সক্রেটিসের মোরগ

অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে বেশ খানিকটা। সোনালি আলো পার্থেননের শুভ্র মার্বেলের স্তম্ভে বিকীর্ণ হয়ে নরম দীপ্তি ছড়াচ্ছে চারদিকে। দূরে ইজিয়ান সাগরের ঢেউ রুপালি আভা ছড়িয়ে চিকচিক করছে। দূর থেকে মনে হয় যেন সমুদ্রের বুকে চলেছে আলোছায়ার খেলা। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্রিটো কারাগারের বাইরে দাঁড়িয়ে সেসব দেখছিলেন। তিনি স্পষ্ট দেখলেন পশ্চিম প্রান্তের লাল, কমলা ও বেগুনি রঙের মিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত সৌন্দর্য ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। আলো ক্রমে ম্লান হয়ে পানির ওপর পড়েছে সূর্যের শেষ কিরণ। অ্যাক্রোপলিসের পায়ের নিচে আগোরা বাজারটির কোলাহল যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। ছায়ায় ডুবে থাকা বিস্তীর্ণ অলিভবাগানের পাতায় পাতায় ফিসফিস শব্দ শোনা যাচ্ছে—তাহলে সত্যি সত্যিই কি মহাত্মার মৃত্যুদণ্ড হতে যাচ্ছে আজ? এটা ভাবতেই ক্রিটোর কণ্ঠ বাষ্পরূদ্ধ হয়ে এল। তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন, এথেন্সের কারাগারের জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের আলোও যেন আজ ঢুকছে ধীরে ধীরে—তাহলে সূর্য কি আজ নিজেই দ্বিধায় পড়েছে? এই আলো আদৌ কি একজন মানুষের কাছে পৌঁছাবে? যিনি নিজেই পৃথিবীর জন্য আলো হয়ে উঠেছেন।

ক্রিটো কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করেই দেখলেন, পেশিবহুল পা দুটো ঝুলিয়ে পাথরের বিছানায় বসে আছেন সক্রেটিস। অদ্ভুত এক প্রশান্তির দ্যুতি ফুটে উঠেছে তাঁর মুখাবয়বজুড়ে, যা মৃত্যুর নয়; বরং জ্ঞানের স্বাদে পরিতৃপ্ত একজন মানুষের। হঠাৎ পুরোনো কাঠের দরজায় ধাতব শব্দ। ক্রিটো পেছন ফিরে দেখলেন একে একে সক্রেটিসের কয়েকজন শিষ্য প্রবেশ করছে কারাগারের ভেতর। ক্রেবিলুস, সেবেস, অ্যাপোলডোরাস। অন্য দুজন শিষ্য ফাইডো আর সিস্মিয়াস অবশ্য আগে থেকেই বসে আছেন সক্রেটিসের পাশে। ফাইডোর মুখ থমথমে, অ্যাপোলডোরাসের চোখে অশ্রু। ক্রিটো নিজের আঙুল চেপে ধরে আছেন। সক্রেটিস ক্রিটোকে বললেন, ‘আর তো বেশি সময় বাকি নেই। কোথায় তোমার যমদূত? হেমলকের পেয়ালা নিয়ে আসতে বলো তাকে।’ ক্রিটো ভারাক্রান্ত ও ঈষৎ অসন্তোষের সঙ্গে বললেন, ‘আপনি এতটা ব্যস্ত হচ্ছেন কেন মান্যবর। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড কার্যকরের নিয়ম সম্পর্কে আপনার জ্ঞান সত্যি কি আজ অন্তর্হিত হয়েছে? আচার্য, আপনার তো জানার কথা মৃত্যুদণ্ড সাধারণত কার্যকর হয় ভোররাতের দিকে। আপনার পরিবারের সঙ্গেই তো সাক্ষাৎ হলো না এখনো। তা ছাড়া মৃত্যুর আগে আপনার শেষ ইচ্ছা কী, সেটিও তো এখনো জানাননি। আপনার কি বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছা করছে?’ সক্রেটিস উদাস গলায় বললেন, ‘জ্ঞান ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো লোভনীয় জিনিস নেই, যা আমাকে আকৃষ্ট করতে পারে। তোমরা সবই জানো, তবু কেন এসব জিজ্ঞেস করছ?’

ক্রিটো বেশ ভালো করেই জানে তার গুরু পরিমিত আহারে অভ্যস্ত। যতটুকু খাবার শরীরকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন, কেবল সেটুকুই খান তিনি। অতিরিক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণকে তিনি নৈতিক দুর্বলতা মনে করেন। সক্রেটিস ক্রিটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ভাবছ ক্রিটো?’ ক্রিটো কিছুটা অপ্রস্তুত কণ্ঠে বললেন, ‘তেমন কিছু নয় আচার্য।’ ‘আমি জানি তুমি হয়তো আমার খাবারের বিষয়েই ভাবছ।’ অম্লান বদনে বললেন সক্রেটিস। তিনি আরও বললেন, ‘তোমরা তো জানোই আমার খাবারদাবার, পোশাক–পরিচ্ছেদ, চলাফেরা সবই সাধারণ। ওই ধরো বার্লি কিংবা যবের এক টুকরো রুটি, সঙ্গে কয়েকটা জলপাই, কিছু শাকসবজি। এতটুকুই আমার আহার। তবে ফলের মধ্যে ডুমুর আর আঙুর আমার বেশ পছন্দ। তবে হ্যাঁ, সবজি আমি বেশ ভালো করে ভেজে খেতে পছন্দ করি। ওটা আমার দীর্ঘদিনের ভালোলাগা। তোমরা তো জানো, গ্রিসে মাংস সাধারণত উৎসব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে খাওয়ার রেওয়াজ বেশি। এ জন্য মাংস খুব কমই খাওয়া হয় আমার।’

সক্রেটিস হাত নেড়ে স্মিত হেসে বললেন, ‘ক্রিটো, এসো আমার পাশে এসে বসো। আমি জানি, আমার এই মৃত্যুদণ্ডে তুমি ভীষণ শোকগ্রস্ত কিন্তু যে সময় আসে, তাকে ভয় পেয়ে লাভ কী, ক্রিটো? সময় তো নদীর মতো—পথ বেয়ে বহমান। প্রশ্ন হলো, নদীর জলে আমরা কী প্রতিফলন রেখে যাই।’ শিষ্যরা সব বসে পড়ল তাঁর চারপাশে। কারাগারের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে শুধু সক্রেটিসের কণ্ঠের ধীর ছন্দ। ফাইডো বলল, ‘মহর্ষি, আপনি কি সত্যিই ভয় পাচ্ছেন না?’ সক্রেটিস চিবুকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘ফাইডো, ভয় সেই জিনিস, যাকে আমরা জানি না অথচ তার ওপর ছায়া আঁকি। কিন্তু মৃত্যুকে আমি দেখি একটি নতুন ভোরের মতো; যেখানে অজানা নয়, বরং সত্যের গভীর রূপ উপস্থিত।’ অ্যাপোলডোরাস আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘আমরা আপনাকে ছাড়া কী করে চলব আচার্য? আপনি ছিলেন আমাদের চোখের আলো।’ সক্রেটিস স্নিগ্ধ স্বরে বললেন, ‘আলো কোনো এক মানুষের নয়, অ্যাপোলডোরাস। আলো জন্মায় প্রশ্নে, প্রশ্ন জন্মায় মানুষের মনে। আমি আলো নিভিয়ে যাচ্ছি না, বরং সে আলো আমি তোমাদের হৃদয়ে রেখে যাচ্ছি।’ হঠাৎ সক্রেটিস এদিক–ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, প্লেটো আর জেনোফনকে দেখছি না যে? ওরা কি কেউ আসেনি? মৃত্যুর আগে কি দেখা হবে না ওদের সঙ্গে?’

ক্রিটো ঈষৎ আফসোসের সঙ্গে বললেন, ‘শুনেছি, প্লেটো বেশ অসুস্থ। এ জন্য আসতে পারেনি আর জেনোফন যুদ্ধে গেছে মাস দুয়েক আগে।’ ‘প্লেটো কি সত্যি অসুস্থ? নাকি আমার এই মৃত্যু সে সহ্য করতে পারবে না বলে আসেনি?’ উদাস গলায় বললেন সক্রেটিস। সক্রেটিসের এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না কেউ। মুহূর্তকালের জন্য নীরব রইলেন সবাই। সক্রেটিসই নীরবতা ভাঙলেন, বললেন, ‘তোমরা শুনে অবাক হবে যে প্লেটোকে আমি যখন প্রথম দেখি, তখন তাঁর বয়স সবে কুড়ির কোঠায়। ঈষৎ লম্বাটে, হালকা গড়ন। পুরু ঠোঁটের ওপর নতুন চারাগাছের মতো গোঁফ গজিয়েছে। প্লেটো সে সময় মনেপ্রাণে কবি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, কিন্তু আমার প্রবল প্রশ্ন করার ধারায় কিংবা বলতে পারো যুক্তির ধারালো অস্ত্রে অথবা নৈতিকতার চমকপ্রদ আলোচনায় প্লেটো যেন নিজের ভেতরে আরেকটি নতুন মানুষকে আবিষ্কার করে ফেলল। কী আশ্চর্য! আজ প্লেটো কীভাবে যেন তার কলমকে আমার কণ্ঠস্বর বানিয়ে ফেলেছে। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে।

কথা বলার মধ্যেই কারাগারে ঢুকল সক্রেটিসের তিন ছেলে লামপ্রোক্লিস, সোফ্রোনিসকাস ও মেনেক্সেনাস। ওদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বাড়ির পরিচারিকা নাউসিকা। সক্রেটিসের ভার্যা জ্ঞানথিপ্পে অবশ্য আসেননি সক্রেটিসকে দেখতে। সক্রেটিস তাঁর বড় ছেলে লামপ্রোক্লিসকে বললেন, ‘তোদের মা এল না যে আমাকে দেখতে?’ মুখে কোনো কথা নেই লামপ্রোক্লিসের। মাথা নিচু করে শুধু দাঁড়িয়ে রইল সে। সক্রেটিস সকৌতুকে বললেন, ‘আমি জানতাম, ও আসবে না।’

জীবনে যে মানুষটা আমাকে স্বামী হিসেবে মেনেই নিতে পারেনি, সে কেন আসবে আমাকে দেখতে। সক্রেটিস কিছুটা সময় তাঁর ছেলেদের সঙ্গে কাটিয়ে ফিরে এসে সঙ্গীদের বললেন, ‘তোমরা একটু বসো, ততক্ষণে আমি স্নানটা সেরে আসি।’ ফাইডো চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন, ‘মান্যবর, এই অসময়ে গোসল করবেন আপনি?’ ‘হ্যাঁ, স্নানটা এখনই সেরে নিতে চাই। মৃত্যুর পর কাউকে আমি আমার শরীর ধৌত করার কষ্ট দিতে চাই না।’ স্নান সেরে সক্রেটিস মেঝেতে এসে বসলেন। তাঁকে বেশ সতেজ দেখাচ্ছে। সূর্যাস্তেরও তখন খুব বেশি বাকি নেই। সক্রেটিস ক্রিটোকে লক্ষ করে হাঁক ছাড়লেন। ‘যমদূত তাহলে এখন বিষ নিয়ে আসুক। ওটা কি প্রস্তুত হয়েছে? যদি তৈরি না হয়ে থাকে, তাহলে লোকটাকে সেটা প্রস্তুত করতে বলো জলদি।’ ক্রিটো সক্রেটিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মান্যবর, সূর্য এখনো পাহাড়ের ওপরে। তা ছাড়া আপনার মতো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লোকেরা তাদের রাতের আহার শেষ করে কিছু সময় মদ্যপানের আনন্দ উপভোগ করে। তারপর তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আনন্দঘন সময় কাটানোর পর তাদের হেমলক পানের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয়। সুতরাং তাড়াহুড়োর কিছু নেই আচার্য। এখনো ঢের সময় পড়ে আছে।’

