‘বড় ভাই, কিছু কি করা যায় না?’ ফিসফিস করে বলল পরিতোষ কর্মকার।
সামনে বসা লোকটা মাথা নাড়ল। চায়ে চুমুক দিল। তারপর বলল, ‘নতুন যে স্যার এসেছেন, খুব কড়া। কোনো অনিয়ম সহ্য করেন না।’
‘দেখেন না ভাই, কিছু করা যায় কি না। এত অল্প খাতা দেখে পোষায় না।’
‘আরে পোষাবে না কেন! দুই শ খাতা কি কম নাকি? তা ছাড়া এ বছর থেকে খাতা দেখার সম্মানী বাড়িয়েছে। প্রতি খাতা পঞ্চাশ টাকা। তার মানে দশ হাজার টাকা। কম মনে হচ্ছে?’
মোজাম্মেল বলল, সে শিক্ষা বোর্ডের লাইনম্যান। এই নামে কোনো পদ আসলে নেই। কিন্তু দশ বছর ধরে সে এ শিক্ষা বোর্ডে আছে। আড়ালে মানুষ তাকে ‘দালাল’ বলে ডাকে। তাতে মোজাম্মেলের কিছু যায়–আসে না। এই শিক্ষা বোর্ডে কত অফিসার এল–গেল! মোজাম্মেল তো ঠিকই টিকে আছে। এখানে যেসব স্কুল–কলেজের শিক্ষক কাজে আসেন তাঁরাও মোজাম্মেলকে তোয়াজ করে চলেন। তাঁরা জানেন, মোজাম্মেলকে ধরলে কাজটা হবেই। হোক তার জন্য দু–দশ টাকা খরচ।
‘ভাই, খাতার সংখ্যাটা কি তিন শ করা যায় না?’ অনুনয়ের সুরে বলল পরিতোষ। আজ সে বোর্ডে এসেছে এইচএসসি পরীক্ষার খাতা নিতে। যত বেশি খাতা তত বেশি খাতা দেখার বিল। বোর্ড থেকে সাধারণত পরীক্ষকপ্রতি দুই শ খাতা দেওয়ার নিয়ম। সেই নিয়ম অবশ্য সবার জন্য প্রযোজ্য হয় না। কেউ তিন শ বা চার শ খাতা সঙ্গে নিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে বোর্ডের আঙিনা ত্যাগ করে। পরিতোষ আজ এসেই তাই মোজাম্মেলকে পাকড়াও করেছে। সাধাসাধি করে চায়ের দোকানে বসিয়েছে।
অন্তত কিছু খরচ করে হলেও এক শ খাতা বেশি নেবেই নেবে সে। এক শ খাতা বেশি মানেই পাঁচ হাজার টাকা! পাঁচ হাজার টাকার জন্য দুই–চার শ টাকা খরচ করাই যায়। ‘আপনাকে কত দিতে হবে বলেন?’ পকেটে হাত ঢোকাল পরিতোষ। ‘
অন্তত কিছু খরচ করে হলেও এক শ খাতা বেশি নেবেই নেবে সে। এক শ খাতা বেশি মানেই পাঁচ হাজার টাকা! পাঁচ হাজার টাকার জন্য দুই–চার শ টাকা খরচ করাই যায়।
‘আপনাকে কত দিতে হবে বলেন?’ পকেটে হাত ঢোকাল পরিতোষ।
‘এখন সবার সামনে টাকা দিয়েন না। আগে কাজটা হোক। তারপর টাকা না হয় বিকাশে দিয়েন। আপনার কলেজের নামটা যেন কী?’ প্রতিদিন এত এত শিক্ষকের তদবিরের কথা শুনতে হয় যে কারও নামই মনে থাকে না মোজাম্মেলের।
‘আমার কলেজের নাম স্বদেশ প্রাইভেট কলেজ। নূরপুর উপজেলার।’
‘প্রাইভেট! তাহলে তো এমনিতেই অনেক টাকা বেতন পান। আপনি বেশি খাতা নিয়ে কী করবেন!’
‘নামেই প্রাইভেট। আসলে বেশি বেতন দেয় না এসব কলেজ। আর খাতা দেখে কয় টাকাই বা পাই বলুন। খাতা নেওয়ার জন্য বোর্ডে যাওয়া–আসার খরচ, খাতা দেখার পর প্রধান পরীক্ষককে দেওয়ার জন্য খাতার বান্ডিল করার জন্য কাপড়ের খরচ, প্রধান পরীক্ষকের বাসায় খাতা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যাতায়াত খরচ—এগুলো বোর্ড আমাদের কখনো দেয় না। এমনকি খাতা দেখার জন্য পারিশ্রমিকটাও দেয় এক বছর পর।’ অভিযোগের সুরে বলল পরিতোষ।
মাথা ঝাঁকাল মোজাম্মেল।
‘এই নিয়ম সব শিক্ষাবোর্ডেই আছে। সবাই এই নিয়ম মেনেই খাতা নিচ্ছে।’
‘সে জন্যই তো বেশি খাতা নিতে চাইছি। আমাকে অন্তত এক শ খাতা বেশি দিয়েন।’ মোজাম্মেলের হাতে জোর করে পাঁচ শ টাকা গছিয়ে দিল পরিতোষ।
মোজাম্মেল কী থেকে কী করল কে জানে! পরিতোষ বাড়তি খাতা পেল মাত্র পঞ্চাশটি।
‘ভাই, এক শ খাতা বেশি চাইছিলাম। মাত্র পঞ্চাশটি বেশি পেলাম।’ মোবাইলে অভিযোগ জানাল।
গিন্নি পৃথাও মাঝেমধ্যে সংসারের অভাবের খোঁটা দেয়। ‘তোমার মতো মাস্টারকে বিয়ে করে আমার জীবনটা ডাস্টার হয়ে গেল। কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল আমার। সেই উকিলকে বিয়ে করলেও আজ এত অভাবের মুখ দেখতে হতো না।’
‘যা পেয়েছেন, নিয়ে বাসায় যান। এরপর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা আছে। এমন কলেজে আপনাকে এক্সটার্নাল পরীক্ষক বানাব, যেখানে ছাত্রসংখ্যা বেশি। টাকাও বেশি পাবেন।’ বলে লাইন কেটে দিল মোজাম্মেল।
পরিতোষ লেগে রইল। কয়েক দিন পর আবার ফোন করল লাইনম্যানকে।
‘ভাই, আমার কথাটা ভুলে যাইয়েন না।’
‘কোন কথা?’
‘আপনি বলেছিলেন, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার এক্সটার্নাল পরীক্ষক হিসেবে বড় কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।’
‘আপনি কোন কলেজের? আপনার নাম কী?’
পরিতোষ নিজের নাম–পরিচয় দিল।
‘ঠিক আছে। আপনি আমার নম্বরে পাঁচ শ টাকা বিকাশ করে দিন।’
লাইন কেটে দিল মোজাম্মেল।
দুদিন পর টাকা পাঠিয়ে আবার ফোন দিল পরিতোষ।
‘ভাই, পাঁচ শ টাকা বিকাশ করলাম। একটু দেখিয়েন যেন দুই–তিনটা কলেজে এক্সটার্নালের দায়িত্ব পাই।’
‘আচ্ছা। আচ্ছা। ওয়েবসাইটে লিস্ট দেবে। দেখে নিয়েন।’
এর পর থেকে প্রতিদিন ওয়েবসাইট দেখতে শুরু করল পরিতোষ। টাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এক টুকরো জমি কিনেছে বছরখানেক আগে। তার পর থেকে সংসারে টাকার টানাটানি চলছে।
গিন্নি পৃথাও মাঝেমধ্যে সংসারের অভাবের খোঁটা দেয়। ‘তোমার মতো মাস্টারকে বিয়ে করে আমার জীবনটা ডাস্টার হয়ে গেল। কত ভালো ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল আমার। তাদের মধ্যে সেই উকিলকে বিয়ে করলেও আজ এত অভাবের মুখ দেখতে হতো না।’
এসব কথা শুনে শুনে আজকাল পরিতোষেরও মনে হয় শুধু তাকে বিয়ে করার কারণেই জীবনটা বৃথা হয়ে গেছে পৃথার।
‘আমি কী করব! আয় বাড়ানোর জন্য চেষ্টা তো করছি।’ মিনমিন করে বলে পরিতোষ।
‘ওই চেষ্টা করতে থাকো। টাকা খরচের সুখ আর আমার কপালে নেই।’
‘কয়েক দিন অপেক্ষা করো। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার এক্সটার্নাল হওয়ার জন্য ঘুষ দিয়েছি। বড় একটা কলেজে যদি প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নিতে যেতে পারি তাহলে এমনিতেই হাজার পাঁচেক টাকা পকেটে আসবে। সেই টাকা দিয়ে এই পুজোর জন্য একটা শাড়ি অন্তত কিনতে পারবে তুমি।’
মনে মনে হিসাব করা হয়ে গেছে পরিতোষের। বড় একটা কলেজে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার এক্সটার্নাল হিসেবে নিয়োগ পেলে কমপক্ষে আড়াই শ ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষা নিতে হবে।
প্রতি পত্রে ছাত্রপ্রতি দশ টাকা বরাদ্দ। প্রথম পত্র আর দ্বিতীয় পত্র মিলে দুই পত্র। তার মানে পাঁচ শ খাতার জন্য পাঁচ হাজার টাকা চোখ বুজে পকেটে চলে আসবে।
বাড়ি থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে যাতায়াতের খরচ বোর্ড বহন করবে না। আবার একই কলেজে তিনজন এক্সটার্নাল পরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে ওরা। পরিতোষ যদি না–ও যায়, অপর দুজন পরীক্ষককে নিয়ে ঠিকই প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নিয়ে নেবে।
পাঁচ হাজার!
পরিতোষ অপেক্ষা করতে লাগল। অপেক্ষার পালা শেষ হলো একদিন।
ওয়েবসাইটে এক্সটার্নাল পরীক্ষকদের তালিকা প্রকাশিত হলো।
ওর বাসা থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের এক সরকারি কলেজে ওকে পরীক্ষক করা হয়েছে।
পরিতোষ ভেবেছিল ওকে অন্তত তিনটি কলেজে এক্সটার্নাল পরীক্ষক করা হবে। সেই জায়গায় মাত্র একটা কলেজে নিজের নাম দেখে কিছুটা হতাশই হলো।
পাঁচ শ টাকা ঘুষ কি তাহলে বৃথাই গেল!
মোজাম্মেলকে কয়েকবার ফোন দিল পরিতোষ; কিন্তু সে ফোন রিসিভ করল না।
মনে মনে শিক্ষা বোর্ডের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করল। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে যাতায়াতের খরচ বোর্ড বহন করবে না। আবার একই কলেজে তিনজন এক্সটার্নাল পরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে ওরা। পরিতোষ যদি না–ও যায়, অপর দুজন পরীক্ষককে নিয়ে ঠিকই প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা নিয়ে নেবে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যে ফোন দিল কলেজ থেকে, ‘পরিতোষ স্যার বলছেন?’
‘জি বলছি।’
‘আমি ইছামতী কলেজ থেকে বলছি। আপনাকে আমাদের এখানে এক্সটার্নাল পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আপনি কি আসবেন?’
‘কতজন পরীক্ষার্থী আপনাদের ওখানে? আমাকে কয় দিন যেতে হবে?’ জানতে চাইল পরিতোষ।
‘স্যার, আমাদের এখানে অন্য কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র এক শ বিশ। আমরা চল্লিশজন করে তিন দিনে ভাগ করেছি। আপনি এক দিন আসলেই হবে।’
মাত্র চল্লিশজন!
তার মানে চল্লিশ গুণন বিশ ইকুয়াল আট শ টাকা!
মাত্র আট শ!
পাঁচ শ টাকা ঘুষ আর তিন শ টাকা যাতায়াত। কী লাভ হলো ঘুষ দিয়ে!
তবু নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা নিতে ইছামতী কলেজে গেল পরিতোষ।
সকাল-বিকাল দুই বেলা পরীক্ষাও নিল।
পরীক্ষা শেষে আট শ টাকা বুঝে নেওয়ার জন্য বসে রইল পরিতোষ।
একটু পরেই পিয়ন এসে ওর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল।
আট শ টাকার মধ্যে ইনকাম ট্যাক্স কেটেছে দশ পার্সেন্ট।
আশি টাকা কেটে কলেজ কর্তৃপক্ষ দিয়েছে সাত শ বিশ টাকা।
একটা খাম দিল পিয়ন। ‘স্যার, টাকাটা গুনে নিন।’ হেসে বলল সে।
খামের ভেতর মাত্র তিন শ বিশ টাকা। একটু অবাক হয়ে পিয়নের দিকে তাকাল পরিতোষ।
‘স্যার, আপনি দুপুরে যে লাঞ্চ করেছেন সেই লাঞ্চের বিল চার শ টাকা কেটে নিয়েছে কলেজ। আপনাকে খাওয়ানোর বিল বোর্ড কর্তৃপক্ষ তো দেয় না। তাই ছাত্রপ্রতি আপনি যে বিশ টাকা পেতেন সেই টাকা দিয়েই আপনাকে দুপুরে লাঞ্চ করাতে হয়েছে, বুঝেছেন স্যার?’