শেষ ফোনকল

অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

পাঁচ আগস্ট। পড়ার টেবিলে খোলা পড়ে ছিল সাধারণ গণিত খাতাটা। জ্যামিতির একটা ত্রিভুজ অর্ধেক আঁকা, পেনসিলটা খাতার ভাঁজেই রাখা। ঠিক এই ঘরের জানালার বাইরে আগস্টের তপ্ত বাতাস। হইহুল্লোড় আর গুলির শব্দ। কিন্তু ঘরের ভেতরটা কেমন যেন হিমশীতল, কোনো স্পন্দন নেই।

সাদাফ সকালে বেরিয়েছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ছেলেটা এখনো ফিরল না।

সকালবেলা বের হওয়ার সময় বলেছিল, ‘প্রাইভেটে যাচ্ছি। দুপুরের আগেই ফিরে আসব।’ সাদিয়া আক্তার তখন ভাত চাপিয়েছেন। গলা বাড়িয়ে বললেন, ‘দুপুরে এসে ভাত খাবি কিন্তু।’ মনে মনে বললেন, ‘এত অনিয়ম করে! কবে যে বড় হবে!’

খবরের কাগজ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আলতাফ হোসেন। হাত নেড়ে ছেলেকে বিদায় দিয়ে শুধু বলেছিলেন, ‘সোজা বাড়ি ফিরিস, চারদিকের অবস্থা ভালো না।’

সাদাফ হেসেছিল। বলেছিল, ‘একটু দেরি হবে, বাবা। কত দিন ঘরে আটকে রাখবে? শুধু শুধু দুচিন্তা করো।’

চিন্তাহীন অভিব্যক্তি আর তাড়াহুড়া নিয়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আলতাফ সাহেবের বুকটা কেমন জানি করে উঠল।

দুপুর গড়িয়ে বেলা সাড়ে তিনটা। আলতাফ হোসেন একবার টেলিভিশনের স্ক্রিন আর একবার মোবাইল ফোনে খবর স্ক্রল করছিলেন। ছেলের জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। সাদাফের ফোন। আলতাফ হোসেন একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় তুই?’ ওপাশ থেকে ভেসে এল কাঁপা কণ্ঠ, ‘বাবা, বাইপাইল মোড়ের কাছে আছি।’ শব্দের ভেতর অনেক শব্দ। মানুষের দৌড়ঝাঁপ। চিৎকার। হর্ন। আতঙ্ক!

এদিকে দুপুরের পর থেকেই আশুলিয়ার জামগড়া, ইউনিক আর শিমুলতলা এলাকায় মানুষের ঢল নামল। চারদিকে স্লোগান, মানুষের চোখেমুখে অদ্ভুত উত্তেজনা। স্বৈরাচারীর পতন হয়েছে, এ খবর বাতাসে ভাসছে, কিন্তু আশুলিয়া থানার মোড়টা থমথমে।

সাদাফ হাঁপাচ্ছিল। থেমে থেমে বলল, ‘এখানে গুলি হচ্ছে। আমার সামনে একজনের মাথায় গুলি লাগল, আরেকজনের কোমরে, একজনের পেটে...’

আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতর হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। অজানা আতঙ্কে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেলে যেন শিরদাঁড়া বেয়ে। সবকিছু জমাট বেঁধে গেল। ‘তুই ওখানে কেন? এখনই ফিরে আয়।’

‘সব রাস্তা বন্ধ। অনেক মানুষ। চেষ্টা করছি, বাবা। আমি আসব। তুমি চিন্তা কোরো না।’

‘যেভাবেই হোক চলে আয়।’

ওপাশে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। মানুষের আর্তনাদ, তারপর খুব আস্তে একটি শব্দ, ‘আচ্ছা’। যেন মহাকালের ওপার থেকে এল। লাইন কেটে গেল।

