কেনাবেচার হাট

রেজাউর রহমানের এ গল্প প্রথম আলোর ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৫ মার্চ। তখনও প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই গল্পটি এত দিন শুধু কাগজের পাতাজুড়েই ছিল। ‘অন্য আলো’ অনলাইন পাঠকের জন্য আজ গল্পটি তুলে ধরা হলো।

অলংকরণ: অশোক কর্মকার। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দীর্ঘ সরকারি চাকুরে জীবনের কতো-না অভিজ্ঞতা! চাকরির সূত্রে কতো না জায়গায় ঘুরেছি! দেশের আনাচে-কানাচে। কতো-না প্রত্যন্ত অঞ্চলে! কোনো জায়গায় স্বল্পকাল কাটিয়েছি। কোথাও বছরের পর বছর। দেখা পেয়েছি নানা জাতের, নানা বৈশিষ্ট্যের, নানা চেহারার জনগোষ্ঠীর। মানুষজনের সঙ্গেই ছিল আমার বরাবরের কারবার। সার্বক্ষণিক ওঠাবসা। এছাড়া আমার গত্যন্তর ছিল না। এটাই আমার চাকরির ধরন। এরা বেশিরভাগই আমার কাছে আসতে নিজেদের নানা ধান্দা-উছিলায়। কাজ উদ্ধারের মওকা করে নিতে। কাজ যতোক্ষণ ঝুলে থাকতো-ততোক্ষণ তাদের ভিন্ন এক চেহারা। বিনয় আর কৃতজ্ঞতার ভারে নুইয়ে থাকা। আবার যেই না ফাইলে আমার ইতিবাচক সই একবার হয়ে যায় তাদের চেহারা যায় পাল্টে। তখন এখানতক আসার আর দরকার হয় না তাদের। তত্ত্বাবধায়ক আর কেরানি মহলেই তাদের তখনকার পাঁয়তারা-মহড়া-জমায়েত। তাই বলে ব্যবসা-সংযোগ, জনসমাগম আর জনসংযোগের কি কমতি হয় কখনো? এই জনবহুল, সমস্যা জর্জরিত সমাজ দেশের সব অফিস-আদালতে মানুষ কাতার দিয়ে থাকে। তার ওপর এটা তো ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত দপ্তর। এখানে তো আরো ভিড়। একজন যায় তো অন্যজন আসে। জনজট খুলতে খুলতে আমি অতিষ্ঠ। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। চাকরির শেষ চক্করে বদলি হই ঢাকায়। হেড অফিসে। এখানকার ব্যবস্থাপনা উন্নত। লোকবল বেশি। ভাবলাম, এবার যদি একটু ফুরসত হয়? অবসর মেলে। গত কিছুদিনের অভিজ্ঞতায় দেখলাম, ব্যাপারটা অনেকটা তাই-ই। এখানে যখন-তখন লোকজন এসে ধরনা দিয়ে থাকে না। সশরীরে এসে হাজির হয় না। মনে মনে একটু নিশ্চিত স্বস্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলাম অন্য এক সমস্যার। বাজতে আরম্ভ করল টেলিফোন। কথা-তদবির-উপরওয়ালার নির্দেশ আসা আরম্ভ হলো, ইন্টারকম, টেলিফোন, ই-মেইল, ফ্যাক্সের মাধ্যমে। এবার মানব সমাগম নয়। বিরক্তি আমার চরমে ওঠে যোগাযোগ মাধ্যমের আধুনিক প্রযুক্তির ওপর। একটা ছেড়েই আরেকটা ধরতে হয়। কোনো কোনো সময় দুই কানে দুই রিসিভার ধরতে হয়। ইন্টারকম, টেলিফোন এক সঙ্গে বাজতে থাকে। টেলিফোনের সংখ্যাও যেখানে একাধিক। আর যোগাযোগের বিষয়গুলো সবই বৈষয়িক। কাজ উদ্ধার। ফায়দা নেয়া। মালপানির যোগান ইত্যাদি ইত্যাদি।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করি। বয়স বাড়ছে। দেহে আজকাল ক্লান্তিও জমে। অফিসঘরের ডেস্ক-চেয়ার ছেড়ে পাশের হেলান কুশন চেয়ারে কিছুক্ষণ চোখ বুজে এলিয়ে থাকি। আজো তাই করছিলাম। তখন রিসেপশন থেকে ইন্টারকম বেজে ওঠে। একবার ভাবলাম, ধরব না। আবার ভাবলাম, যদি ওপরওয়ালার হয়? তখন তো বিপদ হতে পারে। রিসিভার ওঠাই।

-হ্যালো।

-আমি হরপ্রসাদ ভৌমিক বলছি স্যার। আমি কি আসতে পারি স্যার?

