যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে পড়ে থাকা লাশের মতো জামাকাপড়, বিছানার চাদর, বই—একটার পর একটা এত দিন ধরে রুদ্রর ঘরে পড়ে ছিল। গ্লাস আর ভাত খাওয়ার প্লেটে দুধের বলকের মতো জমে ছিল সাদা আস্তরণ। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এই পরিবেশে বসবাস করা কঠিন। কিন্তু নব নবরূপে গ্রীষ্মে যেমন কৃষ্ণচূড়ার আগমন ঘটে, তেমনি ঢাকা শহরেও প্রতিদিন পাড়ি জমায় অগণিত নতুন মানুষ। তাদের কাউকে কাউকে পরিস্থিতির কারণে কিংবা নিয়তির বিধানে অসম্ভব জেনেও এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে হয়। বিশেষ করে তিন শ্রেণির—যাদের কেউ অভাবের তাড়নায় কাজ করে পেট চালানোর আশায় ঢাকায় আসে; দ্বিতীয় শ্রেণি হলো তারা, যারা থাকা–খাওয়ার ভার না নিয়ে কেবল স্বপ্নপূরণের তাগিদে পাড়ি জমায়। আর তৃতীয় শ্রেণির কারও কারও গল্পটা এমন যে চাহিদা বা উপযোগিতার ধরনে নয়, বরং জীবন বেদনাময় বিষম ব্যথায়।
‘ঢাকা শহরকে স্বপ্নপূরণের সূতিকাগার বললে কি ভুল হবে?’ প্রশ্নটা রুদ্রর। মাঝেমধ্যে বিষয়টা নিয়ে ভাবে। বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষকতা কিংবা হোক তা সর্বনিম্ন পদের কোনো চাকরি, ঢাকা শহরে পা না দিয়ে কিছুই জোটানো যায় না। অনেক অসম্ভব, অপমান, অপারগতা হাসিমুখে মেনে নিতে হয়। রুদ্রও স্বপ্নপূরণের তাগিদেই পাড়ি জমিয়েছে ঢাকায়। তবে তার অবস্থা চাহিদা বা উপযোগিতার ধরনে দুঃসহ নয়। চাকরির প্রস্তাব হাতে নিয়েই ঢাকায় ঢোকে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছে; কিন্তু করলে কী হবে, থাকার জায়গা আর কর্মস্থল ব্যতীত কিছু চেনে না সে। মেট্রোতে করে কাজের জায়গায় রোজ যায়, আবার মেট্রোতে চেপেই বাসায় ফেরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে নতুন মানুষের সঙ্গে তুলনা করা অনুচিত হবে না। শ্রেণিবিভাজনের দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়বে রুদ্র। তার বুক ভরে আছে বিষম ব্যথায়। ব্যথাটা কী?
গ্রাম, উপজেলা শহর, জেলা শহর আর রাজধানী শহরের জীবনাচরণে অনেক পার্থক্য। জীবনের গতিশীলতায়ও আছে ভিন্নতা। আবেগ, সহানুভূতি, ভালোবাসা প্রকাশের ধরনও আলাদা আলাদা। কে ভালোবাসে, কে শুভাকাঙ্ক্ষী, কে ব্যবহার করতে চায়, কে সুযোগ নিতে চায়—বোঝা মোটেও সহজ নয়। রুদ্র গ্রামের ছেলে। নদী-জলে সাঁতরে, বৃষ্টিভেজা মাঠে দৌড়ে বড় হয়েছে। বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরের মতো দিলখোলা তার হৃদয়। বিনয়ী, নম্র, ভদ্র; সহজে মুগ্ধ হয়, ভালোবাসে, অভিমান জমায়। যদিও জেলা শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে, কিন্তু চোখ–কান সেই অর্থে ফোটেনি। তবে পরিসংখ্যানে স্নাতক করার সুবাদে তার পর্যবেক্ষণক্ষমতা ভালো। রুদ্র কাজ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। চৌত্রিশ হাজার তিন শ পঞ্চাশ টাকা বেতন পায়। বাড়িতে টাকা পাঠানো লাগে না। মধ্যবিত্ত পরিবার হলেও বাবার উপার্জনে চলে যায়। প্রতি মাসে উপরন্তু বাবা রুদ্রকে টাকা