আমি শুরু করব মিথ্যা কথা বলে। সেটা মিথ্যা কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত না। আমাদের রাজ্যে মিথ্যা মানে হচ্ছে সেটা, যা আমাদের প্রভুরা শুনতে চান না। কাজেই সত্য–মিথ্যা কোনটা, তা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। শুধু খেয়াল রাখি, প্রভুরা রেগে যান, এমন কিছু যাতে না বলি।
তবু বলি, মিথ্যা এটা যে আমার বসের নাম জিটলুম, সত্য হচ্ছে আমার সামনে এখন তিনি বসে আছেন। তাঁর মুখটা পুরোপুরি গোল, গায়ের রং ফরসা, তবে তা এমন মুখভার করা ফরসা যে মনে হয় এর আড়ালে রয়েছে ছাইরঙা কিছু। আকাশে আমি এ রকম ভয় ধরানো রঙের মেঘ দেখি মাঝেমধ্যে, দেখি পিলে চমকানো বজ্রের আলো। আকাশের বর্ণনা অবশ্য অনাবশ্যক আমাদের রাজ্যে, এখানে মাটিতে এত সমস্যা যে আকাশের দিকে তাকানোর সময় হয় না কারও।
আমি মাটির দিকেই তাকিয়ে থাকি বসের রুমে ঢুকলে। কিন্তু এখন তা করা যাবে না। বসের সঙ্গে কথা বললে মুখ রাখতে হয় সোজাসুজি, যাতে তিনি চোখ দেখতে পারেন আমার। তাঁর নাক মোটা, ঠোঁট মোটা, কিন্তু চোখ দুটো খুব সরু। ফলে তিনি কখন তাকিয়ে আছেন বা কতটা রেগে আছেন, তা ঠিক বোঝা যায় না। তিনি অবশ্য রাগেন না কখনো, আমাকে প্রথম যখন কালোদের কেন মেরে ফেলতে হবে, তা বোঝান, শিরশিরে ঘৃণা এবং তার সঙ্গে দো–আঁশলা একটা আনন্দ ছিল তাঁর গলায়। কিন্তু সেই কথাটা, আমি নিশ্চিত যে অন্য কোনো বস প্রচণ্ড না রেগে বলতে পারতেন না।
জিটলুম, আচ্ছা থাক, বসই হোক তাঁর নাম, তিনি পেটের ওপর হাতড়ে হাতড়ে তাঁর ইউনিফর্মের বোতাম খুলেছেন একটু আগে। এখন তিনি সেই হাত দিয়ে গরুর একটা হাড় মটমট শব্দ করে ভেঙে খাচ্ছেন। হাড়ে লেগে থাকা মাংসের রক্তে তাঁর ঠোঁটের চারপাশটায় গোল সিলের মতো ছাপ পড়ে আছে। বসের মাথায় চুল কম, গরুর মাংসের ঝালে মাথা থেকে টপটপ করে ঘাম নামছে, একটা ফোঁটা ঠোঁটের রক্তের সঙ্গে মিশে দ্বিধান্বিত হয়ে ঝুলে আছে।
তিনি একটু পেছনে সরে পিঠ সোজা করে বসেন। প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেন। আমি জানি সেটা কিসের লিস্ট, সেখানে যারই নাম আছে, তাদের নিকাশ করে ফেলতে হবে চিরদিনের জন্য। কোনো প্রশ্ন, কোনো দ্বিমত না করে।
তিনি বড় করে হাই তোলেন, ওপরের ঠোঁটের রক্তবিন্দু তাঁর খোলা মুখে ঢুকে যায়, দুপাটি এবড়োখেবড়ো দাঁত বের হয়ে আসে। তিনি একটু পেছনে সরে পিঠ সোজা করে বসেন। প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেন। আমি জানি সেটা কিসের লিস্ট, সেখানে যারই নাম আছে, তাদের নিকাশ করে ফেলতে হবে চিরদিনের জন্য। কোনো প্রশ্ন, কোনো দ্বিমত না করে।
