ডিনস্টন সিমেট্রি
ডিনস্টন সিমেট্রির নাম শুনেছেন? ওই যে শ্রীমঙ্গলে টি প্ল্যান্টার সাহেবদের কবরস্থান?
ব্রিটিশ সাহেব, যারা কোম্পানির আমন্ত্রণে এ দেশে চা–শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে এসে আর নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যেতে পারেনি। কেউ রোগে, কেউ বৃদ্ধ হয়ে, কারও শিশু, কারও স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এই সুবিশাল চা–বাগানের সবুজে ঘেরা ডিনস্টন সিমেট্রিতেই এদের সমাহিত করা হয়েছে। আমি এখানকার বাসিন্দা লক্সমি। এখানে কীভাবে এলাম সে গল্পটাই বলছি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ থেকে দরিদ্র সাঁওতাল, মুন্ডা, গোয়ালা উপজাতিদের ব্রিটিশ কোম্পানির লোকজন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটে নিয়ে আসত চা চাষের জন্য।
কোম্পানির কর্মচারীরা বলত, সিলেটে গাছের পাতায় সোনা ফলে, সারা জীবন বইসা খাবা, পাতা তুললেই টাকা আর টাকা!
গরিব মানুষগুলো না বুঝেই রওনা হয়ে যেত সমৃদ্ধ জীবনের সন্ধানে। দীর্ঘ যাত্রায় পথের মধ্যে না খেয়ে, জ্বরে, কলেরা বা অন্য রোগে, সাপ, পোকামাকড় বা কোনো প্রাণীর আক্রমণে মারা যেত অনেকে। তখন পথেই কোনো স্থানে এদের লাশ পুঁতে রাখা হতো বা নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। সৌভাগ্যবানেরাই কেবল আধমরা হয়ে প্রাণটুকু হাতে নিয়ে চা-বাগান পর্যন্ত আসতে পারত।
আমার বাবা এই শ্রমিকদেরই একজন। তাঁর ভাগ্য ভালো তিনি সুস্থভাবে সিলেট এসে বসতি গড়েন চা–বাগানে। চা–শ্রমিকেরা এখানে এসে কাজ শুরুর পরেই তাঁদের ভুল ভাঙত। অনাহার, অভাব, অত্যাচার হতো শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। কোম্পানির চুক্তি অনুযায়ী একবার এস্টেটে কাজ শুরুর পর কেউ এখান থেকে পালাতে পারত না। সাপ-ঘোপ, বাঘ-জঙ্গলে ঘেরা এমন জায়গা ছেড়ে যারা পালিয়েছে বা যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদের কাউকেই আর কোনো দিন দেখা যায়নি। জঙ্গলে গুম হয়ে যেত। শ্রমিকদের জীবন এখানকার সাহেবদের কুকুরের চেয়েও মূল্যহীন। বাবা জঙ্গল ভালোবেসে থেকে গেছেন সুবোধ হয়ে। কে জানে হয়তো ভয়ে অথবা জীবনের মায়ায়।
চা–বাগানেই জন্ম আমার। তামাটে গায়ের রং, ছিপছিপে দেহ আর দস্যিপনার জন্য পুরো এস্টেটে আমার সুনাম বা দুর্নাম আছে।
চা–শ্রমিকদের মতো তাদের সন্তানদেরও জন্মসূত্রে ব্রিটিশ সাহেবরা তাদের সম্পত্তিই ভাবে। আমরা তাদের জন্মসূত্রে দাস হয়ে যাই। উঁচু উঁচু টিলার ওপরে বাংলোবাড়িগুলোয় সাহেবদের বাস। সেখানে সাপ-ঘোপ পৌঁছাতে পারে না কিন্তু।
