তুমি, আমি ও সুগন্ধি

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেদিন মঙ্গলবার ছিল। কেন আমি বাসায় ছিলাম না তা–ও মনে আছে। কী করে যেন ওইবার পহেলা বৈশাখ মঙ্গলবারেই পড়েছিল। আমি যথারীতি লাল পাড়ের গরদের শাড়ি পরে মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য বের হয়েছি। তুমি বাসায় ছিলে, একাই। দুজনেরই ছুটি ছিল সেদিন। ছুটির জন্যই আজকের মতো সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। আজকের মতোই বাসায় ফিরে টের পেয়েছিলাম, কেউ এসেছিল। ঘরজুড়ে একটা সৌরভ ছিল। দেয়ালে, পর্দায়, বিছানার চাদরে, হাওয়ায় সর্বত্র মন্থন করে বেড়াচ্ছিল অচেনা এক সুগন্ধি।

তখনো সুগন্ধিটার নাম জানতাম না। জানব কী করে! তোমার পছন্দের বারবেরির বাদাম ও মিষ্টি সৌরভের স্পাইসি-ফ্রুটি কম্বিনেশনের ব্রিট ফর ম্যান বাদ দিলে সুগন্ধি বলতে এখনো কী আর তেমন বুঝি! সেই তো বাবার বাগানের থোকা বেলি আর মায়ের রান্না করা গোলাপজল ছিটানো পায়েসের ম–ম ঘ্রাণ। কিন্তু তুমি না বললেও সেদিন আমি ঠিক জেনে গেছি জলজ হাওয়ায় সুগন্ধি ছড়িয়ে রেখে কেউ একজন চলে গেছে। ‘কে?’ ‘কে?’ প্রশ্ন করার জন্য সামনে তাকাতেই দেখেছি তুমি সকালের মতো একই ভঙ্গিতে ঘাড় গুঁজে বই পড়ছ। ‘কী বই’ প্রশ্ন করে হোর্হে লুইস বোর্হেসের দ্য বুক অব স্যান্ড উত্তর আসতেই ‘কে এসেছিল’ প্রশ্ন করতেই মনে হলো তুমি চাপে পড়ে গেছ। ‘কে... কে আসবে!’ প্রশ্ন না বিস্ময়, তোমার অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখে সেদিনের সেই মঙ্গলবারে পাল্টা কিছু না বলে হেসেছিলাম।

হাসলে আমাকে সুন্দর দেখায়। ডান গালে গভীর টোল পড়ে। ত্বকে ফুটে ওঠে আশ্চর্য এক পবিত্রতা। শুধু মুখশ্রী নয় আমার দেহাবয়বেও শ্রী মিশে আছে। ঋজু গড়ন, বাড়তি মেদ নেই।

সত্যি মৈথুনরত দেহ দূর থেকে আশ্চর্য সুন্দর। তবু দেখে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল হন্তারক হওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না। আমার ঊষর দেহ প্রত্নতত্ত্বের মতো জেগে রইল আর দূরে এক দেহ ডিঙিয়ে আরেক দেহ হয়ে উঠল পরম পূজনীয়। নিবেদনের আনন্দে দুই দেহের উত্তাপ ধীরে ধীরে মোমের মতো গলতে শুরু করল।

চুলগুলো একেবারে বশে থাকে না, নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলেও সিল্কের আঁচলের মতো কাঁধে, পিঠে গড়িয়ে পড়ে। শাড়ির সঙ্গে ডিপ নেক কাট ব্লাউজ পরে আঁচল ভাঁজ দিয়ে রাখলে কোনো পুরুষ না তাকিয়ে পারে না জানি। তুমিও জানো। তবু আজ সকালে টেম্পল পাড়ের সাদা–কালো মণিপুরি শাড়ি পরে দুই হাত তুলে যখন বাঁধার চেষ্টা করে ‘ধুর ছাই’ বলে চুলের ঢল ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখন তুমি একবারও ফিরে তাকাওনি। বই না, মোবাইলের স্ক্রিনে ঝুঁকে ছিলে। মনে হচ্ছিল আমার চেয়েও বর্ণনাতীত কোনো শিল্পের দিকে তাকিয়ে আছ। ঠিক তখনই শারমিনের ফোনকল এল আর আমি সেই সে মঙ্গলবারের মতো বেরিয়ে পড়লাম।

কড়কড়া রোদে গাছগাছালির পাতা ঝলসে গেছে। মরুভূমি হয়ে উঠেছে রাজপথ। হাওয়া থেকে হু হু করে সিসাচূর্ণ ঢুকে যাচ্ছে নাকে, মুখে। দানবের মতো ছুটে চলছে চার চাকার বাহনগুলো। মানুষও ছুটছে। এরা কেউ দেখতে পাচ্ছে না, ডেভেলপারের নজর এড়িয়ে বেঁচেবর্তে থাকা একটা পুরোনো একতলা ভবনের গেট জড়িয়ে ফুটে আছে গোছা গোছা ম্যাজেন্টা রঙের বাগানবিলাস ফুল। ঝরা ফুল, পাতা মাড়িয়ে শাড়ির কুঁচি মুঠোতে চেপে ধরে আমি ছুটছি শারমিনের পিছু পিছু।

হঠাৎ উধাও হয়ে গেল সব, হাওয়ায় ভাসতে শুরু করল ফ্লাওয়ার বোম্বের সুঘ্রাণ। গ্রিন টি, সেন্টিফলিয়া রোজ, জেসমিন, অর্কিডের ঘ্রাণ মিলেমিশে মত্ত করে তুলল তোমাকে, আমাকে। অথচ তুমি একটা সময়ে বলতে, আমার কোনো সুগন্ধির প্রয়োজন নেই। তবু ফ্লাওয়ার বোম্বে উড়ে যেতে যেতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সে এল আর দেহের খাঁচা ছেড়ে তুমি বেরিয়ে এলে। হাজার বছরের উপেক্ষা যেসব শুধু আমার জন্য জমিয়ে রাখা ছিল, সেসবও কোরাস করতে করতে বেরিয়ে এল। আর তুমি ব্যগ্র হয়ে খুঁজতে শুরু করলে সুন্দর...আরও সুন্দর। না...সুন্দর না, নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ ছড়িয়ে গেল তোমার গালে, ঠোঁটে, চোখে, জোড় ভ্রুর ভাঁজে। তারও।

সত্যি মৈথুনরত দেহ দূর থেকে আশ্চর্য সুন্দর। তবু দেখে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল হন্তারক হওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না। আমার ঊষর দেহ প্রত্নতত্ত্বের মতো জেগে রইল আর দূরে এক দেহ ডিঙিয়ে আরেক দেহ হয়ে উঠল পরম পূজনীয়। নিবেদনের আনন্দে দুই দেহের উত্তাপ ধীরে ধীরে মোমের মতো গলতে শুরু করল। তুমি আর সে পরস্পরের সঙ্গে সুগন্ধির মতো মিশে গেলে। তোমাদের দেহের নির্যাসও সুগন্ধি তৈরি করল। ওই সুগন্ধি মনে করিয়ে দিল তুমি টিউলিপ আর চেরি ফুল দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠো আর আমি মেতে উঠি অশোকে কিংশুকে।

মীমাংসিত সুন্দরের মতো অমীমাংসিত রহস্য নিঃশেষ হয়ে গেলে মোমের কাঠামোও আর অবিকৃত থাকল না। দেখে বহু দূরে দাঁড়িয়েও বিকৃত হয়ে উঠল আমার গাল, ঠোঁট, চোখ, ভ্রুর ভাঁজ, চুলের ঢল।

শারমিন আমাকে টেনে তুলতেই বিশ্রী রাগ ভর করল ভেতরে। বললাম, কফি খাব না, বাসায় ফিরব। কী দেখব বাসায় ফিরে? অপ্রস্তুত তুমি মোম হয়ে গলে গলে পড়ছ? নাকি নিজেকে পশ অ্যান্ড ট্রেন্ডি দেখাতে এক হাতে ইসাবেল আলেন্দের দ্য হাউজ অব দ্য স্পিরিটস আর আরেক হাতে সিঙ্গেল শট এসপ্রেসোর কাপ ধরে মেপে মেপে চুমুক দিচ্ছ?

আমি কড়া আর তেতো কিছু খেতে পারি না। আমার পছন্দ নরম, মখমলি স্বাদের দুধে ভরপুর লাতে। হ্যাজেলনাট ফ্লেভার হলে তো কথাই নেই। এমনই আমরা। এসপ্রেসো আর লাতে দিয়েই দুজনের পছন্দ আর অপছন্দের সীমারেখা মিলানো যায়। মাঝেমধ্যে অমিলের মাঝে মোটাদাগে কিছু মিলও ধরা দেয়।

এই যে আমি বই পড়ি, তুমিও বই পড়ো। আমি পড়ি দেবদ্যুতির জোড়শিমুল গ্রন্থাগার, নির্ঝরের কুসুমকুমার, নিবেদিতার রতনচূড় ও মৃতুসংক্রান্ত গল্প। তুমি আমার হাতে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের বই দেখে ইংরেজি পত্রিকা হাতে তুলতে তুলতে ঠোঁট উল্টে বলো, এ দেশের কারও লেখা পড়া যায় না, সব ট্র্যাশ...একেবারে ডেড প্রোডাক্ট।

তুমি তাই পড়ো সামান্থা হার্ভের অরবিটাল, হান কাংয়ের দ্য ভেজিটেরিয়ান ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার তুমি বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে যাও না। এমনকি পয়লা বৈশাখেও ঘরের বাইরে বের হও না। আর কোনো বিশেষ দিবস এলে আমি আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে হন্যে হয়ে মণিপুরি বা জামদানি শাড়ি খুঁজি। তোমার মনে হয়, এ আমার চেতনার বাড়াবাড়ি; বই পড়লেই কি দিবস ধরে ধরে বাইরে ছুটতে হবে, রং মিলিয়ে শাড়ি পাঞ্জাবি পরে পুঁজিবাদী রাক্ষসদের তালে তাল দিয়ে দিনের সফরসূচি সাজাতে হবে? আমি চেতনা আঁকড়ে থাকি, আর দেশি চেতনা তোমার মুখে রোচে না। মার্কেজ, বোর্হেস, কাফকায় বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে তুমি তাই বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে গার্বেজ বলে তাচ্ছিল্য করো।

উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য, দম্ভ আর বৈচিত্র্যে আমাদের দাম্পত্যযাপন কিন্তু খারাপ হয় না। দুজনের দেহের সুগন্ধি ব্লেন্ড না হলেও দৈনন্দিন আলাপচারিতা আর সৌজন্য বিনিময়ের নিয়ম মেনে আমরা রুটিনমাফিক সময় কাটাই। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে দিন পার হয়, রাত পার হয়। প্রতি সপ্তাহে শুক্র, শনি, রবিবার ঘুরে মঙ্গলবার আসে। মাসে একটা–দুইটা দিবসও। আমিও দিবসভিত্তিক শাড়ি, চুড়ি, মালা পরে শারমিনের সঙ্গে বেরিয়ে যাই। তুমি, তোমার সিঙ্গেল বা ডাবল শট এসপ্রেসো আর মার্কেজ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকো।

আজ ফেরার সময় মার্কেজের ম্যাজিক রিয়েলিজমের মতোই একটা কাণ্ড ঘটেছে জানো। আসমানি আকাশে উড়ছিল এক শ একটা সাদা হাতি, আমি আর শারমিন ফাল্গুনের অমন ম্যাজিক্যাল আকাশ দেখতে দেখতে শহীদ মিনার রেখে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছিলাম। জাদুঘরের সামনে ওই যে ফুলের দোকানগুলো আছে না, সেই দিকে। ওখানে ফুটপাতে এক পাগলি একটা লোককে লাঠি দিয়ে খুব পিটাচ্ছিল আর চ–বর্গীয় সব শ্রবণঅযোগ্য গালি দিচ্ছিল। পথচারীরা পাগলির কাণ্ড দেখে হাসছিল খুব। টিকটকাররা ভিডিও করছিল।

তোমার শান্ত ভাব আমাকে অশান্ত করে, হতচকিত আমি খোলা দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে ঢুকতে হোঁচট খাওয়া আটকে জানতে চাই, ‘সে কি চলে গেছে?’ হাওয়াভর্তি ঘরে অসহায় প্রশ্নটা উড়তে থাকে। তুমি ধরো না, স্পর্শ করো না। পুনরায় জানতে চাই, ‘মেয়েটা কি চলে গেছে?’

আমি আর শারমিন হাঁটা থামিয়ে পাগলির কথা থেকে জেনেছিলাম, ওর সঙ্গী ওই লোকটা আরেকজনের সঙ্গে শুয়েছে। ছেঁড়াফাড়া কামিজ পরিহিত পাগলিটাকে দেখে মনে হচ্ছিল ওর গর্ভে বাচ্চা আছে। সাধ মিটিয়ে পাগলি লোকটাকে মারছিল, চিৎকার করছিল, সতর্ক করছিল। বলছিল, এই বাচ্চার জন্ম দেবে না, পেট ফুটো করে বাচ্চাটাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনবে। আমি আঁতকে উঠে দেখতে চাইছিলাম, ওর অবিশ্বস্ত সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া। দেখলাম, তার মধ্যে কোনো বিকার নেই। সে অপরিচ্ছন্ন দাঁত বের করে খ্যাক খ্যাক করে হাসছিল আর বলছিল, আজ রাতেই আবার শুবে। শুনে পাগলিটা আরও খেপে উঠল। নিজের ডান হাত কামড়াতে শুরু করল। আমি আর শারমিন একবার ওকে বোঝাতে গেলাম, কোনো একটা এনজিওতে নিয়ে ওর থাকার ব্যবস্থা করতে চাইলাম। কিন্তু পাগলিটা লোকটাকে ছেড়ে লাঠি হাতে আমাদের দিকে তেড়ে এল। তাড়া খেয়ে ছুটতে ছুটতে আমার মনে পড়ল আজ মঙ্গলবার, সেদিনও মঙ্গলবার ছিল।

বাড়ি ফিরেই তোমাকে দেখতে পাব জানি। শুধু জানার অসম্পূর্ণতা আমাকে যে ঘায়েল করতে পারে তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম আমাকে দেখে তুমি ব্যস্ত হয়ে উঠবে। গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে চৌকাঠ আটকে দাঁড়িয়ে থাকবে। তড়িঘড়িতে ঘাড়, গালের দাগ মুছতে ভুলে যাবে। অসময়ে কেন শাওয়ার নিলে তার কৈফিয়ত দিতে দিতে হড়বড় করে বলবে, ‘সে কী এত তাড়াতাড়ি ফিরলে! তোমার না সন্ধ্যার পরে আসার কথা?’

কিন্তু তুমি সামনে এসে দাঁড়িয়েছ ধীর, স্থির। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কিছুই ঘটেনি। কেউ আসেনি। আমিই বরং অতর্কিতে এসে তোমার মতো হার্ডকোর কফিখোরের মনোযোগ নষ্ট করে পড়ার মুহূর্ত থেকে টেনে তুলেছি।

তোমার শান্ত ভাব আমাকে অশান্ত করে, হতচকিত আমি খোলা দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে ঢুকতে হোঁচট খাওয়া আটকে জানতে চাই, ‘সে কি চলে গেছে?’

হাওয়াভর্তি ঘরে অসহায় প্রশ্নটা উড়তে থাকে। তুমি ধরো না, স্পর্শ করো না। পুনরায় জানতে চাই, ‘মেয়েটা কি চলে গেছে?’ উত্তরের ভার না টেনে তুমি এবার টানটান হও, পাল্টা জানতে চাও, ‘কোন মেয়ে?’ তোমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি তাড়া খাওয়া হরিণের মতো শোবার ঘরে ঢুকে যাই, এদিকে খুঁজি, সেদিকে খুঁজি...ক্রমশ দৃষ্টির চাঞ্চল্য কমে আসে। ফ্লাওয়ার বোম্ব সুগন্ধি ছাড়া আর কারও দেখা পাই না।