মুনীর চৌধুরীর অগ্রন্থিত গল্প
শবে বরাত
বাংলাদেশে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-৭১) স্বনামেই খ্যাত। মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে যে কয়েকজন সৃজনশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানপন্থী ঘাতকদের নির্মমতায় শহীদ হন, তিনি তাঁদের অন্যতম। স্বাধীনতার পর আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি তাঁর রচনাবলি চার খণ্ডে প্রকাশ করে। এতে সাতটি গল্প স্থান পায়— ‘নগ্ন পা’, ‘ফিডিং বোতল’, ‘বাবা ফেকু’, ‘ল্যান্টার দেশে’, ‘খড়ম’, ‘একটি তালাকের কাহিনী’ এবং ‘মানুষের জন্য’।
সম্পাদক ভূমিকায় জানিয়েছিলেন, ‘যত দূর সম্ভব অনুসন্ধান করে তাঁর রচনা সংগ্রহ করেছি।’ তবে একটি বাক্যে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন, ‘এর বাইরেও হয়তো কিছু রচনা রয়ে গেছে।’
এই মন্তব্য যথার্থ ছিল। প্রকৃতই তাঁর কিছু রচনা এখনো অসংগৃহীত রয়ে গেছে। ‘হালুম’ নামের একটি গল্প প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে আগেই প্রকাশ করা হয়েছিল।
‘শবে বরাত’ নামেও তাঁর একটি গল্প সীমান্ত পত্রিকায় পাওয়া যায়। এটি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর/ কার্তিক ১৩৫৪-তে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য একটি সাহিত্য পত্রিকা। বেরিয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে ভাষাসৈনিক মাহবুব-উল আলম চৌধুরীর সম্পাদনায়। কৃষ্টি নামের অপর একটি প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকাও একই সময়ে বেরিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে।
কৃষ্টির প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল সাতচল্লিশের আগস্টে পাকিস্তান সৃষ্টির দুই মাস পর ১৩৫৪ সনের কার্তিক মাসে। প্রথম বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ দুই সংখ্যায় দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয় তখনকার প্রতিভাবান সাহিত্যিক মুনীর চৌধুরীর আধুনিক ভাবধারার গল্প ‘শবে বরাত’। কিন্তু বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর রচনাবলি প্রকাশের সময় সীমান্তর সংখ্যাগুলো ছিল অনাবিষ্কৃত। পরবর্তীকালে কিছু কপি পাওয়া গেলে তাতে মেলে তাঁর ‘শবে বরাত’-এর প্রথম কিস্তি। তবে দ্বিতীয় কিস্তি উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে পাক্কা ৩০টি বছর। ‘শবে বরাত’-এর দ্বিতীয় কিস্তিসম্বলিত সীমান্তর ওই সংখ্যাটি সম্প্রতি হস্তগত হওয়ায় এখন গল্পটি পুরো পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যচর্চার প্রথম যুগ কাটে কমিউনিস্ট আদর্শের রচনা লিখে। আমরা জানি, তিনি ১৯৪৩ সালে ঢাকায় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে’ যোগ দেন। ওই সময়ে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বয়স ২০ বছর পূর্ণ হয়নি। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের স্নাতক ও ১৯৪৭ সালে এমএ পাস করে ১৯৪৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এ সময়ের ভাবনাচিন্তাসম্বলিত ‘শবে বরাত’ গল্পটি ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে রচিত বলে ধারণা করা যায়। এর নায়ক আশরাফ বাংলাদেশের বাইরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র এবং ইংরেজি সাহিত্যের নিমগ্ন পাঠক। পড়ার সময় মনে হবে গল্পে লেখকের জীবন প্রতিফলিত হয়েছে।
● সংগ্রহ ও ভূমিকা : ইসরাইল খান
আশরাফ অ্যারিস্টোফেনিসের ‘ফ্রগস’ পড়ছিল। হঠাৎ নীল পর্দার মেঘ সরিয়ে ঘরে ঢুকল ভাবি। আশরাফকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওর চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেলল। তারপর সুডোল বাহুর মৃদু আকর্ষণে দিল তাকে দাঁড় করিয়ে। হাতের বইটা খোলা ব্যাঙের মতো থপ করে চ্যাপটে পড়ে রইল সোফার ওপর।
একটু অপ্রস্তুত হয়ে আশরাফ জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপার কী?’
ভাবি নির্বাক। ধীরে ধীরে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে প্রথমে একটা পাউডার পাফ বের করল। সেটা দিয়ে আশরাফের মুখে দুটো মৃদু আঁচড় দিয়ে, হাতে নিল একটা ক্ষুদ্র-সূক্ষ্ম চিরুনি। তারপর তার রুক্ষ এলোমেলো চুলগুলোকে আঁচড়ে, টিপে ওকে যেন একটু ভদ্রগোছের করে তুলবার চেষ্টা চলল কিছুক্ষণ, এ অসহ্য প্রক্রিয়ার অত্যাচারে ওর মনটা খিঁচড়ে গেল। মাথার তন্ত্রীর মাঝে তখনো ওর তাজা ইউরিপিউডস-স্কাইলাসের যুদ্ধদেহী মূর্তি। ভাবি কিন্তু এদিকে নীরবে ওর মুখের অংশে সভ্য সমাজের যতখানি মাখামাখি চলে করল। তারপর নিঃশব্দ পদবিক্ষেপে আলনা পর্যন্ত এগিয়ে গেল। সেখান থেকে আশরাফেরই শেরওয়ানি আর পায়জামা তুলে নিয়ে ওর অসাড় হাতে গুঁজে দিল।
‘চট করে লক্ষ্মী ছেলের মতন এগুলো পরে নাও তো—আমি এখুনি আসছি’। বিরক্তিতে আশরাফ তখন প্রায় অপ্রকৃতিস্থ। বাধা দিয়ে বলল, ‘মতলবটা কী বলো তো?’
