জেন সন্ন্যাসী সান্তোকা তানেদা
আত্মহননের বদলে আত্মোপলব্ধির হাইকু
সান্তোকাকে ‘ফ্রি ভার্স হাইকু’ তথা স্বাধীন ছন্দের হাইকুর অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই রীতি ঐতিহ্যবাহী হাইকুর ৫-৭-৫ ছন্দ এবং ঋতুকথন (কিগো) থেকে মুক্ত। তাঁর কবিতা সরল, সত্যোচ্চারী এবং জীবনের দুঃখ-কষ্ট, একাকিত্ব ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি জাপানের সবচেয়ে প্রিয় আধুনিক কবিদের একজন, যাঁর কবিতা আজও লাখ লাখ পাঠককে অনুপ্রাণিত করে।
• উপস্থাপন ও অনুবাদ: সৈয়দ তারিক
সান্তোকা তানেদার জন্মনাম ছিল শোয়িচি তানেদা। সান্তোকা তাঁর লেখক নাম, যার অর্থ ‘জ্বলন্ত পর্বতশিখর’। তিনি জাপানের একজন বিখ্যাত হাইকু কবি এবং ভ্রাম্যমাণ জেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। জাপানি জেন কবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত একাকী নক্ষত্র। তাঁর জীবন একদিকে বেদনা, দারিদ্র্য, মাতলামি; অন্যদিকে জেন-ধ্যান আর হাঁটতে হাঁটতে জন্ম নেওয়া কবিতার স্রোতের সমাহার।
সান্তোকা ১৮৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর জাপানের ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের হোফু অঞ্চলে এক ধনী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল দুঃখ-কষ্টে ভরা এবং অস্থির। ছোটবেলায়ই তাঁর জীবনের ভিত কেঁপে ওঠে। তাঁর বয়স যখন ১১ বছর, তখন তাঁর বাবার বহুগামিতার কারণে তাঁর মা পারিবারিক কূপে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনা তাঁর জীবনে গভীর ছায়া ফেলে। এ ঘটনা তাঁর মধ্যে নারীদের প্রতি একধরনের ভয় ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
১৯০২ সালে তিনি ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়তে টোকিও যান। কিন্তু মানসিক অবসাদের কারণে ১৯০৪ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। চাকরিতে ঢোকেন, টিকতে পারেননি। তাঁদের পারিবারিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পিতা মদের কারখানা খুলে ব্যর্থ হন। পরিবার দেউলিয়া হয়। তাঁর ছোট ভাইও আত্মহত্যা করেন। সান্তোকা বিয়ে করেন। একটি পুত্রসন্তান হয়। কিন্তু বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে ১৯২০ সালে। তিনি মদ্যপানে আসক্ত হন, যা তাঁর জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।
কুমামোটোর হো-ওন-জি জেন মন্দিরে আসে সান্তোকার জীবনের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত: মন্দিরে থেকে জেন অনুশীলন করবেন না; বরং পথে বেরিয়ে পড়বেন। তিনি নিজেকে ‘হাঁটতে থাকা ভিক্ষু’ বানালেন। জপ নেই। কঠোর নিয়ম নেই। শুধু হাঁটা।
১৯২৪ সালে মদ্যপ অবস্থায় সান্তোকা আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে রেললাইনের ওপরে দাঁড়ান। একটি ট্রেন জরুরি ব্রেক কষে থেমে যায়। তাঁর আর আত্মহত্যা করা হয় না। স্টেশনে এক বৌদ্ধ সাধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়। তিনিই তাঁকে কুমামোটোর হো-ওন-জি নামক একটি জেন মন্দিরে নিয়ে যান। সেখানে তিনি প্রশান্তির একটি অনুভবের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ১৯২৫ সালে সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত গিয়ান মোচিজুকির কাছে তিনি জেন (সোতো ধারা) সন্ন্যাসী হিসেবে দীক্ষিত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪২ বছর।
এখানেই আসে সান্তোকার জীবনের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত: মন্দিরে থেকে জেন অনুশীলন করবেন না; বরং পথে বেরিয়ে পড়বেন। তিনি নিজেকে ‘হাঁটতে থাকা ভিক্ষু’ বানালেন। জপ নেই। কঠোর নিয়ম নেই। শুধু হাঁটা।
সান্তোকার বিখ্যাত বাক্য ছিল, ‘আমি হাঁটি, তাই আমি আছি (আই ওয়াক, দেয়ারফর আই অ্যাম)।’ তাঁর জন্য হাঁটা ছিল ধ্যান, স্বীকারোক্তি, মুক্তি, এমনকি আশ্রয়। হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখলেন, একটা পাথর, একটা গাছ, একটা মানুষের মুখ, একটু বৃষ্টি—প্রতিটিই তাঁকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখানেই তাঁর আধ্যাত্মিক রূপান্তরের মূল বিন্দু। আর এই হাঁটতে থাকার বিবিধ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করতে থাকেন হাইকু, যেগুলো তাঁর উপলব্ধিকে ধারণ করে রাখে।
জীবনের শেষ ১৫ বছর সান্তোকা ভিক্ষুক সন্ন্যাসী হয়ে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। তিনি ৪৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ হাঁটেন। তাঁর পদচিহ্ন পড়ে জাপানের সর্বত্র। এমনকি তিনি শিকোকু দ্বীপের ৮৮টি পবিত্র স্থানের তীর্থযাত্রাও সম্পন্ন করেন।
সান্তোকা ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, ছোট ছোট কুটিরে থাকতেন। মদ্যপান ছাড়তে পারেননি, কিন্তু কবিতা লেখা কখনো থামাননি। তাঁর জীবনকে ‘অর্থহীন অর্থহীনতার স্তূপ’ বলে বর্ণনা করেছেন নিজেই, কিন্তু সেই জীবন থেকেই অসাধারণ কবিতা জন্ম নিয়েছে। এ সময়েই তিনি তাঁর বেশির ভাগ কবিতা রচনা ও প্রকাশ করেন।
সান্তোকার জন্য ভিক্ষাপাত্র হাতে হাঁটা ছিল এক গতিশীল ধ্যান। দীর্ঘ পথচলা তাঁকে প্রকৃতির ঝড়বৃষ্টি, মানুষের উষ্ণতা-শীতলতা ও অন্তরের নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি করেছিল, যা তাঁর কবিতার প্রাণশক্তি।
সান্তোকার কবিতায় রয়েছে যা কিছু বিদ্যমান, তার স্বীকৃতি। তাঁর কবিতায় অভিযোগ বা প্রতিরোধ খুব কম। তিনি বৃষ্টিতে ভিজুন, রোদে পুড়ুন বা একাকিত্বে কাটান—বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বীকার করে নিতেন। জেনের এই ‘বর্তমানই সত্য’ নীতির প্রতিফলন আছে তাঁর কবিতায়।
সান্তোকা সারা জীবন মদ্যপান ও আত্মহননের প্রবণতার সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। নিজেকে কোনো নিখুঁত সাধু বলে দাবি করেননি তিনি। তাঁর ডায়েরি ও কবিতা এই সংগ্রামের নিবিড় চিত্র বহন করে। এই দুর্বলতার প্রতি সৎ স্বীকারোক্তি তাঁকে আরও বেশি মানবীয় ও জটিল করে তোলে।
তাঁর কবিতায় অভিযোগ বা প্রতিরোধ খুব কম। তিনি বৃষ্টিতে ভিজুন, রোদে পুড়ুন বা একাকিত্বে কাটান—বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বীকার করে নিতেন। জেনের এই ‘বর্তমানই সত্য’ নীতির প্রতিফলন আছে তাঁর কবিতায়। সান্তোকা সারা জীবন মদ্যপান ও আত্মহননের প্রবণতার সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন।
সান্তোকা ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ স্বল্প পরিসর জীবনোপকরণ বেছে নিয়েছিলেন। একটি ভিক্ষাপাত্র, একটি জেন পোশাক ও একটি টুপিই ছিল তাঁর প্রধান সম্পদ। এই বস্তুগত স্বল্পতাই ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা ও নির্মলতার অন্বেষণ।
