৯/১১: অপূরণীয় স্মৃতির কথা

হামিদ দাবাশি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের হাগোপ কেভোরকিয়ান অধ্যাপক। ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর লেখা এই নিবন্ধ আল–জাজিরায় প্রকাশিত হয়। অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন খলীলুল্লাহ মুহাম্মাদ বায়েজীদ

ম্যানহাটানের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, নিউ জার্সির হবকেন শহর থেকে ছবি অবলম্বনেগ্রাফিকস প্রথম আলো

সময় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। সেদিন যথারীতি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠি। বিছানায় শুয়েই পড়তে ও লিখতে শুরু করি। তখনো জানি না মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ম্যানহাটানে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চলেছে।

নিউইয়র্কে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আপার ওয়েস্ট সাইডে ছিল আমাদের বাসা। শহরের কোলাহলমুখর ডাউনটাউন আর ব্যস্ত বাণিজ্যিক মিডটাউন থেকে দূরে, শান্ত ও মনোরম এক আবাসিক এলাকায় আমাদের বসবাস। জায়গাটা এতটাই নিরিবিলি যে দেখলে মনে হতো যেন গ্রামীণ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কোনো এক পাড়া।

ল্যান্ডফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। তখনকার দিনে মুঠোফোন তেমন ছিল না, থাকলেও তা ছিল বিরল ও অদ্ভুত এক জিনিস। তাই যোগাযোগের জন্য আমরা তখনো ল্যান্ডলাইনই ব্যবহার করতাম। ফোনের ওপাশে ছিলেন আমার এক বন্ধু। তাঁর গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ। তিনি জানতে চাইলেন, আমি ঠিক আছি কি না। বললাম, হ্যাঁ, ভালো আছি। তখন তিনি আমাকে টেলিভিশন চালু করতে বললেন।

টিভি চালু করতেই দেখি, আমাদের শহর আক্রান্ত। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বিশাল টুইন টাওয়ারে বিমান আঘাত হেনেছে। ভবন দুটি ধসে পড়ছে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে। তখন ঠিক কয়টা বাজে, আমার মনে নেই। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে।

[দৃশ্যটি দেখে] মুহূর্তেই আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠেছিল সেই বছরেরই ১৫ এপ্রিলের কথা। সেদিন বড় মেয়ে পার্ডিসের জন্মদিন উদ্যাপন করতে তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম উত্তর টাওয়ারের চূড়ায় অবস্থিত ‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’ রেস্তোরাঁয়। স্পষ্ট মনে আছে, আমরা কাছের নেওয়ার্ক বিমানবন্দরে বিমানগুলোকে ওঠানামা করতে দেখেছিলাম। মেয়েকে বলেছিলাম, ‘অদ্ভুত না? বিমানগুলোকে আমরা নিজেদের পায়ের নিচ দিয়ে ওঠানামা করতে দেখছি!’

অর্ধেক অবিশ্বাস আর অর্ধেক হতাশা নিয়ে আমি পোশাক পরে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন আতঙ্কিত মানুষ। আমরা শহরের কেন্দ্রের দিকে হামলাস্থলের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তাঘাট ছিল একেবারে ফাঁকা। পুরো শহরে নেমে এসেছিল অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। আমরা নিউইয়র্কবাসী কোলাহলে অভ্যস্ত। অতিরিক্ত নীরবতা বরং আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে কিন্তু সেদিন সকালে গোটা শহর ছিল নিথর। ব্রডওয়ের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, ওরা যেন সেই শিশু, যারা এইমাত্র মা-বাবাকে হারিয়েছে কিন্তু তারা এখনো জানে না সেই খবর।

আমিসহ বিভ্রান্ত জনতার ছোট্ট দলটি হিউস্টন স্ট্রিটে এসে থামল।

কয়েকজন জাপানি পর্যটককে দেখলাম, স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর ওপর থেকে ধুলা সংগ্রহ করছিলেন। সেই ধুলা ছিল ধসে পড়া টুইন টাওয়ারের। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, সেই ধুলার কথা। কী অদ্ভুত—এই ধুলার মধ্যে মিশে আছে ইট, সিমেন্ট, মানুষের দেহাবশেষ, কফির কাপ আর ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে ধুলায় মিশে যাওয়া কত মানুষের অপূর্ণ স্বপ্ন।

নিজের অজান্তেই ওমর খৈয়ামের কবিতার পঙ্ক্তি আওড়াতে শুরু করলাম—

আহ! ধুলায় মিশে যাওয়ার আগেই,

জীবন যতটা পারা যায় উপভোগ করে নাও।

তারপর ধুলা—স্তূপীকৃত ধুলা, ধুলার নিচেই শয়ন,

মদ, গান ও গায়ক কেউই থাকবে না সে জীবনে।

অর্ধেক অবিশ্বাস আর অর্ধেক হতাশা নিয়ে আমি পোশাক পরে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন আতঙ্কিত মানুষ। আমরা শহরের কেন্দ্রের দিকে হামলাস্থলের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তাঘাট ছিল একেবারে ফাঁকা। পুরো শহরে নেমে এসেছিল অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। আমরা নিউইয়র্কবাসী কোলাহলে অভ্যস্ত। অতিরিক্ত নীরবতা বরং আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে কিন্তু সেদিন সকালে গোটা শহর ছিল নিথর। ব্রডওয়ের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, ওরা যেন সেই শিশু, যারা এইমাত্র মা-বাবাকে হারিয়েছে কিন্তু তারা এখনো জানে না সেই খবর।

শোকের মাহাত্ম্য

ঘটনার পরদিন বুধবার আমার ক্লাস ছিল। ক্যাস্পাসে গিয়ে দেখি, আমার শিক্ষার্থীদের রঙিন চক দেওয়া হয়েছে। তারা লো লাইব্রেরির সিঁড়িতে এঁকে চলেছে নিজেদের ভয়, দুশ্চিন্তা আর শোকের ছবি। এই শোক প্রকাশ আসলে মৃতদের জন্য নয় বরং জীবিতদের জন্য। এটা মহৎভাবে বেঁচে থাকার এক পবিত্র শিল্প, মহামূল্যবান জীবনের অনন্তকালে রূপান্তর উদ্যাপনের পবিত্র আচার। এটা এমন একটা মুহূর্ত যখন আমরা মরণশীল মানুষ আমাদের আত্মার অমরত্ব অনুভব করি কিন্তু যে সংস্কৃতি শোক প্রকাশের এই ভাবগাম্ভীর্য সভ্যতা হারিয়ে ফেলেছে, সেগুলোর কী হবে?

আমাদের শহর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিল। সেই আঘাতের পর স্থির হয়ে বসার, ভাবার ও শোক করার জন্য আমরা মাত্র এক-দুই দিন সময় পেয়েছিলাম। এরপরই আমেরিকানরা শোকের সেই মহৎ পরিসর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল। তাদের সামনে দ্রুত তৈরি করে দাঁড় করানো এক অস্পষ্ট, চেহারাহীন শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে তারা ছুটল।

প্রতিশোধ নেওয়ার আগে মানুষের প্রশান্তি দরকার। তাদের স্থির হয়ে বসে থাকার এবং এই অস্থির পৃথিবীর ভয়কে শান্তভাবে অনুভব করার সময়ও দরকার কিন্তু যুদ্ধের দামামা অতি দ্রুত বেজে উঠল আর সেই প্রশান্ত ধ্যানগুলোতে ছেদ টানল।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা চালানো হয়
ফাইল ছবি: রয়টার্স

৯/১১–এর দশম বার্ষিকীতে আমি আল-জাজিরার জন্য একটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে পাঠকদের উদ্দেশে বিশিষ্ট ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার সঙ্গে আমার একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের কথা তুলে ধরেছিলাম। ৯/১১-এর ভয়াবহ ঘটনার কিছুদিন পরই তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পাবলিক লেকচার দিতে এসেছিলেন। সেদিন দেরিদা ‘রাজনৈতিক শোক’ নিয়ে কথা বলছিলেন। দর্শকদের তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমরা যা দেখছি, তা কেবল ৯/১১–এর ঘটনায় নিহত মানুষদের জন্য শোক নয় বরং আমরা যে অর্থে এত দিন ‘রাজনৈতিক’ বিষয়টিকে চিনে এসেছি, সেই ‘রাজনৈতিক’-এর জন্যও যেন শোক করছিলাম। বক্তৃতা শেষে আমি তাঁকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম—শহরজুড়ে আমরা যে ‘শোকের রাজনীতি’ দেখছি, তা কি শেষ পর্যন্ত ‘রাজনীতির শোক’-এর সম্ভাবনাকেই রুদ্ধ করে দেবে? দেরিদা কিছুক্ষণ প্রশ্নটি নিয়ে ভাবলেন কিন্তু সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না। বললেন, এর কোনো স্পষ্ট উত্তর তাঁর জানা নেই।

আমেরিকার এই মর্মান্তিক ক্ষত ঘিরে যে মানবিক অনুভূতি ও শোক তৈরি হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই ‘শোকের রাজনীতি’ আর যুদ্ধের দামামার নিচে চাপা পড়ে গেল। যতটুকু শোক অবশিষ্ট ছিল, তার সীমানাও যেন নির্ধারিত হলো আমেরিকার যুদ্ধবিমানের উড়ালসীমা দিয়ে। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এত দ্রুত এবং সহিংসভাবে ৯/১১–এর শোকের রাজনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে ভেতরে–ভেতরে মর্মান্তিকভাবে আক্রান্ত এই জাতি তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষত অনুভব করার সুযোগই পেল না। শোক প্রকাশ ছিল কেবলই বাহ্যিক। তা রূপ নিল সহিংস প্রতিশোধে। আসলে কী ঘটেছিল, তা থেমে গভীরভাবে ভেবে দেখার অবকাশ আর রইল না।

৯/১১–এর দশম বার্ষিকীতে আমি আল-জাজিরার জন্য একটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে পাঠকদের উদ্দেশে বিশিষ্ট ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার সঙ্গে আমার একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের কথা তুলে ধরেছিলাম। ৯/১১-এর ভয়াবহ ঘটনার কিছুদিন পরই তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পাবলিক লেকচার দিতে এসেছিলেন। সেদিন দেরিদা ‘রাজনৈতিক শোক’ নিয়ে কথা বলছিলেন।

পাঁচ বছর পর ৯/১১–এর ঘটনার ১৫তম বার্ষিকীতে আমি আল–জাজিরার জন্য অন্য একটি নিবন্ধে এই ধারণা পুনর্বিবেচনা করেছি। শোকের বিজয়ী রাজনীতি কীভাবে রাজনৈতিক শোকের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল সেখানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি।

আসলে অন্যের ব্যথা-বেদনাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার জন্য মনের ভেতর একটি শান্ত পরিসর দরকার কিন্তু ৯/১১-এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকীতে সেই নীরব পরিসরের মৃদু গুঞ্জন চাপা পড়ে গেছে ক্রোধ আর প্রতিশোধের চিৎকারে। আর ‘অন্যরা’ যেহেতু আরও বেশি ‘অপর’ হয়ে উঠেছে, এই দেশের শাসকেরা ততই যেন ভুলে গেছেন—বিশ্বের মধ্যে তাদের নিজেদের অবস্থান আসলে কোথায়।

কান থেকে কান্দাহার

আমেরিকানরা ৯/১১–এর ঘটনায় যে যন্ত্রণা অনুভব করেছিল, আফগান ও ইরাকিরা বছরের পর বছর ধরে সেটির পরিণতি ভোগ করেছে। তারা আজও সেই ভয়াবহ দিনের ফল ভোগ করছে কিন্তু ৯/১১–এর ঘটনার মতো ১০/৭ কিংবা ৩/২০–এর কথা কেই–বা মনে রাখে? উল্লেখ্য, আমেরিকা ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু করে আর ২০ মার্চ ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকে হামলা চালায়। নিজের কষ্টের জন্য মহৎভাবে শোক পালন করার পাশাপাশি অন্যের যন্ত্রণাও অনুভব করতে পারা জরুরি।

টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

সেই সময়কার যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের জগৎকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০০১ সালের মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানি চলচ্চিত্রকার মোহসেন মাখমালবাফের কান্দাহার ছবির প্রিমিয়ার হয়। শুরুতে ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। যদিও এটি সমালোচকদের যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিল কিন্তু সেই একই বছরের সেপ্টেম্বরে ছবিটা অভাবনীয় গুরুত্ব পেয়ে যায়। ৯/১১–এর পরপরই ব্যাপক সমাদরের জন্য মাখমালবাফের অনুমতি নিয়ে কান্দাহার ছবিটি আমি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখাই।

আমার উদ্দেশ্য ছিল কান্দাহার এবং নিউইয়র্ক—এই দুই শহরের মধ্যে এক ধরনের নৈকট্য ও সংহতি স্থাপন করা। যাতে করে এর মাধ্যমে নিউইয়র্কের মর্মান্তিক ঘটনাকে এই অঞ্চলের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার একটি সুযোগ তৈরি হয় কিন্তু বলতে গেলে আমার এ চাওয়া পুরোপুরি ভেস্তে যায়। কেননা, তত দিনে দেশটি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এমনকি সেই যুদ্ধকে রিচার্ড ফকের মতো সবচেয়ে উদার এবং প্রগতিশীল আমেরিকানরাও ন্যায্য বলে মনে করেছিলেন।