আলতাফ সাহেব তখনো জানতেন না, মানুষের জীবনে এমন কিছু শব্দ থাকে, যেগুলো উচ্চারণের মুহূর্ত দ্রুত শেষ হয়ে যায়, কিন্তু প্রতিধ্বনি থেকে যায় সারা জীবন। তিনি আবার ফোন করলেন। ধরল না। আরেকবার করলেন। নাহ! বিকেল গড়াল। সন্ধ্যা। রাত। বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করতে থাকলেন আলতাফ সাহেব। ফোনের ওপাশ থেকে কেবল একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ বারবার জানাতে লাগল, সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাতটা ছিল অপেক্ষার। প্রতিবার গেটের সামনে গাড়ির শব্দ হলেই তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। দূরে কোনো কিশোরের কণ্ঠ শুনলেই মনে হয়েছে, ছেলে ফিরেছে। রান্নাঘরে ভাত ঠান্ডা হয়েছে, সাদাফের জন্য থালা সাজানোই রইল।

এদিকে দুপুরের পর থেকেই আশুলিয়ার জামগড়া, ইউনিক আর শিমুলতলা এলাকায় মানুষের ঢল নামল। চারদিকে স্লোগান, মানুষের চোখেমুখে অদ্ভুত উত্তেজনা। স্বৈরাচারীর পতন হয়েছে, এ খবর বাতাসে ভাসছে, কিন্তু আশুলিয়া থানার মোড়টা থমথমে।

সাদাফকে পাওয়া গেছে। তবে সে আর ফিরবে না। ভিডিওর ওই জ্বলন্ত ভ্যানে, লাশের স্তূপের একদম নিচে ঝুলে থাকা পা দুটো সাদাফের। পরনের ব্লু জিনসের সঙ্গে স্কাই ব্লু শার্টটি সাদাফকে কিছুদিন আগেই কিনে দিয়েছিলেন আলতাফ সাহেব। আগুনে সেই প্যান্ট তখন পুড়ছিল। একপর্যায়ে পুরো শরীর কয়লা হয়ে যায়।

বাতাসটা ভারী হয়ে আসছিল বারুদের ধোঁয়ায়, থানার মোড়ের পিচঢালা রাস্তাটা তেতে ছিল অদ্ভুত হিংস্রতায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে অবস্থান করেন পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায়। বেলা একটার দিকে তাঁরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়েন। সে সময় তাঁর সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশ একত্র হয়ে বাইপাইল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করে। ২০-২৫ জন ছাত্র-জনতা নিহত হয় এবং অনেকেই আহত হয়। বেলা দুইটার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল, ‘প্রধানমন্ত্রী পালিয়েছেন’। চারদিক থেকে মুহুর্মুহু মিছিল। তিনটার দিকে থানার মোড়ে যখন মিছিল পৌঁছাল, চারদিক হঠাৎ কেঁপে উঠল সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলির শব্দে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ মিছিলটা রূপ নিল নরকে। সাদাফ দৌড়ানোর সুযোগ পেল না। একটা তপ্ত সিসার বুলেট এসে বিঁধল তার বুকে। পিচঢালা রাস্তায় ফুটে উঠল তার তাজা রক্ত।

সন্ধ্যার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। একটা রিকশা ভ্যান। তার ওপর স্তূপ করে রাখা মানুষের লাশ। হাত-পাগুলো ঝুলে আছে জড়বস্তুর মতো। পুলিশের পোশাকে কয়েকজন সেই লাশের ওপর আরও লাশ ছুড়ে ফেলছে। যেন তারা মানুষ নয়, আবর্জনা। এরপর সেই তাজা লাশের স্তূপে ঢেলে দেওয়া হলো পেট্রল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। ছয়টি লাশ পলিথিনের প্যাকেটে করে মসজিদের কাছে ফেলে রাখা হলো। স্থানীয় লোকজন লাশগুলোর জানাজা পড়ালেন।

আলতাফ সাহেব বারবার দরজা খুলে বাইরে তাকিয়েছেন। রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে। আবার ফোন এল। অচেনা একটি নম্বর। ওপাশের মানুষটি অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নিজের পরিচয় দিলেন। তাঁর কিছুই কানে গেল না। আলতাফ সাহেব শুধু একটি প্রশ্ন করলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে?’

ওপাশে নীরবতা। তারপর এমন একটি উত্তর, যার পরে পৃথিবীর সব শব্দ অর্থহীন হয়ে যায়।

সাদাফকে পাওয়া গেছে। তবে সে আর ফিরবে না। ভিডিওর ওই জ্বলন্ত ভ্যানে, লাশের স্তূপের একদম নিচে ঝুলে থাকা পা দুটো সাদাফের। পরনের ব্লু জিনসের সঙ্গে স্কাই ব্লু শার্টটি সাদাফকে কিছুদিন আগেই কিনে দিয়েছিলেন আলতাফ সাহেব। আগুনে সেই প্যান্ট তখন পুড়ছিল। একপর্যায়ে পুরো শরীর কয়লা হয়ে যায়।

আজকের সকালটাও সেদিনের মতোই। বাইরে তপ্ত হাওয়া। আলতাফ সাহেব পরে বহুবার চেষ্টা করেছেন সেই শেষ ফোনকল মনে করতে। ভাবতে চাইছিলেন, ছেলেটি কি আরও কিছু বলতে চেয়েছিল? মাকে? বড় ভাইকে? হয়তো বলতে চেয়েছিল, ‘আমি বাড়ি ফিরছি।’ আজও সেই পুরোনো ফোন আলমারির একটি ড্রয়ারে রাখা আছে। মাঝেমধ্যে চার্জ দেন। ফোনটি হাতে নিয়ে কললিস্ট খুলে দেখেন।

দুই বছর পার হয়ে গেছে। পড়ার টেবিলের ওপর জ্যামিতির খাতাটা ওভাবেই পড়ে আছে। সাদাফের আঁকা অর্ধেক ত্রিভুজটা আর কোনো দিন পূর্ণতা পাবে না। সাদিয়া আক্তার সেগুলো পরিষ্কার করে আগের জায়গায় রাখেন। ছেলে ফিরে আসে না। তবে কান পাতলে আশুলিয়ার বাতাসে এখনো যেন একটা চঞ্চল কণ্ঠস্বর শুনতে পান: ‘মা, আমি আসছি।’

পরক্ষণেই হুহু করে ওঠে তার বুকটা।

আজকাল রাতে ভালো ঘুম হয় না সাদিয়ার। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে একটি দানবীয় দৃশ্য। সাদাফকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে একটা ভ্যানের ওপর। তার পিঠের ওপর এসে পড়ল আরও একটা ভারী শরীর। তার ওপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। লাশের স্তূপে চাপা পড়েছে সাদাফ। তার পা ঝুলে আছে ভ্যানের বাইরে। নীল প্যান্টটা রক্তে জবজবে।

‘পেট্রল ঢালো! জলদি করো!’ একটা কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে বাজতে থাকে।

সাদিয়ার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। তিনি চিৎকার করে কাঁদতে চান, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে ওঠেন। বড় আদরের ছেলেটা। কখনো গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দেননি। অথচ পুলিশ তাকে এমনভাবে পোড়াল যে জড়িয়ে ধরার মতো কোনো অবয়বও বাকি রাখল না। শেষবারের মতো ছেলেটাকে আদর করতে না পারার আক্ষেপটা থেকেই গেল।

আজকের সকালটাও সেদিনের মতোই। বাইরে তপ্ত হাওয়া। আলতাফ সাহেব পরে বহুবার চেষ্টা করেছেন সেই শেষ ফোনকল মনে করতে। ভাবতে চাইছিলেন, ছেলেটি কি আরও কিছু বলতে চেয়েছিল? মাকে? বড় ভাইকে? হয়তো বলতে চেয়েছিল, ‘আমি বাড়ি ফিরছি।’ আজও সেই পুরোনো ফোন আলমারির একটি ড্রয়ারে রাখা আছে। মাঝেমধ্যে চার্জ দেন। ফোনটি হাতে নিয়ে কললিস্ট খুলে দেখেন।

একটি নাম এখনো সেখানে জ্বলজ্বল করে; সাদাফ । কললিস্টে ছেলের নামের পাশে লেখা— ‘শেষ কল’। তিনি নম্বরটিতে কল দেন। ওপাশে কেউ সাড়া দেয় না। তারপর তিনি ফোনটি নিঃশব্দে বন্ধ করে আলমারিতে রেখে দেন।