তানভীর হাসানের বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। বয়স যত বেড়েছে, স্মৃতিগুলো তত যেন অদ্ভুত খেলা শুরু করেছে। কাছের মানুষের নাম ভুলে যান, অথচ হঠাৎ ৫০ বছর আগের একটা দুপুরের রোদ, একটা কাকের ডাক কিংবা টেপাখোলার বৃন্দাবনের জোবেদাবুর বাড়ির উঠানের মাটির গন্ধ হুবহু মনে পড়ে যায়।
নূরজাহান রোডের দোতলার বারান্দায় বসে যখন তানভীর হাসান নানা ধরনের ইলেকট্রিক তারে মোড়ানো খাম্বার মাঝামাঝি গর্তের ভেতরে চড়ুই পাখির বাসার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন প্রায়ই মনে হয়, তিনি এখানে নন। তিনি যেন আবার ফিরে গেছেন টেপাখোলায়। সেই বাড়ির পেছনে বিশাল রেইনট্রি; সন্ধ্যা হলেই যেখানে শত শত বাদুড় এসে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকত। গ্রামসুদ্ধ সবাই জায়গাটাকে বলত বাদুড়তলা।
গত পরশু রাতের স্বপ্নটা তানভীর হাসানকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্বপ্নে তিনি দেখলেন, বাদুড়তলার সব বাদুড় নিশ্চুপ হয়ে ঝুলে আছে। হঠাৎ তাদের মাঝখান থেকে একটা অস্বাভাবিক বড় বুড়ো বাদুড় ডানা মেলে উড়ে এল। চোখ দুটো মানুষের মতো শান্ত। উড়তে উড়তে নূরজাহান রোডের বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত তারের খাম্বায় এসে উল্টো হয়ে ঝুলে রইল।
তারপর একেবারে মানুষের গলায় ডাকল, ‘তানভীর, আর কত দেরি করবি?’
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও সেই ডাক কানে বাজতে লাগল।
লোকটা হাসল, ‘আমাকে চিনবি না। কিন্তু আমি তোকে চিনি। তুই জোবেদাবুর ভাই তানভীর।’ তানভীর সাহেব বিস্মিত, ‘আমাকে চিনলেন কী করে?’ বৃদ্ধ রেইনট্রির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যারা অনেক বছর বাদুড়ের সঙ্গে এক আকাশ ভাগ করে থাকে, তাদের চেহারা গাছও মনে রাখে।’ তানভীর সাহেবের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তিনি ধীরে বললেন, ‘আমি স্বপ্নে একটা বুড়ো বাদুড় দেখছি। আমার নাম ধরে ডাকছিল।’
পরদিন সকালেই তানভীর হাসান কাউকে কিছু না বলে ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ছেলে রফিক অফিসে গেছে, বউমা রান্নাঘরে, নাতিরা স্কুলে। তাদের কিছু বলে লাভ নেই। তারা ভাববে, বুড়ো বয়সে দাদার মাথা গেছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে তানভীর হাসান পৌঁছালেন টেপাখোলায়।
সবকিছু বদলে গেছে।
জোবেদাবুর পুরোনো বাড়ি নেই। জায়গাটায় নতুন বিল্ডিং উঠেছে। শুধু বাড়ির পেছনের জমিটা ফাঁকা পড়ে আছে। আশ্চর্য, সেই রেইনট্রি এখনো বেঁচে আছে। বয়সে নুয়ে পড়েছে বটে, তবু তার ডালপালা আজও আকাশ ছুঁয়ে আছে।
কিন্তু বাদুড় নেই। একটাও নেই।
তানভীর সাহেব অনেকক্ষণ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, স্বপ্নটা বুঝি নিছকই স্বপ্ন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কাঁপা গলা ভেসে এল, ‘ওরা দিনের বেলায় আর আসে না। সন্ধ্যা হলে বুঝবি।’
তানভীর হাসান ঘুরে দেখলেন, এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। শুকনো শরীর। পরনে বিবর্ণ লুঙ্গি। কাঁধে পুরোনো গামছা। মুখে অদ্ভুত হাসি।
তানভীর হাসান ভদ্রলোককে আগে কখনো দেখেছেন বলে মনে পড়ল না।
‘আপনি?’
লোকটা হাসল, ‘আমাকে চিনবি না। কিন্তু আমি তোকে চিনি। তুই জোবেদাবুর ভাই তানভীর।’
তানভীর সাহেব বিস্মিত, ‘আমাকে চিনলেন কী করে?’
বৃদ্ধ রেইনট্রির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যারা অনেক বছর বাদুড়ের সঙ্গে এক আকাশ ভাগ করে থাকে, তাদের চেহারা গাছও মনে রাখে।’
তানভীর সাহেবের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তিনি ধীরে বললেন, ‘আমি স্বপ্নে একটা বুড়ো বাদুড় দেখছি। আমার নাম ধরে ডাকছিল।’
তারপর দেশ, সংসার, জীবন—সবকিছু বদলে যাওয়ার ভিড়ে আর কখনো মনে পড়েনি ওই ক্যাপসুল বক্সের কথা। ক্যাপসুল বক্সের ভেতর একটা কাগজও ছিল। কাগজটা এত দিনে হলদে হয়ে উঠেছে। কাগজে রাশেদার হাতের লেখা। বাঁকা অক্ষরে লেখা, ‘ভুলো না আমায়।’ তানভীর সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর মনে হলো, এত দিন ধরে নূরজাহান রোডে বসে ছিলেন, অথচ তাঁকে খুঁজছিল তাঁর নিজের শৈশব।
বৃদ্ধ যেন কথাটা আগেই জানতেন; বললেন, ‘সব ডাক মানুষের জন্য হয় না। কিছু ডাক হয় স্মৃতির জন্য।’
‘মানে?’
