অদ্ভুতুড়ে গহ্বর

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আকাশ ঝলকানো লাল আলোর সঙ্গে হট্টগোল চরমে উঠল। বাজারের এক দোকানের বারান্দায় মুক্তরালী শুয়ে ছিল ত্রিপল বিছিয়ে। রাস্তার উল্টো পাশে দোকানের শাটারে হেলান দিয়ে হাতকাটা পাগলি হিন্দি গানের সুর ভাঁজে—জিন্দেগি পিয়ার কা গীত হ্যায়...। এখন সে প্রায়ই রাত জাগে, এক হাত কাটা, অন্য হাত দিয়ে সে আকাশের দিকে মাঝেমধ্যেই ইঙ্গিত করে। যুবতী পাগলি কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়। তবে দিনের বেলায় বয়োজ্যেষ্ঠরা এদিক দিয়ে গেলে বেজান গাল পাড়ে। তবু সে কিছুতেই গায়ের ঊর্ধ্বাংশে কাপড় জড়াবে না। একে সরাতেও পারে না কেউ, জোর করে স্থানান্তর করতে চাইলে শুয়ে পড়ে।

মুক্তরালী দেখে লাল আলোটা এক পাশ দিয়ে পাগলিকে আলোকিত করছে। ঝলকানো আলোয় মানবী মূর্তির যৌবন ফুটে ওঠে। মুক্তরালী একধরনের প্রশান্তি পেলেও আগুনের ঝাঁজও পায়। এখন লিকলিকে জিহ্বা অনেকটাই আকাশ স্পর্শ করতে চায়। সবাই সেই দিকেই দৌড়াচ্ছে।

দাউ দাউ জ্বলে ওঠা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হলো কয়েকটি দোকান। একটি বইয়ের দোকানে এখন আগুন জ্বলছে। রাতের আড়মোড়া ভেঙে কিছু লোক এসে জড়ো হয়েছে। সবারই নিজেদের চেহারা হাজার উদয়োন্মুখ সূর্যের নিচে আছে বলে মনে হলো, পুবের মথুরাপুর থেকে একদল লোক এসে জড়ো হয়েছে। একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে পাগলি হিন্দি গানের সুর ভেঁজে যায় আর চিৎকার করে বলে—হেল কুড়িগাই, ভাগলপুর যাই! কুকুরের ডাক তখন সপ্তমে পৌঁছায়। এটির পাশেই একটি নেড়ি কুত্তা, অত ডাকতে পারে না, গলায় জোর কম। গায়ের লোম উঠে গেছে। লোকজন বলে, এ হলো মিষ্টি-মিঠাই-বিস্কুট খাওয়ার ফল। সারা দিনের পুরি, শিঙাড়া, জিলাপি, বুন্দিয়া যে বিক্রি হয়েছিল প্লাস্টিকের ওপরে নিউজপ্রিন্ট কাগজ রেখে, সেসব ব্যবহৃত কাগজ দোকানগুলোর বারান্দা ও নর্দমার কংক্রিটের ঢাকনার ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে আছে।

কুকুরটির ডাকে বিরক্ত হয়ে একজন এটিকে তাড়াতে চায়। কিন্তু কুকুরটি যেন বলতে চাইছে, এ আগুন রেখে আমি চলে যাব কেন? আর একজন লোকটির দিকে তেড়ে আসে, ‘এই মিয়া কুত্তারে বকেন ক্যারে। এরা মাইনষের চাইতে ভালা, মইরে দেহেন, পালা কুত্তা থাকলে আপনের কবরের ওপরে বইয়া সারা রাইত কানব।’ লোকটি চুপ হয়ে যায়।

মাজারের বারিন্দায় এই পাগলির অনেক দিন কাটছিল। বার্ষিক ওরশ-মেলার সময় পুলাপান পাগলিরে উত্ত্যক্ত করত। শেষ পর্যন্ত লুকজন তারে তাড়াইতে বাধ্য হয়। সে মাইঝরাইতে মাজারের বারিন্দায় গান ধরত, কিন্তু পবিত্র জায়গায় তো বেপর্দা মানুষের স্থান হইতে পারে না।

তখন কেউ কেউ চলে যাচ্ছে। হাতকাটা পাগলি আবার বলল—হেল কুড়িগাই, ভাগলপুর যাই! মজুরিখাটা মুক্তরালী কিছুই বলল না। যখন তার কাজ থাকে না, সে ভবঘুরের মতো এদিক–সেদিক যায়। মথুরাপুর থেকে আসা লোকগুলো আগুন নেভানোর জন্য পানি মারতে থাকে। কেউ কেউ বিশাল একেকটা কলাগাছ এনে ছেড়ে দেয় আগুনের ওপর। তারা কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে কিছু বালুও এনেছে, রাতে কে এসবের খবর রাখে। এখানে দমকল বাহিনীকে খবর দেবে কে? একজন চেষ্টা করেও পায়নি। বাজার পাহারার লোকগুলো আসতে আসতেই বড় একটা সর্বনাশ হয়ে যায়। ক্রমে আগুন নির্বাপিত হয়ে আসে। পাগলি তখন বলে—হেল কুড়িগাই, আগুন আর নাই! অগ্নিসংযোগকারীরা বীরদর্পে স্থান ত্যাগ করে।

চারপাশ নীরব হয়ে এলে একজন বলে, আইচ্ছা ভাই, পাগলি ‘কুড়িগাই কুড়িগাই’ করে ক্যারে?

বুঝলা না, কুড়িগাই-এর শাহ্ শামসুদ্দিন আউলিয়ার মাজারের বারিন্দায় এই পাগলির অনেক দিন কাটছিল। বার্ষিক ওরশ-মেলার সময় পুলাপান পাগলিরে উত্ত্যক্ত করত। শেষ পর্যন্ত লুকজন তারে তাড়াইতে বাধ্য হয়। সে মাইঝরাইতে মাজারের বারিন্দায় গান ধরত, কিন্তু পবিত্র জায়গায় তো বেপর্দা মানুষের স্থান হইতে পারে না। তাড়াইয়া দিলে চইলা আসে আমরার এলাকায়। এইবার সেই ভাগলপুরের দরগা। চান্নি পশর রাইতে তারে নাহি দেহা যায় গুড়ইয়ের বটগাছের ঢালুতে, সেইখানেও একই কথা কয়। শালার পাগলি, দিনে কাপড় পরে না, রাইতে সাদা কাপড় জড়াইয়া লুকজনরে ভূতের ভয় দেহায়।

আইচ্ছা বুঝছি, পাগলির কথা বাদ দেও। কও দেহি এই পুলাপান আগুন দিল ক্যারে?

কুনু কারণ নাই। তারা হয়তো ভাবছে, আইজকার দিনে এইডাই ঠিক কাম।

আরে একটা পুলারে তো চিনছিরে ভাই! এক বছর আগে আশরাফুন্নেসা হাইস্কুলের হেড ম্যাডামরে কইছিল, ম্যাডাম পদত্যাগ করেন। সেই কী জুরাজুরি, ম্যাডাম কি আর রাজি অয়? শেষে ম্যাডামের জন্য চা আনল, নাশতা আনল। বলল যে, ম্যাডাম চা-নাশতা খান আর ধীরেসুস্থে সাইন করেন। একটা ছেলে আছিল বেয়াদব, সে কইল—ম্যাডাম আপনার জন্য সুন্দর একটা কলম আনছি, এইডা দিয়া সাইন করেন, আরাম পাইবেন।

ম্যাডাম কি রাজি হইছিল?

তা জানি না, রাজি না হইয়া উপায় কী? তার বেজার চেহারা দেইখা চইলা আসি। ক্যাডা কথা কইব এইগুলার লগে?

সেই কী জুরাজুরি, ম্যাডাম কি আর রাজি অয়? শেষে ম্যাডামের জন্য চা আনল, নাশতা আনল। বলল যে, ম্যাডাম চা-নাশতা খান আর ধীরেসুস্থে সাইন করেন। একটা ছেলে আছিল বেয়াদব, সে কইল—ম্যাডাম আপনার জন্য সুন্দর একটা কলম আনছি, এইডা দিয়া সাইন করেন, আরাম পাইবেন।

পোড়া গন্ধে মুক্তরালী অভ্যস্ত। তাই এর আশপাশেই শেষ রাতে ঘুমাতে তার অসুবিধে হয়নি। সূর্য ওঠার পর লোকজনের সরগরমে মুক্তরালীর ঘুম ভাঙে। ওরা বলছে, আরে কুলাঙ্গারের দল, তোরা বই পুড়াইলি! না পুড়াইয়া লুট কইরা বাড়িতে নিয়া পড়লে তো কিছু জ্ঞানগরিমা হইত।

ঠিক কইছেন আঙ্কেল, তবে যে কয়টা আগুনের হাত থাইকা বাঁচছিল, সেইগুলা নষ্ট হইছে পানিতে। বই আর বাঁচল না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসে দোকানগুলোর চারপাশ চওড়া টেপ দিয়ে ঘেরাও দেয়। একজন বাহিনী সদস্য খুব দ্রুতলয়ে কিছু বলে নির্দেশনা দিচ্ছেন। অন্যরা তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছে। পাশের আগুনবাঁচা দোকানের লোকজনও গলা বাড়িয়ে শুনছে। কেউ কেউ বের হয়ে এসেছে একটি খাবারের দোকান থেকে। বাহিনী সদস্যটি বললেন, একটু পানি খাওয়া দরকার। খাবারের দোকানের লোকটি ‘আনছি স্যার’ বলে ঘরে ঢুকবার আগেই তিনি কোনো এনজিওপ্রদত্ত পাশের ‘ড্রিংকিং ওয়াটার’ লেখা টেপ থেকে হাতেই দুই আঁজলা পানি পান করে দ্রুত কেটে পড়লেন। তার তর সইছে না, খুবই ব্যস্ত তিনি। কিন্তু ঝকঝকে ধোয়া গ্লাসে পানি নিয়ে এসে কর্মচারীটি মর্মাহত হলো, পুলিশকে খাওয়াতে না পেরে।

মুক্তরালী সব শুনেবুঝে এবং রাতের স্মৃতিতে বিবমিষা অনুভব করে। সে চন্দ্রাহতের মতো নিজ গ্রামের দিকে হাঁটা ধরে। মনে হচ্ছে মতিভ্রম, তাকে কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অথবা গ্রামে যে জিন আনায়নের জন্যমোরাকাবা বসানো হতো, সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এটির তুলনা হতে পারে। জিনসাধক কামেল মানুষটি মোরাকাবায় বসা লোকটির কাছ থেকে অনেক কথা আদায় করে নিত কিংবা তিনি যা বলতেন আসরলাগা লোকটি তা-ই বলত। একধরনের সওয়াল-জওয়াব।

