মাথাপিছু আড্ডার দাম
মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারটা ইলা আর নীলার।
এই নিয়মের বয়স এগারো বছর। নিয়মটা করেছিল নীলা, যেদিন তার প্রথম চাকরির প্রথম বেতন হয়েছিল। অফিস থেকে বেরিয়ে ইলাকে ফোন করে বলেছিল, ‘রেডি হ। আজ তোকে খাওয়াব।’
‘কেন?’
‘বেতন পেয়েছি।’
‘তুই বেতন পেয়েছিস, আমি কেন খাব?’
‘কারণ, বেতনটা আমি পেয়েছি।’
ইলা আর তর্ক করেনি। যুক্তিটা যেন খুবই নিখুঁত ছিল।
সেদিন তারা ধানমন্ডির একটা রেস্তোরাঁয় বসে চিকেন ফ্রাই, ফ্রায়েড রাইস আর কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়েছিল। বিল আসার পর নীলা পাঁচ মিনিট বিলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ‘পরের মাসেও আসব।’
ইলা বলেছিল, ‘বিলটা আরেকবার দেখ।’
‘দেখেছি।’
‘তাহলে?’
‘পরের মাসে তুই দিবি।’
সেই থেকে মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার।
তারপর দুজনেরই চাকরি হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, বাসা বদলেছে। নীলার মাথায় দু-একটা সাদা চুল এসেছে। ইলার ছেলে ক্লাস ফাইভে উঠেছে। শুধু দ্বিতীয় শুক্রবারটা কোথাও যায়নি।
কেবল রেস্তোরাঁটাই আগে গেল।
এক শুক্রবার মেনু দেখে ইলা বলল, ‘আমাদের সেই ফ্রায়েড রাইসটা কোথায়?’
নীলা দাম দেখিয়ে বলল, ‘আছে। তবে মনে হয় এখন ভাতের সঙ্গে জমিও দেয়।’
দুজন হেসে বেরিয়ে এল।
তারপর কয়েক মাস তাদের দ্বিতীয় শুক্রবার কাটল ফুচকার দোকানে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দশটা ফুচকা দুই প্লেটে। নীলা টক বেশি নেয়, ইলা ঝাল কম।
একদিন ফুচকাওয়ালা বলল, ‘আপা, দাম দশ টাকা বাড়ছে।’
নীলা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমরা কি তাহলে দুইটা ফুচকা কম খাব?’
ইলা বলল, ‘না। একটা তুই কম খাবি, একটা আমি বেশি খাব।’
‘এতে কমল কোথায়?’
‘আমার হিসাবে কমেছে।’
তারা আবার হাসে।
শহরে তখন গাড়ির ধোঁয়া। রিকশার ঘণ্টি। ফুটপাতের ধুলো উড়ে এসে ফুচকার টকের পানিতে পড়তে চায়। নীলা হাত দিয়ে প্লেট ঢেকে রাখে। ইলা তার ওড়না দিয়ে নীলার কপালের ঘাম মুছে দেয়।
পরের বছর তারা ফুচকা ছেড়ে চায়ে নামে।
‘এটা নামা না,’ নীলা বলে। ‘আপগ্রেড। এখন আমরা স্বাস্থ্যসচেতন।’
চায়ের দোকানে দুই কাপ দুধ-চা। সঙ্গে কখনো একটা বিস্কুটের প্যাকেট। বিস্কুট দুজন ভাগ করে খায়, কিন্তু শেষ বিস্কুটটা নিয়ে প্রতিবার ঝামেলা।
‘তুই খা।’
‘না, তুই।’
‘আমি ডায়েটে।’
‘গত মাসেও একই কথা বলেছিস।’
‘আমার ডায়েট দীর্ঘমেয়াদি।’
দোকানের ছোট টিভিতে খবর চলে। সামনে বাস ছুটে যায়, ধোঁয়া রেখে। টিভির শব্দ কখনো শোনা যায়, কখনো যায় না।
সেই শুক্রবার অবশ্য পরিষ্কার শোনা গেল।
একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ বলছেন, দেশের মানুষের আয় বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও আগের তুলনায়—
একটা বাস পাশ দিয়ে হর্ন বাজিয়ে গেল।
বাকিটা শোনা গেল না।
ইলা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কী বাড়ছে বলল?’
নীলা বলল, ‘আমাদের বুঝি।’
‘আমাদের কী?’
‘জানি না। তবে কিছু একটা বাড়ছে।’
চায়ের দামও কিছুদিন পর বাড়ল।
তারপর এক দ্বিতীয় শুক্রবারে নীলা বলল, ‘চল, আজ নতুন জায়গায় বসি।’
‘কোথায়?’
‘ভিআইপি জায়গা।’
ভিআইপি জায়গাটা কাছের পার্ক।
একটা বেঞ্চ খালি পেয়ে নীলা এমন ভঙ্গিতে বসে যেন রেস্তোরাঁর জানালার পাশের টেবিলটা সে আগেই বুক করে রেখেছিল।
ইলা বলে, ‘মেনু কই?’
নীলা চারদিকে তাকায়। ‘আজ বুফে।’
‘কী কী আছে?’
‘বাতাস আছে। ধুলো আছে। ওইদিকে বাদাম আছে।’
‘বাদাম খাবি?’
‘খাওয়া যায়।’
ইলা দূর থেকেই বাদামওয়ালাকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘থাক। বাতাসই খাই।’
তারা হাসে।
তারপর গল্প শুরু হয়। ইলার ছেলের স্কুল। নীলার অফিসের নতুন বস। মায়ের হাঁটুর ব্যথা। বড় খালার মেয়ের বিয়ে। পাশের বাসার ভাবি কেন তিন দিন ধরে কথা বলছেন না—পৃথিবীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়।
পার্কের বাইরে গাড়ির লাইন। বাসের ধোঁয়া এসে গাছের পাতায় লাগে। একটা কাক বেঞ্চের সামনে নেমে পোকা খুঁজে আবার উড়ে যায়।
রাস্তার ওপাশের চায়ের দোকানে টিভি চলছে।
একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় মানুষের ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি ক্রয়ক্ষমতাও—’
ইলা কান খাড়া করে।
‘শোন।’
নীলা শোনে।
‘আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে।’
নীলা মাথা নাড়ে। ‘ঠিকই বলছে।’
ইলা তার দিকে তাকায়। ‘কীভাবে?’
‘আগে এক ঘণ্টা বসতাম। আজ দুই ঘণ্টা বসব।’
‘ওটা ক্রয়ক্ষমতা?’
‘আমাদেরটা।’
ইলা হেসে ফেলে।
একটা বাস কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে যায়। কয়েক সেকেন্ড তাদের মাঝখানে শহরটা ঝাপসা হয়ে থাকে। তারপর আবার নীলাকে দেখা যায়।
ইলা বলে, ‘মনে আছে, প্রথম দিন কত কিছু খেয়েছিলাম?’
‘মনে আছে।’
‘ফ্রায়েড রাইস।’
‘চিকেন ফ্রাই।’
‘কোল্ড ড্রিঙ্কস।’
নীলা বলে, ‘বিল।’
‘বিল আবার খাবার?’
‘আমার সবচেয়ে বেশি মনে আছে ওটাই।’
দুজন আবার হাসে।
কিছুক্ষণ পর ইলা বলে, ‘নীলা।’
‘হুঁ?’
‘আমরা কি তাহলে আর বাইরে খেতে আসি না?’
নীলা একটু ভাবে।
‘আসি তো।’
‘কী খাই?’
নীলা এবার বোনের দিকে তাকায়।
‘একে অন্যের মাথা।’
ইলা সঙ্গে সঙ্গে তার বাহুতে একটা চাপড় দেয়।
‘এগারো বছর ধরে খাচ্ছিস। পেট ভরে না?’
নীলা হাসতে হাসতে ইলার কাঁধে মাথা রাখে।
সামনে শহর ছুটছে। বাস, গাড়ি, হর্ন, ধুলো। ওপাশের টিভিতে দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা তখনো চলছে।
রেস্তোরাঁ গেছে। ফুচকা গেছে। চায়ের কাপও গেছে।
মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারটা যায়নি।
ওটার দাম এখনো কেউ ঠিক করতে পারেনি।