গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস : আমার বিষণ্ন গণিকার স্মৃতিকথা

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস ‘মেমোরিজ অব দ্য মেলানকলি হোরস’–এর  প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ ছাপা হয়েছিল ২০০৫ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম আলোর সাময়কীতে। এত দিন অনুবাদটি শুধু কাগজের পাতাজুড়ে ছিল। আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন গাউস রহমান পিয়াস

পুরনো পত্রিকা অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

যে বছর আমি নব্বইতে পা দিলাম, নিজেকে উপহার দিতে চাইলাম কৈশোরপ্রাপ্ত কোনো কুমারীর সঙ্গে বুনো প্রেমের একটি রাত। মনে পড়ল রোজা কাবারকাসকে, একটি গণিকালয়ের মালিক—যে কিনা নতুন কোনো মেয়ে জোগাড় হলেই তার ভালো খদ্দেরদের খবর দেয়। তার এই বা এ–জাতীয় বহু নীচ প্রলোভনের কোনোটিতেই আমি কখনো বশ হইনি, এরপরও আমার চরিত্রের শুদ্ধতায় তার বিশ্বাস ছিল না। একদিন দেখবেন নৈতিকতাও সময়ের সঙ্গে পাল্টে যায়—ঈর্ষাকাতর হাসিতে বলত সে। সে ছিল আমার চেয়ে অল্প বড় এবং তার ব্যাপারে অনেক বছর কিছুই আমার কানে আসেনি, এমনকি মারা গিয়েও থাকতে পারে। কিন্তু একটা রিং বাজতেই তার কণ্ঠ আমি চিনতে পারলাম এবং কোনো ভূমিকায় না গিয়েই তার দিকে গুলিটা ছুড়ে দিলাম:

‘আজই সেই দিন।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে: হায়রে আমার বিষণ্ন পণ্ডিত, বিশ বছর লাপাত্তা আর ফিরে এলেন এমন কিছু চাইতে, যা দেওয়া অসম্ভব। মুহূর্তেই সে তার শিল্পের অস্ত্রটা ফিরে পেল এবং আমাকে প্রস্তাব দিল আধডজন আনন্দ খোরাকের, তবে এই সব কটিই, সত্যি বলতে কি, ছিল ব্যবহৃত। আমি বললাম, না—বোঝাতে চাইলাম মেয়েটিকে কুমারী হতে হবে এবং তাকে আজ রাতেই আমার চাই। সাবধানী কণ্ঠে বলল সে, তুমি কী প্রমাণ করতে চাইছ? কিছুই না, বললাম আমি, মর্মাহত, কারণ আমি ভালো করেই জানি আমি কী পারি আর কী পারি না। সে–ও অনড়, বলল, পণ্ডিতেরা এটি হয়তো ভালোই জানেন, তবে তারা সবকিছু জানেন না—বিশ্বে শুধু সেসব কন্যারাশির জাতকেরাই রয়ে গেছেন, যারা তোমার মতো জন্মেছে আগস্টে, তো আগে কেন জানালে না? প্রত্যাদেশ কখনো জানান দিয়ে আসে না, বললাম আমি। তবে এটি সম্ভবত অপেক্ষা করতে পারে, বলল সে, সর্বদাই যেকোনো পুরুষের চেয়ে বেশি যার জানাশোনা এবং বাজার তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে মাত্র দুই দিন সময় চাইল। আমি গুরুতর ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম এ রকম একটি ব্যাপারে, আমার এই বয়সে, প্রতিটি ঘণ্টা বছরের সমান। এ সময়ে এটি সম্ভব নয়—বলল সে; সূক্ষ্মতম সন্দেহও না প্রকাশ করে—তবে ব্যাপার না, এ রকম করে হলে এসব আরও মজার হয়, সে যা–ই হোক, আমি তোমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে ফোন করছি।

আমাকে এভাবে বলতে হয় না, কারণ মানুষ তা অল্প দূর থেকেই দেখতে পায়: আমি কুৎসিত, লাজুক এবং যুগ-অনুপযোগী। তবে এসবের কোনোটাই না হওয়ার ইচ্ছে থেকে আমি ঠিক উল্টোটা ভান করেছি। তবে এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বলে দেব আমার নিজের স্বাধীন ইচ্ছের কথাটা বা ঠিক কী রকম মানুষ আমি, এতে করেও যদি আমার বিবেকবোধটা সহজ হয়। আমি তার সূচনা করেছিলাম রোজা কাবারকাসকে একটি অস্বাভাবিক ফোন করার মাধ্যমে, আজকের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে, ওটি ছিল একটি নতুন জীবনের শুরু আর তা এমন বয়সে, যখন বেশির ভাগ নৈতিকতারই ইতিমধ্যে মরণ হয়েছে।