সান্তোকা সব সময় নিজেকে দেখতেন: তাঁর দুর্বলতা, তাঁর মদের নেশা, তাঁর আকাঙ্ক্ষা—সবই। এগুলো লুকানোর চেষ্টা নয়; বরং অভিজ্ঞতাকে হাইকুর মতো ছোট বাক্যে স্থির করে দেওয়া ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর বেশির ভাগ হাইকু লেখা হয়েছে পথে। হাইকুর ছোট কাঠামো, ভিক্ষুর একাকী পথ, আর জেন-মনের স্থিরতা—তিনে মিলে তাঁর কবিতার ভঙ্গিমা তৈরি হয়েছে।
সান্তোকা ডায়েরি রাখতেন। সেখানে জীবনের উন্মুক্ত স্বীকারোক্তি, হতাশা, জেন-ধ্যান আর বেঁচে থাকার ছোট ছোট আনন্দ পাওয়া যায়। এগুলো আজ জাপানের সাহিত্য ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নথি।
সান্তোকার দর্শন গভীরভাবে জেন বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। তিনি জীবনকে অস্থায়ী (মুজো), একাকিত্বপূর্ণ (সাবি) এবং সরলতায় পূর্ণ বলে মনে করতেন। তাঁর কবিতায় ওয়াবি-সাবি (সরলতা ও একাকিত্বের সৌন্দর্য) প্রকাশ পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কবিতা ও জীবন একই ব্যাপার, ‘কবিতা রচনা মানেই জীবন।’ আমাদের মনে পড়বে জীবনানন্দের উক্তি: ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ।’
ঐতিহ্যবাহী হাইকুর নিয়ম থেকে মুক্তি নিয়ে সান্তোকা সরাসরি জীবনের সত্য প্রকাশ করতেন: দারিদ্র্য, মদ্যপান, একাকিত্ব, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা। তাঁর দর্শনে গতি (ভ্রমণ) গুরুত্বপূর্ণ—ভ্রমণই আত্মার যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। তিনি নিজেকে ‘মূর্খ’ বলে মেনে নিতেন এবং সেই মূর্খতায় শান্তি খুঁজতেন। জেনের মতোই তাঁর কবিতা সরল, অলংকারহীন এবং সত্যের সন্ধানী।
সান্তোকা প্রধানত হাইকু কবি। তিনি হাঁটতে হাঁটতে লেখা হাইকু ধারার জনক। তাঁর কবিতা ঐতিহ্যবাহী ৫-৭-৫ ছন্দ মানে না, ঋতুকথন বাধ্যতামূলক নয়। মুক্ত চলন, ভাঙা বাক্য, কখনো অসম্পূর্ণ চিত্র—এটাই তাঁর স্বাক্ষর। জীবদ্দশায় সাতটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পূর্ণ রচনা সংকলিত হয়। তাঁর কবিতা ৮০ হাজারের বেশি। দিনলিপি ও প্রবন্ধও লিখেছেন। সান্তোকার কবিতা সরল ভাষায় জীবনের গভীর সত্য প্রকাশ করে।
জেনের বড় কথা হলো: সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, সবই শূন্য। সান্তোকার কাছে এই শূন্যতা ভয় নয়; বরং আশ্রয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝলেন, যত কম জিনিস নিয়ে বাঁচব, তত কম ভয় থাকবে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘যখন আমার কিছুই থাকে না, তখনই পৃথিবীকে সবচেয়ে কাছে পাই।’ এ উপলব্ধি তাঁকে ভেতর থেকে মুক্ত করেছে।
সান্তোকার রূপান্তরের আরেকটা স্তর হলো, তিনি নিজের দুর্বলতা থেকে পালাননি। মদ্যপান, আলস্য, দারিদ্র্য—সবই আছে তাঁর কবিতায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই স্বীকারোক্তি পরিণত হয় আত্মগ্রহণে। নিজেকে মেনে নিতে পারার সক্ষমতাই তাঁকে শান্ত করেছে।
জীবনের শেষে সান্তোকা কোনো ‘জ্ঞানী গুরু’ ছিলেন না; বরং ছিলেন এক ভগ্ন ভিক্ষু। তবু তাঁর অন্তরে একধরনের স্ফটিকস্বচ্ছ সরলতা তৈরি হয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন: আমাকে বড় কিছু হতে হবে না। আমি যতটা ক্ষুদ্র, ততটাই সত্য। এ বোধই তাঁকে সম্পূর্ণ করেছে। তাঁর শেষ কবিতাগুলোতে ঘন নীরবতা আছে, যার ভেতরে আছে শান্ত আলো।
তিনি নিজের জীবনটা যেমন ছিল, ঠিক তেমনই কবিতায় রেখে গেছেন। সাজসজ্জা নেই, পরিমার্জন নেই, শুধু সত্যের মুহূর্ত। তাই তাঁকে পড়তে পড়তে মনে হয় না যে তিনি শুধু হাইকু লিখছেন; মনে হয়, তিনি হেঁটে যাচ্ছেন আর আমরা পাশে হাঁটছি—নিঃশব্দে, কিন্তু বুঝে বুঝে।
সান্তোকা এক ভাঙা, দিকহারা মানুষ থেকে এক স্বচ্ছ, হালকা, পথচলার উপস্থিতিতে স্থির মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। আর এটি ঘটেছে কোনো গুরুগম্ভীর প্রবচন দিয়ে নয়; বরং হাঁটার তাল, নিঃস্বতার স্বস্তি আর মুহূর্তকে দেখে ফেলার ক্ষমতা দিয়ে।
১৯৩৮ সালে, সান্তোকা মাতসুইয়ামার কাছে একটি কুঁড়েঘরে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪০ সালের ১১ অক্টোবর ৫৭ বছর বয়সে তিনি ঘুমের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও তিনি কবিতা লিখেছিলেন।
যদি সান্তোকার কাজ এক বাক্যে ধরতে হয়, তাহলে বলা যায়, তিনি নিজের জীবনটা যেমন ছিল, ঠিক তেমনই কবিতায় রেখে গেছেন। সাজসজ্জা নেই, পরিমার্জন নেই, শুধু সত্যের মুহূর্ত। তাই তাঁকে পড়তে পড়তে মনে হয় না যে তিনি শুধু হাইকু লিখছেন; মনে হয়, তিনি হেঁটে যাচ্ছেন আর আমরা পাশে হাঁটছি—নিঃশব্দে, কিন্তু বুঝে বুঝে।
সান্তোকা জীবদ্দশায় সীমিত পরিচিত ছিলেন, কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিক থেকে জাপান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর খ্যাতি বৃদ্ধি পায়। তাঁর নিখাদ জীবনযাপন, ভাগ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সততা ও প্রাণবন্ত মুক্ত কবিতা মানুষকে আকর্ষণ করে। তিনি জেন–দর্শন ও আধুনিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তাঁর মুক্ত ছন্দের হাইকু আধুনিক হাইকুর সীমানা প্রসারিত করেছে।
সান্তোকা আজও জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা জীবনের দুঃখকে সুন্দর করে তোলে এবং সরলতায় শান্তি খুঁজে পাওয়ার পথ দেখায়। সান্তোকা তানেদা এমন এক কবি, যিনি তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণরূপে শিল্পে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর জীবন ও কবিতা পরস্পরের ব্যাখ্যা। অনন্ত পথচলা ও ‘যা আছে’ তা গ্রহণের মাধ্যমে, তিনি সবচেয়ে সহজ ভাষায় আধুনিক মানুষের আত্মার গভীরের নিঃসঙ্গতা, সংগ্রাম, শান্তি ও তাৎপর্য অন্বেষণের ছাপ রেখে গেছেন। তিনি শুধু ছোট ছোট কবিতা নয়; বরং জীবনযাপনের এক গভীর সম্ভাবনার ইঙ্গিত রেখে গেছেন।
সা ন্তো কা তা নে দা র হা ই কু
আমরা এখন সান্তোকা তানেদার একগুচ্ছ হাইকুর ভাবানুবাদ পড়ব। হাইকুগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন তাঁর আত্মযাত্রার রূপান্তরগুলো ধরা যায়। ৫টি ধাপে ১০টি করে হাইকু দেওয়া হয়েছে। ধাপগুলো এমন: ভাঙন, অনুসন্ধান, নীরবতা, স্বীকারোক্তি, স্বচ্ছতা।
ধাপ ১: ভাঙন, দিশাহারা অবস্থা, ভেতরের অন্ধকার
১.
পথের ধারে বসে—
আজও নিজেকে
খুঁজে পেলাম না।
২.
চোখ দুটো ভারী—
গত রাতের
হতাশা এখনো জমে আছে।
৩.
ভাঙা সেতু—
আমার ভাগ্যের
ঠিকমতো সাজানো ছবি।
৪.
ঝরাপাতা—
আমি যেদিকে যাই
সেখানে পড়ে থাকে।
৫.
রাতের ঠান্ডায়—
আমার ভুলগুলো
কুয়াশা হয়ে দাঁড়ায়।
৬.
কেউ ডাকেনি—
তবু আমি
ফিরে তাকাই।
৭.
ভাঙা মন্দির—
এ রকমই তো
আমার ভেতর।
৮.
মদের গন্ধ—
আমাকে মনে করায়
কতটা হারিয়েছি।
৯.
পুরোনো ক্ষত—
শরীর নয়,
মনে ব্যথা।
১০.
খালি বাটি—
আজও আমার
সবচেয়ে সত্য স্বীকারোক্তি।
ধাপ ২: ভেতরের ডাক, পরিবর্তনের প্রথম আলো
১১.
হঠাৎ থামলাম—
কারণ, হাওয়াটা
একটু নরম লাগল।
১২.
ভোরের আলো—
জানাল না আমি কে,
তবু শান্ত করল।
১৩.
পাখির ডাক—
আশ্চর্যভাবে
কিছু খুলে গেল।
১৪.
ভিক্ষার পথে—
কেউ না দেখলেও
যেন কেউ ছুঁয়ে যায়।
১৫.
আজ প্রথম মনে হলো—
হাঁটতেই হবে
বাঁচার জন্য।
১৬.
ভুলগুলো রেখে—
হালকা ধুলোর মতো
হেঁটে যাই।
১৭.
সূর্য নেমে গেলে—
নিজেকে
কম ভয় লাগে।
১৮.
কখনো ভাবিনি—
একটি পুরোনো গাছ
আমাকে এভাবে শুনতে পারে।
১৯.
ছিন্ন মেঘ—
আমাকেও করে
ছিন্ন, কিন্তু মুক্ত।
২০.
কারও দরজায়—
না বলার ভেতরেও
অদ্ভুত মমতা ছিল।
ধাপ ৩: জেন-প্রবেশ, নীরবতা, স্বীকারোক্তি
২১.
ঝরনার শব্দ—
আমার ভেতরের
অগোছালো ভাব মুছে দেয়।
২২.
দীর্ঘ পথ—
গোটা দিন
শুধু নিজের সঙ্গে ছিলাম।
২৩.
পায়ের ব্যথা—
প্রার্থনার মতো
নেমে আসে।
২৪.
মেঘহীন আকাশ—
একদম এমনই
হতে চাই।
২৫.
পশমি বাতাস—
আমার নামে
কিছুই চায় না।
২৬.
নদীর ধারে—
শূন্যতা আজ
বন্ধু হয়ে আসে।
২৭.
নীরব মন্দির—
আমার নীরবতা
ধীরে ধীরে বোধ জাগায়।
২৮.
হাঁটতে হাঁটতে—
অতীত নিজেই
ধুলো হয়ে উড়ে গেল।
২৯.
কুয়াশার ভেতর—
আমি শুধু
আমাকেই খুঁজলাম।
৩০.
থেমে শ্বাস নিই—
এটুকুই যথেষ্ট
আজকের ধ্যান।
ধাপ ৪: বিস্তার, গ্রহণ, উপস্থিতি
৩১.
পাহাড়ি বাঁকে—
একটুকরো দৃশ্য
আমাকে বদলে দিল।
৩২.
ক্ষুধা ছিল—
তবু কৃতজ্ঞতা
পেট ভরাল।
৩৩.
শীতে কাঁপতে—
নিজের শরীরটাকেও
আজ ভালো লাগে।
৩৪.
পাতাঝরা দুপুর—
সব হারানো জিনিস
শব্দ না করেই যায়।
৩৫.
আগুনের পাশে—
আমি শুধু
উষ্ণতা হতে চাইলাম।
৩৬.
নুয়ে থাকা গাছ—
তার ভঙ্গিমায়
এক বিজয় আছে।
৩৭.
বৃষ্টিতে ভিজে—
নিজেকে অবাক করে
হেসে ফেললাম।
৩৮.
শুকনো ঘাস—
এত সহজ,
এত টেকসই।
৩৯.
সমুদ্র দেখলাম—
নিজেকে আর
ছোট লাগল না।
৪০.
সন্ধ্যার রং—
আমি যতটা বুঝি
তার চেয়ে বেশি শেখায়।
ধাপ ৫: পরিণতি, স্বচ্ছতা, মুক্তি
৪১.
লম্বা পথ—
এবার মনে হলো
আমি কিছুই বহন করি না।
৪২.
বাতাস বয়ে যায়—
আমাকেও নিয়ে
যেতে পারে।
৪৩.
নিচু হয়ে—
একটি পাথর তুললাম,
গুরুত্বহীনতার আনন্দে।
৪৪.
খোলা আকাশ—
সারা জীবন
এটাই খুঁজেছি।
৪৫.
নদীর শব্দ—
মনে হলো, আমার জীবনও
এমনই সহজ হওয়া উচিত।
৪৬.
পথে পথে—
যা কিছু পেয়েছি
সবই উপহার।
৪৭.
সন্ধ্যা নামে—
এখন আর
অন্ধকার ভয় না।
৪৮.
শূন্য হাত—
এই হালকা অবস্থাটাই
আমার সম্পদ।
৪৯.
আজকে বুঝলাম—
হাঁটার ভেতরেই
আমার ঘর।
৫০.
শেষ আলো—
আমি যতবার জন্মেছি
সবই এই মুহূর্তে।