একবার যখন রিসিভার উঠিয়েছি। আমি বিরক্ত হয়েও জিজ্ঞাসা না করে পারি কী প্রয়োজন? লাঞ্চ আওয়ার তো এখনো শেষ হয়নি।

-স্যার...স্যার... প্রয়োজনটা খুবই সাধারণ। আবার গতানুগতিক নয়। একটু সেবামূলক...

বিরক্তি আমার চরমে উঠতে থাকে।

-দেখুন এটা সরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের অফিস। এখানে...সাধারণ... গতানুগতিক...সেবামূলক—এসব কী বলছেন?

-সেটাই তো আমার কথা স্যার। সেটা বলতেই তো আসতে চাচ্ছি স্যার। শুধুমাত্র আপনার পাঁচটা মিনিট নেব স্যার। শুধু দুটো কথা...গ্রন্থাগার সম্পর্কিত। বেয়াদবি মাফ করবেন। আসব স্যার?

বিতৃষ্ণা চেপে অপারগ তাকে আসতে বলি। কিছুটা কৌতূহল বোধ করলাম। লোকটা একটা ব্যস্তসমস্ত সরকারি অফিসে এসে বিনয় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলছে। বিষয়টাও অদ্ভুত!...গ্রন্থাগার! এসব ভাবতে ভাবতে আমার বন্ধ ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে গেল।

আসতে পারি স্যার? আমি মাথা নাড়ি। সে সরাসরি এসে আমার মুখ বরাবর চেয়ারে বসে পড়ে। তার পায়ের পাশে হাততিনেক লম্বা বড় কালো একটা হ্যান্ড-ব্যাগ রাখে সে। যত্ন সহকারে।

হরপ্রসাদ ভৌমিক বিনম্র উজ্জ্বল হাসে।

স্টুডিও থেকে এলাম। কোন স্টুডিও?

এফডিসি। সিনেমার শুটিং করে এলাম। আমি কিছুটা অবাক হয়ে সোজা হই। তার মানে? তার মানে স্যার...আমি আর্টিস্ট...অভিনেতা...। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই। তখন মনে হলো, বিরক্তিতে তাকে ভালো করে আমি দেখিনি। লক্ষ্য করিনি।

গল্পটি ‘প্রথম আলো’র ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল
যথেষ্ট বিস্মিত হলেও নিজেকে সংবরণ করি। সুতীক্ষ্ন নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে চাওয়ার চেষ্টা করি। স্মৃতি, স্মৃতিচারণের বিষয়ে নিজের ওপর আমার ব্যক্তিগত আস্থা রয়েছে। বিশ্বাস রয়েছে। সেই সূত্র ধরে আমি আমার দীর্ঘ চাকরি জীবনে যতো ঘটনা, যতো চরিত্রের দেখা পেয়েছি সেসব আতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়ালাম কিছুক্ষণ এবং বিফল হলাম। এমন একটি আবেদন-ঘটনা, এমন চরিত্রের একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কোনোদিন।

হরপ্রসাদ ভৌমিক হ্যাংলা-পাতলা। চেহারা-দেহে পুষ্টির অভাব হলেও দৃষ্টি তরতাজা, সতেজ। কথা বলার ধরন, হাবভাব চটপটে। পরনে প্যান্ট-শার্ট-টাই। কোমরে বেল্ট। মোটামুটি কেতাদুরস্ত বলা চলে।

তার মানে...আপনি অভিনেতা...অভিনয় করেন?

জি আমি ক্যারেক্টার আর্টিস্ট স্যার।

কী রকম?