আমি থাকি একটি ঔপনিবেশিক বাড়িতে, সান নিকোলাস পার্কের রৌদ্রোজ্জ্বল দিকটায়, যেখানে আমি ব্যয় করেছি আমার জীবনের সব কটি দিন স্ত্রী ছাড়া, ভাগ্য ছাড়া, যেখানে আমার মা–বাবা জীবনযাপন করেছেন ও মারা গেছেন এবং যেখানে আমিও একাকী মরব বলে ঠিক করেছি, ওই একই শয্যায়; যাতে আমি জন্মেছিলাম এবং এমন এক দিনে, যা দূরবর্তী ও বেদনাবিহীন হবে বলে আশা করছি। আমার বাবা উনিশ শতকের শেষ দিকে সরকারি নিলামে বাড়িটি কেনেন, নিচতলাটি ভাড়া দেন ইতালীয়দের একটি সমিতির অভিজাত দোকানপাট করার জন্য আর নিজের জন্য রেখে দেন তিনতলাটা, যেখানে তিনি সুখে-শান্তিতে বসবাস করবেন, সঙ্গে থাকবে ইতালীয়দের মেয়েদের একজন, ফ্লোরিনা ডি ডিউস কারগামেনটোস, যে কিনা মোত্সার্টের একজন উল্লেখযোগ্য বোদ্ধা ও একজন বহুভাষী গ্যারিবালডি ভক্ত এবং ওই নগরীতে বসবাস করা মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী ও মেধাবী—আমার মা।

বাড়িটি খোলামেলা ও উজ্জ্বল, আস্তর দেওয়া বাঁকানো খিলান, মেঝেতে ফ্লোরেন্সের মোজাইক আর গ্লাসের চারটি দরজার ওপারে একটি ঘোরানো ব্যালকনি, যেখানে আমার মা মার্চের রাতগুলোতে প্রেমের গীতিনাট্য গাইতে বসবেন অন্য মেয়েদের সঙ্গে, যারা তার জ্ঞাতি বোন। সেখান থেকে আপনি দেখতে পাবেন সান নিকোলাস পার্ক, ক্যাথেড্রাল এবং ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভাস্কর্য আর সেগুলো ছাড়িয়ে গেলে নদীর ঘাটে গুদামের সারি এবং মোহনা থেকে কুড়ি লিগ দূরে গ্রেট ম্যাগডালেনা নদীর বিশাল দিগন্ত। বাড়িটির একমাত্র বিরক্তিকর দিক হচ্ছে সূর্য সারা দিন এক জানালা থেকে আরেক জানালায় সরে যেতে থাকে এবং ভ্যাপসা গরমে আলো-আঁধারিতে দিবানিদ্রার চেষ্টা করার সময় আপনাকে এই সব কটি জানালাই বন্ধ করতে হবে। যখন আমাকে একা হয়ে যেতে হলো, ৩২ বছর বয়সে, আমি সেখানটায় সরে গেলাম, যা ছিল আমার মা–বাবার শয়নকক্ষ। ওই কক্ষ ও পাঠাগারের মাঝখানটায় খুলে দিলাম একটা দরজা এবং আমার বেঁচে থাকার জন্য দরকারি নয় এমন সবকিছুই নিলামে দেওয়া শুরু করলাম, পরে দেখা গিয়েছিল বইপত্র ও পিয়ানোলার কাগজের রুল ছাড়া প্রায় সবই এ তালিকায় পড়েছে।

