একটি বুনো ‘অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট’–এর গল্প

অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আরিফুল খেয়াল করে দেখেছে, আগের রাতের বৃষ্টি পরদিন সকালের মাঠকে বড় মনোরম বানিয়ে দেয়। শিমের মাচা, মরিচের ঝোপ কিংবা দোলায়মান কলার পাতায় লেগে থাকে রাতভর গোসলের চিহ্ন। বিশেষ করে ধানের আলে, কলার ভুঁইয়ে এবং শসার জাংলার নিচে ভাদাইল কিংবা দূর্বাঘাসগুলো এমনভাবে ঝকমকিয়ে ওঠে, আরিফুলের ওই সবুজ বিছানার ওপর শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। যদিও তীব্র গরম ছাড়া কখনোই ওর কাজের ফাঁকে ঘাসের ওপর শোয়া হয় না।

বাড়ি থেকে পশ্চিম চরের মাঠ কুড়ি মিনিটের পথ—গত রাতের চোরাগোপ্তা বৃষ্টিতে এই মুহূর্তে যা পিচ্ছিল এবং কর্দমাক্ত। আরিফুল সূর্য ওঠার আগেই বিছানা থেকে উঠে কাস্তে বগলে গুঁজল। তারপর দুই হাতে লুঙ্গির দুই প্রান্ত তুলে হাঁটুর ওপর গিট্টু মারল। এরপর পা বাড়াল মাঠের উদ্দেশে। হাজি মোড় পার হতেই দেখল, কেঁচোর অসংখ্য টাওয়ার মেঠো পথটাকে দখল করে রেখেছে। রইস চাচা চায়ের দোকানের ঝাঁপ তুলতে তুলতে চিৎকার করে বলল, ‘বৃষ্টি হলিই উরা পাল্লা দিয়ে বাড়ি বানায়। কী সুন্দর বাড়ি!’

শৈশবে কেঁচোর বাড়ি নিয়ে কত খেলেছে আরিফুল! কখনো পা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কখনো গোড়া থেকে উপড়ে বিল্ডিং বিল্ডিং খেলেছে। কখনো সরু গর্তের ভেতর ডুবতে থাকা কেঁচোর লেজ ধরে টান মেরেছে। এখন মনে হয়, শৈশবে যা ওর কাছে খেলা ছিল, কেঁচোদের কাছে তা জীবন। এখন বোঝে, আর যা-ই হোক, কারও জীবন নিয়ে খেলা চলে না। সেই অবুঝ জীবনের কাফফারা দিতেই কি না কে জানে, আরিফুল কেঁচোর ঘরগুলোর ফাঁকে ফাঁকে সাবধানে পা ফেলতে লাগল। পিচ্ছিল রাস্তায় কয়েকবার আছাড় খেতে খেতে শেষ মুহূর্তে সামলে নিল নিজেকে। জয়নাল চাচার দোচালা টিনের ঘর মাঠ ও লোকালয়কে বিভাজিত করেছে। ওই দোচালা টিনের ঘরের কাছাকাছি যেতেই পাখিরা নিদ্রা ছেড়ে নতুন দিনের উৎসবে যোগ দিল। এক জোড়া ঘুঘুকে ঘাসের ভেতর খাবার খুঁটতে দেখল। বাঁশঝাড়ে একটি দোয়েল করুণ সুরে শিস কাটতে লাগল। হারেস কাকার পানের বরজ পার হতে গিয়ে রক্ত ছলকে উঠল আরিফুলের। মানুষ সমান লম্বা একটা দাঁড়াশ সাপ বাঁশঝাড় থেকে সড়াৎ করে ঢুকে গেল পানের বরজের ভেতর। আরিফুল দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে দ্রুত পার হয়ে গেল জায়গাটা। সেই থেকে ওর মাথায় ঢুকে গেল সাপ। যতক্ষণ না তৈয়ব চাচার শসার খেতে পা রাখল, ততক্ষণ সাপটা ছোবলাতে থাকল ওর মস্তিষ্কে। তৈয়ব চাচার শসার জাংলায় ভাদাইল ঘাসের প্রাচুর্য দেখে ভুলে গেল সাপের আতঙ্ক। ওর দুচোখ ঘাসের মতো সবুজ খুশিতে চকচক করে উঠল। ভোরের নরম আলোয় সবুজ ঘাসের ছায়া পড়ল ওর উজ্জ্বল চোখে। বিলম্ব না করে কাস্তে হাতে লুঙ্গি গুটিয়ে ও ঢুকে গেল জাংলার নিচে, ঘাসের সমুদ্রে। তারপর ব্যগ্র হাতে ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে কাটতে লাগল ভাদাইল ঘাসের গোড়া। এই ঘাস ওর এক জোড়া গরুর খাবার।

ফোনের ব্রাইটনেস বাড়াতে বাড়াতে পেছন ফিরে দেখে, কলার ভুঁইয়ের মাথার ওপর চোখ শাসাচ্ছে চৈত্রের সূর্য আর একটি দোলায়মান কলার পাতা ফালি ফালি করছে সূর্যের পেট। সূর্য থেকে চোখ সরিয়ে আরিফুল ফেসবুকে ঢোকে।

আরিফুল এবার কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে। পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর বিশেষ কোনো ভাবনা নেই। মৃত কলাগাছের মতো স্রোতের মুখে জীবনটাকে সঁপে দিয়েছে ও। নদী যেখানে নিয়ে যাবে, সেটাই হবে ওর গন্তব্য। আর এ কারণেই স্কুলের ক্লাস ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে কলেজে উঠে গেলেও পড়াশোনার প্রতি ও যত্নবান হয়নি কখনোই। জন্মের পর থেকেই ও দেখছে, জীবন আর অভাব রেললাইনের দুটো পাতের মতো একসাথে হাঁটছে তাদের সংসারে। বহুবার এমন হয়েছে—একটি নতুন জামার জন্য জীবনের খেরোখাতায় জমা করতে হয়েছে দুই-তিনটি ঈদ। এ নিয়ে অবশ্য ওর খুব বেশি দুঃখবোধ নেই। তবে নতুন জামা না পাওয়া ঈদের সকালগুলো ওর ছোট বোনের কান্না দেখেছে নিয়মিত। যদিও ওর জন্মের সময় সংসারের অভাব এতটা তীব্র ছিল না। মাঝখানে মায়ের একটা জটিল অসুখ, অপারেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের জোগান দিতে বিঘাখানেক ধানি জমি বিক্রি করতে হয় বাবাকে। তারপরই তো সংসারটা খাদে পড়ে গেল।

‘কিডা রে শুসার জাংলায়?’ পাশের কলার ভুঁই থেকে উড়ে এল প্রশ্নটা। কণ্ঠটা চিনতে পারল আরিফুল। জয়নাল চাচা। সারা রাত কলার ভুঁই পাহারা দিয়ে এখন বাড়ি যাচ্ছে। আরিফুল কাস্তের ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে উত্তর দিল—চাচা, আমি আরিফুল। ঘাস কাটি।

গোছা গোছা ঘাস কেটে এক জায়গায় জড়ো করছে আরিফুল। গরমের দুপুরে শসার জাংলায় ঘাস কেটে আরাম। চারপাশে উথালপাতাল দুর্বিনীত রোদ নাচানাচি করে। কেবল শসার মাচার নিচে নিবিড় শান্ত ছায়া। কাস্তে হাতে ওই ছায়ায় বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু এখন সকাল। সদ্য সূর্য ওঠা বৃষ্টিবিধৌত মনোরম সকাল। শসাগাছের পাতায় পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টির পানিতে ভিজে আছে পায়ের নিচের ঘাসও। আরিফুল ঘাস কাটতে কাটতে জায়গা বদল করে আর তার মাথার ওপর চুয়ে পড়ে পানি। ঘাস থেকে ভিজে ওঠে পায়ের গোড়ালি, লুঙ্গির নিম্নাংশ—এমনকি পাছাও। ঠান্ডা পানির ত্রিমুখী আক্রমণে একটু শীত শীতও কি করে?

আধা ঘণ্টা ঘাস কাটার পর হাত-পা অসাড় হয়ে এলে শসার মাচার নিচ থেকে বের হয়ে আসে আরিফুল। লুঙ্গির ট্যার থেকে স্মার্ট ফোনটা বের করতে করতে ও শসা আর কলার ভুঁইয়ের মাঝের আলের ওপর পা ছড়িয়ে বসে। ফোনের ব্রাইটনেস বাড়াতে বাড়াতে পেছন ফিরে দেখে, কলার ভুঁইয়ের মাথার ওপর চোখ শাসাচ্ছে চৈত্রের সূর্য আর একটি দোলায়মান কলার পাতা ফালি ফালি করছে সূর্যের পেট। সূর্য থেকে চোখ সরিয়ে আরিফুল ফেসবুকে ঢোকে। ঘাস কাটার এই অবসরে ওর এখন রিলস দেখার সময়। কিন্তু রিলসে ঢোকার আগেই অর্কর থাইল্যান্ড ভ্রমণের ছবি নিউজফিডে ভেসে উঠলে আরিফুলের ঈর্ষাকাতর আঙুল থমকে দাঁড়ায় ফোনের ওপর। ও বিড়বিড় করে বলে, এর মধ্যে অর্ক আবার থাইল্যান্ড গেল কবে! নাকি পুরোনো ছবি! আরিফুল ত্বরিতগতিতে আঙুল চালিয়ে ছোট খালার আইডি সার্চ করে। হ্যাঁ, খালার ওয়ালেও ঝুলছে থাইল্যান্ড ট্যুরের পারিবারিক ছবি।

পরের মাসে বিপুল আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে শ্বশুরবাড়ি গমন করে ছোট খালা। আর মা? ছোট বোনের বিয়ের আনন্দঘন সেই দিনটি কতটা গ্লানি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল মায়ের জীবনে, জানে না আরিফুল।

অর্ক, বিন্দু আর খালা-খালু কোনো একটা সমুদ্রসৈকতের সামনে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ছবির ভেতর ঢুকে গেছে দুটো নারকেলগাছের মাথা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিদেশি সমুদ্র, আরিফুল ক্যাপশন পড়ে বোঝে, থাইল্যান্ড। বিদেশি সমুদ্রের সামনে ছোট খালাদের উচ্ছ্বসিত পারিবারিক ছবি দেখে বুকের ভেতর মোচড় মারে আরিফুলের। একই মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছে তার মা আর ছোট খালা, একই হাঁড়ির ভাত খেয়ে বড় হয়েছে দুই বোন, অথচ ছোট খালা আজ সন্তানদের নিয়ে পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছে আর বাংলাদেশের পাঁচটি জেলাও ঘুরে দেখা হয়নি তার মায়ের। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অর্কর জায়গায় নিজেকে, বিন্দুর জায়গায় বৃষ্টিকে আর ছোট খালার জায়গায় মাকে কল্পনা করে আরিফুল। আর খালু খালুর জায়গায়ই থাকে। এই কল্পনা কি খুবই অন্যায্য কল্পনা?

শুরুতে ছোট খালুর সাথেই বিয়ে ঠিক হয়েছিল মায়ের। খালু তখন বিসিএস পাস করে সদ্য জয়েন করেছে চাকরিতে। সহকারী কমিশনার। পোস্টিং যশোর। বিয়ের বাজারে তীব্র আকর্ষণীয় পাত্র। এক হৈমন্তিক সন্ধ্যায় খালু তার বোন ও দুলাভাইয়ের সাথে দুরুদুরু বুকে দেখতে এসেছিল মাকে। জীবনভর বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা খালুর এই প্রথম কোনো পাত্রী দেখতে আসা, তাই তো তার দুরুদুরু বুক। আরিফুলের গড়পড়তা চেহারার মাকে তার পছন্দও হয়েছিল। বিয়ের দিনক্ষণ যখন পাকা হতে যাবে, সেই মুহূর্তে পুরুষদের আলোচনা কক্ষ থেকে মাকে নিতে এসেছিল ছোট খালা। তখনই ঘটে বিপর্যয়। ছোট খালা ধারালো সুন্দরী। তীক্ষ্ণ নাক, মসৃণ গাল, পটে আঁকা চোখ। প্রথম দর্শনেই তার বেয়াড়া রূপ খপ করে চেপে ধরে যে কারও চোখ। ছোট খালু এবং তার বোন-দুলাভাইয়ের চোখও আটকে যায় খালার রূপের জালে। মা-ও সুন্দরী বটে, তবে ছোট খালার পাশে ম্রিয়মাণ, নিষ্প্রভ। যেন টিউবলাইটের পাশে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা মোমবাতি। এই টিউবলাইটের একমুহূর্তের দর্শন পাত্রপক্ষের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। তারা মাকে নয়, ছোট খালাকে বউ বানাতে চায়। ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় বাড়িটা। মা স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে ঘরের কোনায়। তার সারা গায়ে হাঁটতে থাকে অপমানের আরশোলা। মায়ের জন্য মায়ের বাবা-মা; অর্থাৎ আরিফুলের নানা-নানির কিঞ্চিৎ মন খারাপ হয়। কিন্তু পাত্র যেহেতু পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে না, বরং পাত্রটি বাড়ির বড় জামাইয়ের পরিবর্তে ছোট জামাই হয়ে উঠছে, তাই এই মন খারাপের মধ্যেও তারা গোপন খুশিতে সিক্ত হয়ে ওঠে। আল্লাহ দিলে এর চেয়েও বড় ঘরে বড় মেয়ের বিয়ে হবে—এই আত্মসান্ত্বনা সামনে রেখে তারা বিসিএস ক্যাডার পাত্রের সাথে ছোট মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দেয়। সুপাত্র হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কায় সেই সন্ধ্যায়ই দ্রুত কাজি ডেকে কাবিন করা হয়। পরের মাসে বিপুল আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে শ্বশুরবাড়ি গমন করে ছোট খালা। আর মা? ছোট বোনের বিয়ের আনন্দঘন সেই দিনটি কতটা গ্লানি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল মায়ের জীবনে, জানে না আরিফুল।

আরিফুল বোঝে এখন—মায়ের বিয়েটা শেষমেশ তার জীবনেরই কাফফারা হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি জামাই খোঁজার চাপে মায়ের জন্য এমন এক পাত্র নির্বাচন করা হয়, যে কিনা ছোট খালুর প্রখর মেধা, দুর্দান্ত শিক্ষা ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের পাশে মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারে না।

বাবার বাড়ির সব গল্প বললেও ওই দিনটির প্রসঙ্গ বারবার এড়িয়ে যায় মা। বিব্রতকর ওই প্রসঙ্গ সামনে এলেই ঝুপ করে অন্ধকার নামে মায়ের মুখে। মা এড়িয়ে গেলেও কল্পনা দিয়ে আরিফুল বুঝতে পারে, অপার বেদনার ভার বুকে নিয়ে তার অবিবাহিত মা মেকি হাসির আদর ছড়িয়ে ছোট বোনকে বরের গাড়িতে তুলে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় বিয়ের উৎসব–বাতি নিভে গেলে মা আপন ঘরে খিল তুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিছানায়। বালিশে মুখ ডুবিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল সারাটা রাত। অথচ এই রাতই তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সুখের রাত হওয়ার কথা ছিল।

এরপর মায়ের বিয়ে হলো কবে? ছোট খালার থাইল্যান্ড ট্যুরের ছবি জুম করতে করতে ভাবতে বসে আরিফুল। পারিবারিক সূত্রে শুনেছে ও, ছোট খালার বিয়ের দুই মাসের মাথায় তড়িঘড়ি বিয়ে হয়ে যায় মায়ের। দুই মাসের ব্যবধানে একই বাড়ির দুই কন্যার বিয়ে—‘এত তাড়াহুড়ো ক্যান, মা?’ জিজ্ঞেস করেছিল আরিফুল। ক্লিষ্ট হাসি হেসে মা বলেছিল, বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে হতে নেই। সমাজের নিয়ম। পরিস্থিতি কখনো নিয়ম ভাঙলে জলদি তার কাফফারা দিতে হয়। আমার জলদি বিয়ে সেই নিয়ম ভাঙার কাফফারা।

কাফফারা!

আরিফুল বোঝে এখন—মায়ের বিয়েটা শেষমেশ তার জীবনেরই কাফফারা হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি জামাই খোঁজার চাপে মায়ের জন্য এমন এক পাত্র নির্বাচন করা হয়, যে কিনা ছোট খালুর প্রখর মেধা, দুর্দান্ত শিক্ষা ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের পাশে মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারে না। ভাগ্যচক্রে এই ম্লান অভাবী মানুষটাই বাবা হয়ে যায় আরিফুলের। বিয়ের সময় বাবা ছিল বেকার। অবশ্য বেকার তাদেরকেই বলা হয়, যারা কিছু একটা করার প্রচেষ্টায় থাকে। বাবার ভেতর সেই প্রচেষ্টাটাই ছিল না। পৈতৃক সূত্রে বাবা কয়েক বিঘা জমির মালিক হয়েছিল। সেই অনায়াসসাধ্য জমির আহ্লাদে বাবা চাকরি কিংবা ব্যবসা—কোনোটারই চেষ্টা করেনি; বরং জমির মালিক জমিদার সেজে লিজের টাকা এবং বর্গাদারের কাছ থেকে পাওয়া ফসলের ভাগ নিয়ে ঘুরেফিরে কেটে গেছে তার দিন। শুরুতে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও আরিফুল ও বৃষ্টি যত বড় হয়েছে, সংসারে তত খরচ বেড়েছে আর অভাবও তত ঘনীভূত হয়েছে। কয়েক বছর আগে মায়ের অসুখে জমির একটা অংশ বিক্রি করতে হলে বর্গা ও লিজের জমিগুলো ছাড়িয়ে নেয় বাবা। বাধ্য হয়ে নিজেই শুরু করে চাষ। এ সময়ই সংসারের আয় বাড়াতে শুরু হয় গরু পোষা আর পড়াশোনার ফাঁকে গরুর দেখভালের দায়িত্ব পড়ে আরিফুলের কাঁধে।

তখন ওর সব রাগ গিয়ে পড়ে খালার ওপর। না সরাসরি খালার ওপর নয়, খালার রূপের ওপর। ওই রূপই তো সব অনিষ্ঠের মূল। জগতের সব রূপকে বিদ্রূপ করে আরিফুল এই প্রথম খালার কোনো পোস্টে রিঅ্যাক্ট দেয়। লাভ, কেয়ার কিংবা ওয়াও রিঅ্যাক্ট না; অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট। এইবার আরিফুলের জ্বালা জুড়াল।

গরুর প্রসঙ্গ আসতেই ঘাসের কথা মনে হয় আরিফুলের। সকাল হয়েছে বেশ আগে, গরুগুলোর পেটে এখনো দানাপানি পড়েনি। আরও এক বোঝা ঘাস কেটে তাকে দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু ছোট খালাদের থাইল্যান্ড ট্যুরের ছবি ওর কাজের উদ্যম ও একাগ্রতা নষ্ট করে দিয়েছে। এই অসময়ে কেন যে সে ফেসবুকে ঢুকতে গেল! অনেক কষ্টে জমানো টাকায় দুই বছর আগে স্মার্ট ফোন কিনেছে আরিফুল। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ওই সময়ই খোলা। এত দিন ফেসবুকে আছে ও, কিন্তু আড়াল থেকে ফলো দেওয়া ছাড়া খালা ও খালাতো ভাই–বোনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়নি সে। রিঅ্যাক্ট কিংবা কমেন্টও করে না কখনো। ছোট খালাদের আত্মীয় নয়, মনে হয় দূর আকাশের নক্ষত্র, যেদিকে হাত বাড়াতে নেই। আরিফুল হাত বাড়ায়ও না।

খালু এখন উপসচিব। বিরাট ক্ষমতার মালিক। যার সাথে আত্মীয়তা রক্ষা করতেই হিমশিম খায় বাবা। ঢাকায় কী ভয়ানক ঐশ্বর্যের মধ্যে তিনি সপরিবার দিন কাটান, আরিফুল কল্পনাও করতে পারে না। তারপরও ফেসবুকের ওপেন বুক থেকে খালাদের জীবনাচারের যেসব জৌলুশপূর্ণ ছবি-ভিডিও গড়িয়ে পড়ে, তাতে সে অনুমান করতে পারে, ওই জীবন ধারণ করা দূরে থাক, তার মতো অক্ষমের সেখানে প্রবেশই নিষিদ্ধ। অথচ আরিফুল ওই জীবনের অংশ হতে পারত। সেই হৈমন্তিক সন্ধ্যায় মায়ের ওপর খালুর পছন্দ যদি অটুট থাকত, খালুর পছন্দের মধ্যে খালার রূপ যদি বাগড়া না বাধাত, তবে প্রবল ক্ষমতাধর ওই উপসচিব মানুষটি হতো তার বাবা। কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করত, বাবা কী করে, আরিফুল বুক ফুলিয়ে উত্তর দিত—সরকারি কর্মকর্তা। এই অনটন, এই ঘাস কাটা, এই গরু পালা, একটি নতুন জামার জন্য কয়েকটি ঈদের সকাতর অপেক্ষা—এসবের কিছুই সেই বর্ণিল জীবনকে বাধাগ্রস্ত করত না। পশ্চিম চরের মাঠে তৈয়ব চাচার শসার জাংলায় ক্ষুধার্ত গরুর জন্য ঘাস কাটতে থাকা আরিফুল এই মুহূর্তে থাকত থাইল্যান্ডের কোনো এক রিসোর্টে। তার কানে বাজত হেডফোন। ঠোঁটে থাকত শরবতের গ্লাস। সেই সন্ধ্যায় রূপবতী খালার একঝলকের উপস্থিতি আরিফুলের ভাগ্যটাই ওলটপালট করে দিয়েছে। আঙুলের ফাঁক গলে শুকনো বালুর মতো গড়িয়ে পড়েছে তার আরাধ্য জীবন, যে জীবন এখন অর্ক যাপন করছে। হঠাৎ প্রার্থিত জীবন হাতছাড়া হওয়ার অক্ষমতায় বুনো মোষের মতো ফুঁসে ওঠে আরিফুল। তখন ওর সব রাগ গিয়ে পড়ে খালার ওপর। না, সরাসরি খালার ওপর নয়, খালার রূপের ওপর। ওই রূপই তো সব অনিষ্টের মূল। জগতের সব রূপকে বিদ্রূপ করে আরিফুল এই প্রথম খালার কোনো পোস্টে রিঅ্যাক্ট দেয়। লাভ, কেয়ার কিংবা ওয়াও রিঅ্যাক্ট না; অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট। এইবার আরিফুলের জ্বালা জুড়াল।