‘তুমি যাদের কথা বলছ, তাদের জন্য সেটা স্বাভাবিক। কারণ, তারা মনে করে, সেটা তারা অর্জন করেছে এবং মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার আগে তারা আরেকটু বেশি উপভোগের মাধ্যমে জীবনকে পূর্ণ করতে চায়। তা ছাড়া দেরিতে বিষ পান করলে যে সময়টুকু পাব, সে সময়টুকুতে আমি কিছুই অর্জন করব না আর আমি যদি এখন কোনো প্রকার আমোদ–প্রমোদের সঙ্গে যুক্ত হই, তাহলে বরং নিজের সামনে আমি নিজেকেই হাস্যকর করে তুলব। আর মদ পানের কথা বললে ক্রিটো? তোমরা কি জানো না আমি কতটুকু মদ পান করি?’ শুধু ক্রিটো কেন, সক্রেটিসের সব শিষ্যই ভালো করে জানে অন্য গ্রিকদের মতো সক্রেটিসও মাঝে মাঝে মদ পান করেন বটে কিন্তু কখনোই নেশাগ্রস্ত হন না। জৌলুশের ভোজসভায় হাসির শব্দ ওঠে। শুরা ঢালা হয় পেয়ালায়, কিন্তু সক্রেটিস থাকেন পাহাড়ের মতো স্থির। নেশা তাকে কখনো ছুঁতে পারে না। কারণ তিনি নিজের জ্ঞানের আত্মমগ্নতার নেশাতেই চুর হয়ে থাকেন সর্বদা। তিনি এতটাই সংযমী যে কোনো ভোজসভাতেই তাঁকে কোনো দিন মাতাল অবস্থায় দেখা যায়নি। সে কথা অবশ্য তাঁর শিষ্য প্লেটো গর্বের সঙ্গে বলে বেড়ান সবাইকে।

ক্রিটো চোখ দিয়ে ইশারা করতেই জল্লাদ হেমলকভর্তি পেয়ালা নিয়ে উপস্থিত হলেন সক্রেটিসের সামনে। বিষভর্তি পেয়ালাটা উৎফুল্ল চিত্তে গ্রহণ করলেন সক্রেটিস। জল্লাদকে বললেন, ‘এটা পান করার কি কোনো বিশেষ নিয়ম আছে?’ জল্লাদ তাঁর স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি শুধু গিলে ফেলুন সবটুকু বিষ। তারপর হাঁটতে থাকুন যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার পা দুটো ভারী হয়ে আসে। তারপর শুয়ে পড়বেন। বিষ তার নিজের মতো করেই ক্রিয়া শুরু করবে।’

