বল মাঠে গড়াবে রাত দশটায়। অথচ এশার আজানের পর থেকে আনোয়ার চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠোনে মানুষ গিজগিজ করছে। এই গাঁয়ে সন্ধ্যার আগেই মানুষের নাকের ডাক শোনা যায়। অথচ আজ রীতিমতো চোখে পানি দিয়ে ছেলে–বুড়োরা ঘুম তাড়িয়েছে। উঠোনজুড়ে খড়ের বিছানায় ঝাঁকে ঝাঁকে মশার শুঁড়ে বিদ্ধ হতে হতেও মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে ১৪ ইঞ্চি টেলিভিশন সেটের দিকে।
এখানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। তিন মাইল দূরের বাজার থেকে ব্যাটারি চার্জ করে এনে টেলিভিশন চালাতে হয়। তাতে গাঁটের পয়সা খরচ হয় বলে চেয়ারম্যানের কড়া নির্দেশ—অকারণে টিভি চালানো যাবে না। খবর, ছায়াছন্দ, এমনকি সিনেমার সময়েও টিভি চলবে না। টিভি চলবে ঠিক নয়টা উনষাট মিনিটে, যখন রেফারির পিছু পিছু দুই দল মাঠে নামবে।
চেয়ারম্যান উঠোনে ঢুকলেন নয়টা পঞ্চান্নতে। পায়চারি করতে করতে টিভির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটা প্রকাণ্ড ফজলি আমের গাছের নিচে টিভি সেটটি রাখা। তিনি গলা উঁচু করে গাছের আমগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন কেউ ঢিল ছুড়ে আম পেড়েছে কি না। গ্রামের অন্য গাছগুলোর আম আঁটি শক্ত হওয়ার আগেই ছেলেদের পেটে গেলে গেছে, কিন্তু চেয়ারম্যানের গাছের দিকে হাত বাড়াতে কেউ সাহস করেনি। সন্তুষ্ট হয়ে চেয়ারম্যান টেলিভিশনের মাঝবরাবর একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসলেন। মিনিট তিনেক অপেক্ষা করে টিভি চালু করে দিল তাঁর ডানহাত ফজলু।
কৃষ্ণপক্ষের রাতের নিকষ অন্ধকার ভেদ করে দপ করে জ্বলে উঠল সাদাকালো টিভির নীল-সাদা আলো। কয়েকবার এঁকেবেঁকে যাওয়ার পর পর্দাটা অবশেষে স্থির হলো। চেয়ারম্যানের পাশে বসা জলিল মেম্বার চেঁচিয়ে বলল, ‘ওই ফজলু, আওয়াজ বাড়ায়ে দে।’
আনোয়ার চেয়ারম্যান মুখ টিপে হেসে বললেন, ‘তুমি মনে হয় ইংরাজি বুজতি শুরু করছ, জলিল?’
মেম্বার জিব কেটে বলল, ‘অত এলেম আমার নাই, চেয়ারম্যান সাব। আওয়াজ না হলি পরে খেলা খেলা ভাব আসে না। গোল হলো না ফাউল হলো, আওয়াজ শুনি বুজতি পারি।’
চেয়ারম্যান বললেন, ‘আজকে কে জিতবে বলো তো?’
জলিল মেম্বার কেঁচোর মতো কুঁকড়ে গিয়ে বলল, ‘এ প্রশ্নটাই তো হলো না। কে আর জিতবে? আর্জেন্টিনা। কোথায় ম্যারাডোনার দেশ, আর কোথায় কোন আফ্রিকার দল। কি জানি কয় দেশটারে, চেয়ারম্যান সাব?’
