‘আলোটা জ্বেলে দিই?’ বাবাকে জিজ্ঞাসা করি। কোনো কথা বলেন না। তাঁর ছায়াটা একবার নড়ে, আমি সেদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। ওপরে একটা টিকটিকি তাকিয়ে থাকে স্থির। আমি ঘুরে দাঁড়াতেই টেবিলটা নড়ে ওঠে। একটা শব্দ হতে গিয়েও হয় না। ঘরের মধ্যে কার প্রাণ আছে, কোনটা জড়, বোঝা যায় না। আমি একটা একটা করে সব কটা সুইচ অন করি। লাইট জ্বলে না। এমন এক চিরস্থায়ী অন্ধকারকে পোষ মানিয়ে বসে আছেন বাবা। মনে হয়, বেশিক্ষণ থাকলে এই অন্ধকার থেকে নিজেও বের হতে পারব না।
‘আলো আমার ভালো লাগে না।’ জানালার পর্দা সরাতেই চোখ দুটো বন্ধ করে বললেন বাবা। ঘরের এককোনায় টেবিলের সঙ্গে রাখা একটা চেয়ারে বসে আছেন তিনি। টেবিলটা খালি পড়ে।
‘বাল্বগুলো খুলে রেখেছ?’ জানতে চাই।
‘কাজের মেয়েটা যখন-তখন এসে জ্বালিয়ে দেয়।’
‘রাতে অসুবিধা হয় না?’
‘আলোতেই আমার সমস্যা।’ বাবা মেঝের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেন।
‘এত বছর পর দেশে এলাম। তোমাকে একবার দেখব না?’
বাবা চুপ করে বসে থাকেন। একবার মনে হয় বের হয়ে যাই ঘর থেকে, কিন্তু পারি না। মনে হয় বাইরে আরও বেশি অন্ধকার। চারপাশ থেকে অন্ধকার তৃষ্ণার্ত ভ্যাম্পায়ারের মতো ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে, কিছুক্ষণের মধ্যে জানালা-দরজা সবকিছু ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করবে। শরীরটা শিরশির করে ওঠে। দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, ভেতর থেকে কেউ একজন সমস্ত অক্সিজেন শুষে নিচ্ছে।
‘তোমার বাইরে যাওয়া উচিত। মানুষজনের সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগতে পারে।’ আমি বলি।
বাবা কোনো কথা বলেন না। দেয়ালে চোখ রেখে অনেক দূরে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করেন।
‘তোমার সমস্যা কী, বাবা?’
বোবা প্রাণীর মতো বাবা আমার দিকে তাকান। অন্ধকারে তার চোখ দুটো টলটল করে। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, শেভ করেননি কত দিন কে জানে! ঢিলেঢালা গেঞ্জি গায়ে জড়ানো। শরীর থেকে গন্ধ আসছে। প্রথমে নিতে কষ্ট হলেও মুহূর্তেই মনে হয়, গন্ধটা আমার চেনা। প্রায়ই রাতে ঘুমের মধ্যে এ রকম একটা গন্ধ পাই টরন্টোর বাসায়। ঘুমটা ভাঙতে ভাঙতে আরও গভীর হয়।
‘মা বলল, সেলুনের ছেলেটা এসে ঘুরে যায়। এখন ডাকলেও আর আসতে চায় না। টেবিলে খাবার পড়ে থাকে; খাও তো না, বলোও না নিয়ে যেতে!’ আমি বলি।
প্রায়ই আমার মনে হয়, জ্ঞান মানুষ আলোতে খোঁজে, আলোকে চেতনার সঙ্গে তুলনা করে, আসলে তা আছে অন্ধকারে। আলোটা পৃথিবীর বাইরের জিনিস, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আসে, অন্ধকারটা নিজস্ব।
বাবা নিরুত্তর। তাকিয়ে থাকেন সামনে, শূন্য দেয়ালের দিকে। পেছনের দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে, অনেক বছর আগের। নদীর ছবিটা ময়লা পড়ে অস্পষ্ট হয়ে আছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, কোনো প্রাচীন স্থাপত্যের ফসিল।