আমরা বসে আছি কাঠের পাল্লার জানালা আর পাথরের দেয়ালঘেরা একটা ঘরে। এ রকম তিনটি ঘরের একটি থেকে বসের জন্য আধা সেদ্ধ খাবার রান্না হয়ে আসে। পাথরের দেয়ালের ঘরগুলো হয় বিশেষ আলাপ আর মাংস কামড়ে কামড়ে খাওয়ার জন্য। এগুলোর সামনের দিকে আছে সরকারি আচরণবিধি অনুসারে সাধারণ আলাপ করার আর কম দামি কফি খাওয়ার একটা অফিস। সেবা গ্রহণকারী আর সংবাদ সংগ্রহকারীরা সেখানে আসে, আমরা আসি বিশেষ আলাপের ঘরে।
আমার লিস্ট দেখার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তবু দেখি। লিস্টের কয়েকটা নাম চেনা, তাদের কেউ কেউ আসলে কালো না, সাদাও না, তারা ধূসর রঙের মানুষ। কিন্তু আমাদের নিয়ম হচ্ছে এ রাজ্যে ধূসর রঙের কোনো মানুষ থাকতে পারবে না। মতাদর্শের দিক থেকে সবাইকে ‘সাদা’ হতে হবে। যারা সাদা হওয়ার চেষ্টা করেনি, সাদা হতে চায়নি বা কখনো সাদা ছিল না, তাদের আমরা কালো বলে ধরে নিতে পারব। আসল কালো এবং আমাদের বিবেচনায় যাদের কালো ধরে নেওয়া হয়, তাদের হাত থেকে এই রাজ্যকে বাঁচাতে হবে। লেখা নেই কোথাও, তবু আমাদের রাজ্যের, বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে, মূলনীতি এটাই।
লিস্টের মধ্যে একটা নাম দেখে তবু চমকে যাই। নামটা একজন পত্রিকার সম্পাদকের। তিনি ছোটখাটো, ভদ্রলোক ও সম্ভ্রান্ত চেহারার মানুষ। তাঁকে আমি আসলে ধূসর বলে জানতাম। কিন্তু আমার জানায় কিছু আসে-যায় না। এই লিস্ট আমি তৈরি করি না, আমার বসও না, তাঁরও যিনি বস, তিনি আমাদের সবচেয়ে বড় প্রভুর একদম ঘরের মানুষ, লিস্ট হয় তাঁর অফিসে। কয়েক বছর ধরে কাজ করছি, জানি এখন এসব।
বড় প্রভু বা বস, বড় বস—এভাবে যে কথা বলছি, তার কারণ আছে। কোনোভাবে যদি আমার এই লেখা নীতি পুলিশদের হাতে পড়ে, একটা অজুহাত হয়তো দাঁড় করাতে পারব। বলতে পারব সাহিত্য এটা। যদিও সাহিত্যকেও সাদা হতে হয় আমাদের দেশে এখন, তবু কিছু একটা তো বলা যাবে, প্রাণভিক্ষা পাওয়ার সুযোগ হতে পারে হয়তো তাতে।
বসের কাছ থেকে লিস্টটা নিয়ে চলে আসি। আমার কাজটা সোজাসাপটা। ধূসর আর কালোদের মধ্যে যারা ঝামেলা করতে পারে, তারা আমাদের গুপ্তচরদের নজরে আছে। তাদের খবর অনুসারে, সেটা সত্যি হোক আর মিথ্যা হোক, যে লিস্ট হয়েছে, সেখানকার মানুষদের এখন হত্যা করা হবে। বিশেষ নির্দেশ থাকলে তুলে নিয়ে হত্যা না করে, দূরের কোনো গোপন ঘরে রাখা হবে হাত-পা-চোখ বেঁধে। আরও অনেক কিছু করা হবে, যা পুরোটা বলা যাবে না এখানে। কিছুদিন পর তারা খাঁচায় ঠেসে রাখা ফার্মের মুরগির মতো ল্যাতল্যাতে হয়ে যাবে। এই ল্যাতল্যাতের কাউকে কাউকে হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া হবে, কোন একটা পুকুরের পাড়ে বা জনশূন্য রাস্তায় তারা উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবে, কীভাবে কী হয়েছে, কিছুই মনে থাকবে না তাদের। কোথাও তারা অভিযোগ করবে না। বরং সাদা হওয়ার চেষ্টা করবে এরপর থেকে বা রং লুকিয়ে বাকিটা জীবন বাঁচার চেষ্টা করবে।