‘ক্যামেরুন।’ বলতে বলতে একটা সিগারেট ধরালেন আনোয়ার চেয়ারম্যান।
দর্শকদের মধ্যে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু গমগম করতে লাগল ১৪ ইঞ্চি ফিলিপস টিভির দমদার স্পিকার। ইংরেজি ধারাভাষ্যের মাথামুণ্ডু সামনের সারির কেউ না বুঝলেও মাথা নেড়ে এমন ভাব করল যেন তারা সব খাস বাংলায় শুনছে। টসের পর ম্যারাডোনা বলটা শূন্যে তুলে কিছুক্ষণ কাঁধে নিয়ে নাচাল। আনোয়ার চেয়ারম্যান ম্যারাডোনাকে আবার স্বচক্ষে দেখে আবেগে থরথর হয়ে বলল, ‘আরে, ম্যারাডোনা যে! দেখেছ মেম্বার, কী সুন্দর করে বলটা কাঁধে নিয়ে নাচাচ্ছে। এমন আর হয় না।’
সামনের সারির গোটা পাঁচেক চেয়ারের পর খড়ের ওপর বসে থাকা জনতা কান খাড়া করে চেয়ারম্যান ও মেম্বারের কথোপকথন শুনছিল। ক্যামেরুনের নাম তারা আগে কখনো শোনেনি। তবে আর্জেন্টিনা নামটি তাদের পরিচিত। গ্রামে এ নামটি পরিচিত করার পেছনে আনোয়ার চেয়ারম্যানের বিরাট অবদান আছে। চার বছর আগে খুনের মামলার দায় নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে থাকার সময় তিনি টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখেছিলেন। সেবার ম্যারাডোনা নামের এক ঝাঁকড়াচুলো তরুণের নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই থেকে আনোয়ার ম্যারাডোনা ও তার দলের অন্ধভক্ত। গ্রামে এমনকি তার নামে গোল্ডকাপেরও আয়োজন করেছেন। সেখানে জাতীয় পতাকার পাশে আর্জেন্টিনার পতাকাকে স্থান দিয়ে গ্রামবাসীর চোখ খুলে দিয়েছেন।
চেয়ারম্যানের মুখে ক্যামেরুনের নাম শুনে গ্রামবাসী নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে নামটা আওড়াল। কেউ শুনল ক্যামেরা, কেউ রুন, কেউবা আবার শুনল ক্যাওড়া। সেখান থেকে বিকৃত হয়ে শেষমেশ নামটা শ্যাওড়াতে এসে দাঁড়াল। কে না জানে শ্যাওড়াগাছে ভূত থাকে। খড়ের বিছানায় উবু হয়ে বসে থাকা বুড়ো কফিল উদ্দিন অনবরত বিড়ি টানছিল। সে কার যেন মুখে শ্যাওড়া শুনে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘শুনিছি আফ্রিকার মদ্যি জিন-ভূত, দত্যি-দানো থাহে। লোকগুলোর চেহারা দেখছ একেকটা? কী খেয়ে ও রকম লম্বা-চওড়া হয় বলো দিকি?’
পাশ থেকে নাতি সম্পর্কের ছোকরা বাদল সরদার বলল, ‘শুনিছি ওরা বিড়াল খেয়ে থাকে। এই জন্য খুব মার সহ্যি করতে পারে। ছুটতিও পারে বিড়ালের মতো।’
কফিল বুড়ো ফস করে বলল, ‘বিড়াল নয় হে ছোকরা। ওরা মানুষও খেয়ে থাকে। আল্লাহর দুনিয়ায় কত কী যে আছে তার তুই কতটা দেখিছিস?’