‘সময়কে এভাবে থামিয়ে রাখা যায়? পৃথিবী বদলাতে বদলাতে কোথায় চলে গেছে! তোমার একার জীবনটা থামিয়ে রাখলে হবে? মুভ অন, বাবা। এভাবে কিছুই ধরে রাখা যায় না, বরং ফসকে যায়, ছুটে যায়। জানো সেটা? তোমার জানা উচিত।’ আমি বিরক্ত হয়ে বলি। আরও অনেক কথা বলতে গিয়ে পারি না। এভাবে একতরফা আলাপ এগোনো যায় না। মনে হয়, প্রাচীন কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বিস্মৃত কোনো ইতিহাস পাঠ করে শোনাচ্ছি।
রাত হলে বাবা বারান্দায় গিয়ে বসেন। সামনেই লম্বা ঘন দেবদারুগাছ। পাতার ফাঁক গলে রাতের বিচ্ছিন্ন আলো বাবার মুখে-শরীরে মেখে যায়। বাড়ির পেছন দিকটার ফাঁকা জায়গায় অন্ধকার এসে জড়ো হয়ে কী যেন যুক্তি করে। অন্ধকারের চলাচলের একটা শব্দ আছে। এ বাড়িতে সেটা বোঝা যায়। প্রকৃতির নিজস্ব শব্দগুলোকে আলাদা করতে পারলে, অন্ধকারকে বোঝা সম্ভব। প্রায়ই আমার মনে হয়, জ্ঞান মানুষ আলোতে খোঁজে, আলোকে চেতনার সঙ্গে তুলনা করে, আসলে তা আছে অন্ধকারে। আলোটা পৃথিবীর বাইরের জিনিস, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আসে, অন্ধকারটা নিজস্ব।
‘রাত অনেক হলো; ঘুমাবে না?’ বাবাকে জিজ্ঞাসা করি। ভেতর থেকে মায়ের সাড়াশব্দ আসে না। বাবা তাকিয়ে থাকেন দেবদারুর অন্ধকারের ভেতর।
একসময় মনে হতো, সময় খুব দ্রুত যায়। দেশ ছাড়লাম, লেখাপড়া শেষ হলো। টেরই পেলাম না। এখন মনে হয়, সময় আসলে চলে না। আমরাই কিছুটা হাঁটি, কিছুটা বিশ্রাম নিই। সময় নিশ্চুপ। নিশ্চল। ‘তোমার চলা কি তবে থেমে গেছে, বাবা?’ জিজ্ঞাসা করি বাবাকে।
বাবা অন্ধকারের টবে বনসাই হয়ে বসে থাকেন। তাঁর পাশে একটা টুল টেনে বসি। কথা বলতে ইচ্ছা করলে বলি। রাতটা থেমে থাকে ঝিম ধরে থাকা পুকুরের স্থির জলের মতো। নড়চড়ের কোনো গরজ নেই। কোথাও কেউ একটু টোকা দিলে হয়তো সামান্য কেঁপে উঠবে। বাবা উঠে দাঁড়ান। আমার মাথায় হাতটা ছুঁয়ে ভেতরে চলে যান, নাকি হাতটা ভুল করে ঠেকে, বুঝতে পারি না।
যা কিছু আমরা ভুলে থাকতে চাই, সুখে থাকতে ভুলে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি, তা আর ভোলা হয় না। তখন মনে হয়, স্মৃতির চেয়ে বড় শত্রু আর হয় না। স্মৃতির যদি মেডিসিনের মতো মেয়াদ উত্তীর্ণের ব্যাপার থাকত, তাহলে মানুষ আরও বেশি সুখী হতে পারত।
বাবা গেলে রাতটা চলা শুরু করে। মনে হয় যেন মহাকালের একটা গিট্টু ছেড়ে গেল। ভোর উঠে আসে বাড়ির পেছন দিক থেকে। খুব অচেনা মনে হয় নিজেকে। একবার মনে হয়, টরন্টোর বাসার বারান্দায় বসে বাড়ির কথা ভাবছি। ঘটনাটা ঘটছে স্বপ্নে। মা-বাবা কবেই মারা গেছেন। তাঁদের চেহারা মনে পড়ছে না। মনে করতে গেলে শরীরটা কেঁপে ওঠে। ভূমিকম্প হয়, টরন্টোর বাড়িটা তুলোর মতো ভেসে যায়। বারান্দা থেকে পড়ে যেতে যেতে একটা গাছের ডাল আঁকড়ে ধরি, গাছটা মুহূর্তেই আমাকে ঢেকে ফেলে পাতায়। রামছাগলের কানের মতো লম্বা লম্বা দেবদারুর পাতা। পাতার ভেতর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার। একটা গন্ধ লাগে নাকে। বাবা তখনই ডেকে ওঠেন। শুনতে পাই, বাবা ডাকছেন। কী বলে ডাকছেন, বুঝতে পারি না। নিজের নামটা মনে করার চেষ্টা করি। টরন্টোর বন্ধুরা যে নামে ডাকে, সেই নাম মনে পড়ে। বাবা ও নাম জানেন না। বাবা আমার বেড়ে ওঠা জীবনের অনেক কিছুই জানেন না।
বাবা যে নাম জানেন, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে নামেরও মৃত্যু ঘটবে। আমি থাকব, কিন্তু আমার নামটি থাকবে না। মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর মৃত্যু ঘটে। মানুষের চেতনা থেকে স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা বাদ দিলে যেটুকু থাকে, সেটা হয়তো জ্ঞান হয়ে অন্য কারও মাধ্যমে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু স্মৃতির নিজস্ব কোনো শক্তি আছে কি না, জানি না। যা কিছু আমরা ভুলে থাকতে চাই, সুখে থাকতে ভুলে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি, তা আর ভোলা হয় না। তখন মনে হয়, স্মৃতির চেয়ে বড় শত্রু আর হয় না। স্মৃতির যদি মেডিসিনের মতো মেয়াদ উত্তীর্ণের ব্যাপার থাকত, তাহলে মানুষ আরও বেশি সুখী হতে পারত। মানুষের সবকিছু খুব সংকীর্ণ গন্ডির ভেতর বন্দী, বিপরীতে স্মৃতির ভান্ডারটা অসীম। অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য হয়তো এখানেই। মানুষ যে কারণে মহান, সে কারণেই দুর্বল। যে কারণে তার সুখ, সে কারণেই তার দুঃখবোধ। আজ যখন ভাবি, বাবা-আমি-মা, আমরা কি সবকিছু ভুলে থাকতে চাই কেবলই সুখী হওয়ার জন্য? এ প্রশ্নের কোনো সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না। মাঝখান থেকে ভুলে যাওয়া না-যাওয়ার মধ্যে আটকে থাকে কতগুলো অস্ফুট আর্তনাদ।
মাতৃস্তন পান করার স্বপ্ন আমি এখনো দেখি। মাকে অবশ্য বলতে পারিনি কখনো। তিনিও হয়তো শিশুকে স্তন পান করানোর স্বপ্ন থেকে বের হতে পারেননি। আমাদের স্বপ্নগুলো নির্ঘুম দেয়ালে অচল ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে স্পন্দনহীন পড়ে আছে।
‘ঘরে যাব।’ মাকে বলি।
‘তুই তো ঘরেই আছিস।’ মা বলেন। আমি তাকিয়ে থাকি মায়ের দিকে। একবার টরন্টোর অফিসে বের হওয়ার পথ খুঁজছিলাম, সিকিউরিটির লোকটা আমার অস্থিরতা দেখে জানতে চাইল, ‘কী করবেন?’ বললাম, ‘বাইরে যাব।’ বলল, ‘আপনি তো বাইরে আছেন।’ সেই থেকে সব সময় মনে হয়, আমি তো বাইরেই আছি।
‘আমি ঘরে যাব?’ মাকে আবার বলি।
‘আমরা ঘরবন্দী। আমাদের ঘর হারিয়ে গেছে একটা যুদ্ধে। আমাদের যুদ্ধটাই এখন ঘর খোঁজার যুদ্ধ।’ বলে মা উঠে দেয়ালে মুখ করে এমন করে দাঁড়ান যেন জানালায় কোনো অবাক দৃশ্যে তাঁর চোখ আটকে গেছে।