‘রেইনট্রির উত্তর পাশের শিকড়ের কাছে যা।’
তানভীর হাসান ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। শিকড়ের পাশে বসতেই দেখলেন, মাটির খানিকটা অংশ অন্য জায়গার চেয়ে নরম। হাত দিয়ে খুঁড়তেই বেরিয়ে এল একটা ছোট্ট মাটির কলস। তিনি অনেক কষ্টে সেটার মুখ খুললেন। ভেতরে কোনো সোনাদানা নেই। শুধু ছোট কাপড়ে মোড়া একটা ক্যাপসুল বক্সে পুরোনো গুলতি, দুটি মার্বেল আর একটি শুকনা তেঁতুলবিচি।
তানভীর সাহেবের বুক ধক করে উঠল। এগুলো তাঁরই। ১২ বছর বয়সে এখানেই খেলতে খেলতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ক্যাপসুল বক্সটা এনেছিল জালাল মামা। তিনি তখন বিলেতফেরত ডাক্তার। বক্সটাতে দামি ক্যাপসুল ছিল। বক্সটা ব্যবহার শেষে জোবেদাবুর ঘরের সিঙ্গারদানে পড়ে ছিল। ওটা আস্তে আস্তে তানভীরের খেলার সামগ্রীতে পরিণত হয়েছিল।
তারপর দেশ, সংসার, জীবন—সবকিছু বদলে যাওয়ার ভিড়ে আর কখনো মনে পড়েনি ওই ক্যাপসুল বক্সের কথা।
ক্যাপসুল বক্সের ভেতর একটা কাগজও ছিল। কাগজটা এত দিনে হলদে হয়ে উঠেছে। কাগজে রাশেদার হাতের লেখা। বাঁকা অক্ষরে লেখা, ‘ভুলো না আমায়।’
তানভীর সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর মনে হলো, এত দিন ধরে নূরজাহান রোডে বসে ছিলেন, অথচ তাঁকে খুঁজছিল তাঁর নিজের শৈশব।
তানভীর সাহেব ব্যাগ থেকে মার্বেল দুটো বের করে নাতির হাতে দিলেন। হেসে বললেন, হারিয়ে যাওয়া একটা খেলা খুঁজতে গিয়েছিলাম।’ নাতি অবাক হয়ে বলল, ‘খুঁজে পেলে? তাহলে খেলাটা আমাকে শেখাও।’ তানভীর সাহেব বারান্দার পাশে খাম্বাটার দিকে তাকালেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে খাম্বাটাকে অদ্ভুত শান্ত, মৃত একটা পাকুড়গাছের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে বললেন, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। খেলনাগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কখন ডাক আসে।’
হঠাৎ ওপর থেকে ডানার শব্দ এল। তিনি মাথা তুলে দেখলেন, সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। কোথা থেকে যেন একে একে বাদুড় ফিরে আসছে। শত শত। রেইনট্রির ডাল ভরে উঠছে। সব শেষে সেই বড় বুড়ো বাদুড়টা এসে মাঝের ডালে ঝুলল, কিন্তু আর ডাকল না। শুধু অনেকক্ষণ তানভীরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তানভীর সাহেবের মনে হলো, চোখ দুটো বড় পরিচিত। যেন তাঁর প্রয়াত বাবা। আবার যেন তাঁর নিজেরই মুখ।
তানভীর চোখের পলক ফেললেন।
বাদুড়টা আর নেই। নাকি ছিলই না?
পরদিন ফিরতি পথে কুমার নদ পার হওয়ার সময় তানভীর সাহেবের মনে হলো, কাঁধের ব্যাগটা আগের চেয়ে ভারী। অথচ ভেতরে আছে মাত্র একটা ক্যাপসুল বক্স, কয়েকটা মার্বেল, একটা গুলতি আর শুকনা তেঁতুলবিচি।
বাড়ি ফিরতেই নাতি জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদা, কী এনেছ?’
তানভীর সাহেব ব্যাগ থেকে মার্বেল দুটো বের করে নাতির হাতে দিলেন। হেসে বললেন, হারিয়ে যাওয়া একটা খেলা খুঁজতে গিয়েছিলাম।’
নাতি অবাক হয়ে বলল, ‘খুঁজে পেলে? তাহলে খেলাটা আমাকে শেখাও।’
তানভীর সাহেব বারান্দার পাশে খাম্বাটার দিকে তাকালেন। সন্ধ্যার অন্ধকারে খাম্বাটাকে অদ্ভুত শান্ত, মৃত একটা পাকুড়গাছের মতো দেখাচ্ছিল। তিনি নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে বললেন, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। খেলনাগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কখন ডাক আসে।’
সেই রাতে তানভীর সাহেব অনেক দিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমালেন।