অ্যান কারসনের গদ্য: অল্প কিছু কথা

কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদে স্বতন্ত্র এক সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছেন কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য লেখায় এনে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। সম্প্রতি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তাঁর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গদ্য ‘অল্প কিছু কথা’ অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ আহসান নাহিয়ান।

নোবেল পদক ও অ্যান কারসনের ছবি অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস

একদিন খুব ভোরবেলা শব্দগুলোকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার আগে শব্দ বলতে কিছুই ছিল না। ছিল ঘটনা, ছিল আবহ। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে একটা ভালো গল্পে যা কিছুই ঘটে, তা ঘটানোর জন্য সব সময় অন্য কিছু একটা লাগে, যা বাকি সবকিছুকে ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়। একদিন কেউ একজন খেয়াল করল যে আকাশে তারা আছে, কিন্তু কোথাও কোনো শব্দ নেই। কিন্তু কেন? অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি। আমার মনে হয়, এটা একটা ভালো প্রশ্ন। তিনজন বৃদ্ধা একটা মাঠে ঝুঁকে পড়ে কাজ করছিল। তারা বলল এই কথা আমাদের জিজ্ঞেস করে কী লাভ? কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা গেল যে বরফে ঢাকা মাঠ, নীলচে-সবুজ অঙ্কুর সম্পর্কে, আর ‘দুঃসাহস’ নামের যে গাছটিকে কবিরা ভায়োলেট ভেবে ভুল করে, সেটি সম্পর্কে যত কিছু জানা সম্ভব তার সবটুকুই তারা জানে। তারা যাকিছু বলছিল, আমি সব টুকে রাখতে শুরু করেছিলাম। আমার কলমের দাগগুলো আস্তে আস্তে সহজাত একটা মুহূর্ত তৈরি করল, গল্পের ভেতরের একঘেয়েমি ছাড়াই। এই কথাটা আমি খুব জোর দিয়ে বলতে চাই। একঘেয়েমি ব্যাপারটা এড়াতে আমি যেকোনো কিছু করতে রাজি আছি। আর এই কাজ করতে সারা জীবন লেগে যায়। কোনো কিছুকে কখনোই আমার কাছে যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে হয় না। আমার মনে হয়, কখনোই যথেষ্ট জানা সম্ভব না, কখনোই যথেষ্ট কাজ করা সম্ভব না, ক্রিয়ার ইনফিনিটিভ আর পার্টিসিপল রূপগুলোকেও যথেষ্ট অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব না, চলার গতিতে যথেষ্ট পরিমাণে বাধা দেওয়া সম্ভব না। কারও মন থেকে যথেষ্ট দ্রুত বেরিয়ে পড়াও সম্ভব না।

যা যা কথা হয়েছিল তিপ্পান্নটা ছোট পুস্তিকায় আমি সব কথা টুকে রেখেছিলাম। একে অন্যের থেকে বহু দূরে দূরে বসবাস করে, এমন সব কথা। প্রতিদিন একই সময়ে আমি পুস্তিকাগুলো পড়তাম। গতকাল কয়েকজন লোক এসে সেগুলো তুলে নিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত আমি পড়েছি। লোকগুলো পুস্তিকাগুলোকে একটা কাঠের বাক্সে রাখল। তালা দিল। এরপর আমরা একসঙ্গে বাইরের দৃশ্য দেখলাম। তাদের দেওয়া নির্দেশ খুব স্পষ্ট ছিল। আমাকে এমন একটা আয়নার অনুকরণ করতে হবে, যেটা পানির মতো (যদিও পানি কোনো আয়না না, আর পানিকে আয়না ভাবাটাও বিপজ্জনক)। আসলে পুরোটা সময় আমি অপেক্ষা করছিলাম তারা কখন চলে যাবে, যাতে আমি আমার লেখাগুলোর বাদ পড়ে যাওয়া অংশগুলো লেখা শুরু করতে পারি। আমার কাছে তিনটি পুস্তিকা আছে (যেগুলো আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম)। আমি কী কী লিখে রাখছি, সে বিষয়ে আমাকে এখন সতর্ক হতে হবে। অ্যারিস্টটল সম্ভাব্যতা আর অনিবার্যতার কথা বলতেন। কিন্তু সেই রত্ন বা গল্প দিয়ে কীই–বা হবে, যাতে বিষাক্ত ড্রাগনের ছোঁয়া নেই? সত্যিই কখনো যথেষ্ট কাজ করা সম্ভব না।

কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসন
ফাইল ছবি: এএফপি

উল্টো দিকে হাঁটা নিয়ে অল্প কিছু কথা

মা আমাদের উল্টো দিকে হাঁটতে মানা করতেন। মা বলতেন, মৃত মানুষেরা এভাবেই হাঁটে। এই ধারণা মা কোথা থেকে পেয়েছিলেন? হয়তো কোনো ভুল অনুবাদ থেকে। কারণ, মৃত মানুষেরা তো পেছন দিকে হাঁটে না, তারা হাঁটে আমাদের পেছনে পেছনে। তাদের ফুসফুস নেই বলে তারা আমাদের ডাক দিতে পারে না। কিন্তু তারা খুব করে চায় আমরা যেন পেছন ফিরে তাকাই। তারা আসলে ভালোবাসার শিকার, তাদের অনেকেই।

ভালোবাসা পাওয়ার সুখ নিয়ে অল্প কিছু কথা

দিনের পর দিন, ঘুম থেকে উঠেই আমি তোমার কথা ভাবি। কেউ একজন বাতাসের মধ্যে মণিমুক্তার মতো করে পাখিদের আর্তনাদগুলোকে সাজিয়ে রেখেছে।

মা আমাদের উল্টো দিকে হাঁটতে মানা করতেন। মা বলতেন, মৃত মানুষেরা এভাবেই হাঁটে। এই ধারণা মা কোথা থেকে পেয়েছিলেন? হয়তো কোনো ভুল অনুবাদ থেকে। কারণ, মৃত মানুষেরা তো পেছন দিকে হাঁটে না, তারা হাঁটে আমাদের পেছনে পেছনে। তাদের ফুসফুস নেই বলে তারা আমাদের ডাক দিতে পারে না। কিন্তু তারা খুব করে চায় আমরা যেন পেছন ফিরে তাকাই। তারা আসলে ভালোবাসার শিকার, তাদের অনেকেই।

ঠিক করে দেওয়া নিয়ে অল্প কিছু কথা

কাফকা তাঁর ঘড়ির সময় দেড় ঘণ্টা এগিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। আর ফেলিসে বারবার ঘড়িটা ঠিক করে দিতেন। নিজের ডায়েরিতে কাফকা লিখেছিলেন, তারপরও আমরা একে অন্যকে যেমন আছি, ঠিক সেভাবেই ভালোবাসি। এর সঙ্গে ফেলিসের সোনার দাঁত নিয়েও কিছু কথা লেখা ছিল। ১৯১২ সালে সেই দাঁতের ঝলক তাঁর কাছে সত্যিই নারকীয় মনে হচ্ছিল। পাঁচ বছর ধরে তাঁদের বিয়েটা হবে হবে করছিল। বিয়ে করার পক্ষে আর বিপক্ষে কী কী যুক্তি আছে, কাফকা তার একটা তালিকাও করেছিলেন। নিজের জীবনের আক্রমণ আর সহ্য করতে না পারাটা ছিল বিয়ে করার পক্ষে একটা যুক্তি। আর রাত সাড়ে দশটায় মা-বাবার বিছানায় শোয়ার জামাগুলো বিছিয়ে রাখা দেখতে হওয়াটা ছিল বিয়ের বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষরণ তাকে বাঁচিয়ে দিল। স্যানাটোরিয়ামের চিকিৎসকেরা যখন তাকে কথা বলতে মানা করল, তখন সে মেঝেজুড়ে কাচের বাক্য রেখে গেল। সেই বাক্যগুলোর একটা বলে, ফেলিসের ভেতরে তখনো অনেকখানি নগ্নতা বাকি ছিল। আর সুস্থ দাঁত? সেগুলোও নিজের মতো করে ভয়ংকর।

ভ্যান গঘ নিয়ে অল্প কিছু কথা

ভ্যান গঘ বলেছিলেন, আমি মদ খাই হলুদ আকাশটাকে বোঝার জন্য, ওই বিশাল হলুদ আকাশটাকে। পৃথিবীর দিকে তাকালে তিনি দেখতে পেতেন যে সব রং আসলে পেরেক দিয়ে জিনিসপত্রের সঙ্গে আটকানো, আর পেরেকগুলো কষ্ট পাচ্ছে।

ঘুমের পাথর নিয়ে অল্প কিছু কথা

ক্যামিল ক্লোদেল তাঁর জীবনের শেষ ত্রিশ বছর একটা মানসিক হাসপাতালে কাটিয়েছিলেন। কেন তাঁকে সেখানে থাকতে হচ্ছে, সে কথাই তিনি ভাবতেন, আর তাঁর কবি ভাইকে চিঠি লিখতেন। যে ভাই তাঁকে সেখানে পাঠানোর কাগজপত্রে সই করেছিল। চিঠিতে তিনি বলতেন, ‘আমাকে দেখতে এসো। মনে রেখো, আমি এখানে পাগল মেয়েদের সঙ্গে থাকি, দিনগুলো অনেক লম্বা মনে হয় আমার।’ তিনি ধূমপান করতেন না, পায়চারি করতেন না। ভাস্কর্য গড়তেও তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যদিও তাঁকে কিছু পাথর দেওয়া হয়েছিল, মার্বেল, গ্রানাইট আর পরফিরি। কিন্তু তিনি পাথরগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন, আর টুকরাগুলো জড়ো করে রাতের বেলা দেয়ালের বাইরে পুঁতে রেখেছিলেন। রাতের বেলাতেই তাঁর হাত দুটো বড় হতে হতে আরও বড় হয়ে যেত। এত বড় যে শেষ পর্যন্ত ছবিতে হাত দুটোকে দেখে মনে হতো যেন অন্য কারও শরীরের দুটো অংশ এনে তার হাঁটুর ওপর চাপিয়ে রাখা হয়েছে।

অ্যান কারসন
বিওউলফ শিহ্যান/ পেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল

পানি আটকানো নিয়ে অল্প কিছু কথা

ফ্রানৎস কাফকা ইহুদি ছিলেন। তাঁর এক বোন ছিল, নাম ওটলা। তিনিও ইহুদি ছিলেন। ওটলা বিয়ে করেছিলেন ইয়োসেফ ডাভিড নামে একজন আইনজ্ঞকে, যিনি ইহুদি ছিলেন না। ১৯৪২ সালে বোহেমিয়া-মোরাভিয়ায় নুরেমবার্গ আইন চালু হওয়ার পর শান্ত স্বভাবের ওটলা ইয়োসেফ ডাভিডকে বললেন যে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ করা উচিত। প্রথমে তিনি রাজি হননি। ওটলা তাঁর সঙ্গে রাতের অবয়বগুলো নিয়ে কথা বললেন, সম্পত্তি নিয়ে কথা বললেন, তাঁদের দুই মেয়েকে নিয়ে কথা বললেন। যুক্তি দিয়ে পুরো ব্যাপারটা দেখার কথাও বললেন; কিন্তু আউশভিৎসের কথা তিনি বলেনি, কারণ এই শব্দটা তখনো তাঁর জানা ছিল না, ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে যেখানে তাঁর মৃত্যু হবে। বাসাটা গুছিয়ে নেওয়ার পর তিনি একটা পিঠব্যাগে নিজের জিনিসপত্র ভরলেন। ইয়োসেফ ডাভিড তাঁর জুতা ভালো করে পলিশ করে দিলেন, তারপর গ্রিজের একটা প্রলেপ মাখিয়ে দিয়ে বললেন, এখন থেকে এগুলো ওয়াটারপ্রুফ।

মোনালিসা নিয়ে অল্প কিছু কথা

প্রতিদিন তিনি মেয়েটির ভেতরে তাঁর প্রশ্নগুলো ঢেলে দিতেন, যেভাবে একটা পাত্র থেকে আরেকটা পাত্রে পানি ঢালা হয় আর সেই পানি আবার ফিরে আসে আগের পাত্রে। আমাকে বোলো না যে তিনি তাঁর মাকে আঁকছিলেন, কিংবা কামনাকে আঁকছিলেন, কিংবা ওই রকম অন্য কিছু। পানি ঢালার সময় এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন পানি এই পাত্রেও থাকে না, ওই পাত্রেও থাকে না। কী একটা ভীষণ তৃষ্ণার মুহূর্ত সেটা! তিনি ভেবেছিলেন যে ক্যানভাসটা যখন একেবারে খালি হয়ে যাবে, তখন তিনি থামবেন। কিন্তু মেয়েরা তো অনেক শক্ত। মেয়েটি পাত্র চিনত, পানি চিনত, আর মরণশীল মানুষের তৃষ্ণা কেমন হয়, সেটাও জানত।

সিলভিয়া প্লাথ নিয়ে অল্প কিছু কথা

টেলিভিশনে তাঁর মাকে দেখেছিলে? তিনি যা বলেছিলেন, সেগুলো ছিল সাদামাটা, পুড়ে যাওয়া সব কথা। তিনি বলেছিলেন, কবিতাটা আমার চমৎকার মনে হয়েছিল, কিন্তু সেটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে। তিনি জঙ্গলের ভয়ের কথা বলেননি। তিনি বলেননি জঙ্গলের ঘৃণা, বুনো জঙ্গলের কান্না, ছেঁটে দিতে। তিনি বলেছিলেন নিজেকে শাসন করার কথা, তিনি বলেছিলেন পথের শেষের কথা। তিনি বলেননি বাতাসের মাঝের গুনগুন সুরের কথা, যা কেটে ফেলার জন্য তুমি এসেছিলে।

ক্যামিল ক্লোদেল তাঁর জীবনের শেষ ত্রিশ বছর একটা মানসিক হাসপাতালে কাটিয়েছিলেন। কেন তাঁকে সেখানে থাকতে হচ্ছে, সে কথাই তিনি ভাবতেন, আর তাঁর কবি ভাইকে চিঠি লিখতেন। যে ভাই তাঁকে সেখানে পাঠানোর কাগজপত্রে সই করেছিল। চিঠিতে তিনি বলতেন, ‘আমাকে দেখতে এসো। মনে রেখো, আমি এখানে পাগল মেয়েদের সঙ্গে থাকি, দিনগুলো অনেক লম্বা মনে হয় আমার।’ তিনি ধূমপান করতেন না, পায়চারি করতেন না।

সবকিছু সংগ্রহ করা নিয়ে অল্প কিছু কথা

ছোটবেলা থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন যে পৃথিবীর সব জিনিস তিনি নিজের কাছে রাখতে পারবেন, নিজের তাক আর বইয়ের আলমারিতে সারি করে সাজিয়ে রাখতে পারবেন। কোনো কিছুর অভাব থাকতে পারে, কোনো কিছু ভুলে যেতে হতে পারে, এমনকি একটা টুকরাও হারিয়ে যেতে পারে, এসব তিনি মানতে চাইতেন না। নুহের ভেতর থেকে নীল ত্রিভুজের আকারে শৃঙ্খলা বয়ে আসছিল। আর সবকিছুকে আলাদা আলাদা ভাগে সাজিয়ে রাখার সেই বিশুদ্ধ উন্মত্ততা তাঁর চারপাশে উঠে আসছিল, আস্তে আস্তে তাঁর জীবনটাকে গ্রাস করছিল। অন্যরা সেই উঠে আসা জিনিসগুলোকে ঢেউ বলে ডাকতে শুরু করল। তারপর তারা ডুবে গেল। একটা গোটা পৃথিবীভর্তি মানুষ।

বসে থাকা নিয়ে অল্প কিছু কথা

আজকাল তিনজন পাগলের সঙ্গে একটা ঘরে তাঁকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমার বাবা ছিলেন বিমানের নেভিগেটর। গুপ্তচরদের জন্য পার্সেল ফেলতে বাবা ফ্রান্সের ওপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে যেতেন। একবার সেই পার্সেলে ছিল নাইলনের স্টকিংস। যে জার্মানরা গুলি করে বিমানটা নামিয়েছিল, তাদের এই ব্যাপারটা বোঝানো কঠিন ছিল। তারা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘সে কোথায়?’ কিন্তু বাবা জার্মান ভাষা জানতেন না, আর বাকি তিনজন নিজের আসনেই মরে পড়ে ছিল।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডিয়ান কবি অ্যান কারসন
ছবি: নিকলাস এলমেহেড/ নোবেল প্রাইজ ডট অর্গ

‘ডক্টর ডেইমানের শারীরবিদ্যার পাঠ’ নিয়ে অল্প কিছু কথা

সেবার এত ঠান্ডা পড়েছিল যে হাঁটার সময় রোদ থেকে ছায়ায় গেলেই পার্থক্যটা টের পাওয়া যেত, মনে হতো মাথার খুলি বেয়ে পানি গড়িয়ে নামছে। ১৬৫৬ সালের সেই ক্ষুধা জর্জরিত শীতে ব্ল্যাক ইয়ান এলসিয়ে ওটিয়ে নামের এক যৌনকর্মীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলেন। কিছুদিন তাঁদের বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু এক বরফশীতল জানুয়ারিতে একটা কাপড় ব্যবসায়ীর বাড়িতে চুরি করতে দেখা গেল ব্ল্যাক ইয়ানকে। তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেন, পড়ে গেলেন, একজনকে ছুরি মারলেন, আর ২৭ জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হলো। এরপর তাঁর কী হয়েছিল, সেটা নিশ্চয়ই তোমার জানা। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ডক্টর ডেইমান তিন দিন ধরে ব্ল্যাক ইয়ানকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেরেছিলেন। ভাবতে ইচ্ছে হয়, এলসিয়ে কি কখনো রেমব্রান্টের আঁকা ছবিটা দেখেছিলেন, যেখানে তাঁর সেই চোর প্রেমিককে সামনের দিক থেকে এমন একটা কোণে দেখা যায় যে শরীরের দৈর্ঘ্য অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে। তাঁর নির্মল পায়ের তলা যেন প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে কেটে খোলা মস্তিষ্কটাকে। ডক্টর ডেইমান বলছেন, কাটো, সমস্যার উৎস খুঁজে পেতে গভীর করে কাটো। আর বলতে বলতে তিনি চুলে সিঁথি কাটার মতো করে মস্তিষ্কটাকে দুই পাশে সরিয়ে দিচ্ছেন। সেখান থেকে হাতড়ে হাতড়ে বিষণ্ণতা বেরিয়ে আসে।

আজকাল তিনজন পাগলের সঙ্গে একটা ঘরে তাঁকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমার বাবা ছিলেন বিমানের নেভিগেটর। গুপ্তচরদের জন্য পার্সেল ফেলতে বাবা ফ্রান্সের ওপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে যেতেন। একবার সেই পার্সেলে ছিল নাইলনের স্টকিংস। যে জার্মানরা গুলি করে বিমানটা নামিয়েছিল, তাদের এই ব্যাপারটা বোঝানো কঠিন ছিল। তারা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ‘সে কোথায়?’ কিন্তু বাবা জার্মান ভাষা জানতেন না, আর বাকি তিনজন নিজের আসনেই মরে পড়ে ছিল।

বিমান উড়তে শুরু করার অনুভূতি নিয়ে অল্প কিছু কথা

জানো, আমার মনে হয় ভালোবাসা হাত উঁচু করে আমার জীবনের দিকে ছুটে আসছে আর চিৎকার করে বলছে, ‘চলো এটা কিনে ফেলি, খুব সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে!’

অর্কিড নিয়ে অল্প কিছু কথা

আমরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খুঁড়ে বেঁচে থাকি, কারণ আমরা এমন মানুষ যাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। তুমি যে সুড়ঙ্গগুলো তৈরি করো, সেগুলো আমার কাছে অদ্ভুত রকমের উদ্দেশ্যহীন মনে হবে, যেন শিকড় উপড়ে ফেলা অর্কিড। কিন্তু তাদের সুবাস কখনো মরে না। ১৮৮৩ সালের একটা চিঠিতে এমিলি ডিকিনসন লেখেন যে কয়েক দিন আগে আমহার্স্ট থেকে একটা ছোট ছেলে পালিয়ে গেছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সে কোথায় যাচ্ছে, সে বলেছিল, ভারমন্ট অথবা এশিয়া।

আশ্রয় নিয়ে অল্প কিছু কথা

মাছের হৃৎপিণ্ড দিয়ে দেয়ালে লেখা যায়, ওতে ফসফরাস থাকে বলে। ওরা সেটা খায়, নদীর ধারে ওদিকটায় এমন কুঁড়েঘর আছে। আমি এভাবে লিখছি কারণ আমি চাই তোমার চোখে লেখাটা যতটা ভুল মনে হওয়া সম্ভব সেভাবেই লিখি। সেই কুঁড়েঘরে লেখা আছে, বের হওয়ার সময় দরজাটা আবার পাল্টে দিও। এবার তুমিই আমাকে বলো, এই কথাটা কতখানি ভুল। কতক্ষণ সেটা জ্বলজ্বল করে জ্বলবে। বলো আমাকে।