বাদল একটা জুতসই জবাব দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় ফজলু ধমকে উঠে বলল, ‘অ্যাই, চুপ করে বস দিকি? নইলে উঠে বাড়ির রাস্তা মাপ। খেলার সময় একটা কথা বলতে পারবি না।’
দর্শকদের মধ্যে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু গমগম করতে লাগল ১৪ ইঞ্চি ফিলিপস টিভির দমদার স্পিকার। ইংরেজি ধারাভাষ্যের মাথামুণ্ডু সামনের সারির কেউ না বুঝলেও মাথা নেড়ে এমন ভাব করল যেন তারা সব খাস বাংলায় শুনছে।
টসের পর ম্যারাডোনা বলটা শূন্যে তুলে কিছুক্ষণ কাঁধে নিয়ে নাচাল। আনোয়ার চেয়ারম্যান ম্যারাডোনাকে আবার স্বচক্ষে দেখে আবেগে থরথর হয়ে বলল, ‘আরে, ম্যারাডোনা যে! দেখেছ মেম্বার, কী সুন্দর করে বলটা কাঁধে নিয়ে নাচাচ্ছে। এমন আর হয় না।’
জলিল মেম্বার শুনে শুনে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছে। ম্যারাডোনাকেও কখনো স্বচক্ষে দেখেনি। চেয়ারম্যানকে খুশি করার জন্য বলল, ‘শুনিছি মহামান্য রাষ্ট্রপতিও ম্যারাডোনার খেলা ভালোবাসেন। সেই তারে দেখে আজ চক্ষু জুড়াইল।’
গ্রামবাসীর চোখ গেল পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে পান চিবুতে থাকা কাদেরের দিকে। কাদেরের চিবুক বেয়ে অবিরাম ঘাম ঝরছে। তবু সে টেলিভিশনে নিজের চেহারার এক লোককে দেখতে পেয়ে দেঁতো হাসি হাসল। তার হাসি দেখে গ্রামবাসীর মধ্যে হাসির হুল্লোড় উঠল। উৎসাহী ছোকরারা তার পিঠ চাপড়ে দিল। জলিল মেম্বার একবার পেছন ফিরে দেখে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল, ‘কোথায় বিশ্বকাপের খেলোয়াড়, আর কোথায় আমাদের কাদের! তোদের কথা শুনলে অবাক লাগে বাপু।’
গ্রামবাসী দম চেপে গ্রামের মাথাদের কথাবার্তা শুনছিল। ভিড় থেকে কে একজন ফস করে বলল, ‘এ তো আমাগের সমান দেহা যায়। কে জানি কইছিল ম্যারাডোনা লম্বায় তালগাছের মাঝামাঝি?’
‘চুপ কর!’ জোরে ধমক দিয়ে বক্তাকে চুপ করিয়ে দিল ফজলু। অন্ধকারে বসে থাকা শত শত চোখের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে বলল, ‘ব্যাটারি চার্জ করার এক পয়সা দেওয়ার মুরোদ নেই, শুধু খেলা দেখার সময় বকবকানির খুব ইচ্ছা হয়েছে, তাই না? এত বকতে ইচ্ছা করলে নিজেরা টিভি কিনে বকোগে, যাও!’
এবারে উঠোনে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। জলিল মেম্বার আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের দেখতে দেখতে বলে উঠল, ‘আহা, কী সুন্দর গায়ের রং! একেবারে দুধে-আলতা। সাহেবদের সঙ্গে আমরা পারিনি। নিজেরা না ছাড়লে ওদের কখনোই এ দেশ থেকে তাড়ানো যেত না। তাদের সঙ্গে কী করে ওই ক্যামেরা না ফ্যামেরা দেশটা পারবে? গুনে গুনে এক গন্ডা গোল খাবে, দেখে নিয়েন চেয়ারম্যান সাব।’
আনোয়ার চেয়ারম্যান এক টোকায় সিগারেটের শেষাংশ ছুড়ে ফেলে বললেন, ‘কয়টা গোল খাবে তার চেয়ে বেশি দরকার ম্যারডোনার গোল পাওয়া। ছোটখাটো দলের বিরুদ্ধে বেশি বেশি গোল পেলে গোল্ডেন শু, মানে সোনার জুতা পাওয়া সহজ হবে।’
সোনার জুতার কথা শুনে জলিল মেম্বার চেয়ার উল্টে পড়ে যাওয়ার জোগাড়। সে টাল সামলে বলল, ‘বলেন কী? বিশ্বকাপে সোনার জুতা দেয়? কী করে পায়ের মাপ আগেভাগে জানে ওরা?’
