাকস্থলী ঠেলে উঠে আসে পচা মাংস। রুকাইয়ার শরীর। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এদিক–সেদিক খোঁজে একটু বাতাস। টলতে টলতে এগিয়ে যায় নরম বিছানায়। একটা শূন্য বিছানা হতো যদি। হয় না। এই সব অতিপাপের দিনগুলোতেও তার নিষ্পাপ কন্যা ফেরেশতার অবয়বে শুয়ে থাকে তার বিছানায়, পিতার অপেক্ষায়। শায়িত নিমগ্ন তার ঔরসজাত আত্মজা তাকে ঠেলে নিয়ে যায় আরও খাদে। মরে যেতে সাধ জাগায়। রোদ পড়ছে মেয়ের গালে। আশফাক তার পাশে গা এলিয়ে দেয়। একবারও মনে পড়ে না ঢাউস বিড়ালের মৃত শরীর। রুকাইয়ার শ্বাসহীন মুখ। পরম আহ্লাদে হাত বাড়ায়। আশফাক জানে, সে পিতা হতে চায়, কন্যার আহ্লাদী আবদারে সুখী হতে চায়, এ জীবনে যা কিছু হয়ে উঠতে পারেনি, তার সব অপ্রাপ্তির শেষ চায় কন্যাতে। আপন মা তাকে ভালোবাসেনি। তার ভয়ংকর চোখে সব সময় দেখেছে পারভার্ট জন্মদানের গ্লানি। কেউ তার বন্ধু হয়ে ওঠেনি। কাছে আসেনি কোনো প্রণয়ী। আয়োজন করে ঘৃণা দিয়েছে সবাই। যেন তারা জানতই আশফাকের স্নায়ুতে লুকানো উদগ্র বাসনা বদলাবার নয়। আদতেই আশফাক বদলায়নি, ফারিহা প্রথম স্পর্শেই নাক–মুখ কুঁচকে বলেছিল, ‘তুমি এ–ই? ছিহ!’ রাতের পর রাত গেছে ভালোবাসাহীন সঙ্গমে। কন্যার জন্মের পরও ফারিহার মন টলেনি। অথচ পৃথিবীতে তাকে শুধু ভালোবাসে একা এই কন্যাই। আশফাক দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। নিবিড় স্পর্শে পরম ভরসা খোঁজে। উচ্ছ্বাস ভরে উচ্চারণ করে, মা–মা–মা। কিন্তু কী এক বিভ্রমে হঠাৎ তার কন্যা হয়ে ওঠে রুকাইয়া, সিতারা খালা, নারীগন্ধী সহপাঠী অথবা প্রসূতি কুকুর বা বিড়াল। পুরো ঘরে অজস্র মানুষ বিভীষিকাময় কামনা নিয়ে উপস্থিত হয় আশফাকের বিছানায়। প্রচণ্ড আতঙ্কের শিহরণে, অপ্রকৃতিস্থ আশফাক ছোট হতে হতে বামন হয়ে যায়। ঘরগুলো দেয়ালসমেত তাকে জাপটে ধরতে এলে এককাপড়ে সে ঘর ছেড়ে পালায়।
এরপর ফুটপাত, রেলস্টেশন, চায়ের দোকান, ব্যস্ত পার্ক, মসজিদ, মন্দির, গির্জা সব স্থানে সব মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে চলতে চলতে একসময় আশফাকের মনে হতে শুরু করে, সব মানুষের গন্ধই যেন মস্ত এক মৃত শরীরের মতো। চাকরিটা তার টেকেনি। ফারিহাও তাকে দয়া করেছে বলা যায়। এখন সে যা পেয়েছে, তার নাম এক চমৎকার একাকিত্ব। কিন্তু তাতেও মন ভরে না। আরও চায়। যেখানে সে দাঁড়াবে, মানুষজন সরে যাক। কিন্তু যায় না। আরও লাগিয়ে রাখে শরীরে শরীর। আশফাক যেন জেনে গেছে, তারা তাকে নগ্ন করে, জিহ্বার লালায় স্যাঁতসেঁতে করে মুখ। ধর্ষিত হওয়ার অনুভূতিতে সে গিলে নেয় সকল পুরুষ, নারী আর জনতার স্পর্শ। স্রষ্টা এভাবেও কাউকে শাস্তি দেয়! পৃথিবীর প্রতিটি অস্তিত্ব এখন তার ভেতরে উলঙ্গ শবের মতো জমে থাকে। মগজ, বুক, পেট, জঙ্ঘা—সব চলে গেছে অপরের দখলে। যেন ক্রমেই আশফাক হয়ে উঠছে সহস্র পুরুষের কামনার নারী। সে বুঝে যায়, তার ভেতরে এখন যে বাস করে, সে পূর্ণ মানুষ নয়, এক উনমানুষ।