চল্লিশ বছর ধরে আমি ছিলাম এল ডায়রিও দে লা পাজের কেব্ল এডিটর, কাজ বলতে গদ্যে পুনর্নির্মাণ করা দুনিয়ার তাবত খবরকে, যেগুলো ক্ষুদ্রতরঙ্গে কিংবা মোর্স সংকেতের আকারে মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর সময় ধরতাম আমরা। সেই বিলুপ্ত পেশা থেকে আসা পেনশনের অর্থের সঙ্গে আজ আমি লড়াই করি, শুধু স্প্যানিশ ও লাতিন ব্যাকরণ শিখিয়ে একজন থেকেও যা পাই, পেনশনটা তার চেয়েও কম। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে রোববারের যে কলাম লিখে আসছি, তা থেকেও প্রায় কিছুই পাই না এবং কিছুই আসে না সেসব সংগীত ও নাটকবিষয়ক লেখাগুলো থেকেও, যেগুলো বিখ্যাত শিল্পীদের শহরে আসার সুবাদে বিভিন্ন সময় ছাপা হয় আমার প্রতি আনুকূল্য থেকে। লেখালেখি ছাড়া কিছুই কখনো করিনি আমি, গল্পকার হওয়ার মতো দক্ষতা বা মেধা আমার নেই, নাটকীয় লেখনশৈলীর বিধানেও আমার বিন্দুমাত্র দখল নেই আর আমি এ পেশায় যুক্ত হয়েছি এ জন্য যে জীবনে যা কিছুই পড়াশোনা করেছি, তার বিচ্ছুরিত আলোয় আমার বিশ্বাস আছে। এক কথায়, আমার মহান ভালোবাসার স্মৃতির মধ্য দিয়ে আমি যে ঘটনার বিবরণ আমার সর্বোচ্চ সাধ্যমতো দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছি, সেটি দিতে না পারা মানে হবে আমি একটি রেখার শেষ প্রান্ত, যার কোনো গুণ নেই, মেধা নেই—যে তার ওয়ারিশদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারবে না।

আমার নব্বইতম জন্মদিনে আমি জাগলাম, বরাবরের মতোই, সকাল পাঁচটায়। যেহেতু দিনটি ছিল শুক্রবার, আমার একমাত্র অবশ্যকরণীয় ছিল এল ডায়রিও দে পাজে আমার রোববারের কলামটি লেখা। আমি যে সুস্থ বোধ করছি না, তার সব উপসর্গই এই ভোরে ঠিকঠাক জানান দিচ্ছিল—ঘড়ির ছোট ঘণ্টাগুলো থেকেই হাড়গোড়ে যন্ত্রণা হচ্ছিল, গুহ্যদ্বার জ্বলছিল আর তিন মাসের খরার পর ঝড়ের আভাস দিচ্ছিল বিদ্যুৎ। কফি ফোটার সময় স্নানটা সেরে নিলাম। মধু মিশিয়ে মিষ্ট করে ঢাউস এক কাপ পান করলাম। দুই টুকরা কাসাভা রুটি খেলাম এবং বাড়িতে লিনেনের যে ওভারঅলটা পরে থাকি, তা জড়িয়ে নিলাম।

ওই দিনকার কলামের বিষয় ছিল, অবশ্যই, আমার নব্বইতম জন্মদিন। কোনো দিনই আমার মনে হয়নি বয়স হলো ছাদের ফুটার মতো, যা ইঙ্গিত করে একজন আর কত দিন বাঁচবে। আমি যখন খুব ছোট, একজনকে বলতে শুনেছিলাম, মানুষ যখন মারা যায়, তার চুলের সব উকুন আতঙ্কে বালিশে নেমে আসে, যা মৃতের পরিবারের জন্যও হয় লজ্জার। এটি আমার জন্য এমন এক রূঢ় হুঁশিয়ারি ছিল যে আমি স্কুলে যেতাম ছাঁটা চুলে এবং এখনো যে ক গাছা রয়ে গেছে, সেগুলো আমি ধুই এমন সাবান দিয়ে, যা দিয়ে আপনি হয়তো মাছি-কামড়ানো কৃতজ্ঞ কুকুরকে স্নান করাবেন। তার মানে, আমি নিজেকে বলি, ছোটবেলা থেকেই আমার সামাজিক সৌন্দর্যবোধ আমার মৃত্যুর বোধের চেয়ে বেশি বিকশিত।

গত কয়েক মাস আমি প্রত্যাশা করেছি আমার জন্মদিনের কলাম বিগত বছরগুলোর স্মরণে গতানুগতিক শোকগাথা হবে না, হবে এর ঠিক উল্টো—বার্ধক্যের জয়গান। আমি খুঁজতে শুরু করলাম ঠিক কখন আমি বুড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছিলাম এবং আমি বিশ্বাস করি, সময়টি ছিল ওই দিনটির অল্প আগে। ৪২ বছর বয়সে পিঠে ব্যথা, সঙ্গে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিত্সকের কাছে গিয়েছিলাম আমি। ডাক্তার গা-ই করলেন না—এ ধরনের ব্যথা আপনার এই বয়সে স্বাভাবিক, বললেন তিনি।

