বিলয়
মশিউল আলমের ‘বিলয়’ গল্পটি ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। এত দিন শুধু কাগুজে সংস্করণে থাকা গল্পটি আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
যে লেখাটি নিচে পত্রস্থ হচ্ছে, তা আমার রচনা নয়। আমাদের ক্রাইম রিপোর্টার সুপন রায়ের মারফতে লেখাটি আমার হস্তগত হয়েছে। তিনি লেখাটি সংগ্রহ করেন ঢাকার তেজগাঁও থানা থেকে, গত আগস্ট মাসে। সে মাসের ২০ তারিখে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার পূর্ব রাজাবাজারে দেড় রুমের একটি ভাড়া বাসায় পুলিশ দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, বাড়িওয়ালা ভাড়া নিতে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি, ধাক্কাধাক্কি করে কোনো সাড়া না পেয়ে সংশয়ে পড়েন। একটা কিছু দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে তিনি পুলিশ ডাকেন। পুলিশ দরজায় কোনো তালা না দেখে ভেতরে লোক আছে মনে করে বহুক্ষণ ডাকাডাকি করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অবশেষে দরজা ভাঙতে বাধ্য হয়। ভেতরে ঢুকে কাউকে পাওয়া যায় না। স্বভাবতই পুলিশ-বাড়িওয়ালা সবাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে। বাসার তিনটি জানালা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো অক্ষত। ভেতর থেকে কোনো মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার কোনো পথ বা ছিদ্র ছিল না। বাসাটিতে ভাড়া থাকতেন, বাড়িওয়ালার সাক্ষ্য অনুসারে, এক নবীন দম্পতি। যুবকের নাম নেয়ামুল কবির, তিনি একটি গার্মেন্টস কোম্পানিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী কিছু করতেন না, সারা দিন ঘরে বসে কাটাতেন। আশপাশের কোনো প্রতিবেশী, ভাড়াটে বা বাড়িওয়ালার পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কোনো মেলামেশা ছিল না। তাঁরা প্রায় সকলের অলক্ষে নিরিবিলি বসবাস করতেন।
পুলিশ নিশ্চিত হয় যে বাসার দরজা ভেতরের দিকে লোহার দুটি ছিটকিনি দ্বারা বন্ধ ছিল। দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কোন পথে কীভাবে বাসা থেকে বের হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন, তা পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি।
ঘটনাটি আগাগোড়াই বিভ্রান্তিকর ও অলৌকিক বলে দেশের সংবাদপত্রগুলো এ নিয়ে তেমন উত্সাহ দেখায়নি। দুয়েকটি পত্রিকায় এক কলামে তিন ইঞ্চি খবর বেরিয়েছে যে রহস্যজনকভাবে দম্পতি উধাও।
বাড়িওয়ালার সঙ্গে বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র থেকে জানা গেছে, নেয়ামুল কবিরের স্থায়ী নিবাস দিনাজপুর শহর, পিতা মৃত আক্কাসুর রহমান। পুলিশ নিজের গরজে দিনাজপুরে নেয়ামুল কবিরের খোঁজ করেনি, তা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বাড়িওয়ালার কোনো অভিযোগও ছিল না। সুপন রায় নিজ কৌতূহলে দিনাজপুর অবধি গিয়ে মৃত আক্কাসুর রহমানের বাড়ি খুঁজেছেন। কিন্তু শুধু নাম ছাড়া অন্যান্য পরিচয় বা পাড়ার নাম না থাকায় তিনি কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি।
