হঠাৎ ফার্মেসির লাউডস্পিকারে ঘোষণা এল—
‘হ্যাপি বার্থডে টু আওয়ার ডিয়ার উম্মে হালিমা’
স্টেইনওয়ের এক ব্যস্ত মোড়ে ততোধিক ব্যস্ত এক ফার্মেসিতে হালিমা কাজ করে। সকাল আটটা বাজার আগে শিফটে হাজির হয়ে যায়। সারা দিন লোকজন আসে, যায়, নানা দেশের নানা জাতির মানুষ। কেউ ওষুধ নেয়, কেউ ভিটামিন ট্যাবলেট, কেউ ফ্লু শট নিতে আসে। এই রুটিনের ভেতরে কেটে যায় দিন।
হালিমার এটাই প্রথম ফুলটাইম জব। এর আগে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ওই সময়টাতে জ্যাকসন হাইটসে এক চালু রেস্টুরেন্টে ক্যাশিয়ারের কাজ করত। মেয়ে এখন বড় হয়েছে। ওকে আফটার স্কুলে দিয়ে চার মাস হলো ফার্মেসির কাজটা নিয়েছে ও।
জন্মদিনের ঘোষণা শুনে সহকর্মীরা হাততালি দিয়ে ওঠে। ওষুধ নিতে আসা বৃদ্ধ–বৃদ্ধারা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, উম্মে।’ ওর নাম উম্মে হয়ে গেছে এই দেশে।
ম্যানেজার একটা ছোট কেক নিয়ে এলেন। উনি ওনার ডিপার্টমেন্টের সবার জন্মদিনে এটা করেন। হালিমা হাসিমুখে কেক কাটে সবার সামনে। ওর ত্রিশ বছরের জীবনে প্রথম জন্মদিনের আয়োজন। হালিমার বুকের ভেতরে কেমন যেন কেঁপে ওঠে। ওর মনে হতে থাকে—‘এটা তো আমার আসল জন্মদিন না। কেউ যদি সেটা জেনে ফেলে! তাহলে সবাই ভাববে আমি একটা প্রতারক!’
ভুল, নাকি আসলে ছিল ওটা অবহেলা! ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ওর ক্লাস টিচার হালিমার সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ লিখেছিলেন নিজের মতো করে। একই তারিখ, একই বছর—দুই বোন হালিমা ও খাদিজার জন্য। অথচ ওরা যমজ নয়।
অনেক বছর আগের একটা ভুলের জন্য গ্লানিবোধ হয় হালিমার। ভুল, নাকি আসলে ছিল ওটা অবহেলা! ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ওর ক্লাস টিচার হালিমার সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ লিখেছিলেন নিজের মতো করে। একই তারিখ, একই বছর—দুই বোন হালিমা ও খাদিজার জন্য। অথচ ওরা যমজ নয়।
ছয় বোনের মধ্যে হালিমার অবস্থান পাঁচ নম্বরে। চার নম্বরে থাকা উম্মে খাদিজা থাকে রংপুরের এক উপজেলা শহরে। ওদের দুজনের যে একই দিনে জন্মদিন, খাদিজা হয়তো ভুলে গেছে। ওখানে কেউ জন্মদিন মনে রাখে না। কেক কাটা তো অনেক পরের কথা।
খাদিজা হয়তো আজ সন্ধ্যায় রিকশা করে উপজেলা শহরের বাজারে ছিট কাপড় কিনতে গিয়েছিল। খাদিজার সারা দিন কাটে সেলাই মেশিনে কাপড় বানিয়ে। অনেক সময় ছোট বোন হালিমার জন্যও বানিয়ে পাঠায়—সালোয়ার, কামিজ, ব্লাউজ, হাতের কাজ করা নকশিকাঁথা। কত ভালোবাসা যে মাখামাখি থাকে সেই নকশিকাঁথায়, হালিমা কখনো বলতে পারেনি বোনকে।
বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে নিউইয়র্কে নিজের মিথ্যা জন্মদিনে হালিমার ঘুরেফিরে শুধু মনে হতে লাগল—যে দিনে আমার জন্ম হয়নি সেই দিনে সবাই আমাকে মনে রাখে। অথচ আমার জানা নেই কবে আমার প্রকৃত জন্মদিন!
দুপুরের শিফট শেষে হালিমা মেয়ের স্কুলের পথ ধরে। যাওয়ার আগে কাউন্টারের নিচে পড়ে থাকা কেকের টুকরাগুলো বক্সে ঢুকিয়ে নেয় মেয়েকে দেবে বলে। হাতে লেগে থাকা ফ্রস্টিং ধুয়ে ফেলে। কিন্তু মিষ্টি গন্ধটা লেগে থাকে হাতে, যেন লেগে থাকে মনের অলিগলিতে।
বাসায় ফিরে শাওয়ার নেওয়ার আয়নায় নিজের দিকে তাকায় হালিমা। মনে হয়, এই মুখটা যেন ওর নিজের না। যেমন আজকের এই মিথ্যা জন্মদিনের মতো! ওর জন্মদিন আজ নয়, তাহলে এই আয়োজন কার জন্য? কার জন্য ও কেক কেটেছে, কার জন্য গিফট পেয়েছে? যে মানুষ নিজের জন্মদিনই জানে না, সে আসলে কে?
বাথরুমের গরম পানির বাষ্পভেজা আয়নায় হাত বুলিয়ে ও নিজের নাম লেখে—‘উম্মে হালিমা’।
তারপর নিচে আবার লেখে—‘উম্মে খাদিজা’।
দুটি নাম পাশাপাশি লিখলে মনে হয়, একটি অন্যটির প্রতিবিম্ব। একজন নিউইয়র্কে, আরেকজন বাংলাদেশের এক মফস্সল শহরে। দুই বোনের জন্ম একই দিনে, অথচ ওরা যমজ নয়।
দুপুরের শিফট শেষে হালিমা মেয়ের স্কুলের পথ ধরে। কাউন্টারের নিচে পড়ে থাকা কেকের টুকরাগুলো বক্সে ঢুকিয়ে নেয় মেয়েকে দেবে বলে। হাতে লেগে থাকা ফ্রস্টিং ধুয়ে ফেলে। কিন্তু মিষ্টি গন্ধটা লেগে থাকে হাতে, লেগে থাকে মনের অলিগলিতে।
হালিমা ভাবে—শুধু জন্মতারিখ নয়, ওর পুরো জীবনটাই একটা মিথ্যা সার্টিফিকেট। অন্যের দেওয়া পরিচয়ের ভেতর ওর নিজের আসল নাম, আসল জন্মতারিখ, আসল আমি—সবকিছু হারিয়ে গেছে।
সন্ধ্যায় মেয়ে লিলার হোমওয়ার্ক শেষ হলে কেক খেতে দেয় ওকে। কেক পেয়ে লিলা খুশিতে নেচে ওঠে, ‘মা, কার জন্মদিন ছিল?’
হালিমা এড়িয়ে যাওয়া সুরে ছোট্ট করে বলে, ‘এক সহকর্মীর।’
লিলা তবু থামে না। ‘মা, তোমার জন্মদিন কবে? বলো না মা। আমি, তুমি আর বাবা—আমরা তিনজন মিলে কেক কাটব।’
হালিমা চুপ করে থাকে। ঠোঁটে হাসি, চোখে একধরনের শূন্যতা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ১২ ভাই–বোন এক হাঁড়ির ভাত ভাগ করে খেত, জন্মদিন কী জিনিস, ওদের কারও কল্পনাতেও ছিল না।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হালিমা বোনকে মেসেজ লিখতে শুরু করে—‘তোর মনে আছে, আজ আমাদের জন্মদিন ছিল। কিন্তু এটা আমাদের আসল জন্মদিন নয়…।’ এতটুকু লিখে মুছে ফেলে। মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে হালিমা। অন্ধকার ঘরে কেবল ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বাজে, যেন সময় নিজেই প্রশ্ন করছে নিজেকে।
‘তোমার জন্ম কয় তারিখে হইছিল, উম্মে হালিমা?’
হালিমা ভাবতে থাকে, ওর জন্ম হয়েছিল এমন এক দরিদ্র পরিবারে, যেখানে কারও আলাদা করে জন্মদিন ছিল না। ছিল শুধু দিন আর রাত, আর অভাবের সঙ্গে লড়াই। ১২ ভাই–বোনের মধ্যে ও ছিল মাঝামাঝি কোথাও, যেন নামহীন এক ছায়া। বড়রা মাঠে কাজ করতে যেত, ছোটরা উঠানে পা ছড়িয়ে কাঁদত, আর ও রান্নাঘরের দরজায় খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত, কথা না বললে কেউ ওকে খেয়ালই করত না।
বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রাইমারি স্কুলের পরে আর পড়াশোনা করত না। হালিমা আর খাদিজা তবু স্কুল বৃত্তি পেয়ে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছিল। হালিমার খুব ভালো লাগত বইয়ের ঘ্রাণ, কিন্তু ওর পরিবারের কাছে পড়াশোনা ছিল বিলাসিতা।
হালিমার মায়ের মুখে চিরদিন একধরনের ক্লান্তি লেগে থাকত, যেন জীবনটা সন্তান ধারণ আর ঘরকন্নার সীমাহীন কাজের মধ্যে গড়িয়ে গেছে নিঃশব্দে।
তারপর একদিন ওদের বাড়িতে একজন বয়স্ক লোক এল। ভদ্রলোকের সব চুল পাকা, বিপত্নীক, ছেলেমেয়ে সবার বিয়ে হয়ে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করার জন্য একজন স্ত্রী দরকার।
কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না হালিমাকে, শুধু বিয়েটা হয়ে গেল।
বিয়ের রাতে হালিমা বসে ছিল ঘরের কোণে, হাতে মেহেদি শুকায়নি তখনো। লোকটির বয়স ওর চেয়ে প্রায় ৩৫ বছর বেশি। তবে লোকটা সহৃদয় ছিল। নিজের বেশি বয়সের কথা ভেবে স্ত্রীকে নিউইয়র্কে একটা অ্যাডাল্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। বুড়ো বয়সে এক কন্যাসন্তানের পিতা হবার পরে বুঝলেন সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল।
ওই সন্তানই হালিমার জীবনের একমাত্র আলো, তবু আলোটা যেন দূরে কোথাও, ধোঁয়ার মধ্যে ভাসে।
ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে বড় বোন উম্মে শরিফার মোবাইল ফোনে কল করে হালিমা।
‘বুবু, তোমার কি মনে আছে যেদিন আমার জন্ম হইছিল, সেই দিনটার কথা? তুমি তো তখন বড়, তোমার তো মনে থাকার কথা!’
শরিফা ঠিক ধরতে পারে না হালিমার কী হয়েছে! মনে মনে ভাবে, বিদেশে গিয়ে ওর মন কাঁদে ভাইবোনদের জন্য। ‘তেমন কিছু মনে নাই রে হালিমা। মায়ের বছর বছর ছেলেমেয়ে হইতো, আর আমারে বাড়ির সব কাজ করতে হইত। এই জন্য মায়ের ওপর খুব রাগ হইত তখন, শুধু এটুকুই মনে আছে।’
হালিমা বলে, ‘তাও তো আমার একটা বিয়া হইছে। একটা মাইয়া হইছে, সংসার হইছে। জানেন, আমার যে উম্মে খাদিজা নামে এক বোন আছে, সার্টিফিকেটে ওর ও আমার জন্মতারিখ এক। খাদিজার তো সারা দিন কাটে সেলাই মেশিনে।’
বড় বোনের কথায় দুঃখের মধ্যেও হাসে হালিমা। তবে হাল ছাড়ে না। ‘তোমার কি কিছুই মনে পড়ে না বড় বু? আমার জন্ম কখন হয়েছিল? কোন ঋতুতে? তখন কি ধান কাটা শেষ হয়েছিল, নাকি ঘোর বর্ষায় চারদিক ডুবে গেছিল, কিছুই মনে নেই তোমার?’
