ঢেউ কিংবা ঘুমের সম্ভাবনায়

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

রফিক রিনাকে ভালোবাসে। তাহমিনা ভালোবাসে রফিককে। রফিক রিনার গৃহশিক্ষক। সপ্তায় তিন দিন এসে বাংলা আর ইংরেজি পড়ায়। বিকেলে, কোনো কোনো দিন সন্ধ্যায়। কিন্তু গত তিন সপ্তায় তাকে এই ক্যালেন্ডারের বাইরে, দুপুরে আসতে হয়েছে। তাহমিনাই তাকে ডেকেছিল, নিজের লেখা কবিতার ভাষা মেরামতের জন্য। তার স্বামী, মানে রিনার বাবা মারা গেছে আট-নয় বছর আগে। রিনার বড় একটা ভাই আছে, শেওড়াপাড়ায় পোলট্রি ফার্মের বিভিন্ন উপকরণ যেমন মুরগির খাবার, ওষুধ, খাঁচা ইত্যাদির ব্যবসা করে। এই তথ্যের দরকার কি আছে? রফিক তো তাকে কোনো দিন দেখেনি। না দেখুক, পাঠক বা শ্রোতাকে বিশ্বাস করানোর জন্য এই সব আজাইরা বাক্য বড়ই জরুরি। অবিশ্বাসের সমাজে লেখক বা বক্তার এটাই প্রধান টেনশন, বুঝলেন? এখানেই সব উজাড় হয়ে যায়।

এখন রফিক কী করবে? আমার কাছে পরামর্শ চায়। রাতে টিভিতে ক্রিকেট দেখার বারোটা বাজিয়ে গত চার মাসের তাগড়া-তাজা একটা গল্প শুনিয়ে গেল। আমি তা পুরোপুরি অনুসরণ করেছি। ওভাবেই সে বর্ণনা দেয়। যাহোক, সবটা তো আর বলা যায় না। কিন্তু এটা বলা যায় যে গত নয় দিনে রিনাকে পড়ানোর সময় একবারও তাহমিনা রফিকের সামনে আসেনি। কারণ জানতে চাইলে সে বলেছিল, ‘মেয়েরা সব বুঝতে পারে।’

রিনার কণ্ঠ থেকে ‘আম্মু আপনাকে বিশ্বাস করে’ শোনার আগে ওদের মধ্যে বিশেষ কোনো আলাপ হয়নি। বর্ষাকালের উপক্রমণিকায় ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানি সে পার হয়ে এসেছে হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট তুলে, ছপছপ শব্দ থেকে রিনা বুঝতে পেরেছিল।

রফিকের মনে হয়েছে, এই আড়াল টিকবে না। বা এটা আদৌ নেই, হয়তো অভিনয়টুকু আছে। তাতে কী! এমনও তো হতে পারে, ভাষার শিক্ষককে এই নারী কবিতা মেরামতের কাজে ব্যবহার করছে। কিন্তু তিন দিন আগের আর্দ্র বিকেলে আচমকা ‘আম্মু আপনাকে বিশ্বাস করে,’ রিনার এই উক্তির অর্থ নিয়ে রফিক এত ভাবছিল কেন? সে কি উপভোগ করেনি? তাহমিনার সঙ্গে দ্বিতীয় দুপুরে, পুরোনো দিনের বাংলা প্রেমের ছবির প্রসঙ্গ যখন উঠল, ইলেকট্রিসিটি চলে গেল, হাওয়ায় হিউমিডিটি ছিল খুব? রফিকের কপালে ঘাম দেখা দিয়েছিল। তাহমিনা প্রথমে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়ে, ‘না না, আমিই মুছে দিচ্ছি’, বলে পাশে এসে, সেই ত্বকনিঃসৃত তরলের গুচ্ছ অপসারণ করতে করতে আরও বলেছিল, ‘ভেবে নাও, এটা গুরুদক্ষিণা।’

বললাম, ‘তারপর?’ রফিক বলল, ‘কিছু না। কিন্তু প্রেমের চেয়ে প্রেমের অভিনয় নেহাত খারাপ না। ভালোই তো লাগে।’‘এটা বলেছিলি নাকি?’ সে বলল, ‘না না, মনে মনে।’

রিনার কণ্ঠ থেকে ‘আম্মু আপনাকে বিশ্বাস করে’ শোনার আগে ওদের মধ্যে বিশেষ কোনো আলাপ হয়নি। বর্ষাকালের উপক্রমণিকায় ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানি সে পার হয়ে এসেছে হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট তুলে, ছপছপ শব্দ থেকে রিনা বুঝতে পেরেছিল। জানালার পর্দা সরিয়ে সে বলেছিল, ‘সিঁড়িতে পানিভর্তি বালতি আছে, পা ধুয়ে আসেন।’ এর মধ্যে দরজা খোলা, ঢোকার সময় ‘হায়, না না, বেশি না, একটু’, সুইচ অন করে ‘ভিজে গেছেন’ এবং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রেগুলেটর ঘোরানো—রফিকের আসন গ্রহণের আগে পৃথিবীতে এই সব ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল কি? ঘটেছিল কি কিছু, যাতে রফিক নিজেকে পবিত্র বা মহান ভাবতে পারে? তা না পারুক, তার অজ্ঞাতসারে এই বাড়িতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসের কোনো পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয়েছে ভেবে সুখ বোধ করতে পারাও তো একটা অর্জন। কিন্তু রিনার দিকে তাকিয়ে তার ‘আম্মু’কে দেখতে চেয়েছিল সে। ফ্যানের সমুদ্রহাওয়াসম শোঁ শোঁ শব্দের মধ্যে একটা বিড়াল নিঃশব্দে তার কোলে উঠে বসার মুহূর্তে রিনা কিঞ্চিৎ হেসে বলেছিল, ‘কী হলো আপনার, হুম? আম্মু কিন্তু বিশ্বাস করে আপনাকে।’ সে ভাবে, তাহমিনা কি কিছু বলে দিয়েছে? না, তা কেন হবে! কবিতার আরও একটা ফাইল আছে, এগুলো শেষ করার আগে কোনো গোলমাল হবে না, আশা করা যায়। বিড়ালটা তার কোল থেকে কখন নেমে গেছে, খেয়াল করেনি। খেয়াল করে, রিনাও নেই। রফিক উঠে দরজার দিকে যায়, পর্দা সরিয়ে দেখে, ডাইনিং স্পেসের কোণের একটা চেয়ারে তাহমিনা বসে আছে। ‘রিনা রান্নাঘরে। চা বানাচ্ছে।’ স্বরটা এমন, কেবল এই তথ্যের অডিও তার মুখগহ্বরে রেখে দেওয়া হয়েছে সেই মুহূর্তের জন্য, যখন রফিক তাহমিনার দৃশ্যজগতে ঢুকে পড়বে। এই অনুভূতি নিয়ে সে রিনাকে দ্বন্দ্ব, দ্বিগু আর নিত্য সমাস পড়িয়েছিল। বের হওয়ার সময়, সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে রফিক তার হাত ধরেছিল। ধীর, নিচু স্বরে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, রিনা।’ ভ্রু তুলে সে এর উত্তর দিয়েছিল, ‘তা-ই! থ্যাংক ইউ!’ এটা সম্মতি কি না, বুঝতে পারেনি তবে ভেবেছিল, এই বাক্য শোনার অভিজ্ঞতা তার আরও হয়েছে নিশ্চয়ই, উত্তরও রপ্ত হয়ে আছে। হোক, তাকে তার চাই। আজ থেকে একদিকে রিনা, অন্যদিকে সমস্ত পৃথিবী।

‘আজ কবিতাটবিতা হবে না, কথা আছে তোমার সঙ্গে।’ সে খুব ভড়কে যায়, এই ভেবে, যদি কর্মচ্যুত হয়, তাহলে রিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে। এটাও ভাবে, রিনা কি তার মাকে বলে দিয়েছে? বাবা না থাকলে মা-মেয়ের খুব বন্ধুত্ব হয়, তবে মিনিমাম একটা গোপনীয়তা তো মেয়েরা মেইনটেইন করে।

এর পরের দিন, লাঞ্চের পর তাহমিনা বিশ্বাসযোগ্য রফিককে যথেষ্ট আপ্যায়ন করেছিল। বলেছিল, ‘আজ কবিতাটবিতা হবে না, কথা আছে তোমার সঙ্গে।’ সে খুব ভড়কে যায়, এই ভেবে, যদি কর্মচ্যুত হয়, তাহলে রিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে। এটাও ভাবে, রিনা কি তার মাকে বলে দিয়েছে? বাবা না থাকলে মা-মেয়ের খুব বন্ধুত্ব হয়, তবে মিনিমাম একটা গোপনীয়তা তো মেয়েরা মেইনটেইন করে। বারান্দায় মেলে দেওয়া শাড়িটা একবার জানালায় কিছুক্ষণ লেপটে ফের আলগা হয়ে যাচ্ছিল। বিছানায় বসা রফিকের সামনে এক কাপ চা রেখে তাহমিনা মুখোমুখি বসেছিল। ‘রিনার জন্য ভালো একটা পাত্র পাওয়া গেছে, কানাডায় থাকে। ও চলে গেলে আমি একা হয়ে যাব। সারা বাড়িতে একা।’ চায়ে চুমুক দিয়ে সে আরও বলেছিল, ‘তোমাকে আমার পছন্দ হইছে। ভদ্র, শিক্ষিত। আচ্ছা, মাঝেমধ্যে তো একটু-আধটু অভদ্র হইতে হয়।’ শাড়িটা লেপটে ছিল এবার কিছু বেশিক্ষণ। দম নিয়ে সে বলেছিল, ‘আমার একটা সমস্যা আছে, রফিক।’ সে কি শুনছিল কিছু? রিনার মুখ, কথা বলার ভঙ্গি, তাকানো, লেখার সময়ের আঙুল—সবই যেন একেকটা বিচরণশীল কোলাজ হয়ে তার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছিল। ‘হাজব্যান্ডের সঙ্গে অনেক দিন না থাকলে শরীরে একটা সমস্যা হয়। তোমরা ছেলেমানুষ, বুঝবে না।’ দীর্ঘশ্বাসের সময় রফিক কোথায় ছিল? কিন্তু সেই মুহূর্তে সে দেখতে পেয়েছিল, তার বুক-শিরদাঁড়ার টানে, হাওয়ায় যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।…তাহমিনা তার ওষ্ঠ চুম্বন করেছিল। বলেছিল, ‘তোমার মা–বাবা গ্রামে থাকে, না? আরও কথা আছে তোমার সঙ্গে। এসো। একটু পরই রিনা চলে আসবে।’

আমি রফিককে বললাম, ‘তোর প্রেম শুরুই হয়নি রে বেকুব।’ সে বলল, ‘রিনাকে আমি যে বলে দিলাম। আর কাউকে তো বলি নাই এই কথা, এত দিনে। ভালোবাসছিলাম বলেই বলতে পারছিলাম।’

বললাম, ‘ধরে নে, একতরফা একটা প্রেম হইছে কিছুদিন। ধর, ঘুমের মধ্যেই ছিলি। ওই ভদ্রমহিলা যে তোরে আদর করল, ওইটারে এখানে রাখার দরকার নাই। আধা জাগনার মধ্যে রাখ। মনে করবি, প্রেম শেষ পর্যন্ত একটা ঘুম, ভেঙে গেলে দেখা যায়, পৃথিবী আগের মতোই আছে।’

আমার সামনে রফিক মাথা নিচু করে বসে ছিল। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ফ্যানের হাওয়ায় শোনা যায় না। তবে বোঝা যায়। আজকাল এই সব ব্যাপারে কাউকে সাধারণত কষ্ট পেতে দেখা যায় না। অনেক অপশন তো। ঢেউয়ের পর ঢেউ আসতে থাকলে পছন্দের কোনো একটায় ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। সেটা যদি সম্ভব না হয়, আরও উঁচু, সাদা ফ্রিলের মতো ফেনাময়, আরও উজ্জ্বল সুন্দর ঢেউয়ের সম্ভাবনা তো থাকেই।

রফিক সম্ভবত অন্য রকম। কিন্তু সে কী করবে, জানায়নি। এটা নিশ্চিত যে একটা প্রলুব্ধকর ঢেউয়ের সামনে, আধা জাগরণকে নিদ্রায় পরিণত করার সুযোগের মধ্যে সে আছে। দেখা যাক।