মিসরের গল্প
মাংসের ঘর
ইউসুফ ইদ্রিস (১৯২৭-১৯৯১) ছিলেন আধুনিক আরবি সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাশিল্পী ও নাট্যকার। মিসরে জন্ম নেওয়া ইদ্রিস পেশায় চিকিৎসক হলেও সাহিত্যেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে। ছোটগল্পে বাস্তববাদ, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং সামাজিক বৈষম্যের তীক্ষ্ণ চিত্রায়ণ তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়। গ্রামীণ জীবন, দারিদ্র্য, যৌনতা, ক্ষমতা ও মানবিক দ্বন্দ্ব তাঁর রচনার কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে। এই গল্পটি আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ডেনিস জনসন-ডেভিস। এটি তাঁর দশম গল্পগ্রন্থ ‘হাউস অব ফ্লেশ’ (১৯৭১)-এর নামগল্প।
• ভাষান্তর: মুহসীন মোসাদ্দেক
লন্ঠনের পাশে আংটি। নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে সবখানে; কান যেন বদ্ধ। সে নিস্তব্ধতার ভেতরেই একটি আঙুল নিঃশব্দে এগিয়ে এসে আংটিটি পরে নেয়। নিস্তব্ধতার মধ্যেই লন্ঠন নিভে যায়—অন্ধকার নেমে আসে।
অন্ধকারে চোখও অন্ধ। বিধবা ও তার তিন মেয়ে তাদের এক কক্ষের বাসায়। শুরু নিস্তব্ধতার...
***
বিধবা লম্বা, স্বাস্থ্যবান, ফরসা; বয়স পঁয়ত্রিশ। তার মেয়েরাও লম্বা, যুবতী। তারা সব সময় দীর্ঘ কালো পোশাক পরে থাকে, যা তাদের সম্পূর্ণ ঢেকে রাখে। সবচেয়ে ছোটটির বয়স ষোলো, বড়টির কুড়ি।
তারা কুৎসিত। বাবার কাছ থেকে পাওয়া শ্যামলা রং তাদের গায়ে লেগে আছে। শরীরের গড়ন মায়ের মতো আবেদনময় ও আকর্ষণীয় নয়; ত্বকজুড়ে দাগের ছাপ। মায়ের কাছ থেকে তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে কেবল উচ্চতাই।
ঘরটি ছোট, গাদাগাদি; তবু দিনের বেলায় তাদের চারজনের জন্য যথেষ্ট। তীব্র দারিদ্র্য সত্ত্বেও সেটি রুচিসম্পন্নভাবে সাজানো। চার নারীর স্পর্শে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে এক নিবিড় ঘরোয়া অনুভব। রাতে তাদের চারটি দেহ ছড়িয়ে থাকে—উষ্ণ, জীবন্ত মাংসের স্তূপের মতো। কেউ পাতলা গদির ওপর, কেউ তার চারপাশের মেঝেতে। দেহগুলোর ভেতর থেকে শ্বাস ওঠানামা করে, অনিয়মিত শ্বাস। কখনো গভীর, কখনো ভারী...
পুরুষটির মৃত্যুর পর থেকেই নিস্তব্ধতা ঘরটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দীর্ঘ অসুস্থতার শেষে, দুই বছর আগে তার মৃত্যু হয়। শোকের তীব্রতা ক্ষয় হয়ে এলে অবশিষ্ট রইল চার শোকাহত নারী, আর অবশ্যই নিস্তব্ধতা। এক দীর্ঘ নীরবতা, যা কিছুতেই বিদায় নিতে চায় না। হয়তো তা ছিল অপেক্ষার নীরবতা...