জল্লাদের হাত থেকে বিষপাত্রটি হাতে তুলে একনিশ্বাসে সবটুকু বিষ গলায় ঢেলে দিলেন সক্রেটিস। অ্যাপোলডোরাস শুরু থেকেই কাঁদছিলেন। এখন তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। ক্রিটো কাঁদতে কাঁদতে বাইরে চলে গেল। সংক্রামক ব্যাধির মতো সক্রেটিসের অন্য শিষ্যরাও সব অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। সক্রেটিস ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘হে আমার বন্ধুগণ, এটা তোমাদের কী ধরনের আচরণ। যেখানে আমি নিজেই আমার মৃত্যুর জন্য দুঃখিত নই, সেখানে তোমরা কেন এমন আহাজারি করছ? এমন একটি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আমি মহিলাদের এখানে ঘেঁষতে দিইনি। অথচ এখন দেখছি তোমরা নিজেরাই মেয়েদের মতো আচরণ করছ।’ সক্রেটিস কথা বলেছিলেন আর দ্রুত পায়চারি করছিলেন, যাতে করে বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রিটো মনে মনে ভাবলেন, জীবনে তিনি কাউকে মৃত্যুকে এমন হাসিমুখে ও সহজভাবে আলিঙ্গন করতে দেখেননি। সক্রেটিস ক্রিটোকে বললেন, ‘ক্রিটো, আমি অ্যাসক্লেপিয়াস দেবতার কাছে একটি মোরগ ঋণী। আমার মৃত্যুর পর এই ঋণটুকু তুমি তোমার নিজ দায়িত্বে শোধ করে দিয়ো ভাই।’ ক্রিটো আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘অ্যাসক্লেপিয়াস? চিকিৎসা ও আরোগ্যের দেবতা?’ সক্রেটিস পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের চিকিৎসা ও আরোগ্যের দেবতা।’ ক্রিটো ভ্রু কুচকে বললেন, ‘কিন্তু সে তো আমরা কেউ গুরুতর অসুস্থতা থেকে সেরে উঠলে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার উদ্দেশে মোরগ উৎসর্গ করি।’

সক্রেটিস শান্ত গলায় বললেন, ‘বন্ধুরা, তোমরা কি জানো না, আমরা যতক্ষণ বেঁচে থাকি, ততক্ষণ এক অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত আমরা? এই রোগের নাম—অজ্ঞতা, লোভ ও ভয়। আমাদের এই যাপিত জীবন আমাদের আত্মাকে ভারী করে রাখে, আমাদের সত্যকে অস্পষ্ট করে দেয়। ডাক্তার যখন রোগ সারায়, আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। মৃত্যু আজ আমার আত্মার ডাক্তার। সে আমার শরীরের শৃঙ্খল খুলে দিচ্ছে, আমাকে মুক্ত করছে। আমি এমন এক জগতে যাচ্ছি, যেখানে সত্য আছে, আর আমার আত্মা সেই সত্যের আলোয় স্নান করবে। অ্যাসক্লেপিয়াসকে মোরগ দেওয়া মানে ধন্যবাদ জানানো সেই চিকিৎসকের প্রতি, যিনি আমার এই দীর্ঘ রোগমুক্তির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করলেন। আমার জন্য মৃত্যু মানে রোগমুক্তি, আর আমার আত্মার জন্য নতুন ভোর।’

সক্রেটিস চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালেন, যেন অদৃশ্য কোনো ভোরের আলো দেখতে পাচ্ছেন, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না। যখন সময় আসবে, তোমরাও তোমাদের মোরগ উৎসর্গ করো।’

সক্রেটিস জল্লাদকে বললেন, ‘আমার শরীর ভারী হয়ে আসছে।’ তিনি শরীরে একটি চাদর চাপিয়ে পাথরের বিছানাটিতে শুয়ে পড়লেন। জল্লাদ সক্রেটিসের শরীরে চিমটি কেটে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মান্যবর, আপনার শরীরে কি কিছু অনুভূতি হচ্ছে?’ সক্রেটিস বললেন, ‘না, আমার শরীরের সব অনুভূতি লোপ পেয়েছে।’ তিনি তাঁর শিষ্যদের বললেন, ‘মৃত্যু যদি হয় ঘুম, তবে সে ঘুম হবে আরামের আর যদি হয় নতুন জীবন, তবে আমি সেখানে দেখা পাব হোমার, হেক্টর আর পিথাগোরাসদের।’ ধীরে ধীরে সক্রেটিসের কণ্ঠ যেন জড়িয়ে আসছিল। মৃদু শব্দে সক্রেটিস শুধু বললেন, ‘তোমরা কিন্তু মনে করে মো-র-গ-টা...।’

এরপর চোখ দুটি বন্ধ হলো। সক্রেটিসের মুখে শুধু লেগে রইল শান্তির একটুকরো স্নিগ্ধ হাসি।