সেই সময়কার যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের জগৎকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০০১ সালের মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইরানি চলচ্চিত্রকার মোহসেন মাখমালবাফের কান্দাহার ছবির প্রিমিয়ার হয়। শুরুতে ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। যদিও এটি সমালোচকদের যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিল কিন্তু সেই একই বছরের সেপ্টেম্বরে ছবিটা অভাবনীয় গুরুত্ব পেয়ে যায়। ৯/১১–এর পরপরই ব্যাপক সমাদরের জন্য মাখমালবাফের অনুমতি নিয়ে কান্দাহার ছবিটি আমি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখাই।

২০০১ সালের অক্টোবরে দ্য নেশন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে রিচার্ড ফক লিখেছিলেন, ‘আমার শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল এমন কোনো একটি সরাসরি যুদ্ধকেও আমি সমর্থন করিনি। যদিও আমি মনে করি, কসোভোতে ন্যাটো বাহিনীর যুদ্ধ ইতিবাচক ফল এনে দিয়েছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আমি আফগানিস্তানে অ্যাপোক্যালিপটিক বা ভয়াবহ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে [যুক্তরাষ্ট্রের] যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম সত্যিকারের ন্যায়সংগত যুদ্ধ মনে করি।’

কিন্তু ৯/১১-এর সহিংসতা যতই ভয়াবহ হোক, আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা ও দখল কেবল প্রতিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি অবশ্য রিচার্ড ফক নিজেই আশঙ্কা করেছিলেন ও স্বীকার করেছিলেন। যুদ্ধ একবার শুরু হলে তা নিজের সামরিক যুক্তি তৈরি করে। নিজেই নিজের ভয়াবহ পরিণতির পথ তৈরি করে এবং সেই পথেই এগিয়ে চলে।

আমেরিকান ইতিহাসে প্রচুর জাতীয় ট্র্যাজেডি রয়েছে। গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে আব্রাহাম লিংকনের হত্যাকাণ্ড। জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং ম্যালকম এক্সের গুপ্তপথে হত্যার ঘটনা। তারপর ৯/১১–এর মর্মান্তিক যন্ত্রণা। ইতিহাস বারবার আমেরিকানদের সামনে শোক করার এবং আত্ম-প্রতিফলনের জন্য নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ এনে দিয়েছে।

নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা
ফাইল ছবি

কিন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর বিজয়ী সামরিক উন্মাদনা এবং ৯/১১–এর হামলার প্রতিশোধ নিতে দুটি দেশকে ধ্বংস করার অমানবিক নিষ্ঠুরতা সেই ভয়াবহ দিনটির রেখে যাওয়া গভীর শূন্যতাকে সমূলে উৎপাটন করে না বরং শুধু আড়াল করে। এই দেশ কখনোই একটি আদর্শ জাতিতে পরিণত হবে না যতক্ষণ না এটি তার বন্দুক তাক করা কিংবা অন্য কোনো দেশে যুদ্ধবিমান পাঠানোর আগে একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির জন্য শোকের প্রজ্ঞা এবং সান্ত্বনা অর্জন করতে না শেখে আর তা সম্ভব হবে না, যত দিন একজন আফগান বা ইরাকি শিশুর জীবনের মূল্য আমেরিকান শিশুর জীবনের সমান মূল্যবান মনে না করা হবে। প্রতিশোধ মানুষের মনের কোনো মর্মান্তিক ক্ষতকে সারায় না বরং সেই ক্ষতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে।

ম্যানহাটান শহর আবার তার চিরচেনা জনাকীর্ণতা আর ব্যস্ততায় স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে গেছে। ৯/১১ একটি প্রতীকী ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে, যা মানুষ খুব কমই মনে রাখে। অনেকটা ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বরের পার্ল হারবারে হামলার মতো। আমেরিকায় স্মরণীয় দিনগুলোর অনেকগুলোই এখন সোমবারের ছুটির সঙ্গে মিশে গেছে। মেমোরিয়াল ডে কিংবা লেবার ডের মতো দিনগুলো মানুষকে তাদের ক্লান্তিকর দৈনন্দিন জীবন থেকে একটি দীর্ঘ সপ্তাহান্তের বিরতি দেয় কিন্তু ৯/১১ ছিল মঙ্গলবার। এমন একটি মঙ্গলবার, যা ক্রমেই বিস্মৃতির দিকে চলে যাচ্ছে। এটি কর্মব্যাপৃত মঙ্গলবার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে অথচ যার ক্ষতি আর কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। সেদিন খুব অল্প সময়ের জন্য এই জাতির আত্মা সেই ভয় অনুভব করেছিল—যে ভয় পৃথিবীর মানুষ প্রতিনিয়ত অনুভব করে।

[এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত একেবারেই লেখকের নিজস্ব এবং অবধারিতভাবে আল–জাজিরার সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রতিফলিত করে না।]