বলো তো শুনি, এই রোগ তাড়াইবার জন্য কি তাবিজ লাগবে? জিন বলত, তাবিজ তো লাগবই। নদীর তিন মোহনার স্রোতের পানিতে অষ্টধাতুর পড়া তাবিজ ভাসাইয়া দেওয়া লাগব। এই রকমই কেউ যেন তাকে কিছু বলছে আর মুক্তরালী অনবরত পা চালিয়ে যাচ্ছে। তার একটি গন্তব্য দরকার। সে যেন তার ছায়াটি দেখতে পাচ্ছে না। তার ছায়াহীন কায়াটি অনবরত হেঁটেই চলেছে। অবারিত ঘন সবুজের হাতছানি তার গতিকে আরও চলিষ্ণু করে। গ্রামে পৌঁছে সে একটি বেতঝোপের ফাঁকে শরীর ঢুকিয়ে দেয়। সে হয়তো ভেবেছিল এখানে ঝোলানো আছে সবুজ রঙের সুশোভিত ঝালর। সঙ্গে নুয়ে পড়া হিজলের লালরঙা ঝালরও পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ছিল। তার পায়ের নিচের মাটি নরম নরম ঠেকে। সে বের হতে চাইলে বেতকাঁটা গায়ে জড়িয়ে যায়। একবার হামাগুড়ি দিয়ে হাতের আঙুল কণ্টকবিদ্ধ করে করে বেতসলতা সরিয়ে বের হতে চাইলে একটি দাঁড়াশ সাপ তাকে পেঁচিয়ে ধরে। সাপটি চাপ দিতে থাকলে সে কিছুটা ভয় পেলেও বোঝে যে এটি কামড় দেবে না, কামড় দিলেও বিষ না-ও ছড়াতে পারে। মুক্তরালী সবই বোঝে, কিন্তু কিছু করতে পারে না। নাকি কেউ করতে দেয় না? এখন যেমন বুঝছে যে দাঁড়াশ সাপের শক্তি অনেক, কিন্তু এই শক্তি কোনো কামের না। এরই মধ্যে সাপটি গলা বাড়িয়ে একটি ইঁদুর খপ করে ধরে গিলে ফেলে। কিন্তু মুক্তরালীকে দাঁড়াশ ছাড়ে না। এখন তার কত কথাই মনে পড়ছে। মনে পড়ছে দাঁড়াশ সাপের যুদ্ধনাচের দৃশ্য। মিয়াবাড়ির উঠানে বেদেরা দেখিয়েছিল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সাপের লড়াই। এরা পরস্পর দেহের অর্ধেক রশির মতো পেঁচিয়ে মাটিতে দৈহিক কসরত দেখায়। সে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ভাবে, অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল। এখন তার বের হওয়া দরকার, যদিও কখন পারবে, তা সে জানে না। সে এ–ও জানে না, এই রকম গুহায় আরও কোনো মানুষ আটকে আছে কি না। এই সাধারণ মানুষটি বংশের অতীত জানে ভালোই। দাদার আমলটা বেশ জমকালো ছিল। এখন গনি মিয়ার তত্ত্বাবধানে তৈরি গম্বুজওয়ালা যে মসজিদটা দাঁড়িয়ে আছে, সেই মসজিদ মুক্তরালীর দাদার দান করা জায়গায় নির্মিত। সে শুনেছে, তার দাদা টাকার মধ্যে তামাকের গুঁড়া গুঁজে দিয়ে বিড়ি বানিয়ে টানত। সেসব এখন সাপের পেঁচানো সময়ের মতো অলীক শোনায়।

সে বুঝতে পারছে না সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, নাকি মেঘ ঢেকেছে আকাশ। বেতের ঝোপের ভেতরে হিসহিসে বাতাসের শব্দ, পাতা ও কাঁটার কম্পন দেখে-শুনে মনে হলো একপাল বিচ্ছৃঙ্খল জনতার পদধ্বনি। ঝোপের ফাঁক গলিয়ে বিশাল একেকটি আগ্রাসী কচুরিপানার বেগুনি ফুল তার চোখে বুলিয়ে যাচ্ছে প্রশান্তির ছোঁয়া।

ঝোপটার পেছনেই যে উঁচু বাড়িটি, তা থেকে ভেসে আসছে বাজখাঁই এক কণ্ঠস্বর। গেরস্ত রমণীটি হয়তো রান্নাবাড়ার আয়োজনে ব্যস্ত। সে বোধ হয় এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছে, আর কাউকে কাউকে এটা–সেটা বলছে। আর একজন আরও উচ্চ স্বরে বলছে, এই ছেড়ি তরে কইলাম জ্বালডা চালু রাখ, আর তুই দৌড় দে গেলি গাছের তলে তেঁতই টুহাইতে। তাড়াতাড়ি ঘরে আয়! মুহূর্তেই এসবকে ছাড়িয়ে যায় কতকগুলো কণ্ঠের সমস্বর। মুক্তরালীর মনে হচ্ছে, সবাই একসাথে কথা বলছে, কেউ কারও কথা শুনছে না। আগে কি মানুষ এইভাবে একসাথে কথা বলে উঠত?

ঝোপের মধ্যে বেতের শিষ ছাড়িয়ে একধরনের ছোট্ট বুনো ফল দেখে তার হাতকাটা পাগলির স্তনবৃন্তের কথা মনে পড়ে, কোনো গানের কলি যদিও এখন মনে নেই। এই ঝোপের বহিরাংশের জারমনিঠাসা দিঘল অংশটিতে একসময় যে কীভাবে কচ্ছপশিকারি এসে শক্ত তিনকাঁটা দিয়ে কচ্ছপ ধরত, তা–ও এখন মনে পড়ছে। এই কচ্ছপ বা কাছিম শিকারির সাথে তার একটা ভাব জমে গিয়েছিল। শিকারি প্রতিবছর শীতের আগে আগে আসত নিয়মিত। তার পেছনে একটি জালের থলে ঝোলানো থাকত। গ্রামবাসী তাকে ডাকত কাছিম ভাই। এ কাছিম ভাই-ই ক্রমে হয়ে যায় ‘কাছুম ভাই’। তখন ছেলেছোকরা এসে ভিড় করত। তার অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে কাছুম বলত, মুক্তর তুই দেহি কিছুই জানস্ না। কাছিমধরা লোকটি অবশেষে চুপ হয়ে একাগ্রচিত্তে নরম মাটিতে লোহার তিনকাঁটাটি অনবরত খুঁচিয়ে যেত এবং উঠিয়ে আনত পিঠে বিদ্ধ ছোটবড় কাট্টা-কাছিম। ওরা কেবল অবাক বিস্ময়ে দেখত, কীভাবে তার পিঠের জালের থলেটি ভরে উঠছে। এখানে একসময় একদল শৌখিন শিকারি ফাঁদ পেতে হলদে পায়া ডাহুকও ধরত। এখন কেউ পাখি ধরে না। মুক্তরালীর চোখের সামনের পুকুরপাড়ের গর্ত থেকে এখনই একটি বাহারি রঙের মাছরাঙা বের হয়ে গেল। নিশ্চয় ডিমে তা দিচ্ছিল। মাটি-জঙ্গল-পগারের ভৌত পরিবর্তনের কারণে কাছিম উধাও। আর থাকবেই–বা কেমনে? তারা তো নিজ চোখেই দেখেছে কাছুম ভাই কীভাবে তার পিঠের জালটি পূর্ণ হয়ে গেলে সহকারী বালকটির হাতে এটি দিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় জালথলেটি পিঠে স্থাপন করে নিত।

এখন সে কাছুম ভাইয়ের আগমনের প্রত্যাশা করছে, যে এসে তাকে উদ্ধার করতে পারে। শিকারিই আরেক শিকারিকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। দাঁড়াশ সাপ নিশ্চয় শিকারি দেখলেই মাথা নুইয়ে দেবে। এই কাঁটা আর দাঁড়াশের প্যাঁচ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কীভাবে বের হয়ে আসবে, এটি সে এখন একাগ্র মনেই ভাবে। এরই মধ্যে অকস্মাৎই বাতাবরণ অন্ধকার হয়ে এল। সে বুঝতে পারছে না সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, নাকি মেঘ ঢেকেছে আকাশ। বেতের ঝোপের ভেতরে হিসহিসে বাতাসের শব্দ, পাতা ও কাঁটার কম্পন দেখে-শুনে মনে হলো একপাল বিচ্ছৃঙ্খল জনতার পদধ্বনি। ঝোপের ফাঁক গলিয়ে বিশাল একেকটি আগ্রাসী কচুরিপানার বেগুনি ফুল তার চোখে বুলিয়ে যাচ্ছে প্রশান্তির ছোঁয়া। এ-ই একমাত্র স্বস্তি। এ ভয়াল অদ্ভুত বিবর থেকে বের হয়েই সে কচুরিপানার ক’ বোঝা উপড়ে তুলে পাড়ার লাউগাছগুলোর গোড়ায় ছড়িয়ে দেবে। তলিয়ে যাওয়ার আগে এ যেন অন্যের জন্য তার কিছু করে যাওয়ার ভাবনা। মুক্তরালীর বিক্ষিপ্ত ভাবনা এখন দিগন্তের বাতাসের ঢেউখেলানো ধানপাতার উঁচু–নিচু। এরই মধ্যে তার মনে হলো একটিমাত্র ইঁদুর ভক্ষণের সন্তুষ্টিতে দাঁড়াশ সাপটি ঘুমিয়ে পড়েছে।