নিচের লেখাটি থেকে পুলিশ ও সুপন রায়ের নিশ্চিত ধারণা যে সেটা নেয়ামুল কবিরের লেখা। সুপন রায় সাহিত্যরসিক। পুলিশের কাছ থেকে লেখাটির একটি ফটোকপি নিয়ে পড়ে তিনি রিপোর্টারের স্বভাবসুলভ কৌতূহল ছাপিয়ে এক অনন্য সাহিত্যরসের স্বাদ পান। অবশ্য তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে লেখাটির ভাষা হয়তো সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ নয়। কিন্তু এর বিষয়বস্তু সন্দেহাতীতভাবে ‘ইউনিক’ বলে তাঁর মনে হয়েছে। আমি একটু–আধটু গল্প লেখার চেষ্টা করি। সুপন আমাকে লেখাটি পড়তে দিয়ে জানতে চান, লেখাটি কেমন। বলা বাহুল্য, আমি লেখাটি পাঠ করে বেশ ঔত্সুক্য বোধ করি এবং লেখকের সম্পর্কে সুপনের কাছে জানতে চাই। সুপন আমাকে যা জানান, তা ওপরে বলেছি। এর বেশি আর কিছু জানা যায়নি। সুপন আমাকে প্রস্তাব করেন, লেখাটির ভাষা পরিমার্জন করে তা প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে ছাপানোর ব্যবস্থা করা যায় কি না। আমরা একত্রে সাময়িকী সম্পাদককে লেখাটি পড়ে দেখার অনুরোধ করি। তিনি লেখাটি অন্যমনস্কভাবে পড়তে পড়তে মনোযোগী হয়ে ওঠেন এবং পড়া শেষ করে উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করেন, কে লিখেছে? সুপন তাঁকেও বিস্তারিত জানান। আমরা তাঁর কাছে জানতে চাই, কিছু ঘষামাজা করে লেখাটি ছাপানো যায় কি না। তিনি জানান, ঘষামাজার প্রয়োজন নেই।
অতএব নেয়ামুল কবিরের লেখাটি হুবহু ছাপা হচ্ছে। শুধু লেখাটির শিরোনাম আমার দেওয়া—
‘আমার বয়স ২৮। আমার স্ত্রীর ২২ অথবা ২৩, বা ২১; আমি ঠিক জানি না। মনে হয় সে নিজেও ঠিক জানে না। সে কখনো ঠিক করে বলেনি। অবশ্য ওর মিথ্যে বয়সটা ২১, মানে সার্টিফিকেটের। তা যা–ই হোক, বয়স কোনো ফ্যাক্টর না। আমি এখন, আমার এখন বলতে ইচ্ছে করছে আমাদের সম্পর্কের কথা। না, আমি বোধ হয় বলতে চাই, সে কেমন মানুষ (ছিল)। ছিল, এখন নেই। একটু আগে সে মারা গেছে। এতক্ষণে আমি নিশ্চিত, সে মরে গেছে। মানুষ মরে যাওয়ার পরে আমরা বলে থাকি, সে কেমন মানুষ ছিল। বলি, আহা লোকটা বড় ভালো মানুষ ছিল। আমার স্ত্রীর সম্পর্কে আমি তা বলব না। তার সঙ্গে দুই বছর বাস করে আমি বুঝতে পারিনি তাকে। তা–ই বলে তার সঙ্গে আমার বনিবনা ছিল না, তা কিন্তু নয়। একসঙ্গে থাকলে একটু–আধটু বনিবনা তো হয়ই। মনোমালিন্যও হয়। আমাদের মধ্যে দুরকমই ছিল। কিন্তু সেটাও বড় কোনো ব্যাপার নয়। আলাদা করে দেখার বিষয় নয়। আর এখন তো সেসব ভাবার মতো বিষয়ই নয়। কারণ, একটু আগে সে মারা গেছে। আর আমার মনে হচ্ছে, আমিও মারা যাচ্ছি।