মানে...মানে স্যার এই ধরেন কখনো আমি বিদেশীর পাট করি। কখনো, উকিলের। কখনো হোটেল ম্যানেজারের রোলে নামি...ইত্যাদি...ইত্যাদি...।

সিনেমা, ছায়াছবির ব্যাপারে, এককালে আমার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। ছাত্রজীবনে প্রচুর ছবি দেখেছি। সেসব দীর্ঘদিন আগেকার হলেও এসবের কোনো কোনোটার ঘটনাপ্রবাহ, কোনো কোনো অভিনেতা/অভিনেত্রীর অভিনয় দক্ষতা, সঙ্গীত/আবহসঙ্গীত, নৃত্যশৈলী, নারীদেহের সৌন্দর্য-ছন্দ স্মৃতিতে বেশ তরতাজা হয়ে আছে এখনো। কাজেই জাজ্বল্যমান অভিনয় জগতের একজন সক্রিয় প্রতিনিধিকে সামনে পেয়ে আমার বর্তমান নীরস জীবন যেন উজ্জীবিত হয়ে উঠতে চাইলে খানিকটা।

-বিদেশীর চরিত্রে পার্ট করি-কথা কয়টি আমাকে কৌতূহলী করে তোলে বেশি।

-বিদেশীর চরিত্রে অভিনয়, ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।

-আপনারা স্যার অন্য জাতের মানুষ। আপনার না বোঝারই কথা। সিনেমা জগতে কতো ধরনের লোকের না প্রয়োজন হয়। সাধারণ পথচারী, পাবলিক-হেঁটে যাচ্ছে। এই শটে পথচারীও একটি চরিত্র। অনেক সময় তা অভিনয় গুণে হয়ে ওঠে উল্লেখযোগ্য, অসাধারণ। দর্শক তা মনে রাখে। আলবত মনে রাখে। মনে রাখতে বাধ্য। এটুকুন বলতে পেরে হরপ্রসাদ বিয়ের মতো মুখ টিপে হাসে। মাথা নাড়ে।

-ওহ...বিদেশী চরিত্রের কথা বলছিলেন? হ্যাঁ...এসব চরিত্রে যখন নামি তখন তিন তারা/পাঁচ তারা হোটেলে শুটিং হয়। হোটেল লবিতে দেশী/বিদেশী লোকজনের আনাগোনা থাকে। ছোটখাটো রোল থাকে। তাছাড়া ঐতিহাসিক মুভি যেমন, ব্রিটিশ আমল বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পর্কিত কোনো ছবিতে বিদেশীর পাট করতে হয়। এসব শটের জন্য বিদেশী লোকজন কোথায় পাওয়া যাবে। তাও আবার অভিনয়! এ কি সবাই পারে?

ঘরপ্রসাদ ভৌমিকের জবরদখল গোছের আগমনে প্রাথমিকভাবে আমি যে বিরক্ত হয়েছিলাম তা এতোক্ষণে প্রশমিত হয়ে আসতে থাকে। তার দিকে আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাই। তার চেহারা-আদল পরখ করি এবং অনুমানে ভেবে দেখার চেষ্টা করি, হরপ্রসাদকে ইংরেজের পোশাক-আশাকে কেমন লাগবে?

আমার মনে হলো, মোটামুটি মন্দ লাগবে না।

আমার স্বর নরম হয়ে আসে। আমি কিছুটা সহজ বোধ করি।

-আচ্ছা হরপ্রসাদ বাবু, বর্তমান সিনেমা জগতের অবস্থাটা কেমন?

-অভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ। তবে আমার কথা ভিন্ন। নায়ক-নায়িকা তো মার্কামারা হয়। জোড়ায় জোড়ায় পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যারেক্টার অ্যাক্টর সে অর্থে বিরল...। আর আমি তো অ্যারিস্ট্রোক্রেটিক রোল ছাড়া করি না...

আমি কিছুটা মুগ্ধ হই তার চটপটে হাবভাবে। বাধ্য হয়েই আমি জিজ্ঞেস করি,

-এখানে আসার কারণ। এখানে আপনার কি থাকতে পারে? আমরা ব্যবসাবাণিজ্য-সওদা করি।

-আমাদের কাজ...বিশেষ করে আমার কাজ সব জায়গায়। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু। এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধ। যেখানে কাগজ-কলম আছে, সেখানেই আমার বিচরণ।

-ঠিক বুঝলাম না। ধরতে পারলাম না কথাটা।

তার কণ্ঠস্বরের চটপটে ভাব নমনীয় হয়ে আসে।

-আমার স্বর্গত জনকের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমি একটি গ্রন্থাগার করেছি। নাম-গঙ্গাপ্রসাদ পাবলিক লাইব্রেরি।

-এইটুকুন বলে সে ঝকমকে অফসেট পেপারে লেখা দুটি আবেদনপত্র আমার সামনে মেলে ধরে। টানা টানা সুচারু বড় বড় অক্ষরের লেখা। আমি একটু আলতো চোখ বুলাই।

ওপরে নির্ভুল সম্বোধন। আমার পদবী, বিভাগ, অফিস ঠিকানা ইত্যাদির উল্লেখে কোথাও জটিলতা নেই। অপরিচ্ছন্নতা নেই। বিষয় উত্থাপনে সে লিখেছে: গঙ্গাপ্রসাদ পাবলিক লাইব্রেরির জন্য দুই সেট বই, পাবলিকেশন এবং রিপোর্ট বা অন্য কোনো পাঠ্যবস্তু দানের আবেদন।

যথেষ্ট বিস্মিত হলেও নিজেকে সংবরণ করি। সুতীক্ষ্ন নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে চাওয়ার চেষ্টা করি। স্মৃতি, স্মৃতিচারণের বিষয়ে নিজের ওপর আমার ব্যক্তিগত আস্থা রয়েছে। বিশ্বাস রয়েছে। সেই সূত্র ধরে আমি আমার দীর্ঘ চাকরি জীবনে যতো ঘটনা, যতো চরিত্রের দেখা পেয়েছি সেসব আতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়ালাম কিছুক্ষণ এবং বিফল হলাম। এমন একটি আবেদন-ঘটনা, এমন চরিত্রের একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কোনোদিন।

এবার আমার সুর পাল্টাতে হয়। -হ্যাঁ...মাঝে মাঝে পার্টির কাছ থেকে বিজ্ঞাপন আদায় করার জন্য নমুনা হিসেবে কোনো সংস্থা, সমাজসেবী গোষ্ঠীর লোকজন আসে। তারা অবশ্য মাঝে মাঝে দু’চারটা প্রকাশনা, বুকলেট, সুভেনির রেখে যায়।

আমারও মনটা ভিজে আসে। অনেকদিন আগে মরে যাওয়া নিজের বাবার কথাও মনে পড়ে। হরপ্রসাদের দিকে কিছুটা ঈর্ষা মেশানো মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাই। মনে মনে ভাবি, কই আমার মৃত জনকের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, সতেজ করার প্রচেষ্টা নিয়ে এমন সুন্দর একটা পরিকল্পনা তো আমি করতে পারিনি। নিদেনপক্ষে ভাবতেও পারিনি। পেরে ওঠা তো দূরের কথা। অথচ গরিব বাবা তো কম করেনি আমার জন্য। অপর্যাপ্ত কৃষিখামারীর পাশাপাশি জায়গায়-বেজায়গায় লাউকুমড়ো-শিমের টাল-মাচান উঠিয়ে আগাম ফলন ফলিয়েছেন। সঞ্চয় করেছেন কুঁড়িয়ে কুঁড়িয়ে অর্থ। নিজের ঘরদুয়ার-থাকাশোয়ায় জায়গায় সযত্নে লালন করেছেন ছাগল-হাঁস-মুরগি। সবই করেছেন আমার দিকে চেয়ে। ঠিকানাহীন ঢাকা শহরে আমার গরিবি হালতে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে গিয়ে জীবনে তিনি পরব-উত্সবেও নতুন জামা-কাপড় পরে দেখেননি। দেখেননি আমার মাও। সেই বাবা আমার চলে গেলেন অকালে। অকালে বলবো এই জন্য যে, তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো রোগবালাই ছিল না। আজকে আমার যতোটুকু মনে পড়ে, তিনি অপুষ্টি ও অচিকিত্সায় মারা গেছেন। মা রয়ে গেছেন আজও। পৈতৃক ভিটে আঁকড়ে। তার দৃষ্টিশক্তি নেই বললেই চলে। পরব-উত্সবে আমি বাড়ি গেলে তিনি আমায় হাত দিয়ে অনুভব করেন। গায়ের গন্ধ নেন। আজীবনের চেনা গন্ধ। মায়ের কোল থেকে।

সামনে বসে থাকা অপ্রতিভ হরপ্রসাদের দিকে চেয়ে মনটা বেদনাসিক্ত হয় আমার। কণ্ঠ ভার হয়ে আসতে চায়। আমি কি বলতে গিয়ে থেমে যাই। চোখের সামনে দেখি, হরপ্রসাদের প্রতিকৃতি ধীরে ধীরে ফুলেফেঁপে বড় হয়ে যায় এবং আমি ছোট হতে হতে পায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে থাকি। সে তার কাজে তত্পর। দায়িত্বশীল অন্যদিকে আমি চরম অবহেলায় কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।

সামনে বসা লোকটা আমার করণীয় কাজের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে আমাকে আগলে দাঁড়িয়েছে যেন। লোকটা কতো সুন্দর একটা কাজ করছে। পিতার নামে গ্রন্থাগার। দিব্যচোখে যেন আমি দেখতে থাকি, বালিয়াহাটা পুকুরপাড়ে, গাছে ঢাকা শান্ত পরিবেশে পুরোনো সুন্দর এক পাঠাগার। নাম স্বর্গত গঙ্গাপ্রসাদ লাইব্রেরি। সকাল-বিকেল কতো লোকের সমাগম এখানটায়। বই-পুস্তক, পত্রপত্রিকা পড়ে এরা। পবিত্র মন নিয়ে। আশপাশের দু’চার গ্রামে সেই গ্রন্থাগারের পরিচিতি।...

চেয়ারের হেলান থেকে নড়েচড়ে বসি। ঘড়ির দিকে চাই। লাঞ্চ-আওয়ার পায় শেষ। বেল বাজিয়ে পিয়নকে চা দিতে বলি।

ধূমায়িত চা সামনে পেয়ে হরপ্রসাদ আহ্লাদিত হয়।

আমাদেরও মানুষ চিনতে অসুবিধা হয় না। আমরাও পেয়ে যাই সঠিক মানুষ। আমি তো আর নিজের পেটের ধান্দা করছি না। করছি মানুষের মনের ধান্দা। মগজের ধান্দা...। দিচ্ছি বুদ্ধিবৃত্তি তৈরির যোগান...

-তবে একটা ব্যাপার কী জানেন হরপ্রসাদ বাবু?...

বলে একটু থামতে হয় আমাকে। আমি একটু লজ্জায় পড়ে যাই। এতো বড়, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা অফিস...এখানে বই-পুস্তক, সাময়িকী, পত্রপত্রিকার কোনো চলন-প্রচলন নেই। চর্চা নেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের, এটা কেমনতর কথা? হোক না বাণিজ্য, লেনদেনের আড্ডাখানা, সরকারি অফিস...এখানে কি অবসর বিনোদন বা একটু মানসিক বিশ্রামের জায়গা থাকবে না কোথাও? সামাজিক, সংস্কার-সংস্কৃতি, পিকনিক...নানা ধরনের কতো না কর্মকাণ্ড চলে বছরের চাকা ধরে। কই একটা গ্রন্থাগারের প্রয়োজনের কথা তো কেউ বলে না?

চায়ের কাপে ঠোঁট লাগাতে গিয়ে হরপ্রসাদের দিকে চেয়ে দেখি সে তৃপ্তি সহকারে চা গিলছে। তার চোখে-মুখে এক ধরনের নির্লিপ্ত প্রশান্তির প্রলেপও জমে আছে। আমি আবার ভাবার চেষ্টা করি, বাবার স্মৃতি কেন... ছোট হোক, বড় হোক কেবলমাত্র একটা গ্রন্থাগার গড়ে তোলার ইচ্ছাটাও তো একটা মহত্ কাজ। বড় মাপের পরিকল্পনা। একটা সুন্দর উদ্যোগ।

আবার আমি পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করি।

হরপ্রসাদ বাবু...তবে একটা ব্যাপার কি জানেন...এটা একটা সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এখানে বই-পুস্তকের লেনদেন বা দেন-দরবার খুব একটা নেই। লোকজন আসে শুধু স্বার্থ আর পয়সার ধান্দায়। মাঝে মাঝে একেবারে ফাঁপড়ে পড়ে যাই।

-ডাইরেক্টর সাহেব, আমি কিন্তু সব জেনেই এসেছি এতোদূর। আমি সব সময় তাই করি। আমার ধরনা দেয়ার জায়গার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় আমি বড় ধরনের সাহায্য পেয়ে যাই। অপ্রত্যাশিতভাবে। ঐ যে বলে-না..‘.যেখানে দেখিবে ছাই, খুঁজিয়া দেখ তাই...অমূল্য রতন।’ মহাকবির প্রাতঃস্মরণীয় কথা আমি কখনোই ভুলি না।

