সৈনিকের স্বপ্ন

এআইয়ের সহযোগিতায় অলংকরণ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আড্ডাঘরের কোণে রাখা পুরোনো লণ্ঠনটা মাঝে মাঝেই একটু কেঁপে উঠছে। তেলের অভাব নাকি বাতাসের ঝাপটা, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমরা জনা সাতেক মানুষ আষ্টেপৃষ্ঠে গোল হয়ে বসে আছি। বাইরের অন্ধকারটা আজ বড্ড বেশি জমাট। কেউ একজন দেশলাই জ্বালিয়ে ধরাল, সেই এক মুহূর্তের আলোয় দেখলাম সবার চোখ আমার দিকে। কারণ, এবার আমার গল্পের পালা।

আমি গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিলাম। আজ কোনো হালকা চালের গল্প নয়, আজ এক গভীর ক্ষত আর একটা অদ্ভুত উন্মাদনার গল্প শোনাব। শোনো তবে। সেই সীমান্তরেখার গল্প।

জায়গাটা এমন যে ম্যাপে দেখলে মনে হবে একটা সরু পেনসিলের আঁচড়। কিন্তু বাস্তবে ওটা একটা অনন্ত নরক। মাইলের পর মাইল কাঁটাতার। একদিকে ধূসর পাহাড়, অন্যদিকে শুকনো পাথুরে জমি। সেই মাঝখানের শূন্যরেখায় দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। তারা মানুষ নাকি প্রস্তরীভূত কোনো মূর্তি, তা দূর থেকে বোঝা দায়। তাদের পরনে ভারী উর্দি, হাতে ধরা স্টেনগান। সেই গান-ব্যারেলের নল একে অপরের হৃৎপিণ্ড বরাবর স্থির। আজ না, কাল না—বহু যুগ ধরে তারা এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য পলক পড়ে না, এক ইঞ্চি নড়ে না।

আচ্ছা, তারা কি কখনো ক্লান্ত হয় না? ওদের কি মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষটার নাম জানতে ইচ্ছা হয় না, গল্প শুনতে ইচ্ছা করে না সীমান্তের ওই পাড়ের? তপন জিজ্ঞেস করল। ওর গলার স্বরটা আজ খানিকটা রুক্ষ।

আমি নীরস জবাব দিলাম—ক্লান্তি? ক্লান্তি তো মানুষের হয়। কিন্তু যারা সীমানা পাহারা দেয়, তারা তো তখন আর মানুষ থাকে না, তারা হয়ে যায় রাষ্ট্রের একটা অংশ। এরপর আবার গল্পে ফিরে যাই—অয়ন দাঁড়িয়ে ছিল উত্তরের দিকে। তার চোখের মণিতে লালচে আভা। সে শুধু জানে, ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার পরম শত্রু।

আর দাউদ দাঁড়িয়ে ছিল দক্ষিণ দিকে। সে জানে, এই লোকটা সুযোগ পেলেই তার দেশের মাটিতে পা রাখবে। ঘৃণাটা তাদের রক্তে মিশে আছে তাদের পোশাকের বুননের মতো। মগজের কোষে কোষে ঘৃণার চাষ করে তারা সব সময়।

এআইয়ের সহযোগিতায় অলংকরণ
আমি বললাম—না। তারা এক পা এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। মনে হলো অদৃশ্য কোনো পাথর তাদের পা দুটো মাটির সঙ্গে আটকে রেখেছে। রাষ্ট্রের আইন, কোর্ট মার্শাল, আর দেশপ্রেমের সেই ভয়ংকর ভার তাদের ঘাড় চেপে ধরল। তারা আবার পাথরের মতো অনড় হয়ে গেল। এভাবে বছরের পর বছর কেটে গেল। অয়ন আর দাউদ বুড়ো হলো। তাদের জায়গায় নতুন রক্ত এল। কিন্তু কী বিচিত্র ব্যাপার! নতুন যে প্রহরীরা এল, তাদের মনেও ঠিক একদিন, ওই একই সময়ে ওই একই প্রশ্নটা জেগে উঠল। কেন আমরা শত্রু?

কিন্তু একদিন, ঠিক দুপুর বারোটা তেইশ মিনিটে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল। আকাশটা হঠাৎ একদম নীল হয়ে গেল। কোনো মেঘ নেই, কোনো পাখির ডাক নেই। এক গভীর নিস্তব্ধতা। অয়নের মনে হলো, তার কানের ভেতর কেউ যেন খুব জোরে একটা ঘণ্টা বাজিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে ওপাশের দাউদের চোখের দিকে তাকাল। একটা প্রশ্ন তার মাথার ভেতরে পোকার মতো কামড়াতে শুরু করল—‘আমি কেন এখানে? ও কেন ওখানে? আমাদের মাঝখানে এই লোহার কাঁটাতার কেন? কাঁটাতারের ওপারের মানুষটি সত্যিই কি আমার শত্রু?’

ঠিক একই সময়ে, ঠিক একই সেকেন্ডে দাউদের মস্তিষ্কেও সেই একই ভাবনা হানা দিল। সে ভাবল, ‘এই মানুষটার তো আমার মতোই দুটো হাত, দুটো চোখ। ওর বুটের নিচেও ধুলো জমছে, আমার বুটের নিচেও। তবে কেন আমরা একে অপরের রক্ত নিতে উদ্‌গ্রীব? ওপাশের মানুষটা আমার কী ক্ষতি করেছে?’

তারপর? তারা কী কথা বলল? এবার প্রশ্ন করল নীলু। তার কপালে হালকা ঘাম দেখা দিয়েছে। ঘরের ভেতর টেনশনটা যেন চুইয়ে পড়ছে—আমি কিছুটা আঁচ করতে পেরে গল্পটা আরও টান টান করে ফেললাম।

আমি বললাম—না। তারা এক পা এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। মনে হলো অদৃশ্য কোনো পাথর তাদের পা দুটো মাটির সঙ্গে আটকে রেখেছে। রাষ্ট্রের আইন, কোর্ট মার্শাল, আর দেশপ্রেমের সেই ভয়ংকর ভার তাদের ঘাড় চেপে ধরল। তারা আবার পাথরের মতো অনড় হয়ে গেল। এভাবে বছরের পর বছর কেটে গেল। অয়ন আর দাউদ বুড়ো হলো। তাদের জায়গায় নতুন রক্ত এল। কিন্তু কী বিচিত্র ব্যাপার! নতুন যে প্রহরীরা এল, তাদের মনেও ঠিক একদিন, ওই একই সময়ে ওই একই প্রশ্নটা জেগে উঠল। কেন আমরা শত্রু? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, শুধু আছে বন্দুকের শীতল নল। দিন যায়, দশক যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে।

এআইয়ের সহযোগিতায় অলংকরণ
আমি বলতে থাকলাম—রণবীর আর ইমতিয়াজ বুঝতে পারল, এই সমস্যার কোনো সমাধান এই পৃথিবীতে নেই। সমাধান আছে কেবল সীমান্তে। তারা একে অপরের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে এক নিদারুণ পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ তারা আবার নিজের অবস্থানে ফিরে গেল। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে পরম শান্তিতে রাইফেল উঁচিয়ে ধরল।

কিন্তু আজ যা হলো, তা আগে কখনো হয়নি। আজ সীমান্তে দাঁড়িয়ে ছিল রণবীর আর ইমতিয়াজ। দুজনই টগবগে তরুণ। তাদের রক্তে বিদ্রোহ। রণবীর হঠাৎ রাইফেলটা ঝটকা দিয়ে নিচে নামিয়ে রাখল। এই দৃশ্য দেখে ইমতিয়াজের আঙুল ট্রিগারে স্থির হয়ে গেল। কিন্তু সে গুলি চালাল না। রণবীর এক কদম এগোল। তারপর আরও এক কদম। সে এখন ঠিক জিরো পয়েন্টে। ইমতিয়াজও সম্মোহিতের মতো এগিয়ে এল। রণবীর ইমতিয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাকে কেন শত্রু ভাবছ ইমতিয়াজ?’

ইমতিয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘আমি আমার দেশকে রক্ষা করছি। দেশকে ভালোবাসা মানেই তো শত্রুকে বিনাশ করা। তুমি কেন দাঁড়িয়ে আছ?’

রণবীর একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল একবুক জ্বালা। সে বলল, ‘আমিও আমার দেশকে রক্ষা করছি। কিন্তু ইমতিয়াজ, একটা কথা বলো তো—তুমি কি চাও না তোমার দেশটা বড় হোক? আরও বড় হোক তোমার দেশের মানচিত্র?’

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলল, ‘অবশ্যই চাই। আমার দেশের মাটি যেন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তুমিও কি চাও না প্রতিবেশীকে শত্রু না ভাবতে? এই রোজকার টেনশন, এই অনিশ্চিত মৃত্যু—এসব কি তোমার ভালো লাগে?’ রণবীরের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে ধরা গলায় বলল, ‘লাগে না। একদম ভালো লাগে না। কিন্তু উপায় কী?’

আড্ডার সবাই তখন রুদ্ধশ্বাসে শুনছে। কারও হাতের সিগারেট পুড়ে ছাই হয়ে আঙুলের কাছে চলে এসেছে, কিন্তু খেয়াল নেই। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেছে।

আমি বলতে থাকলাম—রণবীর আর ইমতিয়াজ বুঝতে পারল, এই সমস্যার কোনো সমাধান এই পৃথিবীতে নেই। সমাধান আছে কেবল সীমান্তে। তারা একে অপরের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে এক নিদারুণ পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ তারা আবার নিজের অবস্থানে ফিরে গেল। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে পরম শান্তিতে রাইফেল উঁচিয়ে ধরল।

এআইয়ের সহযোগিতায় অলংকরণ
বাতাসের জন্য কোনো কাঁটাতার নেই, সে এপাশ থেকে ওপাশে অবাধে বয়ে যাচ্ছে। একঝাঁক বুনো পাখি উড়ছে সীমান্তের ওপর দিয়ে। তাদের ডানায় কোনো দেশের পতাকা আঁকা নেই। আর ওই যে মৃত সৈনিকেরা? তারা এখন আর রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। তারা আজ ওই একঝাঁক পাখি হয়ে নীল আকাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে। নিচে নতুন গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা ঘাম মুছছে আর সন্দেহের চোখে ওপাশের দিকে তাকাচ্ছে। আবার সেই একই চক্র। লড়াইটা চলবেই। গোপন সেই প্রশ্নটাও তাদের মনে ঘুরপাক খাবে, কিন্তু উত্তর দেবে কেবল বন্দুকের নল।

তারপর...তারপর কী? প্রায় চিৎকার করে উঠল নীলু।

তারপর একসঙ্গে দুটো গুলির শব্দ হলো। রণবীর আর ইমতিয়াজ একে অপরের কপাল লক্ষ্য করে গুলি চালাল। তারা লুটিয়ে পড়ল সেই মাটিতে, যেখানে কোনো কাঁটাতার নেই। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই মিরাকলটা ঘটল। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি সীমান্তে যত গার্ড ছিল, তাদের সবার মনে একই প্রশ্ন আর একই সংলাপ ট্রিগার করল। একযোগে কয়েক লাখ গুলি চলল সারা পৃথিবীতে। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু—প্রতিটি প্রহরী তার বিপরীত পাশের প্রহরীকে গুলি করল। কোনো সীমান্ত রইল না। কোনো চেকপোস্ট নেই, কোনো পাসপোর্ট চেক নেই। লাশে লাশে ঢেকে গেল সব কাঁটাতার। রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেল দুই দেশের মাটি।

মনে হলো, পৃথিবীটা যেন তার পুরোনো রূপে ফিরে এসেছে। এক অখণ্ড পৃথিবী।

সারা পৃথিবী এক হয়ে গেল? তপনের গলায় বিস্ময়।

আমি ম্লান হাসলাম। বললাম—হ্যাঁ, হলো। কিন্তু কতক্ষণের জন্য? বড়জোর দশ মিনিট। যখনই খবর গেল যে কোনো সীমান্তে আর কোনো গার্ড বেঁচে নেই, রাষ্ট্রগুলো আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করল। তারা ভাবল না কেন এমন হলো, তারা ভাবল না মানুষের প্রাণের দাম। তারা শুধু ভাবল—সীমানা অরক্ষিত! মুহূর্তের মধ্যে ট্রাক বোঝাই হয়ে নতুন সৈনিক এল। তাদের মনে আগের চেয়েও বেশি ঘৃণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এসে মৃত সৈনিকদের দেহগুলো জঞ্জালের মতো সরিয়ে দিল। আবার রাইফেল উঁচিয়ে তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার শুরু হলো সেই শত্রু শত্রু খেলা।

বাতাসের জন্য কোনো কাঁটাতার নেই, সে এপাশ থেকে ওপাশে অবাধে বয়ে যাচ্ছে। একঝাঁক বুনো পাখি উড়ছে সীমান্তের ওপর দিয়ে। তাদের ডানায় কোনো দেশের পতাকা আঁকা নেই। আর ওই যে মৃত সৈনিকেরা? তারা এখন আর রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। তারা আজ ওই একঝাঁক পাখি হয়ে নীল আকাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে। নিচে নতুন গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা ঘাম মুছছে আর সন্দেহের চোখে ওপাশের দিকে তাকাচ্ছে। আবার সেই একই চক্র। লড়াইটা চলবেই। গোপন সেই প্রশ্নটাও তাদের মনে ঘুরপাক খাবে, কিন্তু উত্তর দেবে কেবল বন্দুকের নল।

আমি চুপ করলাম। লণ্ঠনটা এবার দপ করে নিভে গেল। আমরা সবাই অন্ধকারের মধ্যে বসে রইলাম। কারও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু মনের ভেতর সেই রাইফেলের গুলির শব্দ আর পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।