নিজের হৃদয়ে আমি বিঁধিয়ে দিয়েছি আজ নিজেরই নখর

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, এটা সবার জানা। তাঁর কবি পরিচয় স্বল্পজ্ঞাত। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে তর্ক–বিতর্ক চলবে। তবে কবিতায় তিনি হাফিজ বা ওমর খৈয়ামের সুফি আধ্যাত্মিকতার উত্তরাধিকারী। স্মৃতিকথায় কৈশোর থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা বলেছেন। জানিয়েছেন ফারসি, আরবি, উর্দু সাহিত্যের পাশাপাশি রুশ, ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতিও তাঁর অনুরাগের কথা। যৌবনে টান ছিল জ্যঁ পল সার্ত্রে ও বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রতি।

যুবাবয়সে ‘আমিন’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতে শুরু করেন। সাহিত্য–সাধনা ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ। সেটা করতে না পারার বেদনার কথা বারবার বলেছেন। নিয়মিত কবিতার মাহফিল আয়োজন করতেন। তাঁর অন্যতম প্রিয় কবি ও দার্শনিক ছিলেন উর্দু ভাষার কবি মুহাম্মদ ইকবাল।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির (১৯ এপ্রিল ১৯৩৯—২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

হে আমার সূর্য

নিজেকে ভুলে ফেরার হতে অধীর এ মন;
দেহের পিঞ্জিরা ছেড়ে উড়ে যেতে ব্যাকুল রুহের পাখি।

মরণের ভয়ে এই ফরিয়াদ, মোটেও তা নয়
মঞ্জিল কাছে এলে কাফেলার ঘণ্টি খুশিতেই বেজে ওঠে।

আমার হাত তো পৌঁছায় না হৃৎপিণ্ড অব্দি যে তা উপড়ে তুলে আনি
বুকের বস্ত্র ছিন্ন করা বাদে কীই–বা সমাধান এর।

তোমার অবাধ্য চুলের চেয়েও অন্ধকার হয়ে উঠছে আমার সন্ধ্যা
উদিত হও, হে আমার সূর্য, কেননা সকাল সমাগত।

তোমারই অভিমুখে, হে জীবনকুঞ্জের সারাৎসার
ব্যাকুল ডানা মেলেছে, আমার নিরিখের পাখি।

দেখার মতো লায়েক যত ফুল এই বাগানে
তারা তো তোমার থেকেই নিয়েছে রং আর সুরভি।

ব্যথার সঙ্গীদেরও বোঝাতে পারি না গভীর ব্যথার কথা
আমার তকদিরই এই যে সেই ব্যথা না-বলাই থেকে যাবে।

একবার মোহবশে বাসনার স্বাদ পেয়েছে যার ঠোঁট
এমন দিন আসবে, ও আমিন, আফসোসে সে ওই ঠোঁটই কামড়াবে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

নির্ভেজাল সুরা, নীল হলাহল

এত কোলাহল নিয়ে নিজের ভেতরদিল পেরেশান
এত আত্মরতি, হায়, যদি এ বেহাল দশার হতো অবসান

এ পথ আমাকে টানে, ওই পথও টানে, তৃণখড়কুটোর মতন
এ পেতে বাসনা জাগে, ও পেতেও জাগে, এতটাই বেখেয়ালি মন

নিজের হৃদয়ে আমি বিঁধিয়ে দিয়েছি আজ নিজেরই নখর
নেকড়ে স্বভাবে হায়, ঝাঁপিয়ে পড়েছি নিজ পালের ওপর

কখনো নিখাদ সুরা, কখনোবা এই আমি নীল হলাহল
ভেজাল ‘আমি’র ফেরে আত্মা ডুকরে ওঠে, ঝরে অশ্রুজল

চিরশিশু আমি এক, প্রেমের আঁচল ‘পরে পেতেছি শিথান
আমাকে ভুলিয়ে দিক আমার ‘অহং’, ঘুমপাড়ানিয়া কোনো গান

মাতালের বেশে ফিরি, হুঁশহারা, হে আমিন, ভুলেছি অতীত-বর্তমান
হয়েছে আমার প্রতি যতটা জুলুম, কার কাছে চাই বলো তার সমাধান?

হৃদয় আমার তোমার কাছে

বেখেয়ালে হৃদয় আমার
সঁপেছিলাম তোমার কাছে
জানি, তুমি ভুলেই গেছ
কিন্তু আমার মনে আছে।

দিলকাবা

ঠাঁই নিয়েছে যেজন গহন দিলকাবায়
আঁধার রাতে সে-ই তো উজল দীপশিখা
ভোরের হাওয়া, সেই সে প্রিয়ার দরবারে
আরজি জানাই, পৌঁছে দিয়ো এই লেখা।