তীব্র দারিদ্র্য সত্ত্বেও ঘরটি রুচিসম্পন্নভাবে সাজানো। চার নারীর স্পর্শে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে এক নিবিড় ঘরোয়া অনুভব। রাতে তাদের চারটি দেহ ছড়িয়ে থাকে—উষ্ণ, জীবন্ত মাংসের স্তূপের মতো।
কিন্তু মেয়েরা বড় হতে থাকে, প্রত্যাশাও বাড়ে। তবু কোনো পাত্র এসে তাদের জন্য দরজায় কড়া নাড়ে না। এত দরিদ্র, এত কুৎসিত মেয়েদের জন্য কে-ইবা উন্মাদ হবে? যেন তারা যৌতুকহীন এতিম! তবু আশাবাদী হওয়ার সুযোগ থেকে যায়—প্রত্যেকের জন্য কোথাও না কোথাও একজন আছে...প্রত্যেক নারীর জন্য কোথাও না কোথাও একজন পুরুষ নির্ধারিত থাকে, যে তার জীবনের অর্থ হয়ে উঠবে। তার ওপর, পৃথিবীতে চিরকালই এমন কেউ থাকে—যে আরও অভাবী, আরও অসুন্দর। আশা কখনো কখনো বাস্তবের রূপ নেয়। কিন্তু তাতে কতকাল লাগে, কে জানে?
***
নিস্তব্ধতা ভাঙত একমাত্র কোরআন তিলাওয়াতের শব্দে। তা–ও ধীরে ধীরে একঘেয়ে অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল—নতুনত্বহীন, উত্তেজনাহীন এক রুটিন। তিলাওয়াত করতেন এক অন্ধ হাফেজ। তিনি সময়মতোই আসতেন এবং নিস্পৃহ কণ্ঠে পাঠ করতেন। শুক্রবার বিকেলে লাঠি দিয়ে দরজায় ঠকঠক—অভিবাদন জানাতেন প্রসারিত হাতকে, তারপর খড়ের চাটাইয়ে পা গুটিয়ে বসতেন। পাঠ শেষ হলে হাতড়ে খুঁজে নিতেন স্যান্ডেল। বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যেতেন, কেউ সাড়া দিত না। তিনি আসেন, তিলাওয়াত করেন, চলে যান—এক অভ্যাসের মতো। রুটিনের অংশমাত্র। কেউ বিশেষ মনোযোগ দিত না।
সব সময়ই নীরবতা। শুক্রবার বিকেলের কোরআন পাঠও যেন নীরবতার ভেতরে আরেক খণ্ড নীরবতা হয়ে গিয়েছিল। অপেক্ষা ছিল—আশার মতোই ক্ষীণ, তবু উপস্থিত। অন্তত আশাটুকু তো ছিল। কারও কারও ক্ষেত্রে এটুকু আশাও থাকে না—তাহলে তারা আশাহীন কেন হবে? আশা ছাড়া তাদের আর কী-ই বা বাকি ছিল?
নীরবতা চলতেই থাকল—যতক্ষণ না একদিন কিছু একটা ঘটে গেল। শুক্রবার বিকেল এল, কিন্তু হাফেজ এলেন না। কখন শেষ হবে কোরআন তিলাওয়াতের এ আয়োজন, এ নিয়ে কখনো কোনো চুক্তি ছিল না; তবু বুঝি শেষ নিজেই এসে উপস্থিত হলো। বিধবা ও তার তিন মেয়ে হঠাৎ উপলব্ধি করল, তারা তাকে কতটা প্রত্যাশা করত। শুধু তার তিলাওয়াতই যে নীরবতা ভাঙত, তা নয়; বরং সপ্তাহে একবার দরজায় কড়া নাড়া একমাত্র পুরুষ ছিলেন তিনি। আরও কিছু বিষয় তাদের চোখে ধরা পড়ল...হ্যাঁ, তিনি তাদের মতোই দরিদ্র; তবু তার পোশাক বরাবরই পরিচ্ছন্ন, স্যান্ডেল ঝকঝকে পালিশ করা। পাগড়ি এত নিখুঁত পরিপাটি, যেন কোনো দৃষ্টিসম্পন্ন কারও হাতে বাঁধা। আর তার কণ্ঠ—গভীর, অনুরণনময়।
কোনো পাত্র এসে তাদের জন্য দরজায় কড়া নাড়ে না। এত দরিদ্র, এত কুৎসিত মেয়েদের জন্য কে-ইবা উন্মাদ হবে? যেন তারা যৌতুকহীন এতিম! তবু আশাবাদী হওয়ার সুযোগ থেকে যায়—প্রত্যেকের জন্য কোথাও না কোথাও একজন আছে...
পরামর্শের শুরু হলো—এখনই চুক্তি নবায়ন করা যায় না? এই মুহূর্তেই খবর পাঠানো যায় না? তিনি কি ব্যস্ত? থাক, যা হবার হোক! অপেক্ষা করাই যেহেতু অভ্যাস, তাই অপেক্ষা চলল। সূর্য যখন ডুবতে শুরু করেছে, তখন তিনি এলেন। সেদিন তার তিলাওয়াত যেন একেবারে প্রথমবারের মতো প্রাণবন্ত। আরেকটি প্রস্তাব ধীরে ধীরে মাথা তোলে—যদি তাদের একজন এই মানুষটিকে বিয়ে করে? তার কণ্ঠে তো ঘর ভরে উঠবে। তিনি অবিবাহিত; গোঁফে এখনো যৌবনের আভাস, তিনি তরুণ। কথা থেকে কথা জন্ম নেয়—নিশ্চয় তিনিও কোনো সুন্দরী কন্যার সন্ধান করছেন। মেয়েরাই প্রস্তাব তোলে। মা তাদের মুখের দিকে তাকান—কে পূরণ করবে এ ইঙ্গিত? কিন্তু মুখগুলো নীরবে অন্য কথাই বলছিল—শব্দহীন ভাষায় যেন ভেসে উঠল এক গোপন আপত্তি: ‘আমরা তো এক পুরুষের জন্য অভুক্তের মতো লালায়িত...এক অন্ধ পুরুষে কি মিটবে আমাদের ক্ষুধা?’ তারা এখনো পাত্রের অপেক্ষায় আর পাত্ররা সাধারণত অন্ধ হয় না। দুর্ভাগা মেয়েরা—পুরুষের জগৎ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। পুরুষের মাপকাঠি যে দৃষ্টি নয়।
‘মা, আপনিই তাকে বিয়ে করুন।’
‘আমি? এ যে ভীষণ লজ্জার কথা! লোকে কী বলবে?’
‘বলুক যা খুশি। পুরুষের কণ্ঠহীন ঘর কি তার চেয়ে কম লজ্জার?’
‘তোমাদের আগে আমি বিয়ে করব? অসম্ভব!’
‘আপনি আগে বিয়ে করলেই তো ভালো। তাহলে পুরুষেরা এ ঘরে আসবে, আমরাও তাদের একজনকে বিয়ে করতে পারব। বিয়ে করুন, মা!’
অতঃপর তাদের মা অন্ধ হাফেজকে বিয়ে করলেন। ঘরে একটি প্রাণ বাড়ল। আয় সামান্য বেড়ে গেল বটে, কিন্তু সামনে এসে দাঁড়াল আরও বড় এক সমস্যা।
দাম্পত্যের প্রথম রাত নেমে এল। তারা একই শয্যায়—সম্পর্কটি হালাল, তবু যেন কাছে আসার সাহস নেই। তিন মেয়ে ঘুমিয়ে, তবু প্রত্যেকের ভেতর থেকে যেন জেগে আছে অদৃশ্য রাডার: চোখ, কান, অনুভূতি—সব মিলিয়ে তারা আলোকিত করে রাখে দম্পতির মাঝখানের ক্ষুদ্র ফাঁকটুকু। মেয়েরা আর শিশু নয়—পূর্ণবয়স্ক, পরিপক্ব, তারা সব বোঝে। ঘরে তাদের উপস্থিতি এমন এক অনুভব জাগাল, যেন উজ্জ্বল দিনের আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
বিস্ময়! বিভ্রান্তি! ঘরে হাসির ধ্বনি! পুরুষের উচ্চ হাসি মিশে যায় নারীর খিলখিলে ধ্বনির সাথে। তাদের মা হাসছেন আর সেই মানুষটি, যার কণ্ঠে এত দিন তারা শুনেছে কেবল কোরআন তিলাওয়াত, সে–ও হাসছে!