‘তোমায় একটু সভ্যতরো করে তোলা।’
‘ঠাট্টা রাখো, এ আমি পছন্দ করি না। দেখলে পড়ছিলাম, তবুও খামোকা খানিকটা মেয়েলি রসিকতা করে দিলে সমস্ত আবেষ্টনীটাকে পণ্ড করে।’
‘বিকেল ছটা কখনো পড়াশোনার সময় নয়।’
‘মাঠে গিয়ে বলীবর্দের মতন দৌড়াতে হবে?’
‘ঠিক মাঠ নয়, তবে নদীর পাড় অবধি নিশ্চয়। হ্যাঁ দৌড়োদৌড়ি অবশ্য নয়, শুধু কিছুক্ষণ মার্জিত পায়চারি। আর মাঝে মাঝে আমাদের মতো সুজনের দর্শন পেলে নিষ্পলক নেত্রে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে জন্ম সার্থক করবি। খোটার দেশে তো আর তোদের সে সৌভাগ্য কখনো হয় না।’
বাঁধভাঙ্গা হাসির তোড়ে ভাবির সুগঠিত দেহ এত বেশি ফুলে ফুলে দুলে উঠল যে অল্প সময়ের জন্য কথার দুয়োর রুদ্ধ হয়ে রইল। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘সত্যি আশি, তুই হলি কী? পরীক্ষার তো এখনো অনেক দেরি, তবু কেন ওই সব পুরোনো বইয়ের কালো কালো অক্ষরগুলোকে তোর রক্তকে অমন করে শুষতে দিস? চশমার কাচ দুইঞ্চিতে ঠেকল, বুকের মাপ ঊনত্রিশ ইঞ্চিতে পৌঁছল বলে— তবুও তুই যে কী ছাই ভস্ম তৃপ্তি পাস ওই বইগুলোর ভেতর। আর পড়িসই-বা তুই কী করতে, স্মরণশক্তি বলেও কি তোর কিছু আছে নাকি?’
এবার আশরাফ সত্যিই ঘাবড়ে গেল। ওর মনে হলো, তাই তো কয়েক দিন ধরে কেমন যেন একটা ডাল-মেমোরি মতন অনুভব করছিল ও। তাহলে কি আলিগড়ে ভেড়ার গোশত খেতে খেতে স্মরণশক্তির কোষটায় চর্বি জমে গেছে? না, বিএ পাস করার পর জায়গাটা ও ছেড়েই দেবে। ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমার স্মরণশক্তি যে দুর্বল, তার প্রমাণ তুমি কী করে পেলে?’
‘বাহ্ কাল যে দিব্যি কথা দিয়েছিলি আমাকে নিয়ে তুই স্টিমার ঘাটে যাবি!’
‘কেন ইলোপ করতে?’
‘বে-তমিজ! এ-ও মনে নেই যে তোর খালাম্মা তারা আজ আসছেন?’
না হেসে আশরাফ আর পারে না। ছি ছি কী পাগলামি! খালাম্মা তারা যে আজ আসবেন, এ কথা মনে নেই বলেই নাকি তৎক্ষণাৎ প্রমাণিত হয়ে গেল যে তার স্মরণশক্তি অস্বাভাবিক রকম দুর্বল! আর তাই অডিপাস-অ্যান্ডারসন নিয়ে নাড়াচাড়া করা তার পক্ষে কেবল নির্বুদ্ধিতার পরিচয়! এমন সময়ে আশরাফের সাত বছরের বোন টুনি ফ্রক, জুতো ইত্যাদি পরিহিত অবস্থায় ঘরে ঢুকে হঠাৎ আশরাফকে দেখেই একটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠল। তারপর রীতিমতো বৃদ্ধা অভিভাবিকার মতো সোফায় ধাপ করে বসে পড়ে দুগালে হাত দিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাসসহ উচ্চারণ করল।
‘ওমা! আশি ভাই এখন পর্যন্ত তুমি কাপড়ও পরোনি?’
আশরাফের মনে হলো সে যেন এতক্ষণ উলঙ্গ হয়ে বসে ছিল।
আর টিকতে পারল না। গ্রিক নাট্যকারের সমস্ত প্রলোভন ত্যাগ করে ওকে উঠতেই হলো।
বারান্দায় আসতেই একটা বিশ্রী ভুরভুরে গন্ধ নাকে গেল। ওপরের দিকে চেয়ে আশরাফ বুঝল গন্ধ আসছে পাকের ঘর থেকে। আম্মাজান বোধ হয় তাঁর আগতপ্রায় বোনের জন্যই এ অসময়েও পাকের ঘরের গরম আঁচে ঘেমে উঠেছেন। আশরাফের নাকটা কুঁচকে ওঠে। কী কুৎসিত কটা গন্ধ—দারুচিনি আর ঘিয়ে ভাজা পেঁয়াজ আর পেস্তাবাদাম।
বাঁধভাঙ্গা হাসির তোড়ে ভাবির সুগঠিত দেহ এত বেশি ফুলে ফুলে দুলে উঠল যে অল্প সময়ের জন্য কথার দুয়োর রুদ্ধ হয়ে রইল। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘সত্যি আশি, তুই হলি কী? পরীক্ষার তো এখনো অনেক দেরি, তবু কেন ওই সব পুরোনো বইয়ের কালো কালো অক্ষরগুলোকে তোর রক্তকে অমন করে শুষতে দিস?
সবাই এসে গাড়িতে ওঠে। আশরাফ এসে স্টিয়ারিংটা আলগোছে ধরে বসল। আরেকবার নাকটা ছিটকাল। নাহ্, পাকঘরটা কী নুইসেন্স! পুরোনো প্যাটার্নের ব্যুইক গাড়িটা যেন একটু রেগেই ঘর্ঘর করতে লাগল। ক্ল্যাচ টেপ অবস্থাতেই অ্যাক্সিলারেটরে জোরে চাপ দিল আশরাফ। খানিকটা পোড়া স্পিরিট আর মোবিলের গন্ধে বাতাস ভরে উঠল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল আশরাফ। আহ্!—যাক এতক্ষণে তবুও ওই নোংরা পাকের ঘরের স্মৃতি থেকে বাঁচা গেল!
দূরে ঢাকা মেলের বাঁশি কেঁপে কেঁপে বাজতে থাকে। জর্ডন কোয়ার্টার পেরিয়ে ওরাও তখন স্টিমার ঘাটে প্রায় পৌঁছল বলে।
স্টিমার এল।
কড়া এসেন্সের গন্ধ পেয়ে আশরাফ চোখ তুলতেই দেখে ভাবি তার রুমাল নাড়ছে।
প্রথম শ্রেণির রেলিং ঘেঁষে আক্রাম ভাই স্মিতমুখে ভাবিকে সম্বর্ধনা জানাল। ওহ্! ভাবির অত্যধিক আগ্রহের একটা হদিস তবু এতক্ষণে পাওয়া গেল!
সিঁড়ি বেয়ে ওরা নেমে আসছে।
কিন্তু আক্রাম ভাইয়ের পাশে ওটা কে? সাঙ্গানু-সাথী? মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত শীর্ণ হয়ে নেমেছে সিল্কের বোরখাটা, তারপর হঠাৎ কুঁচি দিয়ে ফুলে উঠেছে পা অবধি। বিসর্পিল ঢেউখেলানো সীমারেখার নিচে, স্বচ্ছ ভেনিসিয়ান স্যান্ডেলে জড়ানো শুভ্র একবিন্দু তুলতুলে পা। মাংস আর সিল্কে মিলে হেলেনের প্রশ্নবোধক চিহ্নটা তীক্ষ্ণ বর্শার মতো এসে বিদ্ধ হলো রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডে। সুপ্তোত্থিত দানবের মতো গৃধিনী উচ্চে হাই তুলল হাংগ্রিল ক্ষুধা।
ভাবি একটা আঙুলে গুঁতো দিয়ে আস্তে আস্তে বলল, ‘ভাবছিস উলস্টেডের স্ট্রাইপ দেওয়া স্যুটটা পরে এলেই ভালো করতি না?’
রক্তিম হয়ে ভীরু কণ্ঠে শোধরাবার চেষ্টায় আশরাফ বলল, ‘কী যে বলো—তিন বছর পরে দেখছি, তা-ও একটু উদগ্রীব হব না? তোমার পাপ মন কি না তাই ওসব ভাবো।’
‘বুঝেছি গো বুঝেছি। আর বলতে হবে না।’
মুচকি হাসিতে লতিয়ে উঠল ভাবি।
দুই
সকাল আটটা।
কবিতায় নিট্শীয় দর্শনবাদ খুঁজতে খুঁজতে আশরাফ চায়ের জন্য অপেক্ষা করছিল।
পর্দার ওপাশ থেকে স্যান্ডেলের আওয়াজ ভেসে এল। আশরাফ বুঝল ভাবি চা নিয়ে আসছেন। আরও গম্ভীর হয়ে ও পড়তে থাকে। পায়ের শব্দ আরও কাছে এগিয়ে আসে, একেবারে ওর চেয়ারের পেছন অবধি। আশরাফ তবু নির্লিপ্তভাবে পড়েই চলেছে।
‘দেরি করার জন্য ক্ষমা চাইছি, কণ্ঠস্বর সাহানুর!’
চমকে উঠে চোখ ঘুরিয়ে ও দেখে চায়ের ট্রে হাতে করে দাঁড়িয়ে সাহানু। অত্যধিক সহজ সচল হবার চেষ্টায় আশরাফ প্রশ্ন করল, ‘তা ভাবি আসলেন না কেন?’
‘আম্মা চায়ের টেবিল থেকে ওনায় ছাড়লেন না, তাই ভাবির অনুরোধে আমাকেই এখানে আসতে হলো।’
বলতে বলতে ও টিপয়টা টেনে নিয়ে চা বানাতে শুরু করে। একটু থেমে।
‘এ কিন্তু আপনার অন্যায় আবদার, সকলের সঙ্গে বসে চাও খাবেন না, আবার চাকর-বাকরে বানিয়ে দিলে সেটাও ছোঁবেন না!’
আশরাফের দিকে এক পেয়ালা এগিয়ে দিয়ে ও নিজেও বসে পড়ল পাশের সোফায়।
আশরাফ চোখ থেকে এবার শেলের চশমাটা খুলে ফেলল। চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে সম্পূর্ণভাবে ঘুরে সাহানুর মুখোমুখি হয়ে বসে। জার্মান দর্শনবাদের গুরুগম্ভীর গৈরিক আড়ষ্টতাকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে ও উত্তর দেয়, ‘দেখো, আর সব ব্যাপারে আমি অভদ্র, অসামাজিক থেকে আরম্ভ করে অমানুষিক অবধি হতে পারি, কিন্তু চা খাওয়ার বেলায় আমি খাস জাত অভিজাত। আমার কাছে চা-টা শুধু এক পেয়ালা রঙিন গরম পানি নয়, তাতেই চায়ের ডেফিনেশন পূর্ণ হলো না। তাকে ঘিরে থাকা চাই একটা নরম নমনীয়, রুচিসম্পন্ন আবেষ্টনী। তাই যে পেয়ালায় আমি চা খাব, তাতে থাকা চাই উড়ন্ত চীনে হাঁস আঁকা, যে হাত সে চা ধরবে, তাতে থাকা চাই একটি পরিচ্ছন্ন স্নিগ্ধতা।’
‘বুঝলাম! আপনি যে সাজিয়ে কথা বলতে সিদ্ধহস্ত, সে কথা বুঝলাম।’
বলে সাহানু পিছলে পড়া শাড়ির প্রান্তটুকু কাঁধের ওপর গুছিয়ে নিতে থাকে।
‘হাঁ করে দেখছিস কী, চা খাস না কেন? বলতে বলতে ওর খোশবুরদার ভাবি প্রবেশ করল সশব্দে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপ্রস্তুত হয়ে আশরাফ অনাবশ্যক তাড়াহুড়িতে গরম চা ঠোঁটে ঠেকাতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলল জিভ। ছলকে পড়া কিছু চা নষ্ট করে দিল ওর সাদা পাঞ্জাবির ক্ষুদ্র একটা অংশ। তারপরই এই হাস্যকর পরিস্থিতি থেকে তাড়াতাড়ি রেহাই পাওয়ার জন্য অধিকতর বোকার মতো বলে ফেলল, ‘বাহ এত গরম চা কী করে খাই? ভাবি হেসে উঠল প্রচণ্ড ধ্বনিতে।’
