আজাদ সাহেবের নোটিশ

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আজকের সকালের আলোটা যখন জানালার কাচে কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকবে, তখন রুমে বসে থাকা আজাদ সাহেবের কাছে আলোটা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠবে। যেভাবে ড্রিল মেশিন ছিদ্র করে কংক্রিটের দেয়াল, সেভাবে ভারী আলোটা যেন তার মস্তিষ্কের ভেতর ধীরে ধীরে অথচ প্রচণ্ড শব্দ তুলে প্রবিষ্ট হতে থাকবে। আজাদ সাহেব বসে থাকবেন নিজের ডেস্কে। চোখের সামনে থাকবে ফাইলের স্তূপ—লাল-সবুজ-নীল। প্রতিটি ফাইল যেন আজাদ সাহেবকে আলাদা করে কিছু বলতে চাইবে অথবা প্রতিটি ফাইল আজাদ সাহেবকে যেন একই কথা বলতে চাইবে।

লাল ফাইলটি বলতে চাইছে: ‘আজাদ, তুমি অপরাধী।’

সবুজ ফাইলটি বলতে চাইছে: ‘আজাদ, তুমি অপরাধী।’

নীল ফাইলটি বলতে চাইছে: ‘আজাদ, তুমি অপরাধী।’

কেন এমনটা মনে হচ্ছে আজাদ সাহেবের?

হচ্ছে, কারণ, আজ অফিসে ঢুকতেই দারোয়ান তাঁকে প্রতিদিনের মতো সালাম দেবে না, বরং তাঁকে ইশারায় কাছে ডাকবে। দারোয়ানের হাতে একটি নোটিশ। নোটিশে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘আজাদ: সন্দেহভাজন। তদন্ত চলছে।’

আজাদ সাহেব কিছু ভেবে পাবেন না, তবু ভাববেন। ভাববেন তাঁর অপরাধ কী? কেন তিনি সন্দেহভাজন? কীসের তদন্ত?

আজাদ সাহেব নিজেকে প্রবোধ দেবেন। তিনি তো প্রতিদিন নিয়মমতো অফিস করেন। নির্দিষ্ট সময়ে আসেন, নির্দিষ্ট সময়ে যান, মন দিয়ে কাজ করেন। তাহলে এই নোটিশ কেন?

সকাল সকাল নোটিশ পেয়ে আজাদ সাহেবের ধমনি একটু পরপর কেঁপে কেঁপে উঠবে।

আড়চোখে একেকজন সহকর্মীর দিকে তাকাবেন। সবার চোখে এক অজানা আতঙ্ক। সবার চোখে এক অজানা কৌতূহল। আজাদ সাহেবের পাশের নারী সহকর্মী অদিতি চক্রবর্তী। তিনি ফিসফিস করে বলবেন, ‘তুমি তো এইবার শেষ।’

তারপরও তিনি অফিসে ভেতর অবধি ঢুকবেন। দোতলায় নিজের রুমে যাবেন। রুমের ডান কোনায় নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসবেন। আড়চোখে একেকজন সহকর্মীর দিকে তাকাবেন।

সবার চোখে এক অজানা আতঙ্ক।

সবার চোখে এক অজানা কৌতূহল।

আজাদ সাহেবের পাশের নারী সহকর্মী অদিতি চক্রবর্তী। তিনি ফিসফিস করে বলবেন, ‘তুমি তো এইবার শেষ।’

পূর্বপরিচয়ের সূত্রে অদিতির সঙ্গে তাঁর সখ্য থাকবে। এ জন্য অদিতি তাঁকে তুমি করে সম্বোধন করে থাকেন। আজাদ সাহেব অবশ্য তাঁকে অফিসে আপনি আর বাইরে তুমি বলেন।

অদিতির কথায় আজাদ সাহেব তাকাবেন।

‘শেষ মানে?’

অদিতি কাঁধ ঝাঁকাবেন, বলবেন, ‘এখানে কেউ শেষের কবিতা বোঝে না। শুধু বোঝে, তালিকায় নাম উঠলেই মানুষটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।’

আজাদ সাহেব খুব অবাক হবেন এবং অদিতির দিকে অবাক চোখে তাকাবেন, যেন তিনি বলতে চাইবেন—অদৃশ্য? কোথায় যায় তারা?

আসলে তিনি এসবের কিছুই বলতে পারবেন না।

অদিতির কথায় অদ্ভুত এক ঠান্ডা কুয়াশা আজাদ সাহেবের বুকের ভেতরে ছড়িয়ে পড়বে। সংবিৎ ফিরে পেয়ে তিনি নিবিষ্ট হতে চাইবেন তাঁর ডেস্কে, কিন্তু পারবেন না। ফাইলগুলো অদ্ভুত আচরণ শুরু করবে। তিনি দেখবেন যে কখনো লাল ফাইলটি ডানে যাচ্ছে আবার কখনো নীল ফাইলটি। সবুজ ফাইলটি নিজেকে খুলছে আবার বন্ধ করছে। একি কাণ্ড! আজাদ সাহেব নিজের চেয়ারটি একটু টেনেটুনে নতুন করে বসতে চাইবেন। টানতে গিয়ে দেখবেন চেয়ারটিকে কিছুতেই নড়ানো যাচ্ছে না।

লাঞ্চ ব্রেকের ঠিক আগে আগে আজাদ সাহেবকে ডেকে পাঠানো হবে ‘ওপরের কক্ষে’।

আসলে কেউ জানে না ওপরের কক্ষটা ঠিক কোথায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তিনি গুনতে পারবেন না আসলে কতগুলো ধাপ উঠেছেন। প্রতিটি ধাপ যেন বারবার ঘুরে আসছে, যেন তিনি আসলে একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন।

দরজার হাতলে হাত রাখবেন। হাতলটা কী ঠান্ডা! চাপ দিতেই মনে হবে কেউ যেন তাঁর গলা চেপে ধরছে। ভেতরে ঢুকতেই মনে হবে কেমন যেন কুয়াশা কুয়াশা আলো। প্রথমেই চোখে পড়বে দীর্ঘ একটা কাচের টেবিল। এত বড় কাচের টেবিল আজাদ সাহেব এর আগে কখনো দেখেননি। কুয়াশা কুয়াশা আলোর মধ্যে তিনি দেখবেন, টেবিলের চারপাশে কিছু মানুষ বসে আছে। কুয়াশা কুয়াশা আলোর মধ্যে মানুষগুলোর মুখ দেখা যাচ্ছে না অথবা আজাদ সাহেবের মনে হবে, মানুষগুলোর আসলে কোনো মুখই নেই।

একটা কণ্ঠ ভেসে আসবে, ‘আপনার অপরাধের ব্যাখ্যা দিন।’

আজাদ সাহেব কেঁপে উঠবেন, বলবেন, ‘কিন্তু আমি তো জানি না আমার অপরাধ কী।’

আজাদ সাহেবের অফিসে বেশ কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়মগুলোর একটি হচ্ছে অফিসে কোনো ব্যক্তিগত কাজ করা যাবে না। অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিগত লেখালেখি করা যাবে না।

মুহূর্তে টেবিলের ওপর লাল, নীল, সবুজ ফাইলের পাহাড় নড়েচড়ে উঠবে। তার আশ্চর্য লাগবে এই ভেবে যে টেবিলের এই ফাইলগুলো তার কেন আগে চোখে পড়েনি। একটি ফাইল হঠাৎ খুলে যাবে, ভেতরে দেখা যাবে তাঁরই হাতের লেখা। অথচ তিনি মনে করতে পারবেন না কখন তিনি এগুলো লিখেছিলেন। সেখানে লেখা: ‘আমি দোষী।’

আজাদ সাহেব স্তম্ভিত হবেন। এ লেখা তিনি লিখলেন কবে?

আবার একটা কণ্ঠ ভেসে আসবে, ‘আপনি ইতিমধ্যে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। আর কিছু বলার আছে আপনার?’

আজাদ সাহেবের মাথাটা যেন ঘুরে যাবে। যেন দাঁড়ানো থেকে হুট করে পড়ে যেতে থাকবেন।

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার অপরাধটা কী?’

তখন রুমের সবগুলো কণ্ঠ যেন একসঙ্গে হাসতে শুরু করবে।

হা হা হা। হি হি হি। আবার ঠিক যেন হাসিও না। যেন কর্কশ শব্দ, যেন পুরোনো কোনো দরজার কবজা কেঁপে কেঁপে ওঠার আওয়াজ।

কতক্ষণ পর তা ঠিক জানা যাবে না, হতে পারে পনেরো মিনিট বা ত্রিশ মিনিট বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট, আজাদ সাহেব ফেরত আসবেন তাঁর ডেস্কে। সহকর্মীরা এখন আর কেউ তাকাবেন না, কেউ কথা বলবেন না।

আজাদ সাহেব বুঝতে পারবেন, যখন অফিসে মানুষ থাকে না অথবা থেকেও না থাকার মতো করে থাকে তখন ফাইলগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ফাইলগুলো তখন একেকজন ব্যক্তি হয়ে যায়। তিনি একটি ফাইলের ওপর হাত রেখে বলবেন, ‘আমি কি এখানে একা?’

যেন আশপাশের কেউ শুনতে না পায়, অমন করে ফিসফিসিয়ে ফাইলটি কিছু একটা বলবে তাঁকে।

আজাদ সাহেবের অফিসে বেশ কিছু নিয়ম আছে। সেই নিয়মগুলোর একটি হচ্ছে অফিসে কোনো ব্যক্তিগত কাজ করা যাবে না। অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিগত লেখালেখি করা যাবে না। এমনকি অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ই–মেইল চালাচালিও করা যাবে না। এমনটা করা হলে বা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিস্বরূপ তাঁকে অফিসের দারোয়ানের দায়িত্ব পালন করতে হবে। অপরাধের মাত্রা ভেদে সেটা হতে পারে তিন দিন, সেটা হতে পারে ছয় দিন, সেটা হতে পারে নয় দিন, সেটা হতে পারে আরও বেশি।

আজাদ সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। তিনি অফিসে বসে গল্প লেখেন। সেই গল্প পত্রিকায় প্রকাশ হয়। অফিসেরই কেউ একজন এই অভিযোগ লিখিত আকারে অভিযোগ বাক্সে জমা দিয়েছেন। বলে রাখা দরকার, এই অফিসে একটা অভিযোগ বাক্স আছে। যে কেউ যেকোনো অভিযোগ লিখিত আকারে সেখানে জমা করতে পারেন। যেহেতু নিয়ম থাকবে, অভিযোগপত্রে নাম-পদবি উল্লেখ করা যাবে না; তাই কে কোন অভিযোগ কার বিরুদ্ধে দিচ্ছেন, তা প্রমাণ করার উপায় থাকবে না। একটা দিক দিয়ে অবশ্য প্রমাণ করা যায়, তা হলো হাতের লেখা দিয়ে; কিন্তু হাতে লেখা অভিযোগ জমা দেওয়া জরুরি নয়, মানে আপনি প্রিন্ট কপিও জমা দিতে পারবেন।

আজাদ সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যর একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার জন্য কমিটিকে তিন দিন সময় দেওয়া হবে। একটা নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরি করতে ওই কমিটি যারপরনাই সচেষ্ট থাকবে। তারা গলদঘর্ম হয়ে উঠবে, কেননা কমিটির তিন সদস্য ভেবে পাচ্ছেন না, আজাদ সাহেব যে গল্পগুলো লিখেছেন এবং পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তার কত অংশ অফিসে লেখা হয়েছে বা কত অংশ বাড়িতে লেখা হয়েছে অথবা কত অংশ বাসা থেকে অফিসে আসার পথে বা অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে মোবাইলে লেখা হয়েছে। তবে তাঁরা এটুকু নিশ্চিত যে ওই সব গল্পের কিছু-না-কিছু অংশ অফিসে লেখা হয়ে থাকবে অথবা অফিসে এডিট হয়ে থাকবে অথবা গল্পগুলো অফিসটাইমে পত্রিকায় মেইল করা হয়ে থাকবে। অফিসটাইমে পার্সোনাল লেখালেখি বা পার্সোনাল মেইল করা অপরাধ হিসেবে গণ্য। অফিসের নিয়োগশর্তে তেমনটাই বলা আছে। আজাদ সাহেব এসব নিয়মের সবটুকু অবশ্যই জানতেন।

আজাদ সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। তিনি অফিসে বসে গল্প লেখেন। সেই গল্প পত্রিকায় প্রকাশ হয়। অফিসেরই কেউ একজন এই অভিযোগ লিখিত আকারে অভিযোগ বাক্সে জমা দিয়েছেন। এই অফিসে একটা অভিযোগ বাক্স আছে।

অপরাধের মাত্রা বুঝতে না পারার জন্য শাস্তির মেয়াদ নিয়েও জটিলতা দেখা দেবে। তবে আপাতত আজাদ সাহেবকে দারোয়ানের কাজ করতে হচ্ছে। কত দিন করতে হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

আজাদ এখন দারোয়ান। আজাদ এখন আর সাহেব না। তাকে এখন শুধুই আজাদ বলা যাবে। চাইলে মিয়াটিয়া কিছু একটা যোগ করা যাবে। তবে তা জরুরি নয়।

দারোয়ানের কাজটা আজাদের খারাপ লাগবে না। আজাদের অবশ্য কোনো কিছুতেই তেমন একটা খারাপ লাগে না। বরং জীবনকে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখতেই তার ভালো লাগে। দারোয়ানের কাজটা তেমন তো কোনো কাজ না। কেউ এলে গেট খুলে দেওয়া আর সালাম দেওয়া। এই তো। গেট বেশির ভাগ সময় খোলাই থাকে। খোলা মানে ভেজানো থাকে আরকি, ওটাকে খোলাই বলা যায়। অপরিচিত কেউ এলে বরং একটু বাড়তি কথা খরচ করতে হয়। অপরিচিতকে জিজ্ঞেস করতে হয় কার কাছে যাবেন বা কখনো আরেকটু বাড়তি কথা খরচ করা লাগে, কী জন্য যাবেন। শুধু একটা বিষয় পাল্টে যাবে, আগে সে অফিসে ঢুকলে যাঁরা সালাম জানাতেন এখন তাঁরা অফিসে ঢুকলে উল্টো তাকে সালাম জানাতে হয়। এটাই নিয়ম।

এই যে সে দারোয়ান হয়েছে, এখন অফিসটাকে তার অন্য রকম লাগছে।

এই যে সে এখন দারোয়ান হয়েছে, এখন অফিসের মানুষগুলোকে তার অন্য রকম লাগছে।

এমনকি অফিসের এই পুরোনো ধাঁচের বিল্ডিংটার যে আলাদা এক সৌন্দর্য আছে এত দিন সে তা জানতে পারেনি। দারোয়ান হওয়ার পর বিল্ডিংটার সৌন্দর্য তার কাছে ধরা দেবে বৈকি।

সে অবশ্য দারোয়ানের কাজটা উপভোগই করবে। এখানে তেমন একটা কাজ না থাকায় সাহিত্য নিয়ে অনেক বেশি ভাবতে পারবে সে। গল্পের অনেক প্লট আসবে মাথায়। সপ্তাহ না যেতেই সে দেখবে, তার গল্প লেখার আইডিয়া ক্রমেই বাড়ছে। আগে অফিসের অন্যান্য কাজের চাপে যা তার মাথায় আসত না বা এলেও কম, এখন তা আসছে সহজেই আর অঢেল। শুধু যদি এখানে বসে বই পড়ার অনুমতিটা থাকত তাহলে আর কোনো কষ্ট ছিল না; অথবা তার যদি একটা কম্পিউটার থাকত নেট লাইনসহ, তা–ও হতো। বসে বসে অযথা তার সময় কাটছে অথচ বই পড়তে পাড়ছে না অথবা কম্পিউটার চালাতে পারছে না এই কষ্টটা তাকে পীড়া দেবে বৈকি। তখন তখনই আজাদের মনে এই প্রশ্নের উদয় হবে যে বাংলাদেশে যারা দারোয়ানের চাকরি করে তারা কি অফিস টাইমে বই পড়ার অথবা কম্পিউটার চালানোর সুবিধাটা পায়? দারোয়ানের কাজে কি আসলে সময়ের অপচয় হচ্ছে না? দারোয়ানদের সময়কে আরও কীভাবে ফ্রুটফুল করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকবে আজাদ।