তাঁর আসল অপরাধটা কী, সেটা আন্দাজ করতে পারি। কালোদের একজন লিডারের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ ছাপা হয়েছিল তাঁর পত্রিকায়। কাউকে দোষ দেওয়া হয়নি, মামুলি একটা নিখোঁজ সংবাদ। এ জন্যই লিস্টে নাম চলে এসেছে তাঁর।
এসব নিয়ে একটা সময় কথাবার্তা হতো আমাদের রাজ্যে। এখন সবাই মেনে নিয়েছে। সবচেয়ে সবল আর হিংস্র বিড়ালটা বাচ্চাদের খেয়ে ফেললে যেভাবে মেনে নেয় একসময়ের বেদনার্ত মা-বিড়ালেরা।
লিস্টের সম্পাদকের জন্য তবু আমার মন খচখচ করে। তাঁর আসল অপরাধটা কী, সেটা আন্দাজ করতে পারি। কালোদের একজন লিডারের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ ছাপা হয়েছিল তাঁর পত্রিকায়। কাউকে দোষ দেওয়া হয়নি, মামুলি একটা নিখোঁজ সংবাদ। এ জন্যই লিস্টে নাম চলে এসেছে তাঁর।
আমাদের জন্য এসব নিয়ে ভাবা অন্যায়। কাজেই মন ফুরফুরে করার জন্য অম্বিনিকে ফোন করি। সে কিছুদিন হলো বুঝেছে যে আমি যেনতেন মানুষ না। ফোন ধরার পর কিছুক্ষণ নখরামো করি আমরা। সে আমাকে উত্তেজক ও ক্ষুধার্ত হওয়ার মতো কিছু বলে। এগুলো বলে যেসব কথা শুনতে চায়, তার চেয়েও রগরগে কিছু কথা বলি তাকে। আমি জানি, আমার কথাও রেকর্ড হচ্ছে। তবে আমি পুরোপুরি সাদা মানুষ, এটা নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।
তাকে ঘিরে একটা পরিকল্পনা আছে আমার। হাতে অনেক টাকা জমলে তাকে নিয়ে অন্য কোনো রাজ্যে চলে যাব। সেখানে আমার আর রঙের সমস্যা থাকবে না। গায়ের নোংরা কোটটা খুলে ফেলার মতো আমি আমাদের রাজ্যের সব স্মৃতি চিরতরে ফেলে আসব। সেই সময়টা দূরে না।
এসব ভাবি বলে একটু দুশ্চিন্তাও হয় মাঝেমধ্যে। আমাদের রাজ্যে নাকি থট রিডার টাইপের কিছু যন্ত্র আনা হয়েছে আরও ভয়ংকর একটা রাজ্য থেকে। সত্যি–মিথ্যা জানি না, তবে সত্যি যদি হয় কোনো একদিন বিপদে পড়তে হবে আমাকে। এ জন্য পালানোর ব্যাপারটা দ্রুত সেরে ফেলতে হবে।
দুই
লিস্টের কাজ আমি শেষ করে ফেলি সাত দিনের মধ্যে। তবে শেষ দিনে সম্পাদকটাকে মারার সময় একটু ঝামেলা হয়ে যায়। পরিকল্পনামতো আমার দলটা নিয়ে খুব ভোরে তাঁর অফিসে যাওয়ার রাস্তায় অপেক্ষা করি। একটা ভেসপা চালিয়ে সে যাওয়ার সময় তাঁর পথ রোধ করা হয়। মাইক্রোবাসে করে তুলে চোখ বেঁধে তাঁকে শহর থেকে একটু দূরে বনাঞ্চলের পাশে নির্জন জায়গাটায় নেওয়া হয়।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল, আকাশ ছিল থমথমে। মাইক্রো থেকে বের করে তাঁর ঘাড়ের পেছনটা থাবা মেরে ধরি, ঠেলে ঠেলে বনের পাশে খালের কিনারে আনি, ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলি। গলাকাটা মুরগির মতো তাঁর শরীরটা কাঁপতে থাকে। হঠাৎ তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে কিছু বলেন। বৃষ্টির ঝাপটায় শুনতে পারি না কিছু আমি। ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁর মুখটা সামনের দিকে আনি। তিনি আমার বসের নাম বলেন, বলেন আপনি ভুল করছেন। উনি বলেছেন আমাকে মারা হবে না।
আহা রে নির্বোধ! তিনি কি জানেন বসই দিয়েছেন এই লিস্ট আমাকে। তাঁর কপালের পাশে পিস্তলটা এনে ট্রিগার টিপি। খট করে শব্দ করে সেটা আটকে যায়। আমি অবাক হই। উন্নতমানের পিস্তল ব্যবহার করি আমরা। এমন তো হওয়ার কথা নয়, কখনো হয়নি আগে।
যা–ই হোক এটা নিয়ে বেশি না ভেবে, পকেট থেকে হান্টার নাইফটা বের করি। মাথার ওপর তুলি সেটা তাঁর বুকে বসিয়ে দেওয়ার জন্য। হঠাৎ আমার কাঁধে প্রচণ্ড একটা আঘাত নেমে আসে। হাতটা ঝুলে যায়। মুখ ঘুরিয়ে পুরো কিছু দেখার আগেই আরেকটা আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ি।
কতক্ষণ এভাবে থাকি জানি না। বৃষ্টি আর কাদায় মাখামাখি হয়ে আমাদের মাইক্রোবাসের কাছে ফিরে আসি। সেখানে আমার সঙ্গী দুজন পাথরের মতো মুখ করে বসে আছে কাচ তুলে। তারা আমার আঘাতের চিহ্ন দেখে কিছু বলে না। আমাকে আসলে দেখেও না বোধ হয় ঠিকমতো। দরজা খুলে নেমে খালের দিকে রওনা হয়। সম্পাদকের ডেডবডিটা তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু তারা একটু পরেই জানবে লুকিয়ে ফেলার মতো কিছু নেই আসলে সেখানে।
দুজনের কাঁধেই একটা করে বস্তা! এর মানে কিছুক্ষণ বুঝতে পারি না। জ্ঞান হারিয়ে আমি পড়ে গিয়েছিলাম। গোলাগুলি হয়েছে কোনো? একাধিক মানুষ মারা গেছে? গেলে তারা কারা? সম্পাদক কি আছেন এর মধ্যে? অন্যজন তাহলে কে?
শরীরটা টেনে টেনে তাদের পেছনে এগোই। তারা ফিরে তাকাচ্ছে না আমার দিকে। কিছু দূর গিয়ে হঠাৎ মনে হয় এটা কী করছি আমি! সম্পাদকের ডেডবডি না পেলে তারা আমাকে মেরে ফেলবে। এটাই নিয়ম আমাদের রাজ্যে। এই রিস্ক নেওয়া যাবে না।
বৃষ্টির তোড়ে সামনের সঙ্গী দুজনকে দেখা যাচ্ছে না এখন ঠিকমতো। আমি এ সুযোগে এপাশের ঝোপঝাড়ের আড়ালে সরে যাই। তারপর ছুটতে থাকি। ঘন গাছের আড়ালে থেমে দূর থেকে খালের দিকে তাকাই। বৃষ্টির ঝাপটা সামান্য কমেছে এখন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর খাল থেকে ফিরে আসার পথটায় উঁচু একটা ঢিবিতে তাদের দেখি। আমার যদি ভুল না হয়, দেখি, কাঁধে লম্বা বস্তার মতো কিছু বহন করে সঙ্গী দুজন ফিরে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। দুজনের কাঁধেই একটা করে বস্তা! এর মানে কিছুক্ষণ বুঝতে পারি না। জ্ঞান হারিয়ে আমি যখন পড়ে গিয়েছিলাম, তখন কি সেখানে গোলাগুলি হয়েছে কোনো? একাধিক মানুষ মারা গেছে? গেলে তারা কারা? সম্পাদক কি আছেন এর মধ্যে? অন্যজন তাহলে কে?
অল্পক্ষণ পরে তারা মাইক্রোবাসে পৌঁছে যাবে। হয়তো ভাবছে আমি সেখানে আছি। না পেয়ে নিশ্চয়ই খুঁজবে আমাকে। গাড়ি আছে তাদের সঙ্গে, পিস্তল আছে। খালের পাশে মৃতদেহগুলোর মধ্যে সম্পাদক না থাকলে আমাকে মেরে ফেলার কথা তাদের। সেখানে ঠিক কী হয়েছে, জানি না আমি।
বুদ্ধি করে এবার খালের দিকে দৌড় দিই। তারা যেহেতু উল্টো দিকে যাচ্ছে, আমাকে তাই দেখার কথা না। খালটা আমি সাঁতরে পার হতে পারব। তারপর ঘন বনের ভেতরে হারিয়ে যাব। এই বনটা নিয়ে নানা ধরনের কথা আছে আমাদের রাজ্যে। সারা বছর নাকি গাছের পায়ে পায়ে জমে থাকে কুয়াশা। অদ্ভুত সব জিনিসও নাকি দেখা যায় কখনো কখনো। আমরা এর সত্য–মিথ্যা জানি না। তবে বনটা থেকে দূরে থাকি, যা করার খালের এ পাশেই সেরে নিই। কিন্তু এখন খালের অন্য পারের ঘন বনটাই আমার একমাত্র আশ্রয় মনে হয়। খালটা পার হয়ে দ্রুত আমি তার ভেতরে ঢুকে যাই।
তিন
অনেকক্ষণ পর বনের ভেতরে দুর্গম জায়গায় এসে থামি। সন্ধ্যার শেষ আলোর রেশ মিলিয়ে গেছে এর মধ্যে। ওপরে আকাশছোঁয়া গাছের মাথা ভিজে আছে চাঁদের আলোয়। বড় গাছের গুঁড়ির সামনে যেতেই কুমিরের মতো শরীরের একটা ছোট প্রাণীকে হাঁচড়েপাঁচড়ে সরে যেতে দেখি। হান্টার নাইফটা বের করে হাতে নেওয়ামাত্র সে তার চোখ পুরোপুরি ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকায়। তারপর জিবটা বাতাসে নাচিয়ে হায়েনার হাসির মতো এত অদ্ভুত একটা শব্দ করে যে আমার গা শিউরে ওঠে। সেটা সরে গেলে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে চারদিকে চোখ রাখি। কী আসলে ঘটেছে গত কয়েক ঘণ্টায়, ভেবে প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগে হঠাৎ। ঘুমিয়ে পড়ি, কিন্তু সেটা ঠিক ঘুম বলেও মনে হয় না।
অনেকক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, দিন নাকি রাত। অদ্ভুত আলো চারপাশে, বড় বড় গাছ ঘিরে থাকা ধূসর রঙের কুয়াশা, শোঁ শোঁ করা বাতাসের শব্দ, অথচ একটা পাতাও নড়ছে না গাছের। বুকের ভেতর প্রচণ্ড হাহাকার অনুভব করি। সবকিছু অবাস্তব মনে হয়। পা টেনে টেনে এগোই সামনে। এই বনের অন্য পারে কী আছে, ঠিক জানি না। কিন্তু এত অস্থির লাগে, মনে হয়, যেমনভাবে হোক বনটা থেকে বের হয়ে যেতে হবে আমাকে।
অনেকক্ষণ হেঁটে আকাশ আড়াল করা একটা গাছের নিচে বসি। চোখ বন্ধ করে হাঁপাতে থাকি। হঠাৎ প্রবল অস্বস্তি থেকে চোখ খুলি, দেখি একটু দূরে খোলা জায়গাটায় গোল হয়ে বসে আছে মানুষের মতো আকৃতির কয়েকজন। অবাক হয়ে তাদের কাছে যাই। মানুষই তারা, কিন্তু কেন যেন মনে হয় কাপড়চোপড়ের ভেতর শরীর নেই কোনো। এটা হওয়ার অবশ্য কারণ নেই। কারণ, ভালো করে খেয়াল করে আমি তাদের মুখগুলো বুঝতে পারি। মানুষেরই মুখ, তবে ঘন কুয়াশার মতো কিছু। তাদের মধ্যে একটা মুখ চিনতে পেরে আমি চমকে উঠি। সেই সম্পাদক, যাঁকে আমার মেরে ফেলার কথা ছিল। মনে হয়, আমি না হলেও আমার সঙ্গীরা মেরে ফেলেছে তাকে, তাদের কারও কাঁধেই হয়তো ছিল তাঁর মৃতদেহ।
সে একটা কুখ্যাত বা আমরা যাকে কুখ্যাত বলি, সে রকম রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল। আমি নিজের হাতে গুলি করে মেরেছিলাম তাকে। সে একটু দূরে গোল হয়ে বসে আছে এখন। আমি কি স্বপ্ন দেখছি এসব! চোখ বন্ধ করে তাই ভাবার চেষ্টা করি।
আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, সেই সম্পাদক বা তাঁর সঙ্গে গোল হয়ে বসে থাকা অন্য কেউ আমার দিকে তাকায় না। তারা এমনকি কারও দিকে বা কিছুর দিকেই তাকিয়ে নেই। আমার এমনই মনে হয়। সারা শরীরে অদ্ভুত সেই হাহাকার টের পাই আবার। গোল হয়ে থাকা মুখগুলোর মধ্যে আরও একজনকে আমি চিনতে পেরেছি। সে একটা কুখ্যাত বা আমরা যাকে কুখ্যাত বলি, সে রকম রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল। আমি নিজের হাতে গুলি করে মেরেছিলাম তাকে। সে একটু দূরে গোল হয়ে বসে আছে এখন। আমি কি স্বপ্ন দেখছি এসব! চোখ বন্ধ করে তাই ভাবার চেষ্টা করি।
আশা করেছিলাম চোখ খুলে দেখব কিছু নেই আমার সামনে। কিন্তু আসলে আছে তারা। আমি তাদের দিকে আরেকটু এগোনোর চিন্তা করামাত্র প্রবল ও আকস্মিক বাতাস আমাকে প্রায় উল্টে ফেলে দেয়। ঠান্ডায় গা কেঁপে ওঠে, পুরো শরীর ভেজা ভেজা মনে হয় হঠাৎ। প্রাণপণে অন্যদিকে ঘুরে দৌড় দিই আমি। মনে হয় এটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কিন্তু দুঃস্বপ্নই যদি হয়, তা শেষ হচ্ছে না কেন তাহলে!
চার
কত দিন পর জানি না, সেই প্রবল হাহাকার করা বনে আমার সঙ্গে ডেভিডের দেখা হয়। ডেভিড বা ডেভিডের মুখের মতো মানুষটা কালো পানির একটা গর্তের পাশে বসে ছিল। সে ছিল আমারই মতো একজন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত। কয়েকটা কাজ ঠিকমতো করে সে জিটলুমের চোখের মণিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এরপর টাকা খেয়ে সে কালো মতাদর্শের একজন মানুষকে ছেড়ে দিয়েছিল। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে জিটলুম ডেকে নিয়ে নিজে হত্যা করে। এ রকম বিশ্বাসঘাতকদের হত্যার পর দেহটা নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয় বিশেষ প্রক্রিয়ায়। সেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় যারা অংশ নিয়েছিল, তার মধ্যে আমার চেনা একজন ছিল। সে নিজের চোখে দেখে আমাকে বলেছিল সব।
কাজেই ডেভিডকে দেখে আমার ভয় পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি কেন যেন ভয় পাই না। পুরোনো একজন সঙ্গীকে দেখে বরং তার পাশে গিয়ে বসি। সে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখে। জিব দুলিয়ে কিসের যেন স্বাদ দেয়। কুমিরটার জিবের কথা মনে পড়ে, কেন যেন গা গুলিয়ে ওঠে।
অম্বিনির বেডরুম থেকে ধুমধাড়াক্কা মিউজিকের শব্দ হচ্ছে। আমার সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তি করার সময় এসব শুনত সে। সেসব কথা মনে পড়ে, এতক্ষণে মনে হয় পরিচিত জায়গায় ফিরে এসেছি। বুকের ভেতর একপলক নরম বাতাস অনুভব করি।
তার ঠোঁট একটুও নড়ে না। তবু সে বলে, আমি তোমাকে খুঁজেছি। কবে এসেছ তুমি এখানে?
এখানে মানে কী ডেভিড! তুমিই–বা কীভাবে এখানে?
আমি এটা বলি বটে। কিন্তু বুঝতে পারি না আমারও ঠোঁট নড়ছে, নাকি নড়ছে না।
ডেভিড ম্লান হাসে। বলে, আমাদের তো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি, কোনো প্রিয়জন প্রার্থনা করেনি। তাই আমরা যেতে পারছি না।
কোথায় যেতে পারছি না?
খুন হওয়ার পর যেখানে যায় মানুষ!
তৃষ্ণায় আমার বুকের ছাতি ফেটে যায়। বুঝতে পারি না এই দুঃস্বপ্ন কতক্ষণ বা কত দিন দেখব আমি। এর মধ্যে ডেভিডই–বা এল কেন!
ডেভিড কী বলেছে, তা অবশ্য বুঝতে পেরেছি। আমি তাহলে খুন হয়েছি, সঙ্গীদের বহন করা একটা মৃতদেহ ছিল আমারই!
সে উবু হয়ে চেটে চেটে গর্তের কালো পানি খাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে দেখি আমিও তা-ই করছি। কিন্তু উবু হয়ে করছি কেন, বুঝতে পারি না। তার মতো আমিও কি জন্তু–জানোয়ারে পরিণত হয়েছি। নাকি সেটাই ছিলাম আগে!
পাঁচ
কয়েকটা উদ্ভ্রান্ত দিন কাটানোর পর আমি খাল পার হয়ে শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। না নিয়ে উপায় থাকে না। সারা দিন আমার বুকের ভেতর হিমশীতল শূন্যতা জমে থাকে, মুখের ভেতর থেকে পচা মাংসের মতো জঘন্য দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। শারীরিক কোনো যন্ত্রণা নেই, কিন্তু এত অদ্ভুত হাহাকার সারা অস্তিত্বে, মনে হয় এর চেয়ে পুরোপুরি মরে গেলে ভালো।
আমি মরে গেছি, অথচ মৃতদের দেশে যেতে পারছি না, এই অনুভূতি আর সহ্য করতে পারি না। ডেভিড বলেছিল, কোনো প্রিয়জন বিদায় জানালে মৃতদের জগতে যেতে পারব। সেখানে ঠিক কী আছে জানি না, কিন্তু মনে হয় এই বন থেকে যেকোনো জায়গায়ই ভালো হবে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে আমাকে প্রিয়জনের সাহায্য নিতে হবে।
আমার প্রিয়জন একজনই আছে, সেটা অম্বিনি। আমার বউ ছিল, সন্তানও ছিল আগে। কিন্তু তাদের আমি ত্যাগ করেছিলাম অম্বিনির চেয়েও রগরগে একটা মেয়ের জন্য। তা ছাড়া আমার স্ত্রীর ভাইটাকে মেরে ফেলা হয়েছিল কালো হওয়ার অপরাধে। সে ছিল পরিবেশকর্মী। আমাদের লাভজনক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বাধা দেওয়াই ছিল তার একমাত্র কাজ। আমি মারিনি তাকে, কিন্তু ঠেকানোর চেষ্টাও করিনি, চেষ্টা করার ক্ষমতা ছিল না আমার। কিন্তু আমার স্ত্রীর পরিবার সেটা বুঝতে চায়নি।
যা–ই হোক, পরিবারের কাছে কিছু টাকা পাঠিয়েছিলাম অনেক দিন আগে। তারা ঘৃণাভরে তা ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমি মরে গেছি জানলে প্রার্থনা না করে বরং উৎসব করার কথা তাদের।
অম্বিনি নিশ্চয়ই সে রকম করবে না। তাকে বলতে হবে আমি মরে গেছি, একটিবার প্রার্থনা করো আমার জন্য। সেটা আমি বলতে পারব কি না জানি না, বললেও সে তা শুনতে পারবে কি না, জানি না। কারণ, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার আসলে দেহ নেই কোনো আর।
তবু আমি গোঁয়ারের মতো খালটা পার হই। আমার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে নানা দিকে ছড়িয়ে যায়। কীভাবে যেন সেগুলো খালের কিনারে আবার জড়ো হয়। আমি তাদের টেনেটুনে বহন করে অম্বিনির বাড়ির সামনে হাজির হই।
অম্বিনি থাকে শহরের ঝলমলে জায়গায়, দোতলায় একটা অ্যাপার্টমেন্টে। লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠি। সিঁড়িতে দুজন মানুষ আমাকে পাশ কাটিয়ে নিচে নামে। তারা আমাকে খেয়াল করে না বা এ রকম না করার ভান করে।
অম্বিনির বাসার দরজার সামনে দাঁড়াই। নিশ্চয়ই অটো স্ক্যানারে সব তথ্য চলে যাচ্ছে অম্বিনির কাছে। সে জানে তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি। তবে সত্যি যদি দেহ না থাকে আমার, তাহলে স্ক্যানও হওয়ার কথা না।
কী করব বুঝতে পারি না। দরজায় টোকা দিব ভাবছি, তখনই তা খুলে যায়। আমি ভেতরে ঢোকার পর নিজেই বন্ধ হয়।
অম্বিনির বেডরুম থেকে ধুমধাড়াক্কা মিউজিকের শব্দ হচ্ছে। আমার সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তি করার সময় এসব শুনত সে। সেসব কথা মনে পড়ে, এতক্ষণে মনে হয় পরিচিত জায়গায় ফিরে এসেছি। বুকের ভেতর একপলক নরম বাতাস অনুভব করি। কত দিন পর হলো এমন!
অম্বিনির রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। তার দরজার ঠিক অন্য পাশে বিছানাটা। সে সেখানে কুকুরের ভঙ্গিতে হামা দিয়ে আছে। তার পেছনে সম্পূর্ণ ন্যাংটো হয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে জিটলুম। তার সারা মুখে ঘাম, ফরসা মুখ লাল হয়ে আছে। আমাকে দেখে সে শরীরের আন্দোলন থামিয়ে শান্তভাবে দুপাশে পা ছড়িয়ে অম্বিনির কোমরের ওপর বসে। ঝুঁকে বিছানা থেকে পিস্তল তুলে নেয়। একমুহূর্ত দেরি না করে গুলি করে।
প্রথম গুলিটা লাগার পর পেছনে ছিটকে যাই। সেই অবস্থায় মাথায় আর মুখে দুটো গুলি খাই। আমার পুরো শরীর বেডরুমের দরজায় অন্য পারে আছড়ে পড়ে। অবাক হয়ে দেখি সেখান থেকে রক্তের মতো কিন্তু ঘন কালো রঙের কী যেন বের হচ্ছে।
বেডরুমের দরজা আবার বন্ধ হয়েছে। সেটা ভেদ করে ধুমধাড়াক্কা মিউজিকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেডরুমের পাশে কমন স্পেসে আমার বিকৃত দেহটা পড়ে আছে। এটা আমি নিজেই দেখছি, আবার মিউজিকের শব্দও শুনছি।
বুঝতে পারি না কী হয়েছে আসলে। আমি কি মরে গেছি? নাকি আরও অনেকবার মরতে হবে আমাকে। যতগুলো মানুষকে মেরেছি, ঠিক ততবার?
নাকি আমি বেঁচে আছি আসলে। হয়তো স্বপ্ন দেখছি এসব। অনন্তকাল এই স্বপ্নই হয়তো দেখতে হবে আমাকে!
কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, বুঝতে পারি না। পুরো শরীর টেনে টেনে বনের দিকে এগোই। বুকের ভেতর তীব্র হাহাকার আরও তীব্র হয়েছে। গলা বেয়ে উঠে আসা পচা গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে। হয়তো নিজের প্রতিটি মৃত্যুর পর এমনই হতে থাকবে।
কিন্তু মৃত্যু কি আসলেই হয়েছে আমার? হাহাকার, দুর্গন্ধ, তীব্র অস্বস্তি ছাপিয়ে শুধু সত্যটা জানতে ইচ্ছা করে।
তবে বুঝতে পারি না আমাদের রাজ্যে সত্য আসলে কী।
প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৪’ থেকে উদ্ধৃত