পাঠাতে চান। স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের মতো রুদ্রর জীবনও স্বাভাবিকভাবে চলছিল। ঘরের বসবাস–অনুপযোগী এই অবস্থা আগে ছিল না। রুদ্র পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। সব সময় ঘর পরিপাটি আর বিছানা স্বচ্ছ জলের মতো পরিষ্কার থাকত। কিন্তু নক্ষত্রপতনের মতো হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে। এই ছন্দপতনে রুদ্রর কোনো হাত ছিল না। জীবনে কিছু ঘটনা অতি অকস্মাৎ ঘটে যায়, মানুষের কিছু করার থাকে না।
রুদ্র সেদিন যেতে চায়নি। মাথাব্যথা করছিল। তা ছাড়া বই পড়তে পছন্দ করে না সে। অনেকবার বলেছিল, ‘যাব না, স্যার। মাথাব্যথা করছে, আপনি যান।’ কিন্তু শফিক সাহেব নাছোড়বান্দা। জোর করেই লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন রুদ্রকে।
গাড়িতে উঠে মাথাব্যথার জন্য বিরক্ত লাগলেও কারওয়ান বাজার পার হয়ে বাংলামোটর থেকে শাহবাগে যেতে ডান হাতে সান টওয়ারের নিচতলার ‘দ্য ড্রিম লাইব্রেরি’র সামনে গাড়ি থামতেই রুদ্রর মাথাব্যথা যেমন উবে যায়, মনও ভালো হয়ে যায়। লাইব্রেরিটা বড় সুন্দর, মনোরম। নামের সঙ্গে যদিও কফিশপের উল্লেখ নেই, কিন্তু বইয়ের চেয়ে কফিই বেশি বিক্রি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা কয়েকজন তরুণী লাইব্রেরিটির উদ্যোক্তা।
রুদ্র পেছনে ঘুরে তাকায়। পবিত্র আলোকরশ্মির মতো একটা ঘোর এসে লাগে চোখে। রুদ্র স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তরুণীর পরনে সাদা সালোয়ার–কামিজ, বুকের ওপর সাদা ওড়না বিছানো। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলছে। ‘মৃদুলা বিশ্বাস, এক্সিকিউটিভ, দ্য ড্রিম লাইব্রেরি।’ হাতে সোনা রঙের ব্রেসলেট ঘড়ি। চোখ দুটো করমচা ফলের মতো গোটা গোটা। ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। কপালে শর্ষেদানার মতো ছোট কালো টিপ। রজনীগন্ধা ফুলের সুবাস ভেসে আসছে চুল থেকে। চুলগুলো কাশবনের মতো পিঠের ওপর বিছানো।
শফিক সাহেব ঘুরে ঘুরে মেয়ের জন্যে ‘শার্লক হোমস’ ও সেবা প্রকাশনীর বই খুঁজছিলেন। রুদ্রও হাঁটছিল পেছন পেছন। সাহিত্যের প্রতি রুদ্রর আগ্রহ নেই। কবি শঙ্খ ঘোষ যে বছর মারা গেলেন, সেবার বিসিএসে একটা প্রশ্ন এসেছিল। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কাব্যগ্রন্থের কবি কে? রুদ্র তখন চতুর্থ বর্ষে পড়ে। কাব্যগ্রন্থের নামটা ভালো লাগায় গুগলে সার্চ করেছিল। কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে পেয়েছিল কাব্যগ্রন্থের নামকবিতাটাও। কয়েকবার কবিতাটা পড়ে মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে মুখস্থ হয়ে যায়। সাহিত্যের প্রতি স্বতঃপ্রণোদিত ভালো লাগা বলতে রুদ্রর জীবনে এটুকুই। এর বাইরের যা, তা করেছে বাধ্য হয়ে। যেমন কলেজে থাকতে একাডেমিক চাপে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো কখনো বন্ধুদের জোরাজুরিতে।
শফিক সাহেবের সঙ্গে লাইব্রেরিতে হাঁটতে হাঁটতে শঙ্খ ঘোষের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ বইটা চোখে পড়ে রুদ্রর। তাক থেকে বইটা হাতে টেনে নেয়।
‘কী কবিতা পড়ো? কবিতা ভালো লাগে? তুমি তো মিয়া ছুপা রুস্তম! দেখে কিন্তু বোঝা যায় না, কবিতা পড়ো!’ বলে হেসে ওঠেন শফিক সাহেব।
‘না, স্যার। কবিতা পড়ি না। তবে বইয়ের নামকবিতাটা আমার খুব পছন্দের’, কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলে রুদ্র। ‘নিয়ে নাও। আমার পক্ষ থেকে এটা উপহার।’
রুদ্র আমতা আমতা করছিল; কিন্তু শফিক সাহেব ধমক দিলে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল। শফিক সাহেব রুদ্রর রিপোর্টিং বস। মানুষ ভালো। এর আগে এই পদে যিনি ছিলেন, তাঁর নামে নানা কথা অফিসে চাউর আছে। বার্ষিক কর্মমূল্যায়নের সময় নানা ধরনের সুযোগ–সুবিধা চাইতেন। নারী সহকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার রগরগে গল্পও আছে অনেক। শফিক সাহেব সম্পর্কে এখনো তেমন কিছু শোনা যায়নি। শফিক সাহেব যদিও একটু মেজাজি; কিন্তু মানবিক। ‘স্যারের অন্তরডা ময়লা না।’ এই মত অফিস সহকারী মিজানের।
রুদ্র এসব নিয়ে ভাবে না। তার কথা, ‘আমার কাজ আমি করে যাব, বস কী করল না করল, গোনার সময় নাই।’ তারপরও শফিক সাহেবকে সে যথেষ্ট সম্মান করে। ভদ্রলোকও রুদ্রকে পছন্দ করেন।
‘স্যার কি কবিতা পড়তে পছন্দ করেন? ওই দিকে আমাদের কবিতার বইয়ের আলাদা একটা সেকশন আছে। দেশি-বিদেশি অনেক বই পাবেন। চাইলে দেখতে পারেন।’ তরুণীর কণ্ঠস্বর। রুদ্র পেছনে ঘুরে তাকায়। পবিত্র আলোকরশ্মির মতো একটা ঘোর এসে লাগে চোখে। রুদ্র স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তরুণীর পরনে সাদা সালোয়ার–কামিজ, বুকের ওপর সাদা ওড়না বিছানো। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলছে।
‘মৃদুলা বিশ্বাস, এক্সিকিউটিভ, দ্য ড্রিম লাইব্রেরি।’ হাতে সোনা রঙের ব্রেসলেট ঘড়ি। চোখ দুটো করমচা ফলের মতো গোটা গোটা। ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। কপালে শর্ষেদানার মতো ছোট কালো টিপ। রজনীগন্ধা ফুলের সুবাস ভেসে আসছে চুল থেকে। চুলগুলো কাশবনের মতো পিঠের ওপর বিছানো।
অলেখা উপন্যাসে বর্ণিত কোনো দেবী যেন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। বুকের ভেতর তীব্র আর্তনাদ জেগে ওঠে। তাই কিছুটা সময় নিয়ে কণ্ঠের বিস্ময় লুকিয়ে রুদ্র বলে, ‘না, থাক।’ শফিক সাহেব ওস্তাদ লোক। চোখ দেখে আঁচ করতে পারেন, মনে কী চলছে। মৃদুলা যেতেই রুদ্রর কানের কাছে মুখ এনে বলেন, ‘মিয়া, কাণ্ড তো ঘটায় ফেলাইছ। ঢাকাই সুন্দরী, সেই দেমাগ, তুমি কিন্তু শেষ। খবরদার, আর তাকাইয়ো না। চলো, বই নিয়া যাইগা।’ জবাবে রুদ্র কিছু বলে না। শফিক সাহেব নিজে গাড়িতে করে রুদ্রকে বাসায় পৌঁছে দেন।
রুদ্র ঘরে ঢুকে কবিতার বই থেকে জোরে চিৎকার করে কবিতাটা পড়ে। ‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/ তোমার জন্যে গলির কোণে/ ভাবি আমার মুখ দেখাব/ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে…’
চোখের জল মুছে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে রুদ্র। নিজেকে শান্ত করার উপায় ভাবতে ভাবতে সহকর্মী ইদ্রিসকে কল করে। ‘ইদ্রিস ভাই, সেদিন পরি আছে, লাগবে কি না, জিজ্ঞেস করছিলেন, দিতে পারবেন আজ? যত টাকা লাগে, দেব।’ ‘রুদ্র বাবু, ছটফটানি থামান। জিইয়ে রাখেন। বাসার ঠিকানা টেক্সট করেন। পাঠাচ্ছি, আপনি যেমন এ গ্রেড, তেমন এ গ্রেড। পুরা খুশি করে দেবে আপনারে। টিপস দিতে ভুলবেন না কিন্তু।’
একটা ঘরে একা থাকে রুদ্র। আর দুই ফ্ল্যাটমেট চাকরি করেন এজি অফিসে। দুদক অফিসে হানা দেওয়ার পর থেকে চাপে আছেন দুজনই। বেশির ভাগ সময় অফিসের কাজে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে দৌড়ে বেড়ান। বলা চলে, একাই এক ফ্ল্যাটে থাকে রুদ্র। অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রোজ মা-বোন আর বাবাকে ফোন করে। মৃদুলার ঘোরে থাকলেও ব্যতিক্রম ঘটে না সেদিন। বোনকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলে মৃদুলাকে নিয়ে ভাবতে থাকে। ‘দ্য ড্রিম লাইব্রেরি’র ফেসবুক পেজের বিভিন্ন পোস্টের কমেন্ট আর রিঅ্যাকশন থেকে মৃদুলার আইডি খুঁজতে বেগ পেতে হয় না। প্রোফাইলে একটা শাড়ি পরা ছবি দেওয়া মৃদুলার। ছবিটা দেখে রুদ্র মুগ্ধ হয়। বারবার দেখে। জুম করে করে দেখে। মৃদুলার ঠোঁট, বুক, গলার ভাঁজ ঢাকা ক্লাবের ছানার সন্দেশের মতো সুন্দর। কিন্তু অ্যাবাউটে ক্লিক করতেই রুদ্রর মন খারাপ হয়ে যায়। রিলেশনশিপে লেখা ‘ইটস কমপ্লিকেটেড’।
মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেলে মানুষ যেমন অসহায় বোধ করে, রুদ্রও তেমন হতবিহ্বল হয়ে যায়। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। দ্রুত জলের গ্লাস নিয়ে পট থেকে ঢক ঢক করে তিন গ্লাস জল খায়। ছাদে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদে। ঢাকা শহরের বাতাসের দূষণের মাত্রার সঙ্গে চিৎকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রুদ্র জীবনে প্রথম যে মেয়েকে মনে মনে ভালোবেসেছিল, তাকে বলতে পারেনি। এই দুঃখ নিদারুণ পোড়ায়। ছাদ থেকে ঘরে এসে দেয়ালে টানানো মা কালীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদে। ‘আমার ভাগ্যে কিছুই কি রাখোনি? আর নিতে পারছি না। কত দুঃখ পেলে শান্তি হবে তোমার? আমাকে কি কেউ কখনো ভালোবাসবে না?’
চোখের জল মুছে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে রুদ্র। নিজেকে শান্ত করার উপায় ভাবতে ভাবতে সহকর্মী ইদ্রিসকে কল করে। ‘ইদ্রিস ভাই, সেদিন পরি আছে, লাগবে কি না, জিজ্ঞেস করছিলেন, দিতে পারবেন আজ? যত টাকা লাগে, দেব।’
‘রুদ্র বাবু, ছটফটানি থামান। জিইয়ে রাখেন। বাসার ঠিকানা টেক্সট করেন। পাঠাচ্ছি, আপনি যেমন এ গ্রেড, তেমন এ গ্রেড। পুরা খুশি করে দেবে আপনারে। টিপস দিতে ভুলবেন না কিন্তু।’
ইদ্রিসের হোয়াটসঅ্যাপে ঠিকানা লিখে পাঠায় রুদ্র। তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ বারান্দার চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকে। গিটার হাতে নিয়ে গান গায়, ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী/ তারে বুঝিতে পারিনি...’
হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামে নিচে। বুক ধুকপুক করে রুদ্রর। মেয়েটা কি এল? কিন্তু গাড়ি থেকে মৃদুলাকে নামতে দেখে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে রুদ্রর। মৃদুলা? কান্নায় রুদ্রর বুক ভেঙে আসে। ভালোবাসার মানুষের নিম্নগমনে ওঠা ঝড়ের মতো ঝড় খেলা করে চোখে। কল বেল বাজলে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘লাইব্রেরিতে দেখা হয়েছিল, চিনতে পেরেছেন? আমি সামনের গলিতে থাকি। আপনার মানিব্যাগটা পড়ে গিয়েছিল লাইব্রেরিতে। ভাবলাম, ফোন না করে যাওয়ার সময় দিয়ে যাই। আপনি কিন্তু ভালো গান করেন। সরস্বতীপূজায় গাইলেন। আমি এক পরিচিতর ফোনে ভিডিও দেখেছিলাম।’
রুদ্রর শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। জবাবে কিছু বলতে পারে না। মৃদুলা ভেবেছিল, রুদ্র তাকে ভেতরে গিয়ে বসতে বলবে। না হলেও অন্তত সৌজন্য করে ধন্যবাদ জানাবে। তাই কিছুটা হতাশ ভঙ্গিতেই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে যায়। রুদ্র ক্ষীণস্বরে কবিতা পড়ে, ‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/ তোমার জন্যে গলির কোণে/ ভাবি আমার মুখ দেখাব/ মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।’
ত্রিশ মিনিটের বেশি সময় থম মেরে সিঁড়ির কাছে বসে থাকে রুদ্র। ইদ্রিসের পাঠানো পরি এসে পৌঁছায়। পরনে ঢোলা টি–শার্ট আর জিনস। বুকের খাঁজ দেখা যাচ্ছে। ভয়ানক সুন্দর চেহারা। কিন্তু এই সৌন্দর্যের সঙ্গে মৃদুলার সৌন্দর্যের পার্থক্য আছে। মৃদুলা হচ্ছে পুকুরে ফোটা পদ্মের মতো। আর এই মেয়ে হলো স্থলপদ্ম। তার সৌন্দর্য মাতাল করে; কিন্তু মোহিত করে না। মৃদুলার সৌন্দর্য কেবল মোহিত করে, মাতাল করে না। ভাবতে ভাবতে রুদ্র উঠে দাঁড়ায়।
মেয়েটা বাথরুমের দরজায় টোকা দেয়। দরজা খুলতেই বলে, ‘বের হোন।’ রুদ্র বেরোলে বলে, ‘আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।’ রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে মা কালীর ছবির সামনে যায়। ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, পথ দেখাও।’ রুদ্র আর একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। মেয়েটা ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই বলে, ‘আপনি টাকা নিয়ে চলে যান প্লিজ। আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ মেয়েটা বিরক্ত হয়। ‘ইডিয়ট’ বলে টাকা না নিয়েই দরজা খুলে বের হয়ে যায়।
‘রুদ্র, ইদ্রিস ভাইয়ের কলিগ, রাইট?’ রুদ্র মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে। কী হবে এখন? যেকোনো পুরুষের কাছে এমন নারী আরাধ্য। কিন্তু মৃদুলা? ভাবতে ভাবতে মেয়েটাকে ভেতরে আসতে বলে দরজা বন্ধ করে দেয়। দ্রুত ছুটে বাথরুমে গিয়ে কাঁদতে থাকে। সে সুপুরুষ, সুদর্শন। পুরু ঠোঁট, চওড়া কপাল। বলিষ্ঠ পেশি, মেদহীন শরীর। শয্যাসঙ্গী হিসেবে রুদ্রকে মেয়েটার বেমানান মনে হয় না।
জলের ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুহুর্মুহু আর্তনাদ করতে থাকে রুদ্র। ‘আমি এটা কী করলাম! আজকের পর নিজের সামনে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াব?’
মেয়েটা বাথরুমের দরজায় টোকা দেয়। দরজা খুলতেই বলে, ‘বের হোন।’ রুদ্র বেরোলে বলে, ‘আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।’ রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে মা কালীর ছবির সামনে যায়। ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, পথ দেখাও।’ রুদ্র আর একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। মেয়েটা ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই বলে, ‘আপনি টাকা নিয়ে চলে যান প্লিজ। আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ মেয়েটা বিরক্ত হয়। ‘ইডিয়ট’ বলে টাকা না নিয়েই দরজা খুলে বের হয়ে যায়।
তার পর থেকে উদ্বাস্তুর মতো জীবন কাটাচ্ছিল রুদ্র। মৃদুলার খোঁজ করবে ভেবেছিল; কিন্তু বিবেকের দংশনে সাহস করতে পারেনি। জীবনে কোনো রুটিন ছিল না। খাওয়াদাওয়াও ছিল নামমাত্র। অফিসে আসা–যাওয়া ছিল বটে; কিন্তু কাজে মন ছিল না। তিনি বস না হয়ে অন্য কেউ হলে চাকরিটাও যেত। শফিক সাহেব ব্যাপারটা আন্দাজ করে অনেকবার বলেছিলেন, ‘একবার দেখায় কাউকে এতটা পুড়তে দেখিনি। চলো, লাইব্রেরিতে যাই, যা আছে ভাগ্যে, তা–ই হবে।’ কিন্তু রুদ্র আগ্রহ দেখাতে পারেনি। নীরবে প্রার্থনায় প্রতিদিন চোখের জল ফেলেছে।
সংস্কৃততে আছে, ‘শরীরম ব্যাধি মন্দিরম’, অর্থাৎ শরীর ব্যাধির মন্দির। রুদ্রর শরীরও অনিয়ম–অবহেলা নিতে পারেনি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাড়ি থেকে মা–বাবাসহ গোটা পরিবার ছুটে আসে ঢাকায়। তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। মা অগোছালো ঘর পরিষ্কার করে নতুনভাবে সাজান। রুদ্র হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার এক সপ্তাহ পর মা বাড়িতে চলে যান। রুদ্রও মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। দিন পনেরো পরে অফিস থেকে ফেরার পথে বাসার সামনের মুদিদোকানের মধ্যবয়সী ভদ্রলোক রুদ্রর হাতে একটা চিঠি দেন। খামের ওপর কম্পোজ করে রুদ্রর নাম–পরিচয়, মুঠোফোন নম্বর লেখা। প্রেরকের ঠিকানা নেই। ভদ্রলোকের কাছে কে দিয়েছে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘অল্প বয়সী একটা ছেলে এসে দিয়ে গেল। তখন ব্যস্ত ছিলাম। নাম–ঠিকানা জিজ্ঞাসা করার কথা মাথায় আসেনি। জিগাইল, “উনারে চিনেন?” আমি বললাম, হ্যাঁ। তারপর চিঠিটা দিল, রেখে দিলাম।’ রুদ্র খামটা ছিঁড়ে পড়তে শুরু করে।
‘রুদ্র,
তুমি কি কোনো দিন কাউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছ, হাত ধরেছ, চুমু খেয়েছ? মা বলেন, তার দেখা সবচেয়ে ভালো ছেলে তুমি। আমাদের বাসায় তোমার সেই কদর। সবাই তোমাকে পছন্দ করে। আমার মা, বাবা, বোন সবাইকে তুমি চেনো। আমাকেও চেনো; কিন্তু জানো না, তাদের মেয়ে আমি। সেদিন ঘুম থেকে উঠে শুনি, মাকে বাবা বলছেন, তোমার মতো একটা ছেলেকে জামাই হিসেবে পেলে তাঁদের জীবন নাকি ধন্য হবে। তোমার গান আমার ভালো লাগে। তার চেয়ে বেশি ভালো লাগে বাড়ির সবার তোমাকে নিয়ে মাতামাতি করার ব্যাপারটা। তুমি কি আমার মা–বাবার জীবন ধন্য করবে? কাল তোমার সঙ্গে রিকশায় ঘুরতে চাই। আশ্রমের মোড়ে অপেক্ষায় থাকব। বিকেল পাঁচটায়। চলে এসো, প্লিজ।
মৃদুলা বিশ্বাস’
মুহূর্তের জন্য রুদ্রর পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যায়। আবার বিবেকের দংশনের ক্ষতটা জেগে ওঠে। ইদ্রিসের পাঠানো মেয়েটার ছবি ভেসে ওঠে চোখে। চোখের জল মুছে রুদ্র ভাবতে শুরু করে, কী করা উচিত?