টমাস ট্রান্সট্রোমারের কবিতা
নীরব গ্লাসের কাচ গলে ঝরে যায় বালুকা
নির্বাচিত কবিতাগুলোর সূত্র হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যবিষয়ক জার্নাল ‘ফাইভ পয়েন্টস্’। সুইডিশ ভাষা থেকে ইংরেজিতে এগুলো অনুবাদ করেছেন প্যাটি ক্রেইন।
• ভাষান্তর: মঈনুস সুলতান
টমাস ট্রান্সট্রোমারের (১৯৩১-২০১৫) জন্ম সুইডেনের স্টকহোম নগরীতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর ইউরোপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কবি ছিলেন পেশাগতভাবে একজন মনস্তাত্ত্বিক। কর্মসূত্রে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। কবিতায় অবদানের জন্য ২০১১ সালে কবি ট্রান্সট্রোমার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা। কিশোর বয়সে কবি আকৃষ্ট হন সংগীতে, শেখেন পিয়ানো বাদন। ১৯৪০ সালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় স্কুল ম্যাগাজিনে। ১৯৫৮ সালে কবি বিবাহিত হন মনিকা ব্লাদের সঙ্গে। পরে তাঁদের জীবনে আসে দুটি কন্যাসন্তান। কবি তাঁর সৃজিত পদাবলিতে আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে যেমন যোজন করেন জীবনবোধের গহন-গভীর ব্যঞ্জনা, তেমনি অনায়াস দক্ষতায় কাব্যভাষাকেও করে তোলেন সরল বর্ণনাধর্মী। প্রকরণে কবি প্রথম থেকেই অত্যন্ত আধুনিক, তবে তাঁর ভাবনাভিত্তিক উপস্থাপনের ভঙ্গিতে লক্ষ করা যায় পরাবাস্তববাদের প্রবল উপস্থিতি। দৃশ্যকল্পের ধারাপ্রবাহকে প্রায়ই তিনি করে তোলেন বিচ্ছিন্নতা ও বিভাজনের প্রতীক।
দম্পতি
বাতি নিভিয়ে দেয় তারা
আর অন্ধকার গ্লাসে আলোর বটিকাটি দ্রবীভূত হওয়ার আগে
শ্বেতকায় বৃত্তাকার ডোমটি উদ্ভাসিত হয়ে থাকে মুহূর্তখানেক
তারপর উঠে যায় ঊর্ধ্বে।
হোটেলের দেয়ালটি ভেসে ওঠে আকাশে।
পারস্পরিক তাগিদের আবেগঋদ্ধ তীব্রতা প্রশমিত হয়ে আসে
আর ঘুমিয়ে পড়ে তারা অতঃপর—
কিন্তু তাদের প্রচ্ছন্ন ভাবনারাজি মিলিত হচ্ছে এখন
স্কুলছাত্রের আঁকা চিত্রের বর্ণলেপনে সিক্ত কাগজে
দুটি রঙের মিশ্রিত ধারার মতো।
অন্ধকার সবকিছু—সুনসান ও শান্ত।
তবে আজ রাতে নগরীটি যেন চলে এসেছে খুব কাছে।
জানালাগুলোর বাতি গোটানো।
ঘরবাড়িগুলো উঠে এসেছে।
সন্নিবদ্ধ হয়ে তারা তৈরি করছে গুচ্ছগ্রাম,
অপেক্ষা করছে—কাছেই—
চোখেমুখে বোবা অভিব্যক্তি নিয়ে একটি জটলা।
ঝংকার
আরেকটি সংগীতপ্রবণ দোয়েল
মৃতদেহের পাঁজরের হাড়ে বসে শিস দিয়ে ওঠে।
একটি গাছের নিচে আমরা এসে দাঁড়াই
আর অনুভব করি
পিছলে যাচ্ছে সময়—পায়ের তলায়—নিচে—আরও নিচে
গোরস্থান ও বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ মিলেমিশে সম্প্রসারিত হতে হতে