শরিফা কিছু উত্তর দিতে পারে না। হালিমা একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিনের কাজ শুরু করে।
ফার্মেসিতে প্রতিদিনের মতো রোগীর লম্বা লাইন। ডাক্তার অফিস থেকে প্রেসক্রিপশন আসছে একটার পর একটা। সেই অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য ওষুধ প্যাকেট করে হালিমা। কেউ কাউন্টারে দাঁড়ালে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করে, ‘ডেট অব বার্থ?’
সবাই অনায়াসে নিজের জন্মতারিখ, মাস, বছর বলে যায়। হালিমা গভীর বিস্ময়ে সবাইকে দেখে। ওদের প্রত্যেকের একটা জন্মদিন আছে। শুধু ও জানে না ওর জন্ম কবে হয়েছিল!
বাসায় এসে হালিমা দেখে স্বামী আবদুল গফুর বাসায় ফিরেছেন পেনসিলভানিয়া থেকে। বড় মেয়ে আর নাতি–নাতনিদের দেখতে মাঝেমধ্যে সেখানে যান তিনি। সময়–সুযোগ পেলে নাতি-নাতনিদের কখনো স্কুলে, কখনো পার্কে নিয়ে যান আবদুল গফুর। কিন্তু সময় পেলেও লিলাকে স্কুলে আনা–নেওয়া করেন না তিনি। লিলা যখন প্রি–কে ক্লাসে প্রথম ভর্তি হলো, ওর ক্লাসটিচার আবদুল গফুরকে ‘গ্র্যান্ড পা’ বলে ডেকেছিল। তার পর থেকে আর লজ্জায় মেয়ের স্কুলমুখী হন না তিনি।
বিকেলে চা দেওয়ার সময় স্ত্রীর শুকনা মুখ চোখ এড়ায় না আবদুল গফুরের।
‘কী হইছে হালিমা? কাজের জায়গায় কোনো সমস্যা হইছে?’
হালিমা মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে। ‘ফার্মেসির কাজটা ভালো। কোনো সমস্যা হয় নাই। তবে একটা কারণে আপনাকে আমার ধন্যবাদ দিতেই হবে।’
হালিমা এভাবে কখনো কথা বলে না। যে কারণে আবদুল গফুর একটু অবাক হন। ‘তোমার তো আমার ওপর রাগ করার কথা! তরুণী বয়সে তোমারে একজন বাপের বয়সী লোককে বিয়া করতে হইছে!’
দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে হালিমা বলে, ‘তাও তো আমার একটা বিয়া হইছে। একটা মাইয়া হইছে, সংসার হইছে। জানেন, আমার যে উম্মে খাদিজা নামে এক বোন আছে, সার্টিফিকেটে ওর ও আমার জন্মতারিখ এক। কিন্তু আমরা যমজ না। খাদিজার তো সারা দিন কাটে সেলাই মেশিনে।’
‘তাইলে কিসের জন্য ধন্যবাদ? ফার্মেসির কাজটা নিতে বলছি এই কারণে?’
‘হ, সবকিছুর জন্য। আপনি আমারে বিয়া করছেন, আমারে এই দেশে নিয়া আসছেন, আবার পড়াশোনা করতে দিছেন। কত কিছু শিখছি আমি। এই দেশে না আইলে আমি কোনো দিনই জানতে পারতাম না, জন্মদিন বলে কিছু একটা আছে পৃথিবীতে!’
কথা বলতে বলতে টপ করে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে হালিমার গাল বেয়ে।