‘তাহলে’ আমি বললাম, ‘আমার এই বয়সে কোনটা স্বাভাবিক নয়।’

জবাবে সমব্যথার হাসি হাসলেন ডাক্তার। আপনি তো দার্শনিক দেখছি, বললেন তিনি। ওইবারই প্রথম নিজের বয়স নিয়ে ভাবতে গিয়ে বুড়ো হয়ে যাওয়ার কথা মাথায় এল, তবে বিষয়টি ভুলতে খুব বেশি সময় লাগল না। একেক দিন একেক রকম ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। বছর গড়াতে লাগল, পাল্টাতে লাগল ব্যথার স্থান। মাঝেমধ্যে মনে হতো এ যেন মৃত্যুর নখর, আবার পরদিনই তা অদৃশ্য হয়ে যেত। ওই সময়ই আমি শুনলাম, যেদিন আপনি আপনার বাবার মতো হয়ে উঠতে শুরু করবেন, বুঝবেন এটিই আপনার বুড়ো হওয়ার প্রথম লক্ষণ। আমাকে অবশ্যই চিরযৌবনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, ভাবলাম আমি। কারণ, আমার অশ্বতুল্য বপু কখনোই আমার বাবার নিখাদ ক্যারিবীয় গড়ন কিংবা আমার মায়ের রাজকীয় দেহসৌষ্ঠবের মতো মনে হবে না। সত্য এই যে প্রথম দিককার পরিবর্তনগুলো এত ধীরে ঘটে যে প্রায় নজরেই আসে না এবং প্রতিবারই আপনি নিজেকে দেখেন ভেতর থেকে, আর অন্যরা আপনাকে দেখে থাকে বাইরে থেকে।

আমার পঞ্চাশের দশকে যখন প্রথম আঁচ করলাম স্মৃতিশক্তি কমে আসছে, কল্পনা করতে শুরু করলাম বার্ধক্যটা ঠিক কেমন। চশমা খুঁজতে গিয়ে বাড়িটা ওলট–পালট করে একসময় আবিষ্কার করতাম ওটা আমি পরেই আছি, অথবা চশমা পরা অবস্থায় গোসল শুরু করে দিতাম কিংবা দূরে দেখার চশমার ওপরই চাপিয়ে দিতাম পড়ার চশমা। একদিন আমি দুবার নাশতা করলাম। কারণ, প্রথমবারটির কথা আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আর আমি বন্ধুদের মধ্যেও সতর্কতা আবিষ্কার করতে সক্ষম হলাম, যখন তারা আমাকে বলতে সাহস পাচ্ছিল না যে এক সপ্তাহ আগে বলা গল্পটি আমি আবারও তাদের বলছি। ওই সময় সব পরিচিত মুখের একটি মানসিক তালিকা করলাম, একইভাবে আরেকটি তালিকা করলাম তাদের নামের, কিন্তু সাক্ষাত্কালে আমি সব সময় চেহারার সঙ্গে নাম মেলাতে গিয়ে সফল হতাম না।

আমার যৌন-বয়স কখনোই আমাকে উদ্বিগ্ন করেনি। কারণ, আমার শক্তি ততটা আমার ওপর নির্ভরশীল ছিল না, যতটা ছিল নারীদের ওপর এবং যখনই ইচ্ছে হতো তারা জানতে সক্ষম হতো তারা কীভাবে চায়, কী চায়। আজ ৮২ বছর বয়সী যুবকদের দেখে আমার হাসি পায়, যারা ওই সব আকস্মিক আঘাতে ভয় পেয়ে ডাক্তারের পরামর্শ চায়—এটি না জেনে যে আপনি নব্বইয়ের কোঠায় হলে ওই সব সমস্যা বাড়বেই, তবে তা গুরুতর কিছু না—এই সবই জীবিত থাকার ঝুঁকিমাত্র। অন্যদিকে এ তো জীবনেরই পরম বিজয় যে বার্ধক্যে মানুষ অপ্রয়োজনীয় বিষয় আশয়ের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে, যদিও আমাদের সত্যিকারের আগ্রহ রয়েছে এমন বিষয়ের স্মৃতি প্রায়ই মরে না। সিসেরা এটি বুঝিয়েছেন কলমের একটিমাত্র আঁচড়ে—কোনো বুড়োই ভোলেন না কোথায় তিনি তার সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন।