মোহনায় আসা ভিন্ন দুটি স্রোতের মতো
পরস্পরের ভেতরে প্রবিষ্ট হচ্ছে।
নাটাইয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ঘড়ির ডানায় উড়ে যাচ্ছে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি।
পৃথিবীর ওপর ফেলে রেখে যাচ্ছে প্রবল নীরবতা
আরেকটি বৃক্ষ আগুয়ান হচ্ছে শান্ত পদক্ষেপে—
অনুভব করি আমরা
একটি উদ্ভিদের সুশান্ত পথপরিক্রমা।
জঙ্গলের ভেতরে
জেকব সোয়াম্প নামের হাজামাজা জলাশয়টি হচ্ছে
দিবসের তলকুঠুরি,
যেখানে আলো পচে গিয়ে তৈরি করে যে টক পানীয়
স্বাদে–গন্ধে তা হয়ে দাঁড়ায়
বৃদ্ধ বয়সে বসবাস করা বস্তির মতো।
কমজোর হয়ে পড়া দৈত্যগুলো এমন গাঢ়ভাবে প্যাচপেচে কাদায় জড়িয়ে আছে যে—
ঝড়-তুফানেও পতন হয় না এদের।
ফেটে যাওয়া বার্চ বৃক্ষগুলো দাঁড়িয়ে আছে যেখানে
ঠিক ওই জায়গায়—কট্টর মতবাদের মতো
দণ্ডায়মান থেকে পচে সারা হয়।
জঙ্গলের ভিটে থেকে আমি উঠে দাঁড়াই।
কাণ্ডগুলোর মাঝামাঝি পরিসর উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আমার ছাদের ওপর ঝরে পড়ে বৃষ্টিপাত।
আমি হচ্ছি ঢালুতে গড়িয়ে পড়া ছাপচিত্র।
বনানীর প্রান্তিকে বয়ে যায় লঘু বাতাস।
অন্ধকারে উল্টে পড়া বিরাটকায় স্প্রুস বৃক্ষটি
নাক–মুখ মাটিতে সেঁধিয়ে পান করছে বৃষ্টিপাতের ছায়া।
সংগীতের স্কেল
ভালোবাসার অন্তরঙ্গ লেনদেন সেরে তারা যখন এসে দাঁড়ায় রাজপথে,
তখন ঘূর্ণিরেখায় বাতাসে ঘুরছিল তুষারের শুভ্র কণা।
এসেছে শীত ঋতু—
শুয়ে পড়ে পরস্পরের কাছে আসে তারা।
তাদের ঘিরে গাঢ় হয়ে জমে ওঠে উজ্জ্বল অন্ধকার।
আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে জোরকদমে হাঁটছিল তারা
সারা শহর ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়,
হাসিমুখে আগ বাড়ে পথচারী—
জ্যাকেটের কলার তুলে দিয়ে সকলে তাকাচ্ছে প্রসন্নমুখে।
চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে মুক্তি!
আর প্রতিটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঈশ্বরের অস্তিত্বের নামগান করে উঠছে—
অন্তত সে ভাবছিল তা–ই।
স্বরলিপির বন্ধনমুক্ত হয়ে একটি সুরমূর্ছনা
দীর্ঘ পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছে ঘূর্ণায়মান তুষারকুচির ভেতর দিয়ে।
পথপার্শ্বের প্রতিটি বস্তুনিচয় ঝংকৃত হতে হতে পৌঁছেছে ধৈবতে,
সুর–লয়ে বিভোর হয়ে কম্পাসের কম্পমান কাঁটাও নির্দেশ করছে স্বরলিপির সঠিক সংকেতের দিকে,
যন্ত্রণা ছাপিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে শোভন সময়—
খুব সহজ!
জ্যাকেটের কলার তুলে দিয়ে সকলে তাকাচ্ছে প্রসন্নমুখে।
প্রাসাদ
ঢুকে পড়ি আমরা অট্টালিকার ভেতরভাগে।
পুরো পরিসরজুড়ে বিস্তৃত বিরাট এক হল–কামরা,
তুমুল নির্জনতা ভরে আছে শূন্যতায়
পায়ের নিচে নকশা করা নগ্ন মেঝেটিকে দেখায় নগরীর পতিত এক স্কেটিং রিংয়ের মতো।
প্রতিটি দরজা বন্ধ, বাতাসও বোধ করি এখানে বিবর্ণ বাদামি।
দেয়ালের বোবা চিত্ররাজিতে প্রাণহীন খণ্ডদৃশ্য পরস্পরের দিকে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে, সময়ের হিমবাহে জমে আছে তাদের মিথস্ক্রিয়া।
ঢাল, তৈজসপত্র, সংরক্ষিত মাছ ও মূর্তিরাজি যেন বা বসবাস করছে নির্বাক এক বধির জগতে।
সমগ্র শূন্যতাজুড়ে দাঁড়িয়ে পেল্লায় একটি ভাস্কর্য:
কামরার মধ্যিখানে একাকী দাঁড়িয়ে একটি অশ্ব,
আমরা বিপুল শূন্যতার মাঝে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়েছিলাম যে
ঘোড়াটিকে প্রথমত একদম খেয়ালই করিনি।
শহর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর ও হরেক রকম শব্দরাজিকে শোনাচ্ছে শঙ্খের অভ্যন্তরে সমুদ্রের ম্রিয়মাণ ধ্বনির মতো। আওয়াজের রেশ মর্মরিত হয়ে অনুসন্ধান করছে শক্তির উৎস।
আরেকটি বিষয়। আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দোরগোড়ায় কিছু একটা অন্ধকার যেন প্রোথিত হয়ে আছে, আমরা অনুভব করি তাদের অস্তিত্ব, কিন্তু তা অতিক্রম করে না সংবেদনের চৌকাঠ। প্রতিটি নীরব গ্লাসের কাচ গলে ঝরে যায় বালুকা।
সময় হয়েছে সামনে বাড়ার। অশ্বটিকে নিশানা করে আমরা এগিয়ে যাই। জন্তুটি বিরাট—বর্ণে লোহার মতো কালো। রাজন্যকুল বিগত হওয়ার পর পেছনে পড়ে আছে তাদের ক্ষমতার প্রতিমূর্তি।
কথা বলে ওঠে ঘোড়াটি: ‘আমিই একমাত্র সত্তা যে পিঠে চেপে বসে চড়তে থাকা শূন্যতাকে ছুড়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছি। এটা হচ্ছে আমার আস্তাবল। এখানে আমি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছি। আর নীরবতা হয়ে উঠেছে আমার আহার।’
নিশাচর
একটি গ্রামের ভেতর দিয়ে আমি নিশিরাতের গভীর অন্ধকারে গাড়ি হাঁকাই।
হেডলাইটের তীব্র আলোয় ঘরবাড়িগুলো এগিয়ে আসে সামনে—
জেগে আছে গৃহরাজি, মনে হয় তারা তৃষ্ণার্ত, খোঁজ করে পানীয়।
কুটির, গোলাঘর, ফলক ও যানবাহনগুলো—
এখনই এসেছে শুভলগ্ন
এসেছে এদের জীয়ন্ত হয়ে ওঠার সুসময়।
নিঝুম নিদ্রায় তালিয়ে আছে মানবকুল।
কেউ কেউ নিবিড় শান্তিতে নিমগ্ন থাকে গাঢ় নিদ্রায়,
কিন্তু কারও কারও মুখে লেগে আছে ছাপ
যেন বা তারা অনন্তকালের প্রতীক্ষায় কঠোর প্রশিক্ষণে প্রস্তুত হচ্ছে—
যা আছে যথাসর্বস্ব—কোনো দ্রব্যসম্ভার—কোনো বিত্ত
কোনো কিছুই ছেড়ে–ছুড়ে ফেলে দিতে সাহস পায় না তারা
এমনকি যখন তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন—
গেটে তালা দিয়ে গাঢ় বিশ্রামে তলিয়ে যায় তারা
আর চুপিসারে রহস্যের ধারাস্রোত অতিক্রম করে চৌকাঠ।
গ্রামটি ছাড়িয়ে সড়ক চলে গেছে বহুদূর—বনানীর ভেতর দিয়ে
আর গাছগুলো—সারির পর সারি—পরস্পরের সাথে একাট্টা হয়ে গেঁথে আছে নীরব এক সূত্রে।
বৃক্ষরাজির অবয়বে নাটকীয় বর্ণ, যা পাওয়া যায়
শুধু প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের আভায়।
প্রতিটি পত্রালি কী রকম সহমর্মী!
আমাকে অনুসরণ করে চলে আসে আমার বসতবাটি অব্দি।
ঘুমানোর প্রস্তুতিতে অতঃপর আমি শুয়ে পড়ি,
আর দেখি—অচেনা দৃশ্যরাজি ও চিহ্নমালা
আমার অক্ষিকোটরের পেছন দিককার অন্ধকার দেয়ালে লিখে চলে এলোমেলো রেখায় হিজিবিজি।
স্বপ্ন আর জাগরণের মধ্যবর্তী ভূভাগে
বিরাট একটি হরফ—যুঝে যুঝে অযথা চেষ্টা করে যাচ্ছে পথ তৈরি করে নেওয়ার।