হাসির আবর্তের মাঝে তবু কেন জানি থেকে থেকে জেগে উঠছিল লজ্জার এক-আধটা আড়ষ্ট ইঙ্গিত। কিছু হয়নি, তবু ওরা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তখন আশরাফের ভীষণ অস্বস্তি বোধ হতে থাকে। ওর মনে হতে থাকে ভাবির ওই দোলায়িত হংসগ্রীবার প্রতিটি ভাঁজে কী একটা প্রচ্ছন্ন খোঁচা ওকে ব্যঙ্গ করে।
সাহানুর টোল খাওয়া গালে কে যেন আবির ছিটিয়ে দিয়েছে তখন। হাসির আবর্তের মাঝে তবু কেন জানি থেকে থেকে জেগে উঠছিল লজ্জার এক-আধটা আড়ষ্ট ইঙ্গিত। কিছু হয়নি, তবু ওরা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তখন আশরাফের ভীষণ অস্বস্তি বোধ হতে থাকে। ওর মনে হতে থাকে ভাবির ওই দোলায়িত হংসগ্রীবার প্রতিটি ভাঁজে কী একটা প্রচ্ছন্ন খোঁচা ওকে ব্যঙ্গ করে চলে গেল। ভাবির ওই বাঁ কানের চমকানো হীরার দুলটা যাওয়ার সময় যেন ওর দিকে ঝিকমিক করে হেসে বলল, ‘অত্যন্ত দুঃখিত, তোমাদের ওই নির্জন দ্বীপভূমিতে রবাহূত ভূতের মতো অকস্মাৎ উপস্থিত হবার জন্য আমি লজ্জিত।’
পড়তে পড়তে আশরাফ একসময় হাতের বইটা ভুলে যায়। অন্যমনস্কভাবে ভাবতে আরম্ভ করে। অদ্ভুত, খাপছাড়া কল্পনার অজস্র বন্যা এসে অল্প সময়ের মধ্যে ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এ পৃথিবীর অনেক দূরে। ধীরে ধীরে মরক্কো লেদারে বাঁধানো নীল বইটা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসে—কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে ওর সোনালি নামটা। কুণ্ডলাকৃতি ধোঁয়ার মতো ওর মাঝখান থেকে পেঁচিয়ে উঠতে থাকে কারও সিক্ত আচ্ছাদনের মোলায়েম প্রান্ত, তার ফুলে-ফেঁপে ওঠা মসৃণ ভাঁজ। ওর মনের ঠান্ডা গহ্বর থেকে জেগে ওঠে শ্যালানুর উষ্ণ দেহের পূর্ণাঙ্গ সীমারেখা। অদেহী কোনো কিন্নরীর কোকেন আলিঙ্গনের মতো সবটা স্বপ্ন ওর সমস্ত তন্ত্রীকে করে তোলে তন্দ্রালু নিস্তেজ হিমেল।
আচমকা আশরাফের ইচ্ছে হয়, চুমু দেবার সময় যদি ও রক্তও চুষতে পারত। সত্যি আজ ও বুঝতে পারে যে নিরক্ত দেহ ও কোনো দিন ভালোবাসতে পারবে না। অঙ্গ গঠনে বিকৃত থাক আপত্তি নেই। কিন্তু কোষে কোষে থাকা চাই উপচে ওঠা নোনতা রক্ত। চুমু দিতে দিতে ও চুষে খাবে। বিকারগ্রস্তের মতো ও বিড়বিড় করে ওঠে, ‘খোদা, দাঁত আমার সাপের মতো সূ-চ-ছিদ্র করে দাও, আমি রক্ত চুষব—চুষব।’
দরজার কাছে কার পদধ্বনি শোনা যায়। সম্বিৎ পেয়ে নিজের কল্পনায় আশরাফ নিজেই শিউরে ওঠে।
‘আসতে পারি কি?’
পর্দাটা না সরিয়েই মিহি গলায় বার থেকে কে প্রশ্ন করল।
‘নিশ্চয়ই!’
সঙ্গে সঙ্গে এক পেয়ালা চা আর এক প্লেট বিস্কুট হাতে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল সাহানু! আশরাফ অনেকটা সপ্রতিভ কণ্ঠে বলল, ‘এই এখন হঠাৎ চা নিয়ে যে!’
‘তোমার ঘরে অসময়ে আসবার এ ছাড়া আর অন্য কোনো অজুহাতই নাকি চলে না।’ অবশ্য দোষ দেবার এ ফন্দিটা ভাবির কাছে সদ্য শেখা। চীনে হাঁস আঁকা চায়ের পেয়ালার সোনালি রিমে চুমুক দিয়ে, আশরাফ আরম্ভ করে, ‘অর্থাৎ, তোমরা দুজনে মিলে ষড়যন্ত্র করে আমার সমস্ত পড়াশোনো একেবারে মাটি করে দিতে চাও, না?’
আশরাফের কণ্ঠস্বরে কৃত্রিম গাম্ভীর্যের নিভৃত আবেষ্টনী। সাহানু হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মুখে ওর একটা করুণ রক্তিম আভা। মুখে শুধু বলল, ‘বেশ, তুমি তাহলে পড়ো। সমস্ত বছর ধরে তো আর হাজার মাইল ছুটে গিয়ে তোমার সময় নষ্ট করে, বিরক্ত করতে যাই না!’