সময় যায় এভাবে কার্যকারণ সম্পর্কহীন। তেমনি কোনো এক সন্ধ্যায় ধুলোভরা শহরের নিঃসঙ্গ আলোছায়ার ভেতর বসে ছিল আশফাক। পার্কে, এক পরিত্যক্ত বেঞ্চে। আশপাশে ভিখারি, প্রেমিক যুগল, রিকশাওয়ালা—সবচেয়ে নির্লিপ্ত শহরই যেন তাকে ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ চিৎকার। এক ভাঙা কণ্ঠ; আর্ত, অথচ কুণ্ঠাহীন।
মাঠের অন্য পাশে পড়ে আছে একটি মেয়ে; ফাতেমা, সুরমা, কাজল—নাম জরুরি নয়, সে একজন মানুষ অন্তত এখনো। জীর্ণ শাড়িতে, শহরের ময়লা মেখে, প্রসববেদনায় কাতরাচ্ছে। কেউ তাকে ছুঁতে চায় না। দালাল শ্রেণির কেউ একজন বলে, ‘ওরে থানায় দে, জেনারেল বেডে বাচ্চা ফেলবে, খরচ পড়বে সরকারের ঘাড়ে।’
আশফাক কিছু বলে না। শুধু এগিয়ে যায়। মেয়েটিকে কোলে তুলে নেয়। অবাক হয়, শরীর এত পলকা, একরকম নিঃশেষিত। কিন্তু সেই হাড়, সেই রক্ত, সেই প্রসবিত উষ্ণতা… সেই জীবনের গন্ধ! কত দিন পর এমন জীবন্ত শরীরের উষ্ণতা ছুঁয়ে দেখছে সে? তার প্রসবরজঃ যেন অদ্ভুত এক প্রাণের সঞ্চালন আনে। না, কামনা নয়, এই প্রথমবার আশফাক অনুভব করে, জীবনের নিজস্ব ব্যথা কতটা নরম, কতটা পবিত্র।
একসময় আশফাকের মনে হতে শুরু করে, সব মানুষের গন্ধই যেন মস্ত এক মৃত শরীরের মতো। চাকরিটা তার টেকেনি। ফারিহাও তাকে দয়া করেছে বলা যায়। এখন সে যা পেয়েছে, তার নাম এক চমৎকার একাকিত্ব।
মেয়েটির চোখে বিস্ময়। ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে, ‘আমারে মাইরা ফালাইয়েন না, ভাই…’
সে বাক্য যেন এক ঈশ্বরীয় আবেদন পাপীকে ক্ষমা করার, পতিতকে পুনর্জন্মের।
না, আশফাক মারবে না। তার হাতে আর মৃত্যুর অধিকার নেই।
ঊর্ধ্বশ্বাসে সে ছুটে যায়। শহরের বুক চিরে অটোরিকশা থামিয়ে চলে। তার বুকের ভেতর প্রতিটি ধমনি যেন বেজে উঠছে এক অদ্ভুত মানবিক তাড়নায়। ঘাম, রক্ত, কষ্ট আর চিৎকারে মিলেমিশে সে পৌঁছায় হাসপাতালে।
সন্তান জন্ম নেয়।
এই প্রথম আশফাকের মনে হয়, সে কিছু ‘করেছে’। হ্যাঁ, শিশুটিকে সে বাঁচিয়েছে। অন্য কেউ হলে হয়তো মেয়েটিকে রাস্তায়ই ফেলে রাখত। এই অনুভবে যেন দীর্ঘ সময় পর তার শিরায় একফোঁটা আনন্দ প্রবাহিত হয়।
কিন্তু তারপর…
নার্স সেই শিশুকে পরিচ্ছন্ন কাপড়ে মুড়িয়ে এনে তার কোলে তুলে দেয়। আর তখনই ঘটে সেই দুর্ভাগ্যজনক প্রতিস্মরণ। শিশুটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে খুলে ধরে নার্স—অক্ষত চোখ, নরম মুখ, নিখুঁত আঙুল, গোলাপি বুক, কোমল যোনী। আশফাক আঁতকে ওঠে! কী এক তীব্র চেনা অনুভব, কী এক বিস্ময়! শিশুটিকে ছিটকে ফেলে দেয় সে। একদিন যে বুনো সাপ তার নিম্নস্থ শরীর থেকে উঠে মগজে ছিটিয়েছিল বিষ, তার গলা চেপে ধরে। এরপর আবার সে ছুটতে থাকে, ছুটতেই থাকে। পেছনে কেউ নেই, তবু সে ছোটে। দণ্ডপ্রাপ্ত আদি মানব যেন, নিষিদ্ধ ফল যার অনিবার্য নিয়তি। মৃত্যুতে নয়, জীবনেও নয়, তার নিস্তারের কোনো পথ নেই জানা।