চেয়ারম্যান জবাব দিলেন না। তাঁর দৃষ্টি টিভির পর্দায় নিবদ্ধ। ক্যামেরার চোখ এখন ক্যামেরুনের খেলোয়াড়দের ওপরে। পর্দায় দলনায়ক স্টিফেন তাতাওয়ের মুখ ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবারও পেছন থেকে গুঞ্জন উঠল। বুড়ো কফিল চোখ সরু করে বলল, ‘এ আমাগের কাদের মিয়া না? টেলিভিশনের মাঝে কী করে গেল?’
গ্রামবাসীর চোখ গেল পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে পান চিবুতে থাকা কাদেরের দিকে। কাদেরের চিবুক বেয়ে অবিরাম ঘাম ঝরছে। তবু সে টেলিভিশনে নিজের চেহারার এক লোককে দেখতে পেয়ে দেঁতো হাসি হাসল। তার হাসি দেখে গ্রামবাসীর মধ্যে হাসির হুল্লোড় উঠল। উৎসাহী ছোকরারা তার পিঠ চাপড়ে দিল।
জলিল মেম্বার একবার পেছন ফিরে দেখে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল, ‘কোথায় বিশ্বকাপের খেলোয়াড়, আর কোথায় আমাদের কাদের! তোদের কথা শুনলে অবাক লাগে বাপু।’
বুড়ো কফিল ফিসফিস করে বলল, ‘অত অবাক হওয়ার কী আছে? কথায় বলে, দুনিয়ায় একই চেহারার সাতজন মানুষ আছে। তাদের মধ্যে একজন টেলিভিশনে থাকলে আরেকজন আমাদের গাঁয়ে থাকতেই পারে।’
ফজলু একবার চোখ পাকিয়ে বুড়োর দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।
চেয়ারম্যান এতক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন, ঠিক দশ মিনিটের মাথায় তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।
হাফ টাইম পর্যন্ত কোনো গোল হলো না। সামনের সারির পাঁচজন গোমড়া মুখে বসে ছিল। তাদের মুখ উজ্জ্বল হলো ফজলু গরম চা আর লম্বা লাঠি বিস্কুট নিয়ে এলে। অন্যরা কেউ কিছু পেল না। আনোয়ার চেয়ারম্যান চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুটে একটা কামড় বসিয়ে বললেন, ‘এই হাফে হলো না। পরের হাফে দেখো অন্তত দুইটা গোল হবে। সেটা আসবে ম্যারাডোনার পা থেকে।’ জলিল মেম্বার চায়ের কাপে সুড়ুৎ করে চুমুক দিয়ে বলল, ‘আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।’
ক্যামেরুনের ডিফেন্ডার বেঞ্জামিন মেসিং খোদ ম্যারাডোনাকে ট্যাকল করে বসল। জবাবে রেফারি হলুদ কার্ড দেখিয়ে তাকে সতর্ক করলেন। চেয়ারম্যান চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘চেহারা দেখছ লোকটার? সাক্ষাৎ চামারের মতো দেখা যায়। ঠিক যেন রশিদ মালিথা। রশিদ যেমন ডাকাত, এই ব্যাটাও এক নম্বরের ডাকাত। কীভাবে ম্যারাডোনাকে মারল, ইশ্!’