এতটুকু বলে সাহানু আর দাঁড়ায় না। দরজার দিকে হাঁটতে আরম্ভ করে।
‘সাহানু।’
আশরাফ একটু জোরেই ডাকে। সাহানু কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়েই পর্দাটা ঠেলে ধরেছে বাইরে যাবার জন্য। আশরাফ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘সাহী!’
শিউরে উঠে সাহানু পর্দাটা ছেড়ে দিল। নিজের নামের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে যে অতটা উদাত্ত কল্লোল ধ্বনিত হয়ে উঠতে পারে, এ কথা ও আগে কোনো দিনই ভাবতে পারেনি। মুখ ঘুরিয়ে নিচু স্বরে শুধু প্রশ্ন করল, ‘কী?’
আশরাফ তখন গাঢ় চোখে সাহানুর দিকে চেয়ে আছে, সাহানুর মুখের পানে। যেখানে এরই মধ্যে দুটো লাস্যময়ী টোল দুলতে-ফুলতে আরম্ভ করে দিয়েছে। চারপাশে জমে উঠেছে ঘোর রক্তিম আভা। মনে হচ্ছে রক্তের একটা খ্যাপা খুদে ঘূর্ণি! আশরাফ হেসে উঠল, ‘তুই একটা ছেলেমানুষ, একটুখানি ঠাট্টা করলুম অমনি অত চটে গেলি!’
বলে আশরাফ শূন্য পথে আঙুল তুলে রেখাঙ্কিত করে সাহানুর পথ চিহ্নিত করে দিল। সেই পথ লক্ষ করে সাহানু আবার এসে চেয়ারে বসতে বাধ্য হলো।
‘চটব না, বাহু। সবাই বারান্দায় বসে গল্প করছিল, হঠাৎ আমার এমনিতেই একটু ইচ্ছে হলো তোমায় দেখতে। উঠে পড়লাম। ভাবলাম অত রাত, একলা বসে বসে অনেকক্ষণ পড়ছ, এক পেয়ালা চা পেলে সত্যিই হয়তো তুমি খুশি হয়ে উঠবে। তারপর তুমিই বলো, প্রতিদানে ঘরে ঢুকেই যে সম্ভাষণটা পেলাম, তাতে দুঃখ হওয়া সত্যিই কি বিচিত্র? আশরাফ চা শেষ করে নীরবে খালি পেয়ালাটা এগিয়ে দিল সাহানুর দিকে। তারপর উদগ্রীব আঁখি মেলে চেয়ে রইল, কী করে সাহানুর খোদাই করা হাত বিস্তৃত হয়ে আসে পেয়ালাটা নিতে! আচমকা আশরাফ চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওকি, তোমার হাতে কী হলো?’
আশরাফ ওর হাতটা তুলে নিল ওর নিজের হাতে। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগল হাতের খোলেসের তুলতুলে একটুখানি নরম মাংস। হাতটা ছাড়াবার চেষ্টায় সাহানু একটু ছটফট করে উঠল।
‘আঃ ছেড়ে দাও না, ও কিচ্ছু হয়নি!’
‘কিন্তু রক্ত যে, কাটল কী করে?’
‘তবু খামাখা তর্ক করছ, বলছি কিচ্ছু হয়নি।’
‘না, না, বলা যায় না, রক্ত! সে যে ভয়ঙ্কর দামি জিনিস! আর তা ছাড়া তোমার রক্ত, আমার জন্য নষ্ট হবে সে।’ শব্দগুলো বরফকুচির মতো জমে উঠল। আশরাফ ততক্ষণে সাহানুর নিটোল হাতটা টেনে তুলে ফেলেছে নিজের চোখ আর নাকের বড্ড কাছে। অস্ফুট আড়ষ্ট কণ্ঠে সাহানুর মৃদু গুঞ্জন ভেসে আসল।
সাহানু কিছুতেই বলবে না কী করে কেটেছে।
আশরাফও নাছোড়বান্দা। অতঃপর সাহানু স্বীকার করল যে একটু আগে ক্রিম ক্রাকারের টিন খুলতে গিয়ে ওই ছোট অবহেলিত দুর্ঘটনা ঘটেছে।
‘আমার জন্য বিস্কুট আনতে গিয়ে তোমার হাত কেটে গেল? ছি ছি ছি! এখন না আনলে আমার তরফ থেকে কী-বা এমন ক্ষতি হতো? মাঝখান থেকে খালি খালি তোমার হাতটা অমন করে কেটে অত রক্ত—’
‘থামো না, কী বাজে বকছ!’
‘না, না, বলা যায় না, রক্ত! সে যে ভয়ঙ্কর দামি জিনিস! আর তা ছাড়া তোমার রক্ত, আমার জন্য নষ্ট হবে সে।’ শব্দগুলো বরফকুচির মতো জমে উঠল। আশরাফ ততক্ষণে সাহানুর নিটোল হাতটা টেনে তুলে ফেলেছে নিজের চোখ আর নাকের বড্ড কাছে। অস্ফুট আড়ষ্ট কণ্ঠে সাহানুর মৃদু গুঞ্জন ভেসে আসল, ‘আশি ভাই, ওকি ছেলেমানুষি হচ্ছে?’