পরদিন কোনো তর্ক নেই, কোনো কথা নেই। মেয়েরা একে একে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল, সূর্য ডোবার আগে আর ফিরল না। ফেরার সময় লাজুক, দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপ; এক পা, তারপর আরেক পা—ধীরে ধীরে ঘরের দিকে এগিয়ে আসে। হঠাৎ—বিস্ময়! বিভ্রান্তি! ঘরে হাসির ধ্বনি! পুরুষের উচ্চ হাসি মিশে যায় নারীর খিলখিলে ধ্বনির সাথে। তাদের মা হাসছেন আর সেই মানুষটি, যার কণ্ঠে এত দিন তারা শুনেছে কেবল কোরআন তিলাওয়াত, সে–ও হাসছে! মা হাসতে হাসতেই তাদের চুম্বন করেন, বুকে টেনে নেন। মাথায় ওড়না নেই, চুল ভেজা, পরিপাটি করে আঁচড়ানো। তিনি এখনো হাসছেন! আর তার মুখ—এত দিন যা ছিল নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো, ভাঁজে ভাঁজে ক্লান্তি, জীর্ণতার জাল—আজ তা দীপ্ত, জাজ্বল্যমান, যেন লন্ঠনের ভেতর জ্বলে ওঠা বিদ্যুতের বাতি। আর তার চোখ—যে চোখ এত দিন গহ্বরের গভীরে ডুবে ছিল, আজ তারা জেগে উঠেছে, হাসির অশ্রুতে ঝলমল করছে।
নীরবতা ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল, অবশেষে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেল। রাতের খাবারের আগে, খাবারের সময়, খাবারের পরে—ঠাট্টা, গল্প, হাসি, গান। তিনি যখন গান ধরেন কণ্ঠে ভেসে ওঠে অপূর্ব মাধুর্য; উম্মে কুলসুম, আবদুল ওহাবের অনুকরণে ঘর ভরে যায় সুরে। তার কণ্ঠ ভরাট, উল্লসিত, আনন্দে উদ্দীপ্ত।
‘দারুণ হয়েছে, মা! আগামীকাল এই হাসি টেনে আনবে আরও পুরুষ—পুরুষ তো পুরুষকে ডেকে আনে।’
‘হ্যাঁরে মেয়েরা, কালই বুঝি পাত্রে ভরে যাবে এ ঘর!’
কিন্তু বাস্তবে, পাত্রদের নিয়ে তার তেমন ভাবনা ছিল না। তার সমস্ত মনোযোগ নিবিষ্ট ছিল সেই তরুণ অন্ধ পুরুষে। আর সত্যি বলতে কী—মানুষটা অন্ধ বলে আমরা প্রায়ই তাদের উপস্থিতি দেখতে পাই না। এই সবল, প্রাণবন্ত যুবক—সুস্থ, রোগে সহজে কাবু হওয়ার নয়, বার্ধক্যও এখনো বহু দূরে।
নীরবতা এমনভাবে মিলিয়ে গেল, যেন সে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। জীবনের কোলাহল ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। তাদের বিয়েটা হালাল। তবে সমস্যা কোথায়? সে তো কোনো অন্যায় করছিল না। তিনি নিজেকে উন্মুক্ত করে দিলেন। কোনো গোপন আর রইল না, এমনকি রাতেও, যখন সবাই একই ঘরে একত্রে। প্রেমিক-প্রেমিকা মুক্তি দিল কল্পনাকে, দেহকে—চারপাশে মেয়েরা ছড়িয়ে শুয়ে থাকলেও। মেয়েরা বোঝে। তারা টের পায় কী ঘটছে। নিজ নিজ শয্যায় নিশ্চল পড়ে থাকে—না নড়ে, না কাশে—শুধু শ্বাসের ওঠানামা, তার ফাঁকে ফাঁকে আনন্দের চাপা গোঙানি, ক্লান্তির দীর্ঘ নিশ্বাস।
মায়ের দিন কাটে ধনীদের বাড়িতে কাপড় কাচায়; অন্ধ স্বামীর দিন কাটে দরিদ্রদের ঘরে কোরআন তিলাওয়াতে। বিকেলে সেই এককক্ষের বাসায় ফিরে আসা তার অভ্যাস ছিল না। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে তিনি পছন্দ করতেন না। তাই ধীরে ধীরে বিকেলেই ফিরতে শুরু করলেন। একটু বিশ্রাম নিতে, আর পরবর্তী রাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে। এক রাতে তিনি স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, বিকেলে তার কী হয়েছিল? এখন তিনি এত প্রাণোচ্ছল, কথাবার্তায় ভরপুর, অথচ বিকেলে কেন এত টানটান, এত নীরব ছিল? তিনি আরও প্রশ্ন করলেন, এখন তিনি আংটি পরেছেন কেন? বিয়ের সময় দেওয়া একমাত্র আংটি, যা বিকেলে তার আঙুলে ছিল না। সে মুহূর্তে স্ত্রীর ইচ্ছে হলো পাগলের মতো চিৎকার করে উঠতে! মনে হলো, কেউ যেন তাকে মেরে ফেলতে চাইছে! এ প্রশ্নের অর্থ তো একটাই—এক অদ্ভুত, কুৎসিত সত্য...
দাম্পত্যে এমন ডুবে গিয়েছিলেন তিনি, যে সন্তানদের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। অপেক্ষা তত দিনে তেতো হয়ে উঠেছে—আসন্ন পাত্ররা ছিল কেবল মরীচিকা। হঠাৎ একদিন যেন চমকে জেগে উঠলেন তিনি—আতঙ্কে সন্ত্রস্ত: তার মেয়েরা ক্ষুধার্ত!
কিন্তু তার দম আটকে গেলেও জবান সামলে নিলেন। কিছুই বললেন না। কান, চোখ, নাক, অনুভূতি—সবটুকু সজাগ করে শুনতে লাগলেন, বোঝার চেষ্টা করলেন—কোন মেয়েটি? তার নিশ্চিত বিশ্বাস—মেজ মেয়েটিই। তার চোখে এমন এক দুঃসাহস, যা গুলির ভয়েও পিছু হটবে না। তিনি শুনতে লাগলেন তিন মেযের শ্বাস—গভীর, উষ্ণ, ওঠানামা করা। শ্বাসের শব্দ ধীরে ধীরে বদলে গেল—সাপের ফোঁস ফোঁসের মতো, উত্তাপে পানিতে বাষ্প ওঠার মতো। তার নিজের দমবন্ধ ভাব আরও ঘনীভূত হলো। এ ছিল ক্ষুধার শ্বাস। তিনি মন দিয়ে শুনলেন, তবু এক জীবন্ত উষ্ণ দেহের শ্বাস আর আরেকটির শ্বাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারলেন না। সবাই যেন অনাহারে, চাপা গোঙানিতে ভরা তাদের নিশ্বাস, ওগুলো আর স্বাভাবিক শ্বাস নয়। হয়তো তারা প্রার্থনা করছে সাহায্যের জন্য—অথবা...আরও কিছুর জন্য।
দাম্পত্যে এমন ডুবে গিয়েছিলেন তিনি, যে সন্তানদের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। অপেক্ষা তত দিনে তেতো হয়ে উঠেছে—আসন্ন পাত্ররা ছিল কেবল মরীচিকা। হঠাৎ একদিন যেন চমকে জেগে উঠলেন তিনি—আতঙ্কে সন্ত্রস্ত: তার মেয়েরা ক্ষুধার্ত!
কোনো কোনো খাবার হারাম হতে পারে, কিন্তু ক্ষুধা তার চেয়েও ভয়ংকর। ক্ষুধার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কিছু নেই, এ সত্য তিনি ভালো করেই জানেন। তার শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন, ক্ষুধা যেন হাড়ের গভীর পর্যন্ত শুষে নেয়। ক্ষুধা নিবারণে খুব বেশি কিছু লাগে না। তবু তার স্বাদ, তার স্মৃতি কখনো ভোলা যায় না।
মেয়েরা ক্ষুধার্ত। একসময় তো তিনি নিজের মুখের আহার তুলে তাদের মুখে দিতেন! নিজে অনাহারে থেকেও তাদের খাইয়েছেন। তিনি তো তাদের মা, তবে কি তিনি ভুলে গেলন...?
তার দমবন্ধ কান্না গিয়ে জমল নীরবতায়। মা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। আর সেই মুহূর্তের পর নীরবতা আর ঘর ছেড়ে গেল না।
সকালের নাশতার সময় মেজ মেয়েটি নীরব থাকল এবং চিরদিনের মতো নীরব হয়ে গেল।
রাতের খাবারের সময় তরুণটি এলেন—অন্ধ, তবু প্রফুল্ল; ঠাট্টা, গান, হাসিতে আগের মতোই উচ্ছল। তার হাসিতে সেদিন সঙ্গ দিল শুধু সবচেয়ে ছোট আর সবচেয়ে বড় মেয়েটি।
অপেক্ষা চলতেই থাকল—এবার তাতে তেতো ধৈর্যের স্বাদ। কেউ এল না।
একদিন বড় মেয়েটি মায়ের আংটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। মায়ের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো। আরও দ্রুত, আরও জোরে—যখন মেয়েটি নিঃশব্দ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল, সে কি আংটিটা এক দিনের জন্য পরতে পারে? নীরবে মা আংটিটা খুলে দিলেন। নীরবতার মধ্যেই বড় মেয়েটি সেটি তুলে নিল নিজের অনামিকায়।
পরবর্তী নৈশভোজে বড় মেয়েটি নীরব হয়ে বসে রইল। একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।
অন্ধ তরুণটি তবু আগের মতোই প্রাণবন্ত। গান, হাসি, উচ্ছ্বাসে ভরা। তার হাসিতে সেদিন সাড়া দিল শুধু সবচেয়ে ছোট মেয়েটি।
তবু আতঙ্কে কাঁপছিলেন তিনিই, এই আশঙ্কায় যে, কোনো একদিন যদি অকল্পনীয় সত্যিটা সামনে এসে যায়? যদি নীরবতার গায়ে ফাটল ধরে? হয়তো একটিমাত্র শব্দই যথেষ্ট, এই নীরবতার নির্মিত কাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে।
কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। সবচেয়ে ছোটটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। একদিন সে-ও প্রশ্ন তুলল, ‘আংটির খেলায়’ তার ভূমিকা কোথায়? নিস্তব্ধতার আড়ালে সে নিজের ভূমিকা গ্রহণ করল—নিঃশব্দে।
লন্ঠনের পাশে আংটি। নিস্তব্ধতা সবখানে; কান যেন বদ্ধ। নীরবতার গভীরে আঙুল ধীরে এগিয়ে আসে, ‘আংটির খেলার’ খেলোয়াড় নিঃশব্দে আংটি পরে নেয়। নিস্তব্ধতার মধ্যেই লন্ঠন নিভে যায়, অন্ধকার নেমে আসে। অন্ধকারে চোখও অন্ধ। হাসে না কেউ, গায় না কেউ, কেবল সেই তরুণ অন্ধ পুরুষটি ছাড়া। তবু তার উচ্ছ্বাসের ঠিক আড়ালেই এক আকুল বাসনা জমে থাকে, যা প্রায় তাকে উসকে দেয় এই নীরবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে, একে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে। জানতে পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই সবার শেষ জন। তবু, আসলে কি তিনি জানেন না? জানার কথা নয় কি? প্রথমে তিনি নিজেকেই বুঝিয়েছিলেন, নারীর স্বভাবই তো পরিবর্তনশীল। কখনো সে ভোরের শিশিরের মতো সজীব, কখনো ক্লান্ত-থমথমে পুকুরজল। কখনো গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল, কখনো ক্যাকটাসের মতো রুক্ষ। আংটি তো সব সময়ই আছে—হ্যাঁ, আছে—তবু যেন আঙুলটাই বদলে যায় প্রতিবার, তিনি প্রায় আঁচ করেই ফেলেছেন। মেয়েরা নিশ্চিত জানে। তবে নীরবতা কথা বলে না কেন? নীরবতা নীরবই থাকে কেন?
