চারা

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

ঘুম ভেঙে চোখ খুলেই প্রথম আপনারা কী দেখতে পান?

আমি দেখি একটা বিশাল ক্যাকটাস। বহু বছর আগে একদিন যার একটা ডাল ধুপ করে আমার মাথার ওপর এসে পড়েছিল। হাজারটা কাঁটাযুক্ত কচি সবুজ ডাল—লোকমুখে জিনের বাসা। আমার বেশ লাগে তার নির্জনতা। পুরোনো স্যাঁতসেঁতে এক বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত মাটিতে বেকায়দায় দাঁড়ায়ে থাকে সে, মরচে ধরা ঝুরঝুরে বেড়া দিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে তার সীমানা আঁকা। যার মধ্যে ক্যাকটাস বাদেও আছে একটা বন্ধ্যা কাঁঠালগাছ, নুয়ে পড়া আতাগুল্মে ঝোলানো ভাঙা দোলনা আর মাটি খুঁড়ে বসবাস করা কানকাটা নেউল। আমিও এই ইকোসিস্টেমেরই একজন, তাদের সবার সঙ্গে বসে থাকি সকাল, দুপুর অথবা রাতে। আকাশের দিকে তাকালে বুঝি না যদিও সময়টা, রাত আর দিনের পার্থক্য করতে পারি না আমি, চাঁদ আর সূর্য আমার কাছে দেখতে লাগে একই রকম।

আমার দাদি যখন প্রথম খেয়াল করে, আমি আলো-আঁধারের তফাত বুঝি না, সে খুব একটা বিচলিত হয় নাই। তার ধারণাই ছিল, অপুষ্টিভরা এই শিশু কালা-বোবা-বয়রা যেকোনো কিছু একটা হইতে পারে। তেমন না হয়ে যা আছি, তা-ই মন্দের ভালো। কেউ আমাকে বিশেষ ঘাঁটাতে আসত না। আমি একা একাই ঘুরে বেড়াতাম পাড়াময়, আর সেভাবেই একদিন আবিষ্কার করি রংচটা বাড়িটা।

সম্ভবত তখন দুপুর, কারণ গাছগুলো সব ছিল ঝিম ধরে। অধিক পেকে পচতে থাকা কোনো বুনো ফলের কড়া সুবাস অনুসরণ করে বেড়া ডিঙায়ে চলে এসেছিলাম সেই বাড়ির পেছনে। প্রথমেই আমাকে আকর্ষণ করে ডান দিকে কাত হয়ে থাকা ভাঙা দোলনাটা। পরক্ষণেই বিশাল ক্যাকটাসটার দিকে চোখ আটকে যায়—এ রকম গাছ তো আগে দেখি নাই। ক্যাকটাসটাকে ঘিরে চরকির মতো ঘুরতে থাকি আমি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা মোটা ডাল আমার ঘাড়ের ওপর পড়ে পিঠ চিরে নেমে যায়। আমি চোখ বুজে একদৌড়ে বাসায় চলে আসি।