এবারে গ্রামবাসী মুখ টিপে হাসল। রশিদ মালিথা গাট্টাগোট্টা চেহারার শক্তিশালী মানুষ। কথা বলেন বুকে চাপড় মেরে। কাছেপিঠে কাউকে পেলে তারও গায়ে চাপড় বসান। ইনি আনোয়ার চেয়ারম্যানের চিরশত্রু। গেল বারের ইউপি নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে আনোয়ারের কাছে হেরেছেন। তবে মন্দ লোকে বলে, আনোয়ারের লোকেরা জাল ভোট না দিলে রশিদই আজ চেয়ারম্যানের গদিতে বসতেন।
জলিল মেম্বার ধরা গলায় বলল, ‘লাথিটা ম্যারাডোনাকে না মেরে আমাকে মারলেও পারতি ব্যাটা মালিথার পো।’
হাফ টাইম পর্যন্ত কোনো গোল হলো না। সামনের সারির পাঁচজন গোমড়া মুখে বসে ছিল। তাদের মুখ উজ্জ্বল হলো ফজলু গরম চা আর লম্বা লাঠি বিস্কুট নিয়ে এলে। অন্যরা কেউ কিছু পেল না।
আনোয়ার চেয়ারম্যান চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুটে একটা কামড় বসিয়ে বললেন, ‘এই হাফে হলো না। পরের হাফে দেখো অন্তত দুইটা গোল হবে। সেটা আসবে ম্যারাডোনার পা থেকে।’
জলিল মেম্বার চায়ের কাপে সুড়ুৎ করে চুমুক দিয়ে বলল, ‘আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।’
গ্রামবাসী কিন্তু মনে মনে ক্যামেরুনকে সমর্থন করতে শুরু করেছে। যখনই টেলিভিশনে ক্যামেরুনের খেলোয়াড়দের চেহারা ভেসে উঠেছে, তখনই তারা গ্রামের কোনো না কোনো মানুষের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছে। ফজলুর ধমকের ভয়ে তারা মুখ না খুললেও ইশারা-ইঙ্গিতে পরস্পরকে জানিয়ে দিয়েছে এবার টিভিতে কাকে দেখা যাচ্ছে।
৬৭তম মিনিটে ঘটল এক অকল্পনীয় ঘটনা। ক্যামেরুনের ওমাম-বিয়িকের হেড থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়াল। গোল! গ্রামবাসীর রুদ্ধ আবেগ যেন মেঘের গর্জনের মতো বিস্ফোরিত হলো। ঘুমজড়ানো ছেলে-বুড়োর উদ্দাম নাচের মধ্যে পাথরের মূর্তির মতো ঠায় বসে রইল সামনের সারির জনাপাঁচেক মানুষ।
কফিল বুড়ো চোখ সরু করে বলল, ‘কে গোল দিল রে?’
তার বড় ছেলে কুদরত লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আপনি আব্বা! একে আপনার মতো দেখা যায়!’
জোয়ান বয়সের কথা স্মরণ করে আজকের বৃদ্ধ কফিল উদ্দিন ঘন ঘন মাথা নাড়ল।
দুই-দুইটি লাল কার্ডের পর ক্যামেরুন দলটি হলো নয়জনের দল। তবু অখ্যাত ক্যামেরুনের সঙ্গে পেরে উঠল না বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। শেষ বাঁশি বাজলে গ্রামবাসী এমনভাবে উল্লাসে মেতে উঠল যেন ক্যামেরুন নয়, তারাই মাঠে নেমে বিশ্বকাপজয়ী দলকে হারিয়ে দিয়েছে।
আনোয়ার চেয়ারম্যান চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। জলিল মেম্বারসহ অন্যরাও পালানোর ফিকির করছিল। শুধু ফজলু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তোরা সবাই নিমকহারাম। চেয়ারম্যান সাহেব বলে গেছেন, এর পর থেকে এই টিভি আর ঘরের বাইরে যাবে না। এই তোদের শেষ খেলা দেখা।’
বাদল সরদার ততক্ষণে আমের গাছ তাক করে মাটির ঢ্যালা মারতে শুরু করেছে। তার সঙ্গে যোগ দিল অন্যরাও।
কুদরত বলল, ‘ওরা টেলিভিশন দেখতে না দিলে খেলা কী করে দেখব, আব্বা?’
কফিল উদ্দিন হাসতে হাসতে বলল, ‘একটা টিভি আর ব্যাটারি কিনতি কয় টাকা লাগে? দরকার হলে চাঁদা তুলে কিনে আনব। কী, তোরা চাঁদা দিবি তো?’
জ্যৈষ্ঠের অনলবর্ষী গরমে নাকাল কিন্তু ভিনদেশি এক দলের জন্য আনন্দিত একদল মানুষ সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ!’