একটা যুদ্ধ, যে যুদ্ধের বিজিত যোদ্ধা আমার বাবা। একটা যুদ্ধ, যে যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত ভাস্কর্য আমার মা। একটা যুদ্ধ, যে যুদ্ধ আমার জন্মদাতা। যুদ্ধে নপুংসক হওয়া ওই অন্ধকারবন্দী মানুষটা এই যুদ্ধশিশুর বাবা। যুদ্ধ এ বাড়িতে যেন তল্পিতল্পাসহ চিরকালের মতো সংসার পেতে বসেছে। একটা যুদ্ধের সংসারে কটা মানুষ যোদ্ধার অভিনয় করে যাচ্ছে। দর্শকসারির সবাই উঠে গেছে কবে, কখন, এই মানুষগুলো জানে না।
যুদ্ধের স্ক্রিপ্টটাই আমাদের জীবন।’ বলে মা ঘুরে দাঁড়ান। ক্যাম্পে ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছিল তাঁর দুটো স্তন। কাটতে কাটতে কসাই লোকটা বলেছিল, ‘এভাবে খেয়ে আর হচ্ছে না, রান্না করে খাব।’
তারপর জন্ম হয় আমার। মাতৃস্তন পান করার স্বপ্ন আমি এখনো দেখি। মাকে অবশ্য বলতে পারিনি কখনো। তিনিও হয়তো শিশুকে স্তন পান করানোর স্বপ্ন থেকে বের হতে পারেননি। আমাদের স্বপ্নগুলো নির্ঘুম দেয়ালে অচল ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে স্পন্দনহীন পড়ে আছে। আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখি। বাবা অন্ধকারে নিজের লুঙ্গি সরিয়ে যৌনাঙ্গ খোঁজেন। মা কিছু একটা হাতড়ান তাঁর বুকে। আমি দূর থেকে একটা যুদ্ধের স্মৃতি তাড়াতে আলোর মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করি, যে যুদ্ধ আমি কখনো দেখিনি, সেই যুদ্ধের স্মৃতি আমাকে দগ্ধ করে।
‘অনেক দিন স্বপ্ন দেখি না।’ মাকে বলি।
‘আমরা তো স্বপ্নের ভেতরই আটকে গেছি, বাবা।’ বলে মা পাশে বসেন। মাথাটা তাঁর বুকের মধ্যে টেনে নেন। শুকনো, নিষ্প্রাণ বুকে মরুভূমির তৃষ্ণা নিয়ে শ্রান্তি খোঁজে একটি মৃত বৃক্ষ। একটি অমীমাংসিত যুদ্ধ ঘাতক ব্যাধির মতো সময়ের গায়ে লেপটে থাকে।
একটা গুলির শব্দ আসে বাবার ঘর থেকে।
‘এ বাড়িতে কোনো পিস্তল নেই। কিন্তু আমরা রোজ গুলির শব্দ শুনি।’ বলে মা আরও শব্দ করে হাসতে থাকেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যেন জীবনের শেষ হাসিটা হেসে নিচ্ছে। হাসিটা আর থামে না। গুলির শব্দের মতো মায়ের হাসি বিদ্ধ করতে থাকে আমাকে।
আমি চমকে উঠি। মা মাথায় আদর করে বলেন, ‘গুলি আরও আছে, চিন্তা করিস না।’ এ কথা শোনার পরপরই আমার ঘুম ভেঙে যায়। মায়ের বুকেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
‘গুলির শব্দ শুনলাম না!’ আমি বলি।
‘স্বপ্ন দেখেছিস। মাঝেমধ্যে আমিও দেখি।’ বলে মা টানা নিশ্বাস ছাড়েন।
‘বাবার ঘর থেকেই এল শব্দটা।’ মাকে আবার বলি। মনে হয়, সত্যিও তো হতে পারে। মা বুঝতে পেরে হাসেন।
‘হাসছ যে?’
‘এ বাড়িতে কোনো পিস্তল নেই। কিন্তু আমরা রোজ গুলির শব্দ শুনি।’ বলে মা আরও শব্দ করে হাসতে থাকেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যেন জীবনের শেষ হাসিটা হেসে নিচ্ছে। হাসিটা আর থামে না। গুলির শব্দের মতো মায়ের হাসি বিদ্ধ করতে থাকে আমাকে।