একদিন রাতের খাবারের সময় প্রশ্নটি তাকে চমকে দিল—যদি কখনো নীরবতা কথা বলে ওঠে?
এ কথা ভাবতেই তার গলায় খাবার আটকে গেল।
এর পর থেকে তিনি নীরবতার অতলে তলিয়ে গেলেন এবং আর কখনো সেখান থেকে বের হতে চাইলেন না।
তবু আতঙ্কে কাঁপছিলেন তিনিই, এই আশঙ্কায় যে, কোনো একদিন যদি অকল্পনীয় সত্যিটা সামনে এসে যায়? যদি নীরবতার গায়ে ফাটল ধরে? হয়তো একটিমাত্র শব্দই যথেষ্ট, এই নীরবতার নির্মিত কাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। নীরবতা ভাঙার দুঃসাহস যে করবে—আল্লাহ তার সহায় হোন।
সবাই যেন এক অস্বাভাবিক, অন্যরকম নীরবতায় নিমজ্জিত হলো।
এ নীরবতা আর অভাব বা বেদনায় আরোপিত নয়; এটি এখন স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া নীরবতা, এক নীরব আশ্রয়।
এটি ছিল নীরবতার সবচেয়ে গভীর রূপ, যে নীরবতায় পৌঁছানো যায় এক গভীরতম সমঝোতার মাধ্যমে: এক নীরব, অনুচ্চারিত সমঝোতা।
***
বিধবা ও তার তিন মেয়ে...
তাদের এককক্ষের সংসার...
আর সেই নতুন নীরবতা...
যে অন্ধ হাফেজ সেই নীরবতাকে সঙ্গে করে এনেছিলেন, তিনি নীরবতার মধ্যেই নিজেকে আশ্বস্ত করেন যে তার শয্যাসঙ্গিনী তার বৈধ স্ত্রীই, আংটি পরা। কখনো সে তরুণী, কখনো বয়স্ক। কখনো কোমল, কখনো রুক্ষ। কখনো সে একটু বেশি রোগা, কখনো আবার একটু মোটা। এটি একান্তই তার নিজস্ব বিষয়, এ দায়িত্ব কেবল তার স্ত্রীরই। এ দুশ্চিন্তা কেবল তাদেরই, যারা দেখতে পায়; কারণ তাদের হাতে আছে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ। তারা পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু তিনি পারেন কেবল সন্দেহ করতে—আর দৃষ্টিহীনতার অন্ধকারে সন্দেহ কখনো নিশ্চয়তায় রূপ নিতে পারে না। যত দিন তিনি দৃষ্টিবঞ্চিত, তত দিন তিনি অনিশ্চিতই থাকবেন। তিনি অন্ধ মানুষ। আর অন্ধদের তো জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না...
নাকি যায়...?