আশরাফের চোখের সামনে তখন সাহানু অদৃশ্য, অদৃশ্য হয়ে গেছে ‘স্যালান্ধো’র নীল মরক্কো লেদারে বাঁধানো রাজ সংস্করণ। চারদিকে শুধু একটা সম্পূর্ণ অবলুপ্তির হিমেল গভীর গুহা, টু-শব্দহীন, স্পন্দনহীন। এর মধ্যেই চারদিক ঝলসে দিয়ে ভেসে উঠল একটা মসৃণ চকচকে মেজার গ্লাস, ফোঁটা ফোঁটা টাটকা তপ্ত রক্ত পড়ে ভরে উঠছে সেটা। আর কে যেন তাতে ঢেলে দিয়েছে দু-এক কণা স্যাকারিনের সোনালি গুঁড়ো। আর নিচু হয়ে আশরাফ সেটা চুষছে, চুষছে, চুষছে।
তিন
কেন জানি এরপর দুদিন ধরে সাহানু আর আশরাফের সাথে একরকম কথাবার্তা হয়নি বললেই চলে। সন্তর্পণে এ ওকে যত দূর সম্ভব এড়িয়েই চলেছে। ভাবিই এ দুদিন আগের মতো চা এনে দিয়েছে। সবই বেশ স্বাভাবিকভাবে চলছিল। ভাবির সামনে আশরাফ তবু চাইত আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে। নিজেকে সে তার ফলে করে তুলত হাস্যকর, অদ্ভুতভাবে ভীরু ভীরু। আর তাই প্রত্যেকবারই ভাবি যখন নিঃশব্দে চা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেত ওর তখন মনে হতো ভাবি তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাসছে। ওর চোখ জ্বালা করে উঠত ভাবির ওই বাঁ কানের চমকানো হিরে আর হংসগ্রীবার ওপর কোঁকড়ানো চুলের ভাঙা অংশগুলোকে কাঁপতে দেখে।
সন্ধ্যার দিকে ভাবি হঠাৎ ওর ঘরে এসে হাজির। হুকুম করল ওদের বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য।
নদীর ধারে সুরকি দেওয়া লাল রাস্তা ধরে ওরা তিনজন হাঁটছিল। ভাবি মাঝখানে, আশরাফ আর সাহানু দুপাশে। নদীর ওপর থেকে ভেসে আসছিল বেশ ঠান্ডা একটা বাতাস হু হু করে। সেই শব্দ এসে আবার ঢেউ তুলছিল ঝাউবনে, একটা একটানা শাঁ শাঁ প্রতিধ্বনিতে।
ভাবি একলাই উৎফুল্ল হবার চেষ্টায় খুব জোর গলাতেই কথা বলছিল অনবরত। মাঝখানে সহজ কণ্ঠে আশরাফ বাধা দিল। ভাবির কথার তর্কে জের টেনে বলল, ‘তবু শেষ অবধি তোমাদের অবস্থা ওই বাদুড়ের চেয়ে খুব বেশি উন্নত নয়।’
‘অর্থাৎ?’
ভাবির কণ্ঠস্বরে সশব্দমান প্রশ্ন গর্জন। সাহানুর চোখে অবরুদ্ধ আবেগের নিঃশব্দ তর্জন।
‘কিছু না।’
আশরাফ একবার গলাটা ঝেড়ে আরও ভঙ্গিমা করে, ‘কিছু না, শুধু এই যে সন্ধ্যা না হলে যেমন তোমরা পথে বেরোতে পারো না, ওরাও তার আগে আকাশপথে কিছুতেই বেরোতে সাহস করে না। তবে তফাত এই যে ওরা না দেখে অন্ধ, আর তোমরা দেখেও অন্ধ থাকতে বাধ্য! অবশ্য তোমরা দিনের আলোয় যে একেবারেই বেরোতে পারো না, তা নয়—তবে বোরখার আঁধার আগে চারধারে সৃষ্টি করে নিয়ে তারপর। তাই তো তোমাদের মনে আড়ষ্টতা, চরণে জড়তা, বলনে সংকোচ।’
‘বস বন্ধ করো। তোর লেকচার এখানে চলবে না, এই আমার অর্ডার।’
ভাবি হেসে উঠল। ...সাহানু নীরবে হেঁটে চলেছে। সাবুনে আকাশে একটা প্রায় পুরন্ত চাঁদ নদীর পানিকে রুপালি করে দিতে প্রাণপণ যুঝছে।
‘কালকে শবে বরাত, না?’ ভাবি প্রশ্ন করে।
‘হ্যাঁ, আর পরশু আমাদের যাবার দিন।’
সাহানুর উত্তর।
‘অবশ্য, তার আগে যদি তোমাদের অসুখ না হয়ে পড়ে। যা পাতলা একটা ফ্যাশন-দুরন্ত শাড়ি পরে এসেছ—নাও, এই চাদরটা জড়িয়ে ধরো।’
এবং সাহানু কিছু আপত্তি করবার আগেই আশরাফ নিজের চাদরটা সাহানুর দুকাঁধের ওপর দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে দিল।
বেড়িয়ে এসে ওরা ড্রয়িংরুমে বসে। জানালা দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাঁদের আলো এসে ডুবিয়ে দিচ্ছিল সমস্ত ঘরটাকে। ভাবি বসল চাঁদের দিকে মুখ করে। সাহানু অকারণেই চুপ করে গিয়ে বসল একটা অন্ধকার কোনায়। তিনজনই চুপচাপ, হঠাৎ আশরাফ নিজের অজান্তেই আত্মস্থ হয়ে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে, তার নিজেরই খেয়াল নেই। টেরই পায়নি কখন এরই মধ্যে নিঃশব্দে ভাবি ঘর থেকে চলে গেছে। অজস্র এলোমেলো কল্পনা থেকে যখন বিচ্ছিন্ন করে নিল নিজেকে, তখন খালাম্মার সাথে ভাবির উগ্ররসে ভরা ঝাঁঝালো ঝগড়ার কণ্ঠস্বর অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছিল। সাহানুর কথা বোধ হয় ও ভুলে গিয়েছিল। আশরাফ কী ভেবে লাইটের সুইচটা অন করে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে আবার তা নিভিয়ে দিল।
‘তুমি আলো জ্বাললে কেন?’ সাহানু অন্ধকার কোণ থেকে চিৎকার করে উঠল উত্তেজিত কম্পিত সুরে। আশরাফ ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। নীলচে জোছনায় একটুখানি ব্যঙ্গাত্মক পাংশু হাসি ছিটিয়ে আস্তে আস্তে উচ্চারণ করল, ‘আলো না জ্বাললেও চলত। কারণ, তোমার-আমার মতো বয়সের মেয়ে-ছেলেরা কখন কী করতে পারে, সেসব প্রতিটি মুহূর্তের ইতিহাস ফ্রয়েড মশায় খুব পরিষ্কার করে লিখে গেছে। আলো জ্বালিয়ে তার প্রমাণ আমার না দেখলেও চলত।’
‘কেবল ফ্রয়েড আর ফ্লবেয়ার। যতসব ছাপার অক্ষরে চোখা চোখা সাজানো বুলি! কেন, দরদ দিয়ে নিজের মন থেকে সহজ-সরল করে একটা কথাও কি তুমি বলতে পারো না, আশি ভাই?’
একনিশ্বাসে এই অবধি বলে সাহানু আর সেখানে দাঁড়াল না, খুব তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ঘর থেকে চলে গেল।
আশরাফ প্রথমটায় একটু অগোছালো হয়ে পড়ল। ও ভেবে ভেবে অবাক; এ কেমন অদ্ভুত মনস্তর! আমার আলোয়ানটাকে নিবিড়ভাবে বাহুর ওপর, গলার ওপর, বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে তুমি অন্ধকারে বসে বসে নিজের দেহকে উষ্ণ রাখছিলে—শীতের ভয়ে। বেশ তো, তাতে হয়েছে কী? আর আমি যখন আলো জ্বাললাম তখন কিনা সব দোষ হলো আমার?
হঠাৎ চমকে উঠল আশরাফ, আঁধারে দ্যুতিময় একটা কিছু জ্বলছে টেবিলের ওপর। চারধারে তার বিচিত্র বিচ্ছুরিত বর্ণচ্ছটা।
‘আমার দুল জোড়া বোধ হয় টেবিলের ওপর ফেলে গেছিলাম, না রে?’ দুলের খোঁজে ঘরে ঢুকল ভাবি, কোনো কথা না বলে তুলে নিল দুল জোড়া। তারপর তার পানে চেয়ে নিঃশব্দে কানে দুল পরাতে পরাতে পা বাড়াল ঘরের বাইরে।
আশরাফ ভাবে, রহস্যময় হবার ভাবির কোনো প্রয়োজন ছিল কি?
আশরাফের চোখ দুটো যন্ত্রণায় জ্বালা করে উঠল। ভাবির দুটো নিটোলবাহু বাঁ কানের হীরাটা ধরে, তা থেকে বহুবর্ণের টুকরো টুকরো প্রতিফলিত রঙিন আলোর রেখা, পালকের মতো কোমল ঘাড়ে নীলচে চাঁদের আলো—সবটা মিলে আশরাফকেই যেন ব্যঙ্গ করে কিছু বলছে, হাসছে, বিদ্রূপ করছে।
চার
চাদরটা গায়ের ওপর টেনে নিয়ে আশরাফ শুয়ে পড়ল। রাত খুব কম হয়নি। এগারোটা বোধ হয় বেজে গেছে। শবে বরাত, অন্দরমহলের কোলাহল তখনো অবশ্য তেমন কিছু কমেনি। আশরাফ ভাবছিল সাহানুর কথা। এ সাহানুর অন্যায়। এ দুর্বলতা অক্ষমার্হ। সত্যিই যদি সে তার আশি ভাইকে ভালোবাসবে, তবে তা প্রকাশ করার মতো সাহস কেন নেই ওর? আলোতে আসতে ভয় পায় কেন? চাদরটা গায়ের ওপর ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে এবার আশরাফ সত্যিই ঘুমুবার চেষ্টা করল।
গভীর রাত তখন। দুটো থেকে তিনটে অবধি হতে পারে। মাথার কাছে অনেকক্ষণ অবধি কার অধীর পায়ের শব্দ শুনে আশরাফের ঘুম ভেঙে গেল। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, ‘কে?’
‘আ—মি, —সাহানু।’
‘তুমি, এত রাত ঘুমোওনি যে?’
‘আজ রাতে সবাই জেগে আছে, তাই আমিও জেগেছিলাম।’
‘ওহ্!’
আশরাফ আবার চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
‘আশি—ভা—ই-ই!’
কে যেন মৃদু স্পর্শ করে ডাক দিল। মুখের ওপর থেকে চাদরটা একটু সরিয়ে বলল, ‘কে সাহী নাকি? বসো ওই সামনের চেয়ারটায়, বলবে নাকি আমায় কিছু?’
‘একটা কথা শুধু আশি ভাই, তোমার ঘুমের সত্যি বেশি ব্যাঘাত করব না। বলো, তুমি আমার সেদিনের কথায় রাগ করোনি তো?’
ঘুমের ঘোরে আশরাফ ঠিক বুঝতে পারছিল না। সাহানু কবেকার কিসের কথা বলছে। তা ছাড়া বেশ লাগছিল ঘুমকাতুরে ঝাপসা চোখে পাণ্ডুর জ্যোৎস্নায় সাহানুকে দেখতে। কথার রেশ ধরতে না পারলেও বেশ লাগছিল এ ধরনের আবছা সংলাপ। তবুও একটু সপ্রতিভতার সুর টানল, ‘পাগল, তোমার আমার রাগ সে তো বরাবর একতরফাই চলছে!’
মনে মনে আশরাফ তখন হিসাব করছিল কার কথায় বেশি অসংলগ্নতা প্রকাশ পেল—কে বেশি তন্দ্রাচ্ছন্ন? সে না সাহানু?