পরশু দিন সকালে তার জ্বর আসে। দুপুর হতে হতে জ্বর বেড়ে ওঠে ১০৩ ডিগ্রিতে। সে খুশি হয়। কেননা সে সব সময় মৃত্যুর কথা বলে, মরতে চায়। এমনিতে সে সব সময় মনমরা থাকে। অসুখ করলে খুশি হয়ে ওঠে, ভাবে, এবার মরার সুযোগ এল। কিন্তু গত দুবছরে বেশ কয়েকবার ভালো রকম জ্বরে ভুগলেও তার মরার সুযোগ হয়নি। এবার, গত মঙ্গলবার দুপুরে, তার জ্বর ১০৩ ডিগ্রি পেরিয়ে আরও ওপরের দিকে চড়তে থাকলে সে খুশি হয়ে আমাকে বলে, ‘এবার আর মিস নেই। এবার আমি মরবই।’ আমি তাকে আদর করে বলি, ‘না, তুমি মরবে না। কেন মরতে চাও তুমি?’ আমি তার কপালে জলপট্টি দিচ্ছিলাম আর সে হাসছিল। হাসিটা ম্লান দেখাচ্ছিল। সে বরাবরই ম্লান, নিষ্প্রভ ধরনের মেয়ে। কিন্তু সে খুব ফরসা, সাদা কাগজের মতো তার মুখ, কপাল, গাল। চোখ দুটো গরুর চোখের মতো নিরীহ। হ্যাঁ, আমি তার কপালে জলপট্টি দিচ্ছিলাম আর সে হাসছিল আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে। আগ্রহ নিয়ে, পার্থিব মানুষের মতো কৌতূহল ভরা চোখে আমার চোখের দিকে সে কখনো তাকায়নি। কিন্তু সে যে অভিমানী বা উন্নাসিক, তা–ও নয়। সে যেন কেমন, আমি বুঝতে পারি না।
কপালে জলপট্টি দিয়েও জ্বর বশ মানছিল না, সাদা মুখ পুড়ে তামাটে হয়ে যাচ্ছিল। আমি দোকান থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট কিনে আনি। সে বলে, আমি খাব না। আমি খুব সাধাসাধি করি, তবু সে ট্যাবলেট খায় না। আমি খাইয়ে দিতে চাই, সে মুখ খোলে না। আমি বলি, ‘ছেলেমানুষের মতো জেদ কোরো না।’ সে ম্লান হাসে। তার মুখমণ্ডল সুন্দর, সকরুণ মুখমণ্ডল পুড়ে তামা হয়ে যাচ্ছিল। এভাবে দিনটা গেল। তার জ্বর ১০৩ ডিগ্রিতে থেমে রইল। রাতে আমি আলু ভর্তা করে, ডিম ভেজে তাকে ভাত খেতে দিলাম। সে খাবার ছুঁল না। শুধু ম্লান হেসে বলল, ‘খাব না।’ আমি কাকুতি-মিনতি করলাম, ছোট বোনের মতো করে আদর করলাম, লক্ষ্মী বললাম, সোনা বললাম। সে শব্দ করে হাসল, কিন্তু খাবার স্পর্শ করল না। রাতে সে ঘুমোল না। ঘুমুতে পারল না, কারণ, জ্বর বাড়ছিল। দাঁতে দাঁত কামড়ে সে চুপচাপ পড়ে রইল সারা রাত।
পরদিন তার জ্বর বেড়ে উঠল ১০৪ ডিগ্রিতে। আমি আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে ডেকে আনলাম। দেখেটেখে সে ১৪টা কট্রিম ট্যাবলেট, দিনে ৩টা নাপা ট্যাবলেট আর হিস্টাসিন লিখে দিয়ে গেল। আমি ওষুধগুলো কিনে আনলাম। সে স্পর্শ করল না। দুপুর গড়িয়ে গেলে বলল, ‘ভাত খাব।’ আমি তাকে ভাত খেতে দিলাম। সে একটু খেল, বেশিটাই খেল না। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে ওষুধ খেতে বললাম। ম্লান হেসে চেয়ে রইল সে আমার মুখের দিকে। ওষুধ খেল না। তার জ্বর বাড়তে লাগল। বিকেলে কিছু ফলমূল কিনে আনলাম, গ্লুকোজ, ডাব নিয়ে এলাম। সে কিছুই মুখে তুলল না। আমার মনে হলো, এবার বুঝি আমার বউ সত্যি সত্যি মরে যাচ্ছে।
ওইভাবে ওই দিনটিও চলে গেল। রাতে তার কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠে হাত সরিয়ে নিলাম, যেন তপ্ত কড়াইয়ে হাত দিয়েছি আমি, আমার হাতটা যেন পুড়ে গেল। তাড়াতাড়ি থার্মোমিটার ধুয়ে তার মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম জোর করে, কেননা সে আর জ্বর মাপতে দিচ্ছিল না। সে বলল, ‘কামড়ে দিলাম।’
‘খবরদার! পাগলামি কোরো না।’ অ্যালার্ট হয়ে বললাম।
‘কী হবে কামড়ে দিলে?’
‘কাচ তো, ভেঙে যাবে। মুখ, জিব কেটে যাবে, পারদ বেরিয়ে পেটের ভেতরে চলে যাবে।’
‘তাহলে মরে যাব?’ ভরসা হারিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমি থার্মোমিটার ওর মুখ থেকে টান দিয়ে বের করে নিলাম। এক মিনিটও যায়নি। দেখলাম, এরই মধ্যে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের দাগ ছুঁয়েছে। আমি থ হয়ে বসে রইলাম। সে ছাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
পরদিন সকালে জ্বর এল আমার। মানে আজ সকালে। ভাবলাম, খুব ছোঁয়াচে আর বেপরোয়া ধরনের এক ভাইরাল ফিভার এটা। কট্রিম আর প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেলাম একসঙ্গে দুই ডোজ করে। কিন্তু জ্বর বশ মানল না। দুপুরে রান্না করে ভাত খেলাম, ট্যাবলেটগুলো খেলাম। জ্বর কমল না। বউয়ের পাশে শুয়ে থাকলাম। ভাবলাম, আমারও জ্বর এল, এবার যদি তার মধ্যে সহমর্মিতার বোধ জাগে, একাকিত্বটা দূর হয়ে যায়। বিপদগ্রস্ত পরিব্রাজকদের মধ্যে যেমনটি হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত লোকজনের মধ্যে যেমনটি হয়ে থাকে। কিন্তু দেখতে পেলাম, সে নির্বিকার চেয়ে আছে শাদা, শূন্য ছাদের দিকে। আমি তার কপালে একটা হাত রাখলাম। আমার হাত পুড়ে যাচ্ছে। তার জ্বর নিশ্চয়ই আমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। বিকাল থেকে সে খুব কথা বলতে শুরু করল। ছাদের দিকে তাকিয়ে, পাশ ফিরে দেয়ালের দিকে চেয়ে আপন মনে অনর্গল বকে চলল। একটার পর একটা ছড়া বলে চলল। ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে // ঢাক–ঢোল ঝাঁঝর বাজে // বাজতে বাজতে চলল ঢুলি // ঢুলি গেল কমলাফুলি....’। তারপর হঠাৎ থেমে আবার গোড়া থেকে শুরু। তারপর....‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে// বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে // পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি...’। মাঝখান থেকে সে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে থাকে। তারপর আবার ছড়া—‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ// ওই আমাদের গাঁ// ঐ খানেতে বাস করে // কানাবগির ছা...’। আমি নরম, সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে বলি, ‘বাড়ি যাবে? বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে?’ সে ভ্রুক্ষেপ করল না। বকে চলল আপন মনে। আমার কোনো কথাই সে আর শুনল না।
রাত দুটোর দিকে সে চুপ করল। ক্লান্ত হয়ে চোখ দুটো তার বুজে এল। আর খুলল না। আমি একটু স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম, ঘুমোল। একটু পরে তার কপালে হাত রেখে দেখলাম, ঠান্ডা। ভাবলাম, তার জ্বর পড়ে গেছে আর আমার বেড়েছে। আমি তাকে ডাকলাম। সে সাড়া দিল না। ভাবলাম ঘুমোচ্ছে, ঘুমাক। বড় কষ্ট পাচ্ছিল বেচারি। এদিকে আমার জ্বর বাড়তে লাগল। মেপে দেখলাম, ১০৩ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আরও কিছু সময় পর তার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম, হিম ঠান্ডা। ঝাঁকুনি দিলাম। কোনো সাড়া নেই। জোরে ঝাঁকুনি দিলাম। তার মাথাটা এক দিকে কাত হয়ে বালিশ থেকে ঢলে পড়ে গেল।
ঘরের মেঝেতে ইঁদুর আর আরশোলার দল ছোটাছুটি শুরু করে দিল। তারা টের পেয়ে গেছে। তাদের মারার জন্য আমরা কারওয়ান বাজার থেকে যন্ত্র আর বিষ কিনে এনেছিলাম।
এখন রাত ৪টা। সে আমার পাশে মৃত শুয়ে আছে। ইচ্ছে হলেই আমি তার কপালে হাত রাখতে পারছি। বরফের মতো ঠান্ডা তার কপাল। বারবার এই হিম মৃত্যুকে ছুঁয়ে দেখে কী লাভ? থাক, সে যেভাবে রয়েছে, সেভাবে শুয়ে থাক। আমি তার পাশে শুয়ে কিছু ভাবার চেষ্টা করি। কাল তো ওকে নিয়ে যাওয়া হবে। কবরে রেখে আসতে হবে। কিন্তু তারপর? তারপর আর কোনো দিন, কক্ষণো, কস্মিনকালেও তাকে আর আমি দেখতে পাব না? আমার জ্বর বাড়ছে। ১০৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। মনে হয় আমিও মারা যাচ্ছ। কিন্তু আমি কখনো মরতে চাইনি। আর দশটা সহজ সাধারণ লোকের মতো আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছি।
কিন্তু ও সব সময় মৃত্যুর কথা বলত। বিয়ের রাতেই বলেছিল, ‘আমি যদি মরে যাই?’ আমি ভেবেছিলাম, আমি ওকে কতটা ভালোবাসি, সেটাই তার প্রশ্ন ছিল। কিন্তু পরে দেখেছি, আমার ভালোবাসা ও চায়নি। ও আসলে কিছুই চায়নি। কিছুরই দরকার ছিল না ওর। এত অল্প বয়সে জগতের সব দরকার ওর ফুরিয়ে গিয়েছিল কেমন করে? কী হয়েছিল ওর? নাকি কোনো দরকারবোধ নিয়েই সে আসেনি পৃথিবীতে? অথবা পৃথিবীতে এসে তার কোনো কিছুর জন্য আকাঙ্ক্ষাই জাগেনি।
আমার জ্বর বাড়ছে। আমি একটা অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হচ্ছি। অগ্নিপিণ্ড নিজে উত্তপ্ত, কিন্তু তার শীত লাগে আমার মতো। আমার ভীষণ শীত করছে। একটা কাঁথা চাই আমি। একটা লেপ দরকার। কিন্তু এই ভাদ্র মাসে লেপ-কাঁথা কোথায় পাব? ওগুলো ইঁদুরে কেটেছে। ওই যে ইঁদুরের দল, ছোট ছোট ফুর্তিবাজ দুষ্ট ইঁদুরের দল ঘরময় ছোটাছুটি করছে। ওরা বুঝতে পেরেছে। ওরা দল বেঁধে ঠুকরে ঠুকরে খাবে আমাদের। আমাদের শরীর পচে যাবে। কেউ টের পাবে না, এইখানে, এই শহরের এক অন্ধকার গলিতে একটি ছোট্ট ঘরে আমরা মরে পড়ে আছি। আমরা ফুলে উঠব, ফেঁপে উঠব, দুর্গন্ধ ছড়াব। তবু কেউ আমাদের ডাকতে আসবে না। কেউ আমাদের দরজায় টোকা দিতে আসবে না। আমরা পচে–গলে নিঃশেষ হয়ে গেলে, মাস ফুরোলে, বাড়িওয়ালা ভাড়া নিতে আসবে। কিন্তু আমাদের পাবে না। আমরা শেষ, নিঃশেষিত।
কিন্তু একি? রুনু কোথায়? কোথায় গেল সে? না, সে কীভাবে যাবে? কে তাকে নিয়ে গেল? জিরো ওয়াটের নীল বাল্ব জ্বলছে ঘরে। আমি তাকে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম। তার পাশেই, প্রায় গায়ে গায়ে শুয়ে ছিলাম আমি। এখনো একই জায়গায়ই শুয়ে আছি। কিন্তু পাশে রুনু নেই। নিঃশব্দে কে তাকে তুলে নিয়ে গেলে? নাহ! কে আসবে? ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। আজ সারা দিন আমরা দরজা খুলিনি। তাহলে? রুনু কি মরেনি আসলে? চুপ করে শুয়ে ছিল? একফাঁকে উঠে গেছে নিঃশব্দে? এমন নিঃশব্দে যে নিশ্বাসের নাগালের মধ্যে থেকেও টের পাইনি আমি? হতে পারে না কি? অসম্ভব। অসম্ভব।
আমার অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে? আমি জ্বরের ঘোরে দিশা হারিয়ে ফেলেছি? অন্ধ হয়ে যাচ্ছি? তা কী করে হবে? নীল আলোয় সবকিছু দেখতে পারছি আমি। বিছানার ভাঁজ পর্যন্ত। তাহলে রুনু গেল কোথায়? বাথরুমে? দরজা খোলার শব্দ হবে না? বাতি জ্বালবে না? পানির শব্দ পাব না? যাকগে যেখানে ইচ্ছে! আমার আর কোনো উত্সাহ নেই, শক্তি নেই, কৌতূহল নেই। আমি মারা যাচ্ছি। মারা যাচ্ছি আমি। নিভে যাচ্ছি, নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। আমি আর নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না: আমার হাত নেই, পা নেই, বুক-পেট-পাঁজর কিছু নেই, কিছুই নেই। আমি ছোট হয়ে গেছে, একটা বিন্দুতে পরিণত হয়ে গেছি। বিন্দু কি নিজেকে দেখতে পায়?
ও হো! আমি তো আমাদের সম্পর্কের কথা বলতে চেয়েছিলাম। বলতে চেয়েছিলাম, রুনু কেমন মেয়ে ছিল। হা! হা! কী হাস্যকর! মানুষ তার নিজের সম্পর্কে অন্যদের শোনাতে চায়! কী হাস্যকর যে মানুষেরা একে অপরকে গল্প শোনায়! কী হাস্যকর যে মানুষেরা কথা বলে, কাজ করে, পরস্পর মেলামেশা করে! কী নিষ্ফল, কী অর্থহীন, কী উদ্ভট! আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম হাতিডুম গরুডুম মোষডুম হাঁসডুম মুরগিডুম মুজিবডুম জিয়াডুম রুনুডুম আমিডুম... ডুমস ডে!