আঘাত পাওয়ার শাস্তিস্বরূপ পরদিন সকালে আমাকে ধরে এনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে স্কুলের ভ্যানে তুলে দেওয়া হয়। বাঁহাত মাথার ওপর দিয়ে ঘুরায়ে এনে ডান কান ধরতে পারতাম না তখনো আমি। কিন্তু সব দুষ্টু বাচ্চাকেই দ্রুত স্কুলে পাঠানো দরকার—আমার দাদি বলত। আমি বিনা বাক্যে স্কুলে যাওয়া শুরু করি। আর স্কুলে গিয়ে মূলত আমি যা শিখি তা হলো, দিন-রাতের পার্থক্য করা ছাড়াও আমি আরও অনেক কিছুই বুঝি না। যেমন আমরা সবাই একই ভাষায় কথা বললেও আমি বাকি সবার কথা কম বুঝি। কারণ আমি কিছু ঠিকঠাক বুঝে ওঠার আগেই তারা নতুন কোনো বাক্যে চলে যায়। সেই শব্দের স্রোতে তালগোল পাকায়ে মাথায় চিনচিনে ব্যথা শুরু হতো। তখন শক্ত করে চোখ বুজতাম, আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা পেতাম কাঁটাযুক্ত নির্বাক কচি সবুজ গাছটার। হাত বাঁকায়ে ঘাড়ের-পিঠের ক্ষতটা ধরার চেষ্টা করতাম আমি। খসখসে স্পর্শে মনে হতো, কাঁটাগুলো আমার শরীরে বিঁধে আছে এখনো। তীব্র টান অনুভব করতাম গাছটার প্রতি, দেখে আসতে ইচ্ছে করত তাকে। স্কুল শেষে বাড়িটার আশপাশ দিয়ে ঘুরে যেতাম। কিন্তু কাছে গেলেই হাড়–জিরজিরে অজানা কিছু জেনে যাওয়ার ভয়, তাই বেড়া ডিঙায়ে অপর পাশে যাওয়া হতো না কখনোই। দূর থেকে দেখতাম, কীভাবে বাড়িটার চারপাশ ঢেকে যাচ্ছে আবর্জনায়—ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, বেলুন, অন্তর্বাস, মুরগির পা—কত কিছু। দেখতাম, যত দিন যাচ্ছে, সে পুরোনো হচ্ছে। অগোছালো, অস্পৃশ্য আর অচ্ছুত হওয়ার মধ্য দিয়ে আরও আকর্ষণীয় হচ্ছে।

জামাকাপড় পরে ফিটফাট হয়ে স্কুলে যাওয়া আর ফিরে এসে ঘরদোরের ধুলা মোছা ছিল আমার রোজকার রুটিন। এভাবেই কেটে যায় বহু সময়, আমি স্কুলের সবার চেয়ে লম্বা হয়ে যাই, মুখভর্তি দাড়ি আর লম্বা চুল আমার ঘাড়ের ক্ষত ঢেকে দেয়। আর নড়বড়ে দাঁতগুলো হারায়ে দাদি হয়ে যায় ফোকলা বুড়ি। কিন্তু এত দিন স্কুলে যাবার পরও আমি কোনো ক্লাসে পাস করতে পারি না। ঘুরেফিরে প্রতিবছর একই ক্লাসগুলো করে যেতাম আমি আর ছুটির পর আমাকে লাইব্রেরিতে বসে বাধ্যতামূলক পড়ানো হতো ব্যাকরণ বই। এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন। কিন্তু একদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে কেঁচিগেটটা ধরতেই মনে হলো, জীবনে রাতারাতি কিছু বদলে গেছে। সানসেটের ওপর বসে থাকা একদঙ্গল কাক নিঃশব্দে চেয়ে ছিল আমার দিকে। তাদের তীব্র দৃষ্টি এড়াতে দ্রুত দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকে যাই। নিত্যদিনের অর্থহীন প্রলাপের সুরটা কানে আসে না। হিমশীতল মোজাইকের মেঝে আমার পা দুটো চেপে ধরতে চায়। আমি দ্রুত বড় ঘর, পাকঘর ঘুরে বাথরুমে উঁকি দিই। দেখি, ফোকলা দাদি সেখানে মরে পড়ে আছে। বুঝতে সময় নিই আমি, কী করা উচিত? মৃতদেহকে গোসল করাবে কে, কবর দেবে কে? আমি ছাড়া দাদির আর কেউ নাই। তবে মরাবাড়ির খবর আশপাশে জানাজানি হওয়ার পর আমার এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। জানতে পারলাম, দাদির দুই ছেলে আর নাতিপুতি আছে, তারা সবাই থাকে দেশের বাইরে। মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা বাড়িতে ফিরল আর আমি জানতে পারলাম, আমি তাদের রক্তের সম্পর্কের কেউ নই।

দাদির আপনজনেরা বাড়িতে ফিরে আসার পর বাড়ি আবার রমরমা হয়ে উঠল। নানা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে দাঁড়ায়ে কয়েক দিন আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করি। তবু আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর পাই না। এই প্রথম আমার নিজের অক্ষমতা নিয়ে আফসোস হতে থাকে, অনেক চেষ্টা করেও আমি জানতে পারি না, পনেরো বছর আগে দাদি আমাকে ঠিক কোথা থেকে টোকায়ে আনে। ঘরের নতুন মানুষজনও নানা প্রশ্ন করতে থাকে আমাকে। সেই বিজবিজে গুঞ্জনের ভারে মাথার ভেতর শিরা–উপশিরা একে অপরের সাথে জট পাকায়ে যায় আমার। একদিন সবাই যখন গভীর ঘুমে, সকলকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে আর নিজেও মুক্তি পাইতে, জানালা ভেঙে পালায়ে যাই আমি। কোথায় যাব, কীভাবে যাব ভাবতে ভাবতেই চোখ বন্ধ করে দেখি, সেই ক্যাকটাস, বিশাল ডালপালা মেলে তার অকপট প্ররোচনা। এবার আর অগ্রাহ্য করতে পারি না সেই ডাক, একদৌড়ে ময়লার ঢিবি পেরোয়ে, বেড়া ভেঙে চলে আসি তার কাছে।

এর পর থেকেই আমার এখানে বসবাস। প্রথম দিকে কিছু সমস্যা হলেও, যখন বুঝে যাই, মাটি খেয়েই বেঁচে থাকা সম্ভব, জীবন সহজ হয়ে যায়। এখানকার বাকি সবার মতোই গর্ত করে নিজের একটা ঘর বানাই। সময়ের সাথে সাথে জায়গাটা এতই আরামদায়ক হয়ে ওঠে যে একবার শুইলে আর উঠতে ইচ্ছে করে না, আলস্য এসে জেঁকে ধরে।

ক্যাকটাসটা আমার অদূরেই দাঁড়ায়ে থাকে, চোখ খুললেই দেখতে পাই তাকে। তার ডালগুলো আঙুলের মতো ছায়া ফেলে আমার বুকে। নেউলরা গর্ত থেকে বের হয়ে উঁকি দিয়ে যায়। ভ্রমর, মথ আর চুনরঙা আঠালো পোকারা দেখে যায়। ধীরে ধীরে আমার শরীরের চামড়া শুকায়ে খসখসে হয়ে ওঠে। তখন তাদের সাহস বাড়ে। হাতে-পায়ে-বুকে উঠে বসে কামড়ে পোকারা আমাকে আপন করে নেয়। আমি স্থবির হই। পিঠের ক্ষতগুলোয় শিকড় জন্মেছে, সেগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকে ভূমি। আর সেই মাটির কম্পনে বিলীন হতে থাকে আমার হৃৎস্পন্দন। দীর্ঘদিনের মাথার যন্ত্রণা থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি ঘটে আমার, শান্ত হয়ে আসে শ্বাসপ্রশ্বাস। আমি বুঝতে পারি, এই বাড়ি আমাকে আপন করে নিচ্ছে অথবা এই বাড়ি চিরকাল আমারই ছিল। কখনো কাউকে কিছু বোঝাতে না পারার দুঃখটাও একদিন ঘুচে যায়, যখন বুঝি, সে আমাকে ছুঁচ্ছে, কথা বলছে, আমার শরীরে পৌঁছে গেছে তার মূল। প্রথম দিকে পিঠে সুঁইয়ের মতো খচখচ করে বিঁধত সেগুলো। ধীরে ধীরে তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেয় আমাকে আর জবাব দিয়ে যায় আমার সকল প্রশ্নের—

দাদি আমাকে ঠিক এই মাটি থেকেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এখানেই আমার জন্ম।