বোধ হয় এর ঘণ্টাখানেক পর। আশরাফের ঘুম ভেঙে গেল, এক অস্বস্তিকর কল্পনার সংঘাতে। ওর মনে হতে থাকে যেন একটু আগে সাহানু এসেছিল ওর বিছানার কাছে; কথা বলেছিল ওর সঙ্গে। তবুও কী যেন বলেছিল ওর কিছুতেই মনে পড়ে না। চোখ দুটো মেলে আশরাফ উঠে বসল। রেণু রেণু কথা ওর স্পষ্ট করে মনে হতে থাকে।
তারপর জড়িয়ে জড়িয়ে মিঠে সুরে সাহানু আরও কী কী বলছিল, আশরাফ তার সবটা শোনেনি হয়তো। শুনলেও বুঝবার চেষ্টা করেছিল কি না সন্দেহজনক। একজন উচ্ছ্বসিত আবেগে অনর্গল গুঞ্জন করে চলেছে, অন্যজন স্তিমিত তন্ত্রীতে নির্বিকার চিত্তে কিছু শোনেনি। শুধু আধবোজা মদির চোখে অক্ষরগুলোকে যেন উদাসীন আগ্রহে শুরু থেকে ধরবার চেষ্টা করছে।
একসময় আশরাফের আবছা চোখের সামনে ছোট একটা নরম পুঁটলি নড়ে উঠল। চোখগুলো একটু টেনে আশরাফ বুঝল সাহানু কিছু বলছে খুব উত্তেজিত সুরে, আর তুলতুলে পুঁটলিটা ওরই একটা মুঠ করা হাত। আশরাফের গলার স্বরে ক্ষীণ জিজ্ঞাসার চিহ্ন, ‘কী?’
‘বলতে পারো আমার এ হাতের মুঠোর মধ্যে কী আছে?’
‘বাহ্ তা আমি কী করে বলব?’
‘পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস, এখন বলো তো?’
‘হিরের দুল?’
‘দূর ছাই—আবার বলো।’
‘পুঁতির মালা।’
‘হয়নি, কিছু হয়নি।’
‘তাহলে আমি আগে খুলেই দেখি তারপর না হয় বলব কী ছিল তোমার হাতে।’ আশরাফ মন্থরগতিতে ওর ঘুমন্ত হাতটাকে হেঁচড়ে তুলে ধরে, সাহানুর মুঠো খুলবার জন্যে। সাহানু ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। চট করে দ্রুতবেগে হাতটা সরিয়ে নেয়। রহস্য-শঙ্কিত কণ্ঠে শুধু বলতে থাকে, ‘না না। তোমায় আমি দেখাব না। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে গোপনীয়—আমার দেহের সঙ্গে বন্দী করে রেখেছি সে সম্পদকে এই মুঠোয়। তা আমি তোমায় দেখাব না। তুমি তা দেখতে পারবে না, কক্ষনো পারবে না—না!’
এরপর আর একটা অক্ষরও আশরাফ বুঝতে পারে না। চোখ ওর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আসে ঘুমে।
বোধ হয় এর ঘণ্টাখানেক পর। আশরাফের ঘুম ভেঙে গেল, এক অস্বস্তিকর কল্পনার সংঘাতে। ওর মনে হতে থাকে যেন একটু আগে সাহানু এসেছিল ওর বিছানার কাছে; কথা বলেছিল ওর সঙ্গে। তবুও কী যেন বলেছিল ওর কিছুতেই মনে পড়ে না। চোখ দুটো মেলে আশরাফ উঠে বসল। রেণু রেণু কথা ওর স্পষ্ট করে মনে হতে থাকে।
তাহলে সাহানু সত্যি এসেছিল। হাঁ। ওই বিছানার ধারে চেয়ারটাও ঠিক জায়গাতেই আছে। কী একটা লুকিয়ে রেখেছিল সাহানু তাকে দেখতে দেয়নি। আশরাফ উঠে দাঁড়াল। এক হাতে ছোট টর্চটা নিয়ে ও দক্ষিণ দিকের ছোট ঘরটার দিকে চলতে থাকে। ওখানেই থাকে এ কয়দিন ধরে সাহানু আর ভাবি।
আশরাফ যেন স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো সে ঘরে ঢুকল। সাহানুকে সে ডেকে তুলবে, জিজ্ঞেস করবে, জোর করে দেখবে, যা সে লুকিয়ে নিয়ে এসেছে আশরাফের চোখের সামনে থেকে। সে চোখ তখন ছিল ক্লান্ত, এখন তা জাগ্রত।
আশরাফ তাই দেখতে চায়। আশরাফ সাহানুকে ভালোবাসে সে দাবির সুস্থতাকে সংকটে ফেলতেও আশরাফ জানতে চায় সাহানুর চরম-পরম গোপন সম্পদকে।
মশারির কিনার দিয়ে ঝুলে পড়েছে সাহানুর জাফরানি রঙের ওড়নির জড়ির পাড়টুকু। আঁধারে জ্বলছে ভাবির হিরের দুলটার মতো ঠিকরে ওঠা আভায়। মশারিটা ধীরে সরিয়ে আশরাফ টর্চটা জ্বালল। ওড়নির ওপরই সাহানুর অসহায় হাতটা ঠিক তেমনিভাবে মুঠ করা অবস্থায় বিছিয়ে আছে ওড়নির ওপর। আলতো হয়ে বুজে আছে। অত্যন্ত সন্তর্পণে আশরাফ ওর মুঠোর আঙুলগুলো নির্ভয়ে ছড়িয়ে নিল। তারপর মুহূর্তেই আলোটা সাহানুর সুন্দর ছোট হাতের নরম বুকে পড়তেই শিউরে উঠল আশরাফ।
সাহানুর হাতের ওপর মেহেদিপাতার লাল অক্ষরে খুব পরিষ্কার করে লেখা—আশি।
কিন্তু তবু ক্ষণিকের উচ্ছ্বাস, আত্মতৃপ্তির সে কলরোল সব ছাপিয়ে আশরাফের চোখের সামনে ক্রমশ ভেসে উঠতে লাগল একটা সিরিঞ্জ। টিউবের ওয়াসারটা ওপরে উঠছে আর ফাঁপা বাতাস সুচ-ছিদ্রপথে টেনে তুলছে লাল টাটকা তপ্ত রক্ত।
ওর মনে হতে থাকে সাহানুর ছোট হাতের মাঝে ওই যে লাল দুটো অক্ষরের ইঙ্গিত, তা শুধু অন্তরালের স্ফীত রক্তকণিকার অতৃপ্ত বিস্মৃতি। ওই পাতলা চামড়া ছিঁড়ে ওরা যেন বেরিয়ে আসতে চায়। ওরা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে, আশি, আশি—আশি!
প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৩’ থেকে উদ্ধৃত