এবার আমার সুর পাল্টাতে হয়।

-হ্যাঁ...মাঝে মাঝে পার্টির কাছ থেকে বিজ্ঞাপন আদায় করার জন্য নমুনা হিসেবে কোনো সংস্থা, সমাজসেবী গোষ্ঠীর লোকজন আসে। তারা অবশ্য মাঝে মাঝে দু’চারটা প্রকাশনা, বুকলেট, সুভেনির রেখে যায়।

চেয়ারে পা তুলে বসি। মুক্তির অবসাদ গায়ে-গতরে মেখে উপভোগ করতে গিয়ে আবার চিন্তিত হয়ে পড়ি পরশু দিন হরপ্রসাদ আবার আসছে। তাকে তো সম্মানজনক সংখ্যক বইপত্র দিয়ে বিদায় করতে হবে। তা না হলে...। নিজের বাড়ির বাড়তি বইপত্রের অবস্থা ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। তা খুব একটা ভালো মনে হলো না।

-হরপ্রসাদ উত্ফুল্ল হয়ে ওঠে।

-আমি তো সেই কথাটাই বলতে চাচ্ছি। যেকোনো ছাপানো জিনিসই পড়ার জিনিস। বই কিনে, বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না, অমানুষ হয় না। অক্ষর-লহরা কবিতা...গানেই তো ভগবানের পূজা-অর্চনা করা হয়। বন্দনা করা হয়। ... ঐ যে নমুনা কপি বললেন...সেগুলো দিলেও আমার চলবে। অজগাঁয়ের গ্রন্থাগার। শহরের এসব প্রকাশনা এরা কয়টা পায়? এরা এখান থেকে যা পায়, তাতেই ধন্য হয়।

আমি বেল টিপি।

পিয়ন ওয়াদুদ এসে দাঁড়ায়। বিনম্র ভঙ্গিমায়।

-জি স্যার।

-তুমি দেখো তো...পুরো বিভাগ ঘুরে ঘুরে...কিছু সাময়িকী/বার্ষিকী, বইপুস্তক পাওয়া যায় কিনা? শুধু বাংলাগুলো দেখবে...

-হরপ্রসাদ বাধা দেয়।

-স্যার...বেয়াদবি মাফ করবেন। আমার গ্রন্থাগারের ইংরেজি পাঠকও আছে। বিশেষ করে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষক-প্রফেসররা...তারাও তো আসেন। কাজেই ইংরেজির পাঠকও রয়েছে।

-আধা ঘণ্টাখানেক সময়ের মধ্যে ওয়াদুদ ফিরে আসে। তার হাতে আট-দশটা নানা ধরনের, নানা সাইজের, সাময়িকী-পুস্তক-পুস্তিকা। রঙ-বেরঙের ধুলো জমা মলাট। আমার টেবিলে সে একটু শব্দ করেই রাখে। কিছুটা বিরক্তিসহকারে। ভাবখানা তার এরকমের, এসব পুরোনো ছাইভস্ম টেনে আর কী হবে। না আমার হবে, না অন্য কারোর। এদিকে সে যেকোনো একটা ফাইল এধার-ওধার করলে অনেকের পকেট ভারী হতে থাকে। দু’পয়সা হয় তারও। আর পাইলাম না স্যার।

আমি উত্সুক হয়ে উঠে দাঁড়াই।

-কী বলো? এই কয়টাও তো কম নয়।

কিন্তু এগুলো ধুলোমলিন অবস্থা, দেখে আমি মনে মনে লজ্জিত হই। আমি ভাবতে থাকি, এগুলো পড়ার জিনিস। পড়লে যত্ন হয়। না পড়লে এসবে ধুলো জমে। অনাদরের ধুলো। ওয়াদুদকে কিছুটা রেগেই বলি,

-এগুলো একটু মুছে আনতে পারলে না? আশ্চর্য...কমনসেন্স...। যাও নিয়ে যাও। মুছে-ঘষে আনো।

বইপত্র উঠিয়ে চলে যায় ওয়াদুদ।

হরপ্রসাদ মুখ খোলে।

-স্যার, কথা তো এটাই। এই জিনিসের কদর কয়জন করে? করলে কি আর দেশের এই অবস্থা হয়। গুণ্ডা-পাণ্ডার আখড়ায় পরিণত হয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। লেখাপড়া করে কেউ কি আর পাস করে? লাইব্রেরির বইপত্রে জমে ধুলো। পবিত্র পুস্তকগুলো কেটেকুটে সাবাড় করে পোকা-মাকড়ে।

আমি আবারও লজ্জিত হই। ভাবি, আমাদের অবস্থাও তো তথৈবচ। কবে কোনদিন দু’চারটা পাস দেয়ার জন্য পড়তে হয়েছিল। পড়েছিলাম এরপর আর তো তেমন পড়া হয়ে ওঠেনি। খুব বেশি হলে, দৌড় খবরের কাগজ পর্যন্ত।

-ধুলোঝাড়া বইপত্রগুলো নিয়ে ফিরে আসে ওয়াদুদ।

-কী করবো স্যার এগুলোর?

-ভালো একটা পলিথিন ব্যাগ নিয়ে এসো। বইগুলো গুছিয়ে দেও ভদ্রলোককে।

এবার হরপ্রসাদের দিকে মুখ ফিরাই।

-আজ তাত্ক্ষণিকভাবে যে কয়টা পারলাম-দিলাম। আমাকে দু’চারদিন সময় দিন। হয়তো আরো কিছু দেয়া যাবে। খুঁজে পেতে নেই। মহৎ কাজ হাতে নিয়েছেন। আমাদের দিয়ে তো তেমন কিছু আর হলো কই। অন্তত আপনাকে সাহায্য করতে পারলেও...

ঘরপ্রসাদ বিনয়ী হয়।

-কবে আসব বলুন।

এই ধরুন সপ্তাহখানেক পরে।

-নাহ...আর একটু আগে আসি। দেশে যাবো কি-না। রিডিং মেটেরিয়ালগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। আবার কবে না কবে যাওয়া হয় ঠিক নেই। ফিল্ম শুটিঙের হিড়িক পড়ে গেলে তো আবার সময় পাবো না।

-অল্প সময়ের মধ্যে আর কয়টা জোগাড় করতে পারবো? আমি দ্বিধান্বিত হই।

-দেখুন যে কয়টা হয়। পরশু দিন আসি কী বলেন?

-অপারগ বললাম, আসেন। দেখা যাক। আমি চিন্তিত হই।

-ওয়াদুদের হাত থেকে বইয়ের প্যাকেট নেয় হরপ্রসাদ। বলিষ্ঠ ভঙ্গিমায়। নমস্কার জানিয়ে বিদায় নেয়।

হরপ্রসাদ চলে গেলে টের পেলাম আমি একটা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেলাম এই মুহূর্তে। হরপ্রসাদ যেন আমাকে কোণঠাসা করে রেখেছিল এতোক্ষণ। ফাঁপড়ে পড়ে গিয়েছিলাম।

চেয়ারে পা তুলে বসি। মুক্তির অবসাদ গায়ে-গতরে মেখে উপভোগ করতে গিয়ে আবার চিন্তিত হয়ে পড়ি পরশু দিন হরপ্রসাদ আবার আসছে। তাকে তো সম্মানজনক সংখ্যক বইপত্র দিয়ে বিদায় করতে হবে। তা না হলে...। নিজের বাড়ির বাড়তি বইপত্রের অবস্থা ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। তা খুব একটা ভালো মনে হলো না।

আমি এগিয়ে যাই সে দোকানের দিকে। হরপ্রসাদের রেখে যাওয়া বইগুলো তখনো সেভাবেই পড়ে আছে। দোকানের সামনে। শান বাঁধানো মেঝেতে। কৌতূহলী হয়ে পরখ করতে গিয়ে আরো অবাক হই। এই বইয়ের কাঁড়িতে গতকাল আমার ওখান থেকে আনা বইপুস্তকও যে রয়েছে। সঠিক হওয়ার জন্য তুলে নেই কয়েকটি বই। দু’একটিতে খুঁজে পেলাম আমার নিজের হাতের সংক্ষিপ্ত সই। বিস্ময়ে থমকে দাঁড়িয়ে থাকি খানিকক্ষণ। এক সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থহীন মনে হলো। বেরিয়ে আসি সেখান থেকে। হরপ্রসাদের জন্য আমার আর বই কেনা হলো না।

মাঝখানে দু’বার বড় সাহেবের ঘরে ডাক পড়লো। সময়সীমার মধ্যে জরুরি কাজ শেষ করার নির্দেশ হলো। কিন্তু সব ছাপিয়ে হরপ্রসাদের বইয়ের তাগিদ আমি ভুলতে পারলাম না। চিন্তিতও হয়ে রইলাম। পুলের গাড়িতে নীলক্ষেত বেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে হঠাত্ করেই যেন হরপ্রসাদ সমস্যার একটা সমাধান পেয়ে গেলাম আমি।

নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের বাজারের অভিজ্ঞতা আমার দু’চারবার হয়েছে। তাও নিজস্ব বই পড়া বা সংগ্রহের তাগিদে নয়। ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজের বইপত্র কেনার ব্যাপারে গিয়েছি সেখানে এবং আমার মনে পড়লো, সেখানে কাঁড়ি কাঁড়ি বই। বইয়ের টাল পড়ে গেছে। বিশেষ করে পুরোনো সাময়িকী/পুস্তিকা যথেষ্ট কম দামে কেনা যাবে। দামদর ঠিকমতো করতে পারলে।

আমি আশ্বস্ত হই। সমস্যা সুরাহার একটা সহজ পথ পেয়ে গেলাম সহসা। কিন্তু সময় তো খুব বেশি নেই। কাল বাদ পরশু হরপ্রসাদ আসছে। আগামীকালই সময় করতে হবে। অফিস থেকে এক ফাঁকে বেরিয়ে পড়া যাবে। ৫০-৬০ টাকার পুরোনো বইপত্র কিছু কিনে ফেলতে পারলেই হলো। যে মানেরই হোক না কেন? শুধু ৫০-৬০ টাকার শ্রাদ্ধ হবে এই তো। এর বেশি তো আর নয়।

পরের দিন অফিসে পৌঁছে পুরোনো বই কেনার ধান্দাটা থেকে মনে মনে একেবারে রেহাই পাচ্ছিলাম না। বড় সাহেবের জরুরি কাজ হাতে। তাতে, মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না।

বেলা ১১টার দিকে কাজের ফাঁকে বেরিয়ে পড়ি। নীলক্ষেত বইয়ের বাজারে ঢুকে পড়ি। দু’ধারে ছোটবড় নানা বইয়ের দোকানের সরু গলি বেয়ে এগিয়ে যাই। হঠাৎ বাঁপাশের এক সরু গলির শেষ মাথায় আমার দৃষ্টি থেমে যায়। আমার দৃষ্টি সরু করে দেখার চেষ্টা করি। সঠিক হই। তাই তো এ যে হরপ্রসাদ। সে এখানে কি করছে? হয়তো স্বর্গীয় পিতার নামের গ্রন্থাগারের জন্য বইপত্র কিনছে। তার সংগ্রহ বাড়াচ্ছে। দু’দিন বাদে দেশে যাবে। নিয়ে যাবে বড় বইয়ের বোঝা। লম্বা হবে তার লাইব্রেরির সংগ্রহতালিকা।

আমি খুশি হয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াই। হরপ্রসাদ আমার স্পষ্ট দৃষ্টি সীমানায় কিন্তু আমাকে লক্ষ্য করার তার সময় নেই। সে ব্যস্ত। আমি দেখতে পাই, সে তার বড় সাইজের কালো ব্যাগ থেকে বেশ কিছু বইপত্র নামাচ্ছে। গুনে গুনে দিচ্ছে দোকানদারকে। এর মধ্যের দু’চারটা বই যেন আমার চেনা চেনা ঠেকলো। পরিশেষে নিম্নস্বরের কথাপেকথনের পর হাত বাড়িয়ে সে কিছু টাকা নিলো। একাধিকবার তা গুনলো। এরপর সরু গলি ধরে তরতরিয়ে সে হেঁটে গেলো। একরুখো দক্ষিণমুখী।

আমি এগিয়ে যাই সে দোকানের দিকে। হরপ্রসাদের রেখে যাওয়া বইগুলো তখনো সেভাবেই পড়ে আছে। দোকানের সামনে। শান বাঁধানো মেঝেতে। কৌতূহলী হয়ে পরখ করতে গিয়ে আরো অবাক হই। এই বইয়ের কাঁড়িতে গতকাল আমার ওখান থেকে আনা বইপুস্তকও যে রয়েছে। সঠিক হওয়ার জন্য তুলে নেই কয়েকটি বই। দু’একটিতে খুঁজে পেলাম আমার নিজের হাতের সংক্ষিপ্ত সই। বিস্ময়ে থমকে দাঁড়িয়ে থাকি খানিকক্ষণ। এক সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থহীন মনে হলো। বেরিয়ে আসি সেখান থেকে।

হরপ্রসাদের জন্য আমার আর বই কেনা হলো না।