যত মরণ আমাদেরই। ওই তো সেদিন চা–পাতা তুলতে তুলতে কী এক পোকার কামড় খেল বীরসা। রাতের বেলা মুখে ফেনা তুলতে তুলতেই শেষ, আর বাঁচানো গেল না তাকে। শ্রমিকদের জীবনের দাম আর পোকামাকড়ের জীবনের দাম এখানে এক।
সাদা চামড়ার মানুষগুলো দেবতার মতো দেখতে। সাহেবদের বউদের কথা কী আর বলব, একেবারে সাক্ষাৎ দেবী গো! ছোট ছোট ছাতা মাথায় দিয়ে এই বাংলো থেকে ওই বাংলোয় বেড়াতে বা পার্টি করতে যায় যখন, সে এক মনোহর দৃশ্য।
এরা নাচে, গায়, মদ খায়, হাসে। এই জঙ্গলের বুকে ছোট্ট বিদেশ যেন।
একবার চা–গাছে পোকার আক্রমণ হলো। বিদেশ থেকে পড়াশোনা জানা নতুন এক সাহেব এলেন তা ঠেকাতে। যেহেতু দস্যিপনার জন্য সাহেবরা আমায় চেনে, আবার মাঝেমধ্যে ফুটফরমাশও করে দিই মেম-সাহেবদের, তাই এই নতুন সাহেবের দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর।
প্রথম দিন আমি কৌতূহল নিয়ে দেখছিলাম তাকে। নীল চোখ, একহারা পেটানো গড়ন, লম্বাটে গ্রীবা।
ইশারায় নিজেকে দেখিয়ে বললাম, আমার নাম লক্সমি। ভেবেছিলাম সে আমার কথা বুঝবে না।
সাহেব বুঝতে পারলেন, হেসে বললেন, পিটার।
আরেহ! সাহেব দেখি আমাদের ভাষা জানে। নতুন কথা বলা বাচ্চাদের মতো আধো আধো বোল কিন্তু বোঝা যায়।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের খেতাবধারী ব্যক্তিরাই কেবল এখানে সাহেব হিসেবে নিয়োগ পান, এঁরা উচ্চ বংশের বোধ করি। শুনেছি লর্ড পিটার রানির বিশেষ পছন্দের লোক ছিলেন। এই রানির পছন্দের লোক থেকে ছেলেটা কীভাবে আমার পছন্দের লোক হয়ে গেল, সেই গল্পটাও নিশ্চয় জানার আগ্রহ হয়েছে এখন আপনাদের? বলছি! বলছি!
পিটার আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। আমার রক্তিম মুখ থেকে চোখ সরিয়ে বড় সাহবকে সে ইংরেজিতে কিছু বলল। সেগুলো আমার বোধগম্য হলো না। কিন্তু বড় সাহেব মাহাতোকে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিলেন এবং তাঁর খাস চাকরকে বন্দিখানায় পাঠিয়ে দিলেন। সে যাত্রায় বেঁচে গেল মাহাতো। পিটারের সঙ্গে এ ঘটনার পর যখন দেখা হলো সে শিশুদের মতো ঝলমল করে উঠল, ব্রাভো!
একটা ছেলে ও একটা মেয়ে আগুন আর বারুদের মতো। দুটি কাছাকাছি থাকলেই বিপদ।
পিটারের দেখভাল, যত্ন আমিই করি। রান্নার বাবুর্চি আছে। তবে খাবার দেওয়া, ধোপার কাজ নিজ হাতে করি। চা–বাগানের জঙ্গলে বড় হয়েছি যেহেতু সবুজ ঘেরা এই প্রান্তরের সবটাই আমার চেনা। আমি তাকে পথও চেনাই। অচেনা পথ দেখাতে দেখাতে তার চোখের প্রেমে পড়ে যাই। পিটারের স্বভাবের মধ্যে একটা বিশেষ দিক আছে, যেটা আমি আর কখনো কোন সাহেবদের কাছ থেকে পাইনি। তিনি অন্য সাহেবদের মতো আমায় দাস মনে করেন না, নিজের সম্পত্তি মনে করেন না, আমায় মানুষের মতো সম্মান দেন।
যেমন কোনো কোনো দিন খেতে বসে ডাকেন, লক্সমি!
আমার মনে হয় কোনো ঐশ্বরিক আওয়াজ!
জি!
তুমি আমার সঙ্গে খাবে এসো।
আমি লজ্জিত হয়ে বলি, লর্ড আপনি খান।
সাদা চামড়ার সাহেবদের সঙ্গে আমার মতো দাস শ্রেণির খাবার অধিকার নেই। পিটার সেটা মানতে নারাজ। জোর করে পাত পেতে বসায়। হয়তো তার এই শ্রেণি ভেদাভেদ না থাকার প্রবণতাই আমায় সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। চা–শ্রমিকদের মানুষ বলে তো মনে করেনি আগে কেউ। আরও ঘটনা আছে, আস্তে আস্তে বলি শুনুন!
একবার পিটার আসাম গেল। ফিরে এসেই আমার খোঁজ! আদিখ্যেতাটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না বলুন তো? যাহোক, আমায় অবাক করে দিয়ে বলল, তোমার জন্য কিছু একটা এনেছি, পছন্দ হবে খুব।
হাত বাড়িয়ে একটা ছোট কাঠের বাক্স দিল, নাও ধর!
খুলে দেখি একটা রুপোর চুলের কাঁটা।
আমি উঁচু করে খোঁপা বাঁধতে পছন্দ করি, তাতে জবা ফুল গুঁজলে বেশ দেখায়।
পিটার একবার বলেছিল, তোমায় এই রকম চুল বাঁধা দেখতে বেশ লাগে তো!
এই বিলাতি সাহেবের কি লাজশরম নেই? মুখের ওপর বলে দেয় খোঁপা ভালো লাগে, ফুল ভালো লাগে। তবে এমন খোঁপার কাঁটা পুরো চা এস্টেটের কোনো মেয়ে চোখে দেখেছে কি না, আমার জানা নেই।
আমি প্রচণ্ড মুখরা আগেই বলেছি। একগুঁয়েও। অন্যায় দেখলে, বিপদ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ি। সেদিন মজুরি কম দেওয়া নিয়ে কথা বলায় মাহাতোকে মেরে বাগানের ভেতর জেলে আটকে রাখা হলো। কেউ গেল না ছাড়াতে। রক্তাক্ত মাহাতো দুই দিন পড়ে রইল বন্দিখানায়। তার বউ পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করল বাবার। বাবা শক্ত হয়ে রইলেন, সাহেবদের সঙ্গে তো আমি পারি না। তারা উঁচু জাতের। আমার মতো নগণ্য মানুষের সাধ্য কি তাকে ছাড়িয়ে আনি।
আমার আর মাথা ঠিক রইল না। চা–বাগানের বড় সাহেবের বাংলোয় ছুটলাম দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে। কারণ, আমি জানি মাহাতো আর ফিরে আসবে না সেখান থেকে। একদিন গুম হয়ে যাবে জঙ্গলে।
তারপর কী হলো বলুন তো?
দারোয়ান আমায় ভেতরে ঢুকতে দিল না। এটাই স্বাভাবিক। আমি চিৎকার করে বড় সাহেবকে ডাকতে লাগলাম। দেখলাম বারান্দায় পিটার ও বড় সাহেব বসা। হয়তো পিটারের অনুরোধেই বড় সাহেব দারোয়ানকে ইশারা দিলেন আমায় ঢুকতে দেওয়ার জন্য। ভয়হীন আমি সামনে গিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে বললাম, বড় সাহেব মাহাতোকে বন্দী করে রাখা হয়েছে আপনার বন্দিখানায়, ওর বউ পোয়াতি। বেচারা বউ কেঁদেকেটে একেবারে চোখ বসিয়ে দিয়েছে। বাচ্চাটা পেটে থাকে কি না। দয়া করুন, তাকে ছেড়ে দিন।
বড় সাহেব অবাক বিস্ময়ে আমায় দেখছিলেন। কেউ তার সামনে এভাবেও কথা বলতে পারে! হয়তো ঘোরে ছিলেন।
ঘোর কাটিয়ে বলে উঠলেন, কে মাহাতো? ওই যে ছেলেটা ঝামেলা পাকাল? শুনেছি তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পিটার আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। আমার রক্তিম মুখ থেকে চোখ সরিয়ে বড় সাহবকে সে ইংরেজিতে কিছু বলল। সেগুলো আমার বোধগম্য হলো না।
কিন্তু বড় সাহেব মাহাতোকে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিলেন এবং তাঁর খাস চাকরকে বন্দিখানায় পাঠিয়ে দিলেন।
সে যাত্রায় বেঁচে গেল মাহাতো।
পিটারের সঙ্গে এ ঘটনার পর যখন দেখা হলো সে শিশুদের মতো ঝলমল করে উঠল, ব্রাভো!
পিটার বাধা দিল না, দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমায়। শরীরের উত্তাপে গলে তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে আমার শরীর। আমি চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলাম পিটারের চিবুক, ঘাড়। আমার ঠোঁট দিয়ে তার শরীরের সব উত্তাপ এমনভাবে শুষে নিতে লাগলাম, যেন এটাই তাকে ভালো করবার শেষ উপায়। নইলে যে বিপদ! পিটার হঠাৎ তার তপ্ত ঠোঁটে বিলেতি কায়দায় চুমু খেতে লাগল আমায়। আমি যেন এই ক্ষণটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম জনম জনম। হারিয়ে যেতে লাগলাম, আমার তেজ-জেদ সব জল হয়ে মিশে যেতে লাগল পিটারের নগ্ন গায়ে।
তুমি তো অনেক সাহসী। এমন মেয়ে এই পুরো চা এস্টেটে বিরল, তুমি তো মহামানবী।
তার মুখে প্রশংসা শুনলে মন ভরে যায় কেন জানি। আমার প্রশংসা করে যখন, তার নীল চোখ আরও নীলচে হয়ে যায়। আসলেই কি তা, নাকি আমার মনের ভুল? কি জানি!
পিটার সুপুরুষ। ঝলমলে সোনালি চুল, ফরসা গায়ের রং, চামড়ার নিচে রক্তও দেখতে পাওয়া যায়। তার বড় জুলফি আমার মনে ঢেউ তুলেছে কতবার! কিন্তু আমার উঠতি যৌবন তার মনে কোনো যৌন ক্ষুধা জাগাতে পারেনি। কোনো দিন ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি, কোনো নোংরা ইঙ্গিত দেয়নি। অথচ সাহেবরা চা–বাগানের সব মেয়েকেই বারবনিতা ভাবে। কাউকে মনে ধরলে সেই মেয়ের নিস্তার নেই বিছানায় যাওয়া ছাড়া।
অন্যদিকে পিটারের এমন উদাসীনতা, মেয়েদের প্রতি সম্মান বোধ আমার আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে দেয়। আমি তৃষ্ণার্ত হই বারবার। ওই নীল চোখের গহিনে ডুবে যাই প্রতিদিন।
আমাদের মতো চা–শ্রমিকদের নিজেদের কোনো জমি নেই। কেউ কেউ কয়েক প্রজন্ম ধরে থাকলেও ছোট মাটির বা কুঁড়েঘরের বাসিন্দা হতে পেরেছে কেবল। তবে বাইরের দুনিয়ার কাছে পরিচয়হীনই রয়ে গেছে। এখান থেকে কেউ বাইরে যেতে পারে না। আগেই বলেছি। যারাই একবার এই চা এস্টেটে এসেছে, তারাই বিক্রি হয়ে গেছে। বাইরের পৃথিবী তাদের কাছে মৃত। চা উৎপাদন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য অথবা মৃত্যু। মাঝেমধ্যে কিছু উৎসব আমাদের জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে। ঝুমুর নৃত্যের তালে যখন যুবতীরা কোমর দোলায়, দুলে ওঠে পুরো চা–বাগান। দেশি মদ গিলে পুরুষেরা উৎসবে মাতে।
আজ সেই বিশেষ দিন, ঝুমুরের দিন। লর্ড পিটারকে আমার ঝুমুর নাচ দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। সবাই হাসছে, গাইছে। আনন্দ ছড়িয়ে গেছে পুরো চা–বাগানের সবুজে।
পিটার আসছে না, এদিকে আমার দলের নাচার সময় হয়ে গেছে। ঢোলের তালে নাচ শুরু করলাম আমরা।
ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে এই অসাধারণ নাচ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকেই আমরা শিখে থাকি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।
নাচ শেষের দিকে লর্ড পিটার ঢুকল। আমার দৃষ্টি তার দিকে পড়তেই কান্না পেয়ে গেল অভিমানে, এতক্ষণে আসার সময় হলো!
নাচ শেষ করে পিটারের সামনে এলাম, এত দেরি হলো কেন সাহেব? আরেকটু হলে তো নাচটা দেখতেই পেতে না।
পিটার বলল, আমার শরীরটা ভালো না। জ্বর আসবে বোধ হয়, তাই দেরি।
দেখলাম পিটারের চোখ লাল। নীল বৃত্তের চারপাশের অংশ লালচে হয়ে গেছে, ধারালো চিবুকটাও লাল হয়ে আছে। পাতলা ঠোঁট এমনিতেই লাল থাকে সাহেবদের; কিন্তু আজ বুঝি পৃথিবীর সব লাল রং পিটারের ঠোঁটে এসে মিশেছে। সব মিলে যে দৈব রূপ দেখা যাচ্ছে পিটারের, যা আমার মনের মধ্যে ঝড় তুলছে, তা থামাবে এ সাধ্য কার?
পিটারকে বললাম, চলুন আপনাকে বাংলোয় রেখে আসি। একা একা এত পথ যাওয়া এ শরীরে বিপদ হতে পারে।
পিটার জড়ানো গলায় বলল, দরকার নেই, সামান্য জ্বর হয়েছে সেরে যাবে। তুমি অনুষ্ঠানেই থাকো।
ধুর! তাই হয় নাকি?
মানা করা সত্ত্বেও আমি পিটারের সঙ্গে গেলাম। শুনবার পাত্রী তো আমি নই।
তার শরীর জ্বরে কাঁপছে। আমি আর চাকরটা ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলাম।
এই চা–বাগানে রোগ হওয়া মানেই বিপদ। জ্বর হয়েই কত কত শ্রমিক মারা যায়। গত বছর কলেরা হয়ে কয়েকটি পরিবারের সব সদস্য মারা গেল। মৃত্যু পেছনে লেগেই থাকে এখানে, জঙ্গলের দেবীর বোধ হয় মানুষের রক্ত খুব পছন্দ।
পিটার জ্বরে ছটফট করতে লাগল বিছানায়। আমার কী করা উচিত জানি না। প্রার্থনা করা ছাড়া হয়তো আর কিছু করার নেই।
লাল চোখ মেলে ইশারায় ডাকল সে।
পিটার বাধা দিল না, দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমায়। শরীরের উত্তাপে গলে তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে আমার শরীর। আমি চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলাম পিটারের চিবুক, ঘাড়। আমার ঠোঁট দিয়ে তার শরীরের সব উত্তাপ এমনভাবে শুষে নিতে লাগলাম, যেন এটাই তাকে ভালো করবার শেষ উপায়। নইলে যে বিপদ!
পিটার হঠাৎ তার তপ্ত ঠোঁটে বিলেতি কায়দায় চুমু খেতে লাগল আমায়। আমি যেন এই ক্ষণটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম জনম জনম। হারিয়ে যেতে লাগলাম, আমার তেজ-জেদ সব জল হয়ে মিশে যেতে লাগল পিটারের নগ্ন গায়ে।
পিটার বাধা দিল না, দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমায়। শরীরের উত্তাপে গলে তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে আমার শরীর। আমি চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলাম পিটারের চিবুক, ঘাড়। আমার ঠোঁট দিয়ে তার শরীরের সব উত্তাপ এমনভাবে শুষে নিতে লাগলাম, যেন এটাই তাকে ভালো করবার শেষ উপায়। নইলে যে বিপদ! পিটার হঠাৎ তার তপ্ত ঠোঁটে বিলেতি কায়দায় চুমু খেতে লাগল আমায়। আমি যেন এই ক্ষণটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম জনম জনম। হারিয়ে যেতে লাগলাম, আমার তেজ-জেদ সব জল হয়ে মিশে যেতে লাগল পিটারের নগ্ন গায়ে।
তার সুগঠিত শরীরের যে কল্পনা আমি এত দিন করেছি, তা আজ হাতের তালু দিয়ে আমার পুরো অস্তিত্বে অনুভব করতে লাগলাম। তার তপ্ত গা আমার শরীরের উত্তাপ বাড়িতে দিচ্ছিল। যে ঝড় মনের মধ্যে বয়ে নিয়ে এসেছিলাম, তা আরও প্রবল হয়ে গেল। শরীর অসাড় হয়ে অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম। কেন? কেন?
রাত হয়ে গেল অনেক। বাড়ি ফেরার ইচ্ছা নেই। মেয়েরা সাহেবদের বাড়ি থেকে রাতে ফিরবে না, এটা এই সমাজে অন্যায় হিসেবে দেখা হয় না।
রাত্রি শেষ শেষ হবে, আমি ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে আছি। পিটার চোখ মেলে চাইল, জ্বর কমেছে বোধ হয়।
পাশে আমায় দেখে হাত বাড়িয়ে দিল। সেই হাজার মাইল দূরে তার পরিবার প্রিয়জন ছেড়ে একা এই জঙ্গলে হয়তো খুব স্নেহের, ভালোবাসার পরশ পেতে ইচ্ছা হয়েছিল তার।
হাতটা ধরলাম পিটারের। আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। দলা পাকিয়ে কান্না পেট থেকে ওপরের দিকে চলে এল। বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম পিটারের। যে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা নিয়ে বসেছিলাম সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে পড়ল।
পিটার বাধা দিল না, দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমায়। শরীরের উত্তাপে গলে তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে আমার শরীর। আমি চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলাম পিটারের চিবুক, ঘাড়। আমার ঠোঁট দিয়ে তার শরীরের সব উত্তাপ এমনভাবে শুষে নিতে লাগলাম, যেন এটাই তাকে ভালো করবার শেষ উপায়। নইলে যে বিপদ!
পিটার হঠাৎ তার তপ্ত ঠোঁটে বিলেতি কায়দায় চুমু খেতে লাগল আমায়। আমি যেন এই ক্ষণটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম জনম জনম। হারিয়ে যেতে লাগলাম, আমার তেজ-জেদ সব জল হয়ে মিশে যেতে লাগল পিটারের নগ্ন গায়ে।
প্রকৃতির ভোরের আলো ফোটাবার খেলার সঙ্গেই শরীরের আদিম খেলায় মেতে উঠল বহুদিনের তৃষ্ণার্ত দুজন মানুষ।
একবার চা–শ্রমিকদের বড় একটা অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে হেঁটে রওনা দিয়েছিল নিজ ভূখণ্ডে। ব্রিটিশ সাহেবরা তাদেরকে মেঘনা নদীর কাছে পিটিয়ে, গুলি করে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। জীবিতদের ফিরিয়ে এনেছিল চা–বাগানে কাজ করার জন্য। আমার বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেছে। গায়ে জোর নেই। তিনি হেঁটে বের হতে পারেননি বলে সে যাত্রায়ও বেঁচে গেলেন।
পিটার আর আমার সম্পর্কের গভীরতা মহাসমুদ্রের মতো অতল হয়ে গেল কবে থেকে যে আমরা টেরই পেলাম না। এত বড় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পিটারকে চিন্তিত মনে হলো। একদিন আমায় জিজ্ঞেস করল, আমার সঙ্গে যাবে বিদেশ? সমুদ্রপথে যাব, জাহাজে ঘুরব অনেক দেশ, এরপর আমার বাড়ি। যাবে?
অজানা আশঙ্কায় মন কেমন করে উঠল, তুমি কি চলে যাবে সাহেব?
না তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আমরা আর ফিরব না এখানে। তুমি সাহস দিলে সব বাধাবিপত্তি পার করে একসঙ্গে থাকব সারা জীবন—পিটার দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল।
যে মানুষগুলো কোনো দিন চা–বাগানের বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না, তাকে বিদেশের স্বপ্ন দেখালে চলবে কেমন করে? খাঁচায় বন্দী পাখির কি আর আকাশকে মনে ধরে? আমার যাওয়াটা খুব সহজ নয়। সঙ্গে আছে বড় সাহেবদের ভয়। এই জঙ্গলে আমাদের মতো মানুষকে মেরে ফেলাটা সহজ, নিয়ম ভাঙা এর চেয়ে ঢের কঠিন।
পিটার আমায় নিতে পারল না। যাওয়ার আগে শুধু বলল, আমি ঠিক ফিরে আসব, অপেক্ষা করবে। শুধু তোমায় নেওয়ার জন্য ফিরে আসব।
সেবার শুনেছি পিটারের জাহাজে কলেরা লেগেছিল। এক রাতে জাহাজের সবাই মরে সাফ। কিছু যাত্রী বেঁচেছিল; কিন্তু তাদের মধ্যে পিটার ছিল কি না, সেটা জানা নেই কারও। আমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পিটার অনেক যুদ্ধ করেছে, নিয়ম ভাঙতে চেয়েছে। কিন্তু চা–শ্রমিকদের তো বড় সাহেবরা মানুষ মনে করে না। আমার মতো একটা প্রাণীর জন্য এখানে চলমান শ্রেণিবৈষম্যকে হুমকির মুখে পড়তে দেবে কেন? তাই পিটার আর আমার ঘটনাকে চা–বাগান থেকে মুছে দিতে এক সন্ধ্যায় কেউ একজন পেছন থেকে বল্লমের ফলা গেঁথে দিল আমার পিঠে। স্তন ভেদ করে সামনে দিয়ে বের হয়ে এল তীক্ষ্ণ আগা। মৃতুর আগে দেখলাম রক্তে ভিজে যাচ্ছে আমার প্রিয় চা–বাগানের মাটি। গাছগুলো আমার রক্ত শুষে নিচ্ছে, যেমন করে অসংখ্য চা–শ্রমিকের রক্ত শুষে নিয়ে তার বুকে ঠাঁই করে দিয়েছে চা–গাছগুলো। রক্তের রঙের জন্যই কি চা–পাতা জ্বাল দিলে লাল রং বের হয়?
এরপর কে যেন আমার দেহটা ডিনস্টন সিমেট্রির ভেতরে পুঁতে রাখল। আমি সেদিন থেকে এখানেই আছি।
পিটার আর আসেনি, হয়তো জাহাজে মারা যাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে ছিল। অথবা সে দেশে পৌঁছেছিল ঠিকঠাকমতো এরপর আমায় আর মনে পড়েনি। কে জানে! জানা হয়নি আর।