এসব এবং আরও কিছু ভাবনা মিলিয়ে আমি আমার রোববারের কলামের প্রথম খসড়াটি দাঁড় করিয়েছিলাম যখন আগস্টের সূর্য পার্কের অ্যালমন্ডগাছগুলোয় বিস্ফোরিত হলো এবং খরার কারণে এক সপ্তাহ দেরিতে চিঠি নিয়ে আসা নৌ তরিটি গর্জাতে গর্জাতে ঢুকল বন্দরের খালে। আমি ভাবলাম আমার নব্বইতম জন্মদিন আসছে। আমি কখনোই জানব না—কেন, জানার ভানও করি না, কিন্তু ওই বিধ্বংসী স্মৃতিচারণার জাদুকরি প্রভাবের ফলে আমি রোজা কাবারকাসকে ফোন করার সিদ্ধান্ত নিলাম, যাতে সে আমাকে একটি স্বেচ্ছাচারী রাতের মধ্য দিয়ে আমার জন্মদিনটি উদ্যাপনে সহায়তা করে। আমি আমার শরীর নিয়ে পবিত্র শান্তির সঙ্গে বছরের পর বছর পার করেছি আমার ক্লাসিকগুলোকে এলোমেলোভাবে বারবার অধ্যয়ন এবং গানের কনসার্টগুলোতে ব্যক্তিগতভাবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সময় কাটিয়ে, কিন্তু সেদিন আমার আকাঙ্ক্ষাটা এত তীব্র হয়ে ওঠে যে মনে হচ্ছিল এ যেন ঈশ্বরেরই কোনো বার্তা। ফোন করার পর আমার কলম চলছিল না। আমি ঝুল-বিছানাটাকে পাঠাগারের সে কোনাটায় টানিয়ে দিলাম, যেখানে সূর্য সকালে আলো ফেলে না আর আমি তাতে নিজেকে সঁপে দিলাম, অপেক্ষার উত্কণ্ঠায় আমার বুক তখন ভারী।

আমি ছিলাম অত্যধিক লাই পাওয়া এক শিশু, যার মা অনেক গুণের অধিকারী—যার মৃত্যু হয় পঞ্চাশ বছরে এক বিরল যক্ষ্মা রোগে—আর যার বাবা খুব লৌকিকতাপ্রিয়, যে কিনা কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতেন না এবং যার মৃত্যু হয় মৃতদার পুরুষের শয্যায় নিরলান্ডিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দিন, যার ফলে হাজার বছরের যুদ্ধ এবং বিগত শতাব্দীর অসংখ্য গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। শান্তি শহরটাকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা কখনো কেউ ভাবেনি বা আশা করেনি। একদল মুক্ত নারী মাতাল হয়ে সমৃদ্ধ করল পুরোনো সরাইখানাগুলোকে কালে আনচে-তে, যা পরে পরিচিত হয়েছিল ক্যামেলন আবেলো নামে এবং বর্তমানে যাকে বলা হয় পাসিও কলোন, আমার আত্মার এ শহরে, যা এর মানুষজনের ভালো স্বভাব ও এর আলোর শুদ্ধতার জন্য স্থানীয় ও বহিরাগত সবার কাছেই খুব প্রিয়।

কখনোই এমন কোনো নারীর সঙ্গে আমি বিছানায় যাইনি, যাকে অর্থ দিইনি, যে দুয়েকজন পেশাদার ছিল না, তাদেরও আমি বাধ্য করেছি, যুক্তির জোরে হোক কিংবা গায়ের জোরে, অর্থ নিতে, তা যদি তারা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে থাকে, দিক। বয়স বিশ হওয়ার পর আমি একটি তালিকায় নাম, বয়স, স্থান এবং ভালোবাসাবাসির সময়কার পরিবেশ ও কৌশল সংক্ষেপে লিখে রাখতে শুরু করলাম। বয়স ৫০ হতে দেখলাম সংখ্যাটি ৫১৪, যাদের সঙ্গে অন্তত একবার আমি থেকেছি। হিসাব রাখা বন্ধ করে দিলাম যখন দেখলাম আমার শরীরটা আর এত বেশি নারীর সঙ্গে কুলিয়ে উঠছে না এবং কাগজ ছাড়াই আমি হিসাবটা রাখতে পারছি। আমার নিজের বাছবিচার ছিল। আমি কখনো অরজিতে শরিক হইনি কিংবা প্রকাশ্যে ওসব করিনি, কারোর গোপনীয়তা ফাঁস করিনি কিংবা শরীর বা মনের অ্যাডভেঞ্চার বলে বেড়াইনি। কারণ, শৈশবেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম সবকিছুরই মাশুল গুনতে হয়।

একমাত্র যে অস্বাভাবিক সম্পর্কটি আমি বছরের পর বছর রক্ষা করে গেছি, সেটি ছিল বিশ্বস্ত দামিয়ানার সঙ্গে। সে ছিল প্রায় বালিকা, ভারতীয়সদৃশ, শক্তিশালী, গেঁয়ো, কথা বলত কম শব্দে, অভদ্রজনোচিত ভঙ্গিতে, হাঁটত খালি পায়ে, যাতে আমার লেখায় ব্যাঘাত না ঘটে। মনে পড়ে, একদিন আমি হলওয়েতে ঝুল-বিছানায় শুয়ে লা লুজানা আন্দালুসা—দ্য হফটি আন্দালুজিয়ান গার্ল পড়ছিলাম। আচমকা নজরে এল সে লন্ড্রি কক্ষে ঝুঁকে আছে, পরনের স্কার্টটি এত সংক্ষিপ্ত যে সেটি তার সরস ভাঁজগুলোকে ঢাকতে পারেনি। পেছন থেকে আমি তাকে নিলাম। ওহ্ সেনর, বলল সে শোকার্ত তিরস্কারের সুরে। একটি তীব্র কম্পনে তার দেহটা কেঁপে উঠেছিল, তবে সে দাঁড়িয়ে থাকল স্থির। তাকে অসম্মানিত করার অসম্মানবোধ থেকে আমি তাকে ওই সময়ের সবচেয়ে দামি নারীরা যে দর ধার্য করে থাকে, তার চেয়ে দ্বিগুণ দিতে চাইলাম, কিন্তু সে এক সেন্টও নেবে না এবং আমাকে তার মাহিনা প্রতি মাসেই বাড়াতে হতো ওই সম্পর্কের কারণে, যেটি হতো যখন সে কাপড় ইস্তিরি করত, তখন এবং সর্বদাই পেছন থেকে।

একটা সময়ে এসে ভাবলাম, বাজে–উত্সাহ সূচিত এসব ঘটনা আমার বেপথো জীবনের দুর্দশার বিবরণ একটি আদর্শ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং অপ্রত্যাশিতভাবেই এসে গেল শিরোনামটা: ‘আমার বিষণ্ন গণিকার স্মৃতিকথা’। ওদিকে সামাজিক জীবনে আমার আগ্রহ কমে আসছিল—মা-বাবা দুজনই মারা গেছেন। একজন ব্যাচেলর, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই; একজন মাঝারি মানের সাংবাদিক, যে কিনা চার চারবার কারটাজেনা ডে ইন্ডিয়াসের কবিতা প্রতিযোগিতা—হুয়েগোস ফ্লোরালসের চূড়ান্ত পর্বে উঠেছে, আর ছিলাম উদাহরণযোগ্য কদর্যতার জন্য ব্যক্তচিত্রকরদের মধ্যে জনপ্রিয়। সংক্ষেপে, এ এক অপব্যয়িত জীবন, একটা বাজে সূচনা থেকে যার শুরু হয়েছিল সেই বিকেলে, যেদিন মা উনিশ বছরের আমাকে হাতে ধরে নিয়ে যান এল ডায়রিও দে লা পাজে—আমি স্প্যানিশ ও ভাষার ক্লাসে স্কুলজীবনের যে স্মৃতিকথা লিখেছি, তা ছাপানো যায় কি না, তার তদবির করতে। এটি ছাপা হয়েছিল রোববার সঙ্গে সম্পাদকের প্রশংসাসমৃদ্ধ ভূমিকা। বহু বছর পর যখন জানলাম যে ওই লেখা এবং পরের আরও সাতটি লেখার জন্য আমার মা টাকা দিয়েছিলেন, তত দিনে আমার বিব্রত হওয়ারও সময় চলে গেছে। কারণ, আমার সাপ্তাহিক কলাম তখন নিজের পাখায় ভর করে উড়ছে এবং আমি একই সঙ্গে একজন কেব্ল এডিটর ও সংগীত সমালোচক।

ডিপ্লোমা মানের দুর্দান্ত ফলাফলের সঙ্গে বেচিলারিটো ডিগ্রিটা পাওয়ার পর আমি একই সময়ে তিনটি সরকারি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে স্প্যানিশ ও লাতিন শেখানো শুরু করলাম। আমি ছিলাম একজন দুর্বল শিক্ষক—প্রশিক্ষণ নেই, মেধা নেই আর সেসব শিক্ষার্থীর জন্যও মনে কোনো দরদ নেই, যারা তাদের মা–বাবার কঠোর শাসন থেকে বাঁচার সহজ উপায় হিসেবেই কেবল স্কুলে এসে থাকে। একমাত্র যে কাজটি আমি তাদের জন্য করতে পারতাম, তা হলো আমার কাঠের রুলারটিকে তাদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক করে তোলা, যাতে তারা সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারে অন্তত আমার এ প্রিয় কবিতাটিকে—হে ফ্যাবিও, হে দুঃখ, কি দেখছ এখন, এসব বিধ্বস্ত মাঠঘাট, হতাশ পাহাড়রাজি, একদিন ছিল বিখ্যাত সুন্দর ইটালিকা। শুধু এক বৃদ্ধ হিসেবে আমাকে তখন জানতে হয়েছিল শিক্ষার্থীরা আমাকে পেছনে পেছনে ডাকে সেই নোংরা নামে—প্রফেসর গ্লোমি হিলস।

এ-ই হলো সব, যা জীবন আমাকে দিয়েছিল আর আরও কিছু পাওয়ার জন্য আমি কখনো কিছু করিওনি। ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে একা একা মধ্যাহ্নভোজ সারতাম, সন্ধ্যা ছয়টায় যেতাম পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে নাক্ষত্রিক মহাশূন্য থেকে সংকেত শিকার করতে। রাত ১১টায়, সংস্করণ শেষ হয়ে গেলে শুরু হতো আমার সত্যিকারের জীবন। আমি রাত কাটাতাম রেড-লাইট এলাকা বারিও চিনোয়, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন, আর এত বেশিসংখ্যক বিচিত্র সঙ্গিনী আমি বেছে নিতাম যে দু–দুবার আমাকে বছরের সেরা খদ্দের নির্বাচিত করা হয়। নিকটস্থ ক্যাফে রুমায় রাতের খাবার সেরে আমি একটি গণিকালয়ে দৈবচয়ন করতাম ও সেঁদিয়ে যেতাম পেছনের দরজা দিয়ে। এমনটি করতাম এ জন্য যে এতে আমার মজা লাগত, তবে শেষ পর্যন্ত এটি আমার কাজেরই অংশ হয়ে যায় বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতার বেমক্কা আলাপচারিতার কল্যাণে, যারা ওই রাতের প্রেমিকাকে রাষ্ট্রীয় সব গোপন কথা বলে দিতেন, কস্মিনকালেও তারা ভাবত না কার্ডবোর্ডের দেয়ালের ওপারে জনমত সেগুলো আড়ি পেতে শুনছে। অবশ্য এভাবেই আমি এ–ও জেনে গেলাম, তারা আমার সান্ত্বনার অযোগ্য ব্যাচেলারিত্বের সঙ্গে আরোপ করত নৈশ সমকামিতাকে এই বলে যে আমি কালে ডেল ক্রাইমেনে এতিম বালকদের মাধ্যমে তৃপ্ত হই। এটি ভুলে যাওয়ার মতো সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, এর অনেকগুলো যথার্থ কারণের একটি এই যে আমার বিষয়ে অনেক ইতিবাচক কথাও আমি শুনতাম, যা আমি প্রশংসা করতাম সেগুলোর সত্যিকারের মূল্যমানের জন্যই।

আমার কখনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছিল না আর যে দুয়েকজন কাছাকাছি এসেছিল, তারা আছে নিউইয়র্কে। সেখানে আমার মনে হয় তারা মৃত। কারণ, আমি বিশ্বাস করি ওই জায়গাটিই এমন, যেখানে অপরাধী আত্মারা পাড়ি জমায় তাদের অতীত জীবনের সত্যিটার সঙ্গে মুখোমুখি না হওয়ার উদ্দেশ্য থেকে। অবসর গ্রহণের পর থেকে আমার তেমন কিছু করার ছিল না, কাজ বলতে শুক্রবারের বিকেলগুলোতে লেখা নিয়ে পত্রিকা অফিসে যাওয়া অথবা পালন করা কিছু দায়িত্ব, যেগুলোর রয়েছে বিশেষ তাত্পর্য—বেলাস আর্টেসে কনসার্ট, চিত্র প্রদর্শনী সেনট্রো আর্টিসটিকোতে, যেটির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আমি, মাঝেমধ্যে আয়োজিত সোসাইটি ফর পাবলিক ইমপ্রুভমেন্টে নাগরিক সম্মেলন কিংবা টিট্রো অ্যাপোলোতে ফাবরিগাসের এনগেজমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠান। যুবক বয়সে আমি যেতাম উন্মুক্ত চলচ্চিত্র থিয়েটার প্রদর্শনীতে, যেখানে আমরা বিস্মিত হতাম চন্দ্রগ্রহণ দেখে কিংবা তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে দু-দুবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে। চলচ্চিত্র আমার জন্য ছিল না। শার্লি টেম্পলের অশ্লীল ভক্তি দেখে আমার ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল।

আমার ভ্রমণে যাওয়া বলতে কার্টাজেনা ডে ইন্ডিয়াসের হুয়েগোস ফ্লুরেলস উপলক্ষে বয়স ত্রিশ হওয়ার আগে চারবার সফর এবং সাক্রামান্তো মন্টিয়েল সান্তা মারতায় তার পতিতালয়গুলোর একটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানালে মোটর-লঞ্চে একটি বাজে রাত অতিক্রমণ। আর আমার ঘরোয়া জীবনে, আমি বেশি কিছু খাই না এবং অল্পেই তুষ্ট থাকি। দামিয়ানার বয়স হলে সে আমার জন্য রান্না করা বন্ধ করে দিল এবং সেই থেকে ও পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ক্যাফে রোমাতে আলুর অমলেট ছিল আমার নিয়মিত আহার।

এবং এভাবেই আমার নব্বইতম জন্মদিনের প্রাক্কালে, আমার দুপুরের আহার ছিল না এবং রোজা কাবারকাসের ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম বলে পড়ায়ও মন বসছিল না। বেলা দুইটার তাপে যত বিকট শব্দে সম্ভব তত জোরে সিকাডা পোকাগুলো চিত্কার করে যাচ্ছিল এবং সূর্য খোলা জানালাগুলো দিয়ে সরে যেতে যেতে তিন–তিনবার আমাকে ঝুল-বিছানাটা সরাতে বাধ্য করল। সব সময়ই আমার মনে হয়েছে আমার জন্মদিনটা পড়েছে বছরের উষ্ণতম সময়টায় আর আমি তা সয়ে যাওয়াও শিখে গেছি, তবে ওই দিন আমার মেজাজ একে কঠিন করে তুলল। চারটায় আমি আমার আত্মাটাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম ডন পাবলো কাসালের বাজানো জোয়ান সেবাসতিয়ান বাখের ‘সিক্স স্যুটস ফর আনঅ্যাকোম্পেনিড সেলো’ শুনে। আমি এগুলোকে বিবেচনা করি সব সংগীতের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অংশ হিসেবে, তবে অন্যান্য দিনের মতো এগুলো আমাকে শান্ত করার বদলে ক্লান্তির আরও অতলে ঠেলে দিল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম দ্বিতীয় সেলোটি বাজার সময়, যেটি ছিল আমার কাছে কিছুটা ধীর এবং ঘুমের মধ্যে সেলোর করুণ সুরের সঙ্গে বিদায় নিতে যাচ্ছে এমন একটি বিষণ্ন জাহাজকে গুলিয়ে ফেললাম। প্রায় ঠিক ওই সময়েই ফোনের শব্দ আমার ঘুম ভাঙাল এবং রোজা কাবারকাসের মরচে ধরা গলা আমাকে জীবনে ফিরিয়ে আনল। বোকার কপাল তোমার, বলল সে। তুমি যা চেয়েছিলে, তার চেয়েও ভালো কিছু পেয়েছি, তবে একটি মন্দ দিকও আছে—মেয়েটি সবে চৌদ্দতে পড়েছে। ডায়াপার পাল্টানোতেও আমার আপত্তি নেই, রসিকতা করে আমি বললাম, তার মতলব না বুঝেই। তোমাকে নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, বলল সে, কিন্তু আমি তিন বছর জেল খাটলে এর দাম আমায় কে দেবে?