এভাবেই কিছুদিন যাবে; হয়তো তিন দিন, হয়তো ছয় দিন, হয়তো নয় দিন।

এই সব দিনের কোনো একদিন হুট করেই আজাদের স্ত্রীর আগমন ঘটবে অফিসে। ছেলেকে নিয়ে সে তার এক খালার বাসায় আসবে, কেননা সেই খালা গুরুতর অসুস্থ এবং যেকোনো সময় তিনি এক্সপায়ার করতে পারেন। বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ আজাদের স্ত্রীর মনে হবে, আজাদকে একটু সারপ্রাইজ দেওয়া যাক। সম্ভব হলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাকে সঙ্গে করে আজ একটু আগেভাগে বাসায় ফেরা হোক। অতএব আজাদকে না জানিয়ে তার অফিসে আসবেন।

আজাদের স্ত্রী অফিসটা চিনতে পারবেন, যদিও তিনি এর আগে কখনো আসেননি। আজাদের স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে হাসি হাসি মুখে অফিসে ঢুকবেন। আজাদ যথারীতি টুলে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়বে এবং সালাম জানাবে। আজাদকে এ অবস্থায় দেখে তার স্ত্রী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাবেন। কারণ, আজাদের স্ত্রী জানেন, তাঁর স্বামী এই অফিসের একটি ডিপার্টমেন্টের হেড। আজাদের স্ত্রীর মাথায় সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নের উদয় হবে।

আজাদ কেন দারোয়ান হতে যাবে?

আজাদ কি তাহলে এত দিন দারোয়ানের চাকরিই করে আসছে?

আজাদ কেন এই তথ্য এত দিন তাঁকে জানায়নি?

আজাদের স্ত্রী কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারবেন না। তাঁর মনে হবে, তিনি হয়তো কোনো ভুল অফিসে ঢুকে পড়েছেন। তৎক্ষণাৎ আজাদের স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে অফিস ত্যাগ করবেন। ফিরে যাওয়ার সময় আজাদের স্ত্রী একবারও পেছন ফিরে তাকাবেন না, কিন্তু আজাদ একদৃষ্টে তাঁদের গমনের দিকে তাকিয়ে থাকবে, যতক্ষণ না এক অফিস সহকারী তার সামনে এসে উপস্থিত হবে এবং একটি নোটিশ ধরিয়ে দেবে, ঠিক ততক্ষণ।

আজাদের হাতে নোটিশ। সে নোটিশটি পড়ার চেষ্টা করবে; কিন্তু পারবে না। সে দেখবে, তার চারপাশটা যেন ক্রমেই আলোর কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। হাতের আঙুলগুলো এক এক করে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে কড়ে আঙুলটা মিলিয়ে গেল। তারপর তর্জনী। আজাদ নিজের দিকে একবার তাকাবে, আরেকবার নোটিশের দিকে। একটি হলুদ কাগজ। হ্যাঁ, হলুদই তো। কাগজের ওপর গোটা গোটা সুতন্বী ফন্টে লেখা। লেখাটা পড়তে চেষ্টা করবে; কিন্তু পড়তে পারবে না। আরেকবার ট্রাই করবে। পারবে না। আরেকবার ট্রাই করবে। এবারও পারবে না। আজাদ বুঝতে পারবে না কেন এমন হচ্ছে। তার চোখ কি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে? লেখাগুলো কি মুছে যাচ্ছে? নাকি সে নিজেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে?