কাজী আনোয়ার হোসেনের অগ্রন্থিত গল্প–১: শেষ টিপ

আজ প্রয়াত হয়েছেন মাসুদ রানার স্রষ্টা, জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর এই অগ্রন্থিত গল্পটি আবার প্রকাশিত হলো। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায়, ২০১২ সালে।

কাজী আনোয়ার হোসেনফাইল ছবি

শওকত মির্জার অফিশিয়াল চিঠি পেয়ে খুশি হবে কি ভীত হবে, বুঝে উঠতে পারল না ফটোশিল্পী শিহাব। শওকত লোকটা জায়ান্ট বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই। এবং বদ। এই লোক ইচ্ছে করলে কপিরাইটার-পেইন্টার-ফটোগ্রাফারকে যেমন টেনে আসমানে তুলতে পারে, তেমনি আবার মাথায় পা দিয়ে ডুবিয়ে দিতে পারে অতলে। সবাই জানে, অন্তত এক ডজন শিল্পীর সর্বনাশ করেছে এই লোক। রীতিমতো ডেঞ্জারাস ক্যারেক্টার!
বিশ্ববিখ্যাত এক সাবান কোম্পানির নতুন প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন দরকার। তাই নতুন মডেল নিয়ে নতুন আঙ্গিকে তুলতে হবে ছবি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, প্রভাব খাটিয়ে কাজটা পেয়েছে দেশের সেরা অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি লিব্রা লিমিটেড। এবং এটা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের গুরুদায়িত্ব পড়েছে প্রোডাকশন-ইন-চার্জ শওকত মির্জার ওপর। বসের কাছ থেকে, ধরতে গেলে, প্রায় ছিনিয়েই নিয়েছে সে এই কাজ। কারণটা অবশ্য এখনো কেউ জানে না।

উঠতি ফটোগ্রাফার শিহাব শিকদার। কচি বা কাঁচা নয়, প্রতিষ্ঠিত আলোকচিত্রশিল্পীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত নবীন।

ভয়ে ভয়ে হাজির হলো সে মির্জা সাহেবের টেবিলের সামনে। প্রথমেই ধমকের সুরে ঠিক কেমন ছবি চায় তার বর্ণনা দিল, তারপর সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে চেয়ার দেখাল সে ওকে। মাইন্ড করল না শিহাব। কাজটা যদি পায়, এটাই হবে তার ক্যারিয়ারের প্রথম সত্যিকারের বড় একটা অ্যাসাইনমেন্ট। টাকাও পাওয়া যাবে মেলা।

ইতিমধ্যে প্রাণবন্ত ছবি তোলায় বিজ্ঞাপনজগতে বেশ নাম হয়েছে ওর, দু-একটা আন্তর্জাতিক পুরস্কারও জুটেছে কপালে। তবে এই কাজটা যদি ভালোভাবে তুলে দিতে পারে, আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হবে না ওকে।

এখনো স্টুডিও হয়নি ওর, ভাড়াবাড়ির বাথরুমের একটা অংশকে বানিয়ে নিয়েছে পার্টটাইম ডার্করুম। গাড়ি নেই, যেখানে যায় অ্যাকসেসরির আধমণি বোঝাটা বয়ে বেড়ায় নিজের কাঁধে—আর ওকে বয়ে বেড়ায় দাদার আমলের রংচটা ফোর্থহ্যান্ড একটা লাল ইয়ামাহা মোটরবাইক।

কাজ বোঝে শিহাব। জানে, ও ভালো ফটোগ্রাফার। সৃজনশীল শিল্পীসুলভ সহজ-আন্তরিক একটা ভঙ্গি আছে ওর, যেটা সরাসরি স্পর্শ করে মডেলকে, তাকেও শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য উজ্জীবিত করে তোলে। ফলে ঠিক যেমনটি চায়, তেমনই ছবি আদায় করে নিতে পারে ও তাদের কাছ থেকে। ইদানীং অনেকে বলাবলি শুরু করেছে: সুন্দরী হওয়ার প্রয়োজন নেই মডেলের, শিহাবই তার ভেতরের সৌন্দর্য টেনে বের করে দেখাবে সবাইকে।

প্রথমেই ভাবভঙ্গি ও মাথা পেছনে হেলিয়ে নাক-বরাবর চাহনির মাধ্যমে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল মির্জা: নেহাত কৃপার বশে এই ফেভারটা করছে সে শিহাবকে। ‘একটা চান্স দিয়ে দেখছি আর কি। ঠিকভাবে আমার নির্দেশমতো কাজটা করতে পারলে হয়তো উতরে যাবেন।’

কথাটা পছন্দ হলো না শিহাবের। তবে বুঝল, কেন শিল্পীরা লোকটাকে মাথামোটা জানোয়ার বলে। শিল্পবোধ না থাকুক, ব্যঙ্গাত্মক একটা ভঙ্গি আছে তার, সেই সঙ্গে রয়েছে সবজান্তার ভঙ্গিতে বোলচাল মেরে মানুষকে ইমপ্রেস করার ক্ষমতা। আসলে, লোকটা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, আর তেমনই বাজখাঁই গলার আওয়াজ—সামনে গেলেই শুকিয়ে আসতে চায় কলজেটা। ও যা বলবে, তা-ই করতে হবে অধস্তনদের, নইলে...কী আর করা!

‘নিশ্চয়ই,’ বলল সে মিনমিন করে। ‘আপনার সাহাঘ্য পেলে তো কথাই নেই।’
‘গুড। তাহলে কাল নয়টায় চলে আসুন আমার বাড়িতে। প্লট: ৮, রোড: ৪৫-এ, গুলশান। ঘাটবাঁধানো সুইমিংপুল আছে, পারফেক্ট মডেলও রেডি।’
‘কে?’
‘আমার স্ত্রী।’

মিতাকে ভালো করেই চেনে শিহাব। ঠিকই বলেছে মির্জা—অপরূপ সুন্দরী মহিলা, এখনো স্লিম, তুখোড়—একদম পারফেক্ট মডেল। বছর বিশেক আগে শান্তিবাগে একই পাড়ায় থাকত ওরা। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে দেখা হতো প্রায়ই। বেশ খানিকটা দুর্বলতার মতো এসে গিয়েছিল ওর তরুণ মনে। মিতাও সেটা টের পেয়ে খুশিমনে আর দশটা ছেলেকে যেমন, নাচাত ওকেও; উজ্জ্বল হাসি ছুড়ত আড়ালে-আবডালে। ছবি তুলে দেওয়ার আবদার ধরত। সেই জামানার বেশ কিছু ছবি আজও আছে ওর কাছে।
আঠারোয় পা দিয়েই বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল মিতা বড়লোকের এক কুপুত্রকে। বছর তিনেক টিকেছিল বিয়েটা, তারপর সে ফিরে এসেছিল বাপের বাড়ি। অবশ্য বছর ঘোরার আগেই ফের সওয়ার হয়েছিল মস্ত বড়লোক আর বয়সে ওর দ্বিগুণ বড় শওকত মির্জার শক্ত কাঁধে।

অলংকরণ: ধ্রুব এষ

পরদিন সুইমিংপুল ও তার পাশের ফুলবাগান দেখে খুশি হয়ে উঠল শিহাবের মনটা। থিমটা হচ্ছে: ঘাটে বসে গায়ে সাবান মাখছে প্রায় নগ্ন এক সুন্দরী। খটকা একটা ছিল: সুইমিংপুলে তো কেউ সাবান মাখে না। কিন্তু দেখে টের পেল, বিশেষ কয়েকটা অ্যাঙ্গেলে ছবি নিলে পুল আর চেনা যাবে না। মনে হবে, নির্জন কোনো পুকুরের ঘাটে বসে আপনমনে স্নান করছে স্বর্গের অপ্সরী।

স্ত্রীর সঙ্গে শিহাবকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে দুজনকে হাসতে দেখে অপ্রস্ত্তত হয়ে পড়ল মির্জা। ‘ও, আগেই পরিচয় আছে বুঝি তোমাদের!’ বলে সতর্ক চোখে দেখল দুজনকে।

ডুবে গেল শিহাব কাজে। একটার পর একটা ছবি তুলছে, মৌমাছির মতো ঘুরছে মিতার তিন পাশে, সুন্দর অ্যাঙ্গেল খুঁজছে, সেই সঙ্গে অনর্গল কথা বলছে। সব মডেলের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করে, তেমনই অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বলছে ও: ‘এই তো, লক্ষ্মী মেয়ে।...আর একটু বাঁ দিকে ফেরো তো, মিতা।... হ্যাঁ, এবার আঁচলটা একটু সরাও বুকের ওপর থেকে, সামান্য।... ব্যস, ব্যস..., দারুণ লাগছে কিন্তু।... মুখে না, হাতে আর গলার কাছে আরেকটু ফেনা তোলো সাবানের।... আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছ কিন্তু তুমি, মিতা! সত্যি।... এবার এই পোজে আরও কয়েকটা স্ন্যাপ নেব।... একটু মিষ্টি হাসি... বাহ, ওয়ান্ডারফুল!’

মুখে এসব বলছে বটে, কিন্তু শিহাব জানে, এই মেয়ে আসলে সুযোগসন্ধানী জাতসাপ। স্বার্থপরতায় তার স্বামীর চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না—পেছন ফিরলেই ছুরি মেরে দেবে যেকোনো বন্ধুর পিঠে।

চমৎকার সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুমের দামি, নরম সোফায় বসে গ্লাসের অর্ধেকটা শেষ করে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়ল শিহাব। উদ্বিগ্ন। পোর্চ পর্যন্ত এগিয়ে দিল ওকে মিতা। ওদের দামি অ্যালিয়নের পাশে হাস্যকর দেখাচ্ছে ওর মোটরসাইকেল। স্টার্ট দেওয়ার আগে দুই পা এগিয়ে সামনে ঝুঁকে চাপাগলায় বলল মিতা, ‘অসহ্য! জানোয়ারটা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে আমার!’ নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সামলাল নিজেকে, ‘যেখানেই হাত দেয়, পচিয়ে ফেলে একেবারে! দেখো, তোমাকেও ধ্বংস করে ছাড়বে!’

মিতাকে নাম ধরে ডাকায়, তাকে তুমি করে সম্বোধন করায়, তদুপরি অকাতরে তার গুণকীর্তন করায় একটু যেন রুষ্ট হয়েছিল শওকত মির্জা; কিন্তু কোনো সিন ক্রিয়েট না করে নিজেকে সামলে রাখল সে। তবে বারবার ছবি তোলার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে কসুর করল না। শিহাবের কোনো শটই তার পছন্দ হচ্ছে না। ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছে লোকটা সামান্য এক ফটোগ্রাফারের কথায় তার স্ত্রী মিষ্টি করে হাসছে বলে। বারবার বাধা দিল সে, ‘না, না। হচ্ছে না। আউট অব ফোকাস হয়ে যাচ্ছে। ট্রাইপডটা আরেকটু ডাইনে সরিয়ে এই অ্যাঙ্গেলে সেট করুন...। মিতা, তোমার টিপটা গেল কোথায়?’
‘আমি ওটা খুলে নিয়েছি,’ জবাব দিল শিহাব। ‘ও তো গোসল করতে নেমেছে!’
আরও কুঁচকে গেল মির্জার ভুরুজোড়া।

বৈরী পরিবেশে ধীরে ধীরে উৎসাহ ঝিমিয়ে এল শিহাবের। কাজটা শেষ হতে এক গ্লাস বরফ দেওয়া লেবুর শরবত খেয়ে যেতে অনুরোধ করল মিতা। মির্জাও যখন মাথা ঝাঁকাল, অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়ে গেল ও।

চমৎকার সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুমের দামি, নরম সোফায় বসে গ্লাসের অর্ধেকটা শেষ করে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়ল শিহাব। উদ্বিগ্ন। পোর্চ পর্যন্ত এগিয়ে দিল ওকে মিতা। ওদের দামি অ্যালিয়নের পাশে হাস্যকর দেখাচ্ছে ওর মোটরসাইকেল। স্টার্ট দেওয়ার আগে দুই পা এগিয়ে সামনে ঝুঁকে চাপাগলায় বলল মিতা, ‘অসহ্য! জানোয়ারটা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে আমার!’ নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সামলাল নিজেকে, ‘যেখানেই হাত দেয়, পচিয়ে ফেলে একেবারে! দেখো, তোমাকেও ধ্বংস করে ছাড়বে!’

হাসল শিহাব। ‘খুব রেগে গেছ দেখছি? অত রাগ করে না।’
কথাটা বলেই কিক্ মেরে স্টার্ট করল দ্বিচক্রযান। ঠিক সে সময়ই এসে দরজাজুড়ে দাঁড়াল মির্জা, দুই চোখে সন্দেহ। সরে গেল মিতা। ‘প্রিন্ট আউট নিয়ে কাল আসছি আপনার অফিসে,’ গলা চড়িয়ে কথাটা বলেই রওনা হয়ে গেল শিহাব।

কন্ট্যাক্ট প্রিন্ট বের করল ও সেই রাতেই। বেছে বেছে পছন্দসই ছবিগুলো এনলার্জ করল। কয়েকটা ছবি অনেকক্ষণ ধরে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল শিহাব। আয়ত চোখ, টিকলো নাক, লোভনীয় ঠোঁট, চিবুক, গলা, কাঁধ, মাখনরঙা বুকের একাংশ—এককথায় অপূর্ব সুন্দর চেহারা; কিন্তু ক্যামেরার নির্বিকার, নিরপেক্ষ চোখে ঠিকই ধরা পড়েছে মেয়েটির ভেতরের চাপা ক্ষোভ ও দিনের পর দিন দমিয়ে রাখা মানসিক যন্ত্রণার আভাস। ব্লোয়ার চালু করে দ্রুত শুকিয়ে নিল ও প্রিন্টগুলো। কয়েকটা ছবি বেছে বের করে লুকিয়ে রাখল একগাদা বাতিল ছবির নিচে—নিজেও জানে না, কেন। বাকিগুলো আরও ভালোমতো শুকিয়ে নিয়ে আট বাই দশ ইঞ্চি খামে পুরল—কেন জানি জিনাত, মানে, ওর বউকে এসব ছবি দেখাতে ইচ্ছে করল না।

পরদিন চেয়ারে খাড়া হয়ে বসে ঠান্ডা চোখে দেখল মির্জা ছবিগুলো; তারপর ভেবেচিন্তে রায় দিল, ‘স্রেফ জঘন্য... এসব চলবে না, মিস্টার। একেবারেই বাজে!’
মুখের হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করল শিহাব। জানে, ওকে বাদ দিয়ে মির্জা যদি আর কাউকে দিয়ে কাজটা করায়, দুনিয়াময় রটে যাবে ওর ব্যর্থতার কথা—মির্জাই জানাবে ইন্ডাস্ট্রির সবাইকে। তার ‘সুরুচি’র চাপে মৃত্যু ঘটবে আরেক আলোকচিত্রশিল্পীর। অর্থাৎ, বিদায়, শিহাব!

‘...পচিয়ে ফেলে একেবারে! দেখো, তোমাকেও ধ্বংস করে ছাড়বে! ’ মনে পড়ল ওর মিতার কথাগুলো।
‘সত্যি বলতে কি,’ নরম সুরে বলল শিহাব, ‘আমি নিজেও তেমন সন্তুষ্ট হতে পারিনি নিজের কাজে।’

‘হুঁ, দুর্গন্ধ ছুটছে এগুলো থেকে।’ এক সেকেন্ড বিরতির পর শিহাবকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আর একবার চেষ্টা করে দেখতে হবে আমাদের।’
‘মিতাকে নিয়েই?’
‘তবে আর কাকে? কোনো খুঁত পেয়েছেন ওর মধ্যে?’
‘না, না। তবে একটা কথা...’

চট করে থেমে গেল শিহাব। কথাটা বলা যায় না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল: ধারেকাছে আপনি না থাকলেই ভালো হয়।
‘বলুন,’ গুরুগম্ভীর মির্জার কণ্ঠ। ‘শুনছি।’
‘কী বলছিলাম, ভুলে গেছি। কবে, কোথায়, কখন আসব?’
‘কাল আসুন। ছুটির দিন... এই দুটোর দিকে, ওখানেই।’

সেই রাতে খেতে বসে জিনাতকে জিজ্ঞেস করল শিহাব, ‘মিতার কথা মনে আছে তোমার?’
‘কোন মিতা? তোমাকে ডজ দিয়ে ওই সেই হামবাগ মির্জাকে বিয়ে করেছিল যে মেয়েটা? কেন, কী হয়েছে তার?’

‘একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে আমাকে ওর স্বামীদেবতা।’
‘ইশ্শ্, ওর ওই আকাশছোঁয়া আত্মম্ভরিতা আর দুর্ব্যবহার কী করে যে সহ্য করে মানুষ! ও রকম একটা লোক অত বড় চাকরিতেই বা এত দিন টিকে থাকে কী করে!’
‘ওর সমস্ত হম্বিতম্বি কেবল ছোটদের ওপর। মালিকদের গ্যালনকে গ্যালন তেল মেরে ভজিয়ে রেখেছে। তা ছাড়া শুনেছি, মানুষের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে জানে লোকটা।’

নাক কুঁচকে বলল জিনাত, ‘ওর বউটা, মানে, তোমার মনের মিতা, কী করে যে সহ্য করে ওই চোঁয়াড়ে লোকটাকে বুঝি না।’

‘হয়তো আগে এতটা এ রকম ছিল না,’ বলল শিহাব। খাওয়া শেষ করে বলল, ‘তা ছাড়া ভেতরের খবর কে জানে! হয়তো তোমার মতো ওর বউও দুই চোখে দেখতে পারে না ওকে।’

পিত্তি জ্বলে গেল শিহাবের। ইচ্ছে হলো, গরম কফি ছুড়ে মারে লোকটার মুখে। গোঁজ হয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে মির্জার চোখে চোখ রাখল, ‘আসলে কী চান আপনি, বলুন তো? ভালো ছবি? পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, জেনেশুনে, ইচ্ছা করেই ছুরি চালিয়েছেন আপনি আমার পিঠে, ভালো ভালো ছবি নষ্ট করেছেন। কিন্তু কেন? কিসের জন্য?’

পরদিন ঠিক দুটোর সময় পৌঁছে গেল শিহাব শওকত মির্জার বাড়িতে। ছিমছাম, সুন্দর বাড়িটা আজও মুগ্ধ করল ওকে। পোর্চে লেটেস্ট মডেলের ঝকঝকে সাদা অ্যালিয়ন, যেন আদর করে পোষা বিড়াল।

আজকের নতুন সংযোজন মিতার ১০ বছর বয়সী মেয়েটা। সালাম দিল শিহাবকে। স্কুল ছুটি, তাই ঘুরঘুর করছে সবার পায়ে পায়ে। দেখতে ভালো, তবে চলায়-বলায় একটু যেন বেপরোয়া কিসিমের। একের পর এক প্রশ্ন করে, এবং উত্তরের জন্য শিহাবের শার্টের হাতা ধরে টানাটানি করে বিরক্ত করছে দেখে ওর মা ওকে দোতলায় পাঠানোর চেষ্টা করে বিফল হলো। পরিষ্কার জানিয়ে দিল সে মাকে, ‘এটা তোমার বাপের বাড়ি না, আমার বাপের বাড়ি। আমার ইচ্ছা করলে যাব, ইচ্ছা না করলে এখানেই থাকব। কারও অর্ডার মারার দরকার নেই।’

আলোকচিত্রীর দৃষ্টিতে মেয়েটিকে কয়েক সেকেন্ড ভালো করে দেখল শিহাব। চেহারাই বলে দিল, কখনো কারও আদর-যত্ন পায়নি বেচারি। চেহারায় রুক্ষ একটা ভাব, চুলে তেল-পানি পড়েনি বেশ কিছুদিন, নড়াচড়া করলে পাকানো দড়ির মতো সরু দুটো বেণি বাড়ি খাচ্ছে পিঠে। ভালো লাগল ওর বিদ্রোহী বাচ্চাটাকে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী নাম তোমার, খুকি?’

‘অ্যাঞ্জেলা মির্জা, ডাকনাম দিপু।’
‘বাহ, সুন্দর নাম তো!’
‘জানেন, আমারও ক্যামেরা আছে,’ বলল মেয়েটা। ‘একদৌড়ে নিয়ে আসি? এই যাব আর আসব।’

‘না,’ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল মিতা, ‘কাজের সময় বিরক্ত করলে মার খাবি কিন্তু!’
কে শোনে কার কথা! শিহাবকে মাথা ঝাঁকাতে দেখে বুলেটের বেগে ছুটে চলে গেল ও। দুই মিনিটের মধ্যে সস্তা দামের একটা ক্যামেরা হাতে হাজির হলো। প্রথমেই একটা ছবি তুলল শিহাবের, তারপর মায়ের দিকে ক্যামেরা তাক করে বলল, ‘হাসো তো একটু, মা।’
‘যা এখান থেকে, পাজি কোথাকার!’ ফিরল স্বামীর দিকে, ‘ওকে সামলাও, শওকত। আর নইলে আগামীকাল আসতে বলো শিহাবকে।’

‘কাল আমার অন্য কাজ আছে,’ বলেই শিহাবকে ইঙ্গিত দিল মির্জা, ‘নাও, দাঁড়িয়ে না থেকে হাত চালাও।’

সম্বোধন বদলে যাওয়ায় বিরক্ত হলো শিহাব, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। ট্রাইপড সেট করে তার ওপর সাবধানে বসাল ওর প্রিয় এফ-জি টোয়েন্টি নাইকন সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা। শুরু হলো আরেকটি ম্যারাথন সেশন। কিন্তু আজও এল প্রতি পদে বাধা। গত পরশু ছিল একজন, আজ বাপ-বেটি দুজন মিলে মাথাটা গরম করে তুলল শিহাবের।

মেয়েটি যখন-তখন ব্যস্ত ভঙ্গিতে কখনো চলে আসছে লেন্সের সামনে, কখনো বা ঢুকে পড়ছে ব্যাকগ্রাউন্ডে; বার দুয়েক তো টপকে আরেক পাশে যেতে গিয়ে ট্রাইপড উল্টে ফেলে দামি ক্যামেরার বারোটা বাজানোর উপক্রম করল। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে বাচ্চাটার এসব অত্যাচার সহ্য করে একের পর এক ছবি তুলে চলল শিহাব। কিন্তু ওর বাপের অত্যাচার সহ্য করা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়াল।

শিহাব কিছু করতে গেলেই হাঁ-হাঁ করে ওঠে শওকত মির্জা, ‘না, না। এ রকম না, শিহাব। কম্পোজিশন ঠিক হচ্ছে না, অতিরিক্ত ফাঁকা জায়গা রয়ে যাচ্ছে। মিতা একটু ডাইনে সরে এলে জায়গাটা ভরাট হতো, কিন্তু তুমি একটু বাঁয়ে সরলে আরও ভালো হয়।’ অগত্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যামেরাসহ ট্রাইপড সরিয়ে আবার নতুন করে ফ্রেম সাজানোর চেষ্টা করছে ও, অমনি আরেক বাগড়া, ‘একটু পিছিয়ে এসো। হ্যাঁ, এইবার জুম করে অ্যাডজাস্ট করো সাবজেক্ট।’

‘তাহলে কিন্তু পানির ঢেউগুলো বাদ পড়বে।’
‘পড়ুক।’
এসব করতে গিয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে মিতার এক্সপ্রেশন। কথায়-বার্তায়-প্রশংসায় শিহাব ওকে যেই কিছুটা সহজ করে আনে, অমনি বিগড়ে যায় সব—গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে মিতা, ‘অ্যাই, হারামজাদি, ওই পচা ক্যামেরা নিয়ে তুই গেলি এখান থেকে!’
কিন্তু সহজে নড়ার পাত্রী নয় মেয়ে। গেল দশটা মিনিট।

‘ঘাড়টা সামান্য ডানে কাত করে দৃষ্টিটা আমার আঙুলের ডগায় রাখো দেখি, লক্ষ্মী মেয়ে!’

বলার সঙ্গে সঙ্গে ঘেউ করে ওঠে শওকত মির্জা। ‘উঁ হুঁ। যে লেন্স ব্যবহার করছ, তাতে আউট অব ফোকাস হয়ে যাবে হাতে ধরা সাবানটা।’
‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না...’

‘আমার মনে হয়! সরো দেখি, ভিউয়ারে দেখতে দাও আমাকে। এভাবে আন্দাজের ওপর হাজারটা ছবি তুললেও কোনো লাভ হবে না। বুঝে নিতে দাও আগে।’
বলা বাহুল্য, বুঝতে বুঝতেই পেরিয়ে গেল মাহেন্দ্রক্ষণ, ততক্ষণে প্রাণবন্ত ভাবটা আর নেই মিতার মধ্যে।

একবার হাতে, গলায়, কাঁধে সঠিক পরিমাণে সাবানের ফেনা মেখে সপ্রতিভ, মিষ্টি হাসি দিল মিতা, কিন্তু ‘ওয়েট আ মিনিট,’ বলে লেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে গেল মির্জা। ‘তোমার ট্রাইপড নড়ে গেছে আধ-ইঞ্চি, বাঁকা ছবি তুলে লাভ আছে কিছু?’

আরেকটা ভালো সুযোগ এল খানিক পরেই। সুন্দর, সহজ, স্বচ্ছন্দ ভঙ্গির একটা ছবি হতে পারত সেটা, কিন্তু ‘দাঁড়াও, আগে দেখে নিই,’ বলে শিহাবকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ক্যামেরায় চোখ রাখল মির্জা; তারপর লেন্স নাড়াচাড়া করে ফোকাস রি-অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করল—গেল সেটাও।

রাগে দাঁতে দাঁত চেপেও নিজেকে সামলাতে পারল না, পেছন থেকে কিল তুলে হাত ঝাঁকাল শিহাব মারার ভঙ্গিতে। ক্লিক শব্দ শুনে পাশ ফিরে দেখল, ওরই ছবি তুলেছে দিপু। হাত নামিয়ে নিল শিহাব, লজ্জিত হয়ে ভাবল, মেজাজ খারাপ করা মোটেই উচিত হয়নি ওর। কপাল ভালো, লেন্সে চোখ থাকায় টের পায়নি মির্জা, নইলে বিচ্ছিরি একটা পরিস্থিতি হতো। মিতা অবশ্য দেখেছে সবই, কিন্তু মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না কিছু। এক পা পিছিয়ে সন্তুষ্টচিত্তে বলল মির্জা, ‘এইবার তোলো। মনে হচ্ছে, এতক্ষণে ভালো একটা শট পাওয়া যাবে।’

কিন্তু পাওয়া গেল না। দেরি হয়ে যাওয়ায় নড়ে গেছে মিতা, বদলে গেছে এক্সপ্রেশন, ফেটে গেছে সাবানের বড় বড় বুদ্বুদ। তবু শাটারে টিপ দিল ও মির্জাকে খুশি করতে। এরপর আরও দুটো রোল তুলল শিহাব, লেন্স পাল্টাল, টাইমারে শাটার সেট করে এক পাশ থেকে অঙ্গভঙ্গি করে মিতার চোখে আলো ফোটানোর চেষ্টা করল—তাতে যদি কপালগুণে এক-আধটা ভালো ছবি পাওয়া যায়! নাহ, অসন্তুষ্টি নিয়েই শেষ করতে হলো কাজ।

ক্যামেরা খুলে সযত্নে ব্যাগে রাখল শিহাব, অ্যাকসেসরিগুলো এক এক করে তুলে রাখল ব্যাগের ভেতর বিভিন্ন পকেটে, রিফ্লেক্টরটা জাপানি হাতপাখার মতো ভাঁজ করে গুঁজে দিল বাইরের দিকের সরু-লম্বা একটা পকেটে। ভারী ট্রাইপডের পা তিনটে খাটো করে রাখল হাতেই, মোটরসাইকেলে ওটা রাখার বিশেষ বন্দোবস্ত আছে। এমন সময়ে ডাকল শওকত মির্জা, ‘এসো, এক কাপ কফি খেয়ে যাও।’

শিহাব আপত্তি করতে যাচ্ছে দেখে আবার বলল, ‘আরে, এসো, এসো। স্পেশাল কফি! আমার নিজ হাতে বানানো। ঘন করে জাল দেওয়া খাঁটি গরুর দুধ। চলে এসো।’
অগত্যা আবার সেই ড্রয়িংরুমে গিয়ে ঢুকল সবাই। ওদের সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা হাতে চলে এল দিপুও।

‘আমিও কফি খাব।’
‘তোমার কফি খাওয়ার বয়স হয়নি, দিপু!’ ধমক দিল মিতা। ‘এতক্ষণ যথেষ্ট বিরক্ত করেছ, এবার ক্যামেরাটা ওই শেলফের ওপর রেখে সোজা নিজের ঘরে চলে যাও। আমি যতক্ষণ না ডাকছি, এক পা-ও বেরোবে না ঘর থেকে! বোঝা গেছে?’

শেষের শব্দ দুটো চোখ পাকিয়ে এমন স্বরে বলল মিতা যে আর সাহসে কুলাল না অবাধ্য মেয়ের; ভয়ে ভয়ে ক্যামেরা রেখে সুড়সুড় করে চলে গেল বাড়ির ভেতর। ধুপধাপ আওয়াজ এল সিঁড়ি থেকে, তারপর দড়াম করে লাগল দোতলার একটা দরজা। শিউরে উঠে চোখ বুজল মিতা।

‘আমারটা একটু পরে বানিয়ো, শওকত,’ বলল সে। ‘হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে আসছি আমি।’

ট্রাইপড ফেলে দিল মিতা হাত থেকে, ঘুরে দাঁড়াল শিহাবের দিকে। রক্তশূন্য হয়ে গেছে মুখটা, একটু যেন টলছে। একটা চেয়ারের হেলান ধরে তাল সামলাল, ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, ‘ঘৃণা করি আমি পিশাচটাকে! নরকের কীট... আই হেইট দ্যাট বিস্ট...।’

কফি বানিয়ে এক কাপ শিহাবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিশাল দৈত্যের মতো সিধে হয়ে দাঁড়াল মির্জা শওকত। বাঁকা হাসি হেসে বলল, ‘আজও মনে হয় নিজের কাজে সন্তুষ্ট হতে পারোনি। তাই না?’

বিশাল পাহাড়ের পাশে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র এক পিঁপড়ে মনে হলো শিহাবের। সামনের সোফায় বসল দানব মশমশ আওয়াজ তুলে। ভুরু নাচাল আবার, ‘কী?’
পিত্তি জ্বলে গেল শিহাবের। ইচ্ছে হলো, গরম কফি ছুড়ে মারে লোকটার মুখে। গোঁজ হয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে মির্জার চোখে চোখ রাখল, ‘আসলে কী চান আপনি, বলুন তো? ভালো ছবি? পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, জেনেশুনে, ইচ্ছা করেই ছুরি চালিয়েছেন আপনি আমার পিঠে, ভালো ভালো ছবি নষ্ট করেছেন। কিন্তু কেন? কিসের জন্য?’

‘আপনিই বলুন, শুনি?’ রাগের ঠেলায় আপনিতে ফিরে গেল মির্জা। ‘আপনার মুখেই শুনতে চাই কতটা আগ্রহী আপনি আপনার মডেলের প্রতি, আর সে-ই বা কতখানি আকৃষ্ট আপনার প্রতি।’

‘কী বলছেন এসব!’ কপালে উঠল শিহাবের চোখ। ‘মাথা খারাপ হয়েছে...’
‘ভেবেছেন, কেউ কিছু বোঝে না, না? এরপর কারও কাজ আর পাবেন আপনি? যাতে না পান, তার ব্যবস্থা করব আমি। আপনার কাজের নমুনা পাঠাব আমি প্রতিটি বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে। সবই বুঝবে সবাই। কিছু প্রিন্ট আমি রেখে দেব প্রমাণ হিসেবে।’
একটা কথাও বলতে পারল না শিহাব। একেবারে বজ্রাহত। কী পরিমাণ তেতে আছে লোকটা ভেতর ভেতর, টের পাওয়া যাচ্ছে পরিষ্কার। কাপ ধরে থাকা হাতটা কাঁপছে একটু একটু, লাল হয়ে উঠেছে চোখ। এমনি সময়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল তার স্ত্রী।
‘ভালো লাগছে এতক্ষণে,’ বলল মিতা খুশি খুশি গলায়। ‘শওকত, আমাকেও দেবে এক কাপ? প্লিজ।’

উঠে দাঁড়াল ক্রুদ্ধ লোকটা। তিন কদম এগিয়ে থামল নিচু একটা টেবিলে রাখা পারকোলেটরের সামনে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ট্রাইপডটা হাতে তুলে নিল মিতা সহজ ভঙ্গিতে। তারপর কফি ঢালার জন্য ওর স্বামী যে-ই সামনে ঝুঁকল, অমনি দড়াম করে ট্রাইপডের ভারী দিকটা দিয়ে মারল তার মাথার পেছনে।

প্রথম আঘাতে টলে উঠল শওকত মির্জা, দ্বিতীয় বাড়িটা পড়তেই পতন সামলানোর জন্য ধরে ফেলল সে বুকশেলফ; তারপর ওটা আর কাপ-তস্তরিসহ ধড়াস করে পড়ল মেঝেতে। কেঁপে উঠল গোটা দালান। পরমুহূর্তে নেমে এল প্রাণপণ শক্তিতে মারা তৃতীয় আঘাত, খুলিটা ডেবে গেল ইঞ্চি দেড়েক।

ট্রাইপড ফেলে দিল মিতা হাত থেকে, ঘুরে দাঁড়াল শিহাবের দিকে। রক্তশূন্য হয়ে গেছে মুখটা, একটু যেন টলছে। একটা চেয়ারের হেলান ধরে তাল সামলাল, ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, ‘ঘৃণা করি আমি পিশাচটাকে! নরকের কীট... আই হেইট দ্যাট বিস্ট...।’
হাতের তালু দিয়ে কপাল ডলল। শিহাব লক্ষ করল, হাতে মেডিকেল গ্লাভস পরে আছে মিতা। একটু ধাতস্থ হওয়ার জন্য কপালের দুই পাশ টিপে ধরে শক্তি সঞ্চয় করল, তারপর সোজা চাইল শিহাবের চোখে। শীতল কণ্ঠে বলল, ‘এটা করা তোমার ঠিক হয়নি, শিহাব। কেন করলে কাজটা?’

‘ক্-ক্বী?’ আত্মা চমকে গেছে শিহাবের, ‘আমি...!’
তীক্ষ্ণ একটা চিল-চিৎকার দিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল মিতা। চেঁচিয়ে সাবধান করছে দিপুকে, ‘দিপু! খবরদার! ঘর থেকে বেরোবি না... নিচে নামবি না, দিপু-উ-উ!’
গোটা শরীরে কাঁপন ধরে গেল শিহাবের। একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে ঘটনার আকস্মিকতায়। কয়েক পা এগিয়ে নিস্পন্দ লাশটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ, নিচু হয়ে ট্রাইপডটা তুলে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল, রক্ত আর কয়েকটা চুল লেগে আছে ওখানে।

হাত থেকে ছেড়ে দিল ওটা শিহাব। সশব্দে পড়ল জিনিসটা মেঝেতে। মাথা ঝাড়া দিয়ে দুঃস্বপ্নটা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ও। কথা বলে বাস্তবে ফেরার জন্য অর্থহীন কথা বিড়বিড় করছে, ‘গেল আমার ট্রাইপড। এ আর মেরামত হবে না। তিন হাজার টাকার ধাক্কায় পড়লাম মনে হচ্ছে। আর, কেউ তো বিশ্বাসই করবে না আসলে কী ঘটেছে... কেউ না!’

ওপর থেকে মিতার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এল, কথা বলছে ফোনে: ‘হ্যালো, গুলশান থানা?... ওসি সাহেব, আমি মিসেস শওকত মির্জা বলছি। ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটে গেছে এখানে। জলদি চলে আসুন। আমার স্বামীর লাশ পড়ে আছে ড্রয়িংরুমে।... হ্যাঁ, পিটিয়ে খুন করা হয়েছে তাকে। প্লিজ, শিগগির আসুন! আমাকেও আক্রমণ করতে পারে। পাশের ঘরে আমার ছোট্ট মেয়ে আছে। প্লিজ, তাড়াতাড়ি করুন... হ্যাঁ, খুনি এখনো এ বাড়িতেই আছে।’

অলংকরণ: ধ্রুব এষ

সিআইডি ইন্সপেক্টর আহমেদ জামিলের ওপর পড়ল তদন্তের ভার। অত্যন্ত করিৎকর্মা, বুদ্ধিমান অফিসার। প্রথম দিনই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন, কিন্তু তাই বলে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে কোনো খুঁত বা গাফিলতি রাখলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে কেসটা একেবারে সহজ। শিহাব শিকদারের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে ট্রাইপডে এবং খুনটা হয়েছে একজন আই উইটনেসের সামনে। এ দুটোই যথেষ্ট জোরালো প্রমাণ। কিন্তু তার পরও আরও গভীরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। অনেক জায়গায় গেছেন, অনেক মানুষকে জেরা করেছেন।

অবশ্য তাঁর মনে সামান্য দ্বিধা যে একেবারেই নেই, তা নয়। শিহাব শিকদারের বিবৃতি বারবার ভাবাচ্ছে তাঁকে। শিহাব বলছে, খুনটা করেছে মিতা মির্জা, ঠান্ডা মাথায়, কোনো রকম ঝগড়া-ফ্যাসাদ ছাড়াই...আপাতদৃষ্টিতে অকারণে।

কিন্তু মানুষ তো এভাবে খুন করে না। মির্জা পরিবারের পরিচিত সবাই বলছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল ছিল; কোনো মনোমালিন্যের কথা তাদের জানা নেই। তাহলে এমন আজগুবি অভিযোগ কেন? শিকদারের মতো একজন বুদ্ধিমান, গুণী ফটোগ্রাফার কি এর চেয়ে ভালো কোনো গল্প তৈরি করতে পারল না? নাকি কাজটা করে ফেলে দিশেহারা হয়ে গেছে, চলছে না মাথা?

মিসেস মির্জাকে ভালোমতো জেরা করেছেন তিনি। মহিলা প্রথম দিকে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিল, সে জন্য তাকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না—চোখের সামনে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে তার স্বামীকে, মেঝেতে পড়ে আছে লাশ—এমন অবস্থায় কিছুটা বিকারগ্রস্ত তো হতেই পারে মানুষ। তবে কথায় কথায় তিনি বের করে নিয়েছেন আসল সত্য: শিহাবের সঙ্গে তার প্রেম ছিল। টের পেয়ে যান শওকত মির্জা। তাই একটা কাজের ছুতোয় নিয়ে আসেন তাকে নিজের বাড়িতে। পর পর দুই দিন ওদের আচার-আচরণ দেখে বদ্ধমূল হয়েছে তাঁর সন্দেহ। কাজ শেষ হলে মিতা যখন কাপড় পাল্টাতে নিজের ঘরে যায়, তখনই কথায় কথায় ঝগড়া বেধে যায় দুজনের। ঝগড়ার কথা অবশ্য শিকদারও স্বীকার করেছে, তবে সেটা প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপারে নয়—ছবি তোলার বিষয়ে মতান্তর।

ঠিক কীভাবে হত্যাকাণ্ডটা ঘটানো হলো, সে ব্যাপারে প্রথমে কিছুটা এলোমেলো ভাষ্য দিলেও আসল তথ্যগুলোতে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না তার। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে স্পষ্ট শুনেছে ওদের ঝগড়ার কিছু অংশ: শিহাব অভিযোগ করছিল, ইচ্ছে করেই ওর কাজে বাগড়া দিয়ে ভালো ছবিগুলো নষ্ট করেছে শওকত। প্রত্যুত্তরে শওকত বলছিল, বিজ্ঞাপন কোম্পানির প্রোডাকশন-ইন-চার্জ হিসেবে আমি তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেব। সত্যিই সে ক্ষমতা তার ছিল। এসব কথা অস্বীকার করেনি শিহাব। ব্যস, হন্যে হয়ে আরও কোনো মোটিভ খোঁজার প্রয়োজন কোথায়? মিতার জন্য পারকোলেটার থেকে কফি ঢালতে যে-ই ঝুঁকেছে মির্জা, অমনি...।

মিতার মেয়েটা তখন দোতলায় ছিল নিজের ঘরে। গোলমাল আঁচ করতে পেরে ওসব থেকে বাঁচানোর জন্যই তাকে ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছিল মিতা মির্জা। দিপু বলেছে, ওপর থেকেও শুনতে পেয়েছে সে বুকশেলফটা ভেঙে পড়ার জোর আওয়াজ। তার মিনিট খানেক পর শুনতে পেয়েছে মায়ের চিৎকার।

এই কথাটাতেও একটু খটকা রয়েছে। বারবার প্রশ্ন করার পরও কিন্তু মেয়েটা তার বক্তব্য থেকে নড়েনি: হুড়মুড় করে বুকশেলফ ভাঙা আর ধপ করে বাবার মাটিতে পড়ার শব্দ হওয়ার এক মিনিট পর চিৎকার করেছে ওর মা, ধুপধাপ শব্দে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তাকে বারণ করেছে ঘর থেকে বেরোতে। মিতা মির্জার জবানবন্দির সঙ্গে ঠিক মেলে না কথাটা। তবে অতটুকু বাচ্চার কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার আছে বলে তিনি মনে করেননি। নিজেরও বাচ্চাকাচ্চা আছে, ওরা কেমন কল্পনাপ্রবণ হয়, ভালো করেই জানা আছে তাঁর।

তা ছাড়া শিহাব শিকদারের তোলা ছবিগুলো ভালো করে দেখলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। লোকটা উঁচুদরের শিল্পী, প্রতিটি ছবিতেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর বোঝা যায় মিতা মির্জার মনের কথা। স্পষ্টতই শিহাবের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে মহিলা। স্বামী সেটা টের পেয়ে যাচ্ছে দেখে কিছুটা বিব্রতও। শওকত মির্জার ঈর্ষার কারণটাও বুঝতে কষ্ট হয় না। মিতা মির্জা বলেছে, ছোটবেলা থেকে শিহাব ও সে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। শিহাব সে কথা অস্বীকার করতে পারেনি, তবে সেটাকে কম বয়সের মোহ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তাহলে মিতা মির্জার এতগুলো হাসি-হাসি ছবি ডার্করুমে লুকিয়ে রেখেছে কেন—সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

মাঝেমধ্যে সন্দেহ এসেছে ইন্সপেক্টর আহমেদ জামিলের মনে: দুজন মিলে কাজটা করেনি তো? কিন্তু চিন্তাটা বাতিল করে দিয়েছেন তিনি। কারণ, মিতা যা-ই বলুক, প্রেমের কারণে খুনটা হয়নি, আচরণেই টের পেয়েছেন তিনি; বউকে নিয়ে পরিপূর্ণ সুখী শিহাব। খুনটা করেছে রাগের মাথায়, ঈর্ষাকাতর শওকত মির্জা সন্দেহের বশে তার ক্ষতি করার হুমকি দেওয়ার কারণে। কিংবা হয়তো অনেক দিন পর মিতাকে দেখে কিছুটা দুর্বলও হয়ে পড়েছিল লোকটা, কে জানে!

যা-ই হোক, সবকিছু খুঁটিয়ে দেখেশুনে কেসটার তদন্ত শেষ করেছেন তিনি। এবার পাঠিয়ে দেবেন পুলিশের কাছে। এরপর ওরা করবে যা করার। তবে হস্তান্তরের আগে আজ আরেকবার যাবেন তিনি গুলশানে শওকত মির্জার বাড়িতে। সকালে অফিসে পৌঁছেই টেলিফোন পেয়েছেন মিসেস মির্জার। সেদিন নাকি তার মেয়ে দিপু সস্তা একটা ক্যামেরা নিয়ে শিহাবকে নকল করে একের পর এক ছবি তুলছিল। একপর্যায়ে শিহাব যখন পেছন থেকে শওকত মির্জাকে মারতে উঠেছিল, বাই চান্স ঠিক সে মুহূর্তের একটা শটও তুলেছিল মেয়েটা। যদি ছবিটা ঠিকমতো উঠে থাকে, তাহলে হয়তো অকাট্য মোটিভ পাওয়া যাবে খুনের।

ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ল ইন্সপেক্টরের, প্রথম দিনই ওটা পড়ে থাকতে দেখেছিলেন তিনি মেঝেতে। ওটা বুকশেলফের ওপর রেখে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল দিপু মায়ের ধমক খেয়ে।

ড্রয়িংরুমে বুকশেলফের ওপরই পাওয়া গেল ক্যামেরাটা। সেদিনের পর আর কেউ নাড়াচাড়া করেনি ওটা। ওটা ব্যাগে পুরে নিয়ে ফিরে গেলেন তিনি অফিসে। ভাবছেন: প্রফেশনাল এক ফটোগ্রাফারের পাশাপাশি ছবি তুলেছে ১০ বছরের এক বাচ্চা মেয়ে! কেমন হবে ছবিগুলো? প্রফেশনালকে হারিয়ে দেবে না তো কোনো কোনোটা?
ফটোল্যাব-ইন-চার্জ তরিকুল বন্ধুমানুষ। ক্যামেরাটা তাঁর হাতে দিয়ে ছবিগুলো প্রিন্ট করে দেখাতে বললেন তিনি; তারপর ক্যানটিনে গিয়ে একটা বার্গার আর এক কাপ চা নিয়ে বসলেন।

মিনিট বিশেক পর ফিরে গিয়ে দেখলেন, একগাদা ফটোগ্রাফ হাতে ল্যাবের দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছেন তরিকুল ইসলাম। বললেন, ‘সাজিয়ে দিয়েছি, সিরিয়াল ধরে দেখে যান।’

হ্যাঁ। আট-দশটার পরই পাওয়া গেল ওটা। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কিল তুলেছে শিহাব শওকত মির্জাকে মারবে বলে। তাঁকে থামতে দেখে আবার বললেন তরিকুল, ‘দেখে যান।’
একের পর এক ছবি দেখে শেষ ছবিটায় এসে চমকে উঠলেন ইন্সপেক্টর আহমেদ জামিল। ‘আরে! কী করে... এটা কী করে...! ’

‘মনে হয়, ব্যাপারটা এই রকম,’ বললেন তরিকুল। ‘বুকশেলফের সঙ্গে ক্যামেরাটাও পড়েছিল মেঝেতে। কোনো কিছুতে লেগে শাটার রিলিজে টিপ পড়ে গিয়েছিল, ফলে উঠে গেছে খুনের দৃশ্য। আরিব্বাপ! চেয়ে দেখেন মহিলার চেহারাটা!’
বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন ইন্সপেক্টর ছবির দিকে।


বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে