মাই গড! ফুটবলের সেই গড আমার সামনে! সল্ট অ্যান্ড পেপার চুলে ভরা মাথা। মুখ যেন পাথরে খোদাই করা এক গ্রিক দেবতা। আমি রীতিমতো আড়ষ্ট। কেন যে সেদিন আরেকটু গুছিয়ে সেজেগুজে অফিসে আসিনি! কে জানত আমার বড় আপাদের এককালের অতি আকাঙ্ক্ষিত ফুটবলার প্রেমিক আমার সামনের চেয়ারে এসে বসবে? শুধু বড় আপারা? কৈশোরে পা দেওয়া আমিও কি মনে মনে তাকে চাইনি? শবে বরাতে নামাজ পড়ে মোনাজাতে বলতাম, ‘হে খোদা! আরমান ভাই যেন শুধু আমার হয়।’
নয়টা-পাঁচটা সরকারি অফিসে চাকরি করি। আমাদের এক ফাঁকিবাজ কলিগ বলত, ‘সরকারি অফিসে দুই ঘণ্টার বেশি কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।’ কথাটা খুব মিথ্যে নয়; অন্তত আমার জন্য। কোনো বাঁধাধরা কাজ আমার কোনো দিনও পছন্দ না। নয়টায় অফিস। সকাল সাড়ে সাতটায় অফিসের মাইক্রো হাজির সরকারি আবাসিক ভবনের সামনে। আমি মাঝেমধ্যেই গৃহকর্মীকে দিয়ে বলে পাঠাতাম, ‘যা বলে আয়, ম্যাডাম বাবুকে স্কুলে দিয়ে রিকশায় চলে যাবে সময়মতো।’ আসলে আমার সকালে ঘুম থেকে উঠতেই ইচ্ছা হতো না। তারপর শাড়ি পরে, ম্যাচিং ব্লাউজ খুঁজে না পেয়ে ওয়ার্ডরোবের সব কাপড় বিছানার ওপর পালা মারোরে, টিপের পাতা খুঁজতে ড্রয়ারের পর ড্রয়ার হাতড়াওরে , লাঞ্চবক্স ফেলে দৌড় লাগাওরে! তারপর অফিস গিয়ে কোনো কোনো দিন ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে কাজ শেষ করে হয় সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন না হয় কবিতা লিখতে বসা। একবার এক মুসল্লি টাইপ ডিজি জয়েন করার কয়েক দিন পর আমাকে ডেকে রীতিমতো ধমক—‘কবিতা লেখার জন্য সরকার আপনাকে বেতন দেয় না, কাজ না থাকলে কাজ তৈরি করবেন।’
‘ওরে আমার কে রে! কাজের মুখে আগুন!’ মনে মনে বলে মুখে বললাম, ‘স্যার, আমার কোনো ফাইল পেন্ডিং নেই।’
‘যান, যুব সংগঠনের লেটেস্ট তালিকা তৈরি করে আগামী সপ্তাহে দেখাবেন।’
দেখলাম তার টেবিলে দৈনিক আজকের কাগজ। আমার প্রকাশিত কবিতার সাহিত্যপাতাটি মুচড়িয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ছুড়ে ফেললেন।
রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। রুমে ঢোকার আগে পিয়ন বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার একজন মেহমান এসেছেন।’
‘আমাকে উদ্ধার করেছেন’—রাগে সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছিল। মিনমিন করে বলে রুমে ঢুকে দেখি, যেন এক বয়সী রাজপুত্র দিব্যি সিগারেট ফুঁকছে। চেয়ারে হেলান দেওয়া একটা সুদৃশ্য লাঠি। লাঠির বাঁকানো মাথা রুপালি নকশা করা পাতে মোড়া। সালাম দিলাম। তিনি আমার টেবিলে রাখা চায়ের খালি কাপে সিগারেট টিপে দিলেন। এ কী রে বাবা! চেহারা সুন্দর বলে কি যা ইচ্ছা তা–ই করবেন?
‘আমি আরমান। বীর মুক্তিযোদ্ধা। তোমাদের অঞ্চলের আরমান ফুটবলার।’
কে জানত আমার বড় আপাদের এককালের অতি আকাঙ্ক্ষিত ফুটবলার প্রেমিক আমার সামনের চেয়ারে এসে বসবে? শুধু বড় আপারা? কৈশোরে পা দেওয়া আমিও কি মনে মনে তাকে চাইনি? শবে বরাতে নামাজ পড়ে মোনাজাতে বলতাম, ‘হে খোদা! আরমান ভাই যেন শুধু আমার হয়।’
অন্যরা পরিচয় করিয়ে দিলে ‘বীর’ বলা যায়। কিন্তু নিজেকে বীর বলা যেন ‘আমি মিস্টার অমুক’ বলার মতো। আমার বড় আপাদের একসময়ের ক্রেজ। আমাদের নানাবাড়ির কাছে এ টিম খেলার মাঠে ফুটবল খেলতে আসত আরমানের টিম। ক্যাপ্টেন আরমান ছিল বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন। আমার আপা আর তার বয়সী কাজিনরা ছাদে লুকিয়ে আরমানের খেলা দেখত। খেলা আবার কী? দেখত তো রাজপুত্রের মতো নায়কোচিত আরমানকে। ওদের সাথে আমিও দেখতে চাইতাম। ওরা আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। ছাদে সিঁড়িঘরে লুকিয়ে ওদের কথা শুনতাম—
‘গোল দেবার পর আমাদের ছাদের দিকে তাকাচ্ছিল, দেখেছিস?’
‘ইশ! মনে হচ্ছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর ঘামের গন্ধ নিই।’
‘আমি বাবা একটা চিঠি ওকে দেবই, লিখে রেখেছি। টিকলির হাতে দিয়ে পাঠাব দাঁড়া।’
‘কিন্তু ধরা পড়লে ছোট মামা তো বুলেট ছুড়বে। মুক্তিযুদ্ধে তিন পাকিস্তানিকে গুলি করার ঘটনা তো পুরোনো হয়নি।’
‘ওই দেখ, আবার আর একটা গোল। আরমান আরমান তুম মেরে জানি জান।’
আমার বড় মামার দুর্ধর্ষ মেয়ে পিকলির তখন বিয়ের পাত্র দেখা চলছিল। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা; আরমানের কথা সে নানিকে জানিয়েছিল। বাড়ির সবাই ওকে একটু ভয়ও পেত। হুমকিটুমকি দিয়ে কিছু করে ফেলে কি না! আমার হাতে চিঠি ধরিয়ে দিয়েছিল। আমি ওটা পড়েটড়ে গায়েব। শবে বরাতের রাতে আমার মোনাজাতের তাহলে কী হবে? ছোট মামা সবকিছু নিজ দায়িত্বে নিয়ে আরমান সম্পর্কে জেনে এসে ফেটে পড়লেন—
‘ও তো বিবাহিত। একটা ছেলেও আছে। আবার বলে কিনা তাতে কী? ওই শালা তো যুদ্ধেও যায়নি। ব্লাডি কাওয়ার্ড! খালি রাঙা মুলো মার্কা চেহারা আর দু–চারটা গোল দিলেই পুরুষ হওয়া যায় না।’
ব্যস! আমাদের সবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার।
‘চা দিতে বলি?’
‘তোমার আপারা কেমন আছে? হ্যাঁ, চা তো খাবই। তুমি তখন বেশ ছোট ছিলে। এখন তো দিব্যি হয়েছ।’
আমি একটু রাঙা হয়ে উঠলাম। বললাম, ‘আমার অফিসে কোনো কাজে এসেছেন?’
‘কেন তোমাকে দেখতে আসতে নেই?’ বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি আনত মুখে ফাইল খুলি আর বন্ধ করি। পিয়নকে ডেকে চা–বিস্কুট দিতে বলি।
‘একই অঞ্চলের মেয়ে। ভালো চাকরি করো, এ তো আমার গর্ব। আমার কিছু ছেলে মিলে একটা সংগঠন করেছে। তোমার অফিস থেকে নিবন্ধন দিতে হবে।’
‘নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। ওদের বলবেন গঠনতন্ত্র নিয়ে আমাদের উপজেলা অফিসে যোগাযোগ করতে।’
ছোট মামা সবকিছু নিজ দায়িত্বে নিয়ে আরমান সম্পর্কে জেনে এসে ফেটে পড়লেন—‘ও তো বিবাহিত। একটা ছেলেও আছে। আবার বলে কিনা তাতে কী? ওই শালা তো যুদ্ধেও যায়নি। ব্লাডি কাওয়ার্ড! খালি রাঙা মুলো মার্কা চেহারা আর দু–চারটা গোল দিলেই পুরুষ হওয়া যায় না।’
তিনি যে এ কাজের জন্য খুব মরিয়া, তা মনে হলো না। আপাদের কার কোথায় বিয়ে হয়েছে, তা দেখলাম তার মুখস্থ। আমার নানাবাড়ির চিলেকোঠার ছাদে মামারা কবুতর পুষত। তিনি নাকি একদিন একটা কবুতরের পায়ে চিঠি বেঁধে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নাম উল্লেখ না করেই। এ কথা বলেই খুব জোরে হেসে উঠলেন। প্রতিটা হাসির শেষে ঝুঁকে পড়ে চুলের মধ্যে আঙুল চালাচ্ছিলেন। দেখতে বেশ লাগছিল। হতে পারে কেউ তাকে বলেছিল ওই ভঙ্গিতে তাকে আকর্ষণীয় দেখায়। তার উঠে যাওয়ার কোনো নামনিশানা নেই। আমার হাতেও বিশেষ কোনো কাজ নেই। পাশের রুমের পুরুষ কলিগ দেখলাম একবার উঁকি দিয়ে গেল।
‘তোমার হাজব্যান্ডকে আমার কথা বোলো। সামনের সপ্তাহে মিনিস্ট্রিতে যাব। দেখা করে আসব।’
কী সব্বোনাশ! এই লোক আবার গিয়ে না আপাদের কথা বলে বসে। এমনিতেই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত আমার বর। এমন এক সুদর্শন আমার অফিসে আসে জানতে পারলে আমার খবর আছে!
‘তোমার অফিসে কয়েকটা পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে দেখেছি। আমার দু–একজনকে ঢোকাতে হবে। সাবেরার সাথেও দেখা করেছি। ওর দপ্তরেও লোক নেবে।’
সাবেরার সাথেও দেখা করেছে? সাবেরা আমার স্কুলবন্ধু। অসামান্য সুন্দরী। আমার চেয়ে অনেক ভালো পজিশনে আছে। ওর বর পুলিশ ক্যাডারে। ভদ্রলোকের মতলব কী? একটু দৃঢ় স্বরেই বললাম, ‘আমি তো নেওয়ার কেউ না। তা ছাড়া রিটেনে পাস করলে তখন ওপরের লেভেলে কথা বইলেন।’
‘রাখো তোমার রিটেনমিটেন। যা করলে হয়, সেই ব্যবস্থা করো।’
দেবদূতের মতো পিয়ন এসে বলল, ‘ম্যাডাম, পিডি স্যার বাজেটের ফাইল নিয়ে সালাম দিছেন।’
সৌন্দর্য আর তদবিরের ঘেরাটোপ থেকে বেরোনোর মওকা পেয়ে ফাইল বগলদাবা করে দ্রুতই উঠে বললাম, ‘আরমান ভাই, আমার একটু কাজ আছে। ভালো লাগল। আবার আসবেন।’
‘তোমার পিয়নকে বলো আরেক কাপ চা দিতে। আমার কিছু জরুরি ফোন করার আছে। মুক্তিযুদ্ধ মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি তোমার হাজব্যান্ডের ব্যাচমেট না?’ বলে আমার অনুমতির ধার না ধেরে টেবিলের অপর দিক থেকে হাত বাড়িয়ে নিজের সামনে ফোন টেনে নিলেন। ফোনের তারে আটকে আমার চায়ের কাপ মেঝেতে উল্টে গেল। তিনি সরিটরি না বলেই ডায়াল করতে বসে গেলেন। তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় একটা অদ্ভুত পুরুষালি গন্ধ আমাকে কিছুক্ষণ আবিষ্ট করে রাখল। হতে পারে সেটা কোনো দামি পারফিউমের গন্ধ অথবা একসময়ের না পাওয়া কাঙ্ক্ষিত মানুষের অধরা মাধুরী। আমার ভেতর কি গেয়ে উঠল—‘ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি’?
বাজেট আলোচনায় বেশ সময় লাগল। আমি চাচ্ছিলাম আরও কিছুক্ষণ চলুক। আমাদের সবার প্রেমিক ফুটবলারের সঙ্গ তেমন ভালো লাগছিল না। কেবল চেহারায় আভিজাত্য থাকলেই তো হবে না, আচরণেও আধুনিক হতে হয়। কিন্তু এখনো যদি বসে থাকে? আবার লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে হয় কি না, কে জানে? পাশের রুমের হোঁদল কুতকুত কলিগ একবার দেখে গেছে। যদি আবার এসে দেখে একসাথে লাঞ্চ করছি, তাহলে ডিজির কানে তুলতে কসুর করবে না। আমি নিশ্চিত এই লোকই আমার কবিতা লেখার কথা ডিজিকে লাগিয়েছে। ধীর পায়ে পিডির রুম থেকে বেরিয়েই সিঁড়ির দিকে চোখ গেল। ও মাই গড! এতক্ষণে যাচ্ছেন তিনি। লাঠি ভর দিয়ে একটু খুঁড়িয়ে পেছন ফিরে নামছেন। ধবধবে মুঠোতে ধরা লাঠি, দীর্ঘ সুপুরুষ, ঈষৎ নত, আমাদের ঈপ্সিত প্রাক্তন। বেশ একটা কবিতা এল মনে মনে—
‘তোমার পিয়নকে বলো আরেক কাপ চা দিতে। আমার কিছু জরুরি ফোন করার আছে। মুক্তিযুদ্ধ মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি তোমার হাজব্যান্ডের ব্যাচমেট না?’ বলে আমার অনুমতির ধার না ধেরে টেবিলের অপর দিক থেকে হাত বাড়িয়ে নিজের সামনে ফোন টেনে নিলেন। ফোনের তারে আটকে আমার কাপ মেঝেতে উল্টে গেল।
‘যে পায়ে দুলিয়েছ পোষমানা রবি
চৌখুপি দিগন্ত অনায়াসে লুফে নিত শতমুখ যার
হায় অ্যাকিলিস! তোমার গোড়ালি কিনা
বিনা নির্ভরে
দেখে নাকো আর কোনো সূর্যাস্ত অপার।’
সামনের সপ্তাহটা বেশ ভয়ে ভয়ে কাটল। একটু ব্যস্ততাও ছিল অফিসে। মনে হতো এই বুঝি আবার আরমান ভাই এসে বলবে, ‘আমার কাজের কদ্দুর কী করলা? তোমার হাজব্যান্ডকে আমার কথা বলেছ? তোমাকে আজ সেদিনের চেয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে।’ আমি কি আসলেই চাচ্ছিলাম না আমাদের অ্যাকিলিস আবার আসুক? তাহলে রোজ একটু বাড়তি সাজ কেন চড়াচ্ছিলাম অফিসে আসার সময়? শাড়ির সাথে রং মিলিয়ে টিপ, বুকের পাড়ের ওপর কোনো দিন ঝিনুক, কোনো দিন মাটি বা সুতার মালা। একদিন তো খোঁপায় ফুল গুঁজেও এসেছিলাম অফিসে। কলিগরা ভাবছিলেন ওদিন কোনো বিশেষ দিন ছিল বা আমার...। তারপর কবে কবে যেন আবার সাধারণ হয়ে উঠলাম। বলতে গেলে খঞ্জ অ্যাকিলিসের কথা তেমন আর মনে পড়ত না। মাস দেড়েক বা দু্ই মাস পর সাবেরার ফোন—
‘কিরে কবি কী করছিস? আজকের পেপার দেখেছিস?’
‘নারে। একটা কবিতার শেষটুকু টানতে পারছি না। কেন? আমার কবিতা পড়েছিস নাকি কোনো পেপারে?’
‘না হে না। কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাড়তি ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। আমাদের মহান আরমান ভাই লাঠি হাতে তাদের লিড দিচ্ছিলেন।’
‘তো?’
‘তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, অনেক আগেই ফুটবল খেলার সময় গোড়ালি জখম হলে তার ফুটবলার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।’
‘দাঁড়া দাঁড়া, মনে পড়ছে আমার ছোট মামা বলেছিল ও তো যুদ্ধেই যায়নি।’
বেশ পরে কথায় কথায় সাবেরা অবশ্য বলেছিল যে দুই দিন পরপর ওর অফিসে এসে আমাদের কিংবদন্তি ফুটবলার এমন বিরক্ত করছিল যে ও ওর পুলিশ বরকে বলতে বাধ্য হয়েছিল। আমাদের বরেরা এমনিতেই সন্দেহবাতিক। তার ওপর অমন নজরকাড়া অ